রহিমার ফ্যাক্টরিতে নতুন মেশিন
যখন একটা ক্যামেরা রহিমার চেয়ে ভালো দেখে
১
বোতাম গুনছে রহিমা।
একশো বারো। একশো তেরো। একশো চৌদ্দ।
এটা অভ্যাস। ছোটবেলা থেকে। বাবা বলত, "তুই কি পাগল? সবকিছু গুনতে হবে?" রহিমা বলত, "গুনলে জিনিস হারায় না।" বাবা আর কিছু বলত না। বাবা জানত, রহিমার সাথে তর্ক করে লাভ নেই।
একশো পনেরো। একশো ষোলো।
সকাল সাতটা বাজে। গাজীপুরের রাস্তায় এখনো কুয়াশা। ফ্যাক্টরির ভেতরে টিউবলাইটের সাদা আলো। চারদিকে সেলাই মেশিনের আওয়াজ, যেন হাজারটা ঝিঁঝিঁ পোকা একসাথে ডাকছে। রহিমা আঠারো বছর ধরে এই আওয়াজ শুনছে। এখন আর শুনতে পায় না। শব্দটা তার শরীরের ভেতরে ঢুকে গেছে, হৃদপিণ্ডের তালের সাথে মিশে গেছে।
একশো সতেরো।
"রহিমা আপা, চা।"
ছোট মেয়েটা, সালমা, চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে। সালমা নতুন এসেছে। তিন মাস হয়নি। চোখে এখনো ভয় আছে। রহিমা যখন প্রথম এসেছিল, তার চোখেও ভয় ছিল। সেটা কবে? ২০০৮ সালে। তখন সে কুড়ি বছরের মেয়ে। পেটে মিতু। স্বামী আলম তখন সবে রিকশা চালানো শুরু করেছে।
"রাখ। পরে খাব।"
সালমা চলে গেল। রহিমা বোতাম গুনতে লাগল।
একশো আঠারো। একশো উনিশ। একশো কুড়ি।
ঠিক আছে। একটাও কম নেই।
রহিমা কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর। সোয়েটার বানানোর পর শেষ ধাপে সে দেখে। সেলাই ঠিক আছে কিনা। বোতাম ঠিক আছে কিনা। রঙ মিলছে কিনা। সুতার মাথা বেরিয়ে আছে কিনা। একটা সোয়েটার হাতে নিলে রহিমা ত্রিশ সেকেন্ডে বলে দিতে পারে কোথায় সমস্যা। চোখ দুটো যেন এক্স-রে মেশিন।
আজ সকালে ফ্লোর ম্যানেজার জাহিদ সবাইকে ডেকে বলল, "আজ একটু তাড়াতাড়ি শেষ করবেন সবাই। দুপুরে একটা নতুন মেশিন আসবে।"
"কী মেশিন?" রহিমা জিজ্ঞেস করল।
"ক্যামেরা।"
"ক্যামেরা? আমাদের ছবি তুলবে নাকি? আমি তো আজ ভালো শাড়ি পরে আসিনি।"
লাইনে হাসির শব্দ। জাহিদ হাসল না।
"কোয়ালিটি চেকের ক্যামেরা। এআই ক্যামেরা।"
রহিমা "এআই" শব্দটা শুনেছে। মিতু মাঝে মাঝে বলে। ফোনে কিছু একটা দেখায়, বলে, "এটা এআই দিয়ে করা, আম্মা।" রহিমা বোঝে না। বোঝার দরকারও মনে করে না। মেয়ে পড়াশোনা করছে, এটাই যথেষ্ট।
"এআই ক্যামেরা কী করবে?" পাশ থেকে নাসরিন জিজ্ঞেস করল।
"সোয়েটার দেখবে। ত্রুটি ধরবে।"
একটু চুপচাপ। তারপর রহিমা বলল, "ওহ। তাহলে ক্যামেরাটা আমার কাজ করবে।"
জাহিদ কিছু বললো না। সেটাই উত্তর।
২
দুপুর দুইটায় মেশিনটা এলো।
দেখতে অনেকটা বড় একটা ল্যাম্পপোস্টের মতো। ওপরে একটা বাক্স, বাক্সের সামনে কাচ। নিচে একটা সমতল জায়গা, যেখানে সোয়েটার রাখতে হবে। পাশে একটা মনিটর। একজন চায়নিজ ইঞ্জিনিয়ার এসেছে, সাথে একজন বাঙালি ছেলে। বাঙালি ছেলেটা অনুবাদ করছে।
"এটা প্রতিটা সোয়েটার স্ক্যান করবে। সেলাইয়ের ত্রুটি, রঙের তারতম্য, বোতামের অবস্থান, সবকিছু চেক করবে। প্রতিটা স্ক্যানে তিন সেকেন্ড লাগবে।"
তিন সেকেন্ড। রহিমার লাগে ত্রিশ সেকেন্ড।
রহিমা মেশিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। মেশিনটা কিছু বলল না। মেশিনরা কথা বলে না। এটাই তাদের সুবিধা। কারো সাথে ঝগড়া করে না, চা-বিরতি চায় না, ওভারটাইমের টাকা চায় না, বাচ্চা অসুস্থ বলে ছুটি নেয় না।
চায়নিজ ইঞ্জিনিয়ার একটা সোয়েটার রাখল মেশিনের ওপর। মনিটরে কিছু একটা দেখালো। সবুজ। মানে ঠিক আছে।
আরেকটা রাখল। আবার সবুজ।
তৃতীয়টা রাখতেই মনিটর লাল হয়ে গেল। মনিটরে সোয়েটারের একটা ছবি, আর ছবিতে একটা জায়গায় লাল বৃত্ত। বাঙালি ছেলেটা বলল, "বাম হাতার সেলাইয়ে সমস্যা পেয়েছে। দুই মিলিমিটার ফাঁক।"
জাহিদ সোয়েটারটা হাতে নিয়ে দেখল। ভ্রু কুঁচকে গেল। "সত্যিই তো।"
রহিমা বলল, "দেখি।"
সোয়েটারটা হাতে নিল। বাম হাতা। চোখ কুঁচকে দেখল। দুই মিলিমিটার। সত্যিই। এটা সে মিস করেছে। আজ সকালের ব্যাচে এটা তার হাত দিয়ে পাস হয়ে গেছে।
রহিমার মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে সোয়েটারটা আলতো করে নামিয়ে রাখল।
"ভালো মেশিন," সে বলল। গলার স্বর সমান।
নাসরিন পাশ থেকে ফিসফিস করল, "আপা, ভয় লাগতেছে।"
রহিমা বলল, "ভয়ের কিছু নাই। মেশিন তো। মেশিন আসে, মেশিন যায়।"
কিন্তু রহিমা জানে, মেশিন আসে। মেশিন যায় না।
সেলাই মেশিন এসেছিল। হাতে সেলাই করা মানুষগুলো চলে গেছে। কাটিং মেশিন এসেছিল। হাতে কাটা মানুষগুলো চলে গেছে। মেশিন কখনো যায় না। মানুষ যায়।
বিকেলের দিকে ইঞ্জিনিয়াররা চলে গেল। মেশিনটা রয়ে গেল। ফ্লোরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চুপ। অপেক্ষা করছে।
রহিমা একবার পেছন ফিরে তাকাল। মেশিনের কাচের চোখটা যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। অবশ্যই তাকিয়ে নেই। মেশিন তাকায় না। মেশিন দেখে।
৩
সন্ধ্যা সাতটায় রহিমা বাসায় ফিরল।
বাসা বলতে দুইটা ঘর। একটা ঘরে সবাই ঘুমায়, আরেকটায় রান্না হয়। টিনের চাল। দেয়ালে চুনকাম উঠে গেছে জায়গায় জায়গায়। দরজার পাশে একটা টবে মরিচগাছ, ফল ধরেনি কোনোদিন, তবু রহিমা পানি দেয়। কিন্তু ঘর পরিষ্কার। রহিমা ময়লা সহ্য করতে পারে না। এটা তার আরেকটা অভ্যাস।
আলম রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেছে। রাতের শিফট। রাতে ভাড়া বেশি পাওয়া যায়। রাজু খেলতে গেছে। মিতু ঘরে বসে ফোন দেখছে।
"কী দেখছিস?"
"পড়ছি, আম্মা। ক্লাস।"
মিতু অনলাইনে পড়ে। ফোনে। ইউটিউবে। খান একাডেমি নামে কিছু একটা। রহিমা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "খান কোন খান? আমাদের পাড়ার খান সাহেব?" মিতু হেসে বলেছিল, "না আম্মা, আমেরিকার খান।" রহিমা বলেছিল, "আমেরিকার খান আমাদের পড়ায়। জিনিসপত্র কেমন উলটাপালটা হয়ে গেছে।"
আজ রহিমা জিজ্ঞেস করল, "এআই কী রে?"
মিতু ফোন থেকে চোখ তুলল। "কেন?"
"এমনি।"
"এআই মানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কম্পিউটার নিজে নিজে শেখে। মানুষের মতো চিন্তা করে।"
"মানুষের মতো?"
"হুম। ছবি দেখে বুঝতে পারে। কথা বুঝতে পারে। লিখতে পারে।"
রহিমা চুপ করে রইল। তারপর বলল, "সেলাইয়ের ভুলও দেখতে পারে?"
"হ্যাঁ, পারে। ক্যামেরা দিয়ে দেখে।"
"তিন সেকেন্ডে?"
মিতু একটু অবাক হলো। "হ্যাঁ, এমনকি তার চেয়েও কম সময়ে। আম্মা, তোমার ফ্যাক্টরিতে এসেছে নাকি?"
রহিমা উত্তর দিল না। উঠে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। ভাত বসাতে হবে। রাজু খেলা শেষে ক্ষুধার্ত আসবে। আলম রাত এগারোটায় ফিরবে, তার জন্যও রাখতে হবে।
চাল ধুতে ধুতে রহিমা গুনল। চাল গোনা যায় না, তবু সে গুনল। এক মুঠো। দুই মুঠো। তিন মুঠো। চার মুঠো। পাঁচজনের চার মুঠো। এক মুঠো বাড়তি রাখল। আলম বেশি খায়। রিকশা চালালে পেটে খিদে লাগে।
রান্না করতে করতে রহিমা হিসেব করল।
তার মাসিক বেতন বারো হাজার টাকা। ওভারটাইম মিলিয়ে চৌদ্দ-পনেরো হাজার হয়। আলমের রিকশায় আসে আট-দশ হাজার। মোট বাইশ-পঁচিশ হাজার। ভাড়া সাত হাজার। মিতুর কোচিং তিন হাজার। রাজুর স্কুল দুই হাজার। বাকি থাকে দশ-তেরো হাজার। এই দিয়ে খাওয়া, কাপড়, ওষুধ, যাতায়াত। মাসের শেষে কিছু থাকে না। কখনো কখনো মাইনাস হয়। তখন ধার করতে হয়। পরের মাসে শোধ করতে হয়। চক্র।
যদি ক্যামেরা তার কাজ নিয়ে নেয়?
বারো হাজার টাকা চলে যাবে। শুধু আলমের আয়ে সংসার চলবে না। মিতুর পড়া বন্ধ হবে। মিতু হয়তো কোনো ফ্যাক্টরিতে ঢুকবে। মিতুর চোখেও ভয় থাকবে, সালমার মতো।
রহিমা ভাতের হাঁড়িতে পানি ঢালল। হাত কাঁপল। একটুই। কেউ দেখেনি।
৪
রাতে রাজু ঘুমিয়ে গেছে। আলম এখনো ফেরেনি। মিতু পাশের ঘরে ফোনে কিছু দেখছে। ফোনের আলো দরজার ফাঁক দিয়ে আসছে।
রহিমা উঠে গেল। দরজার কাছে দাঁড়াল।
মিতু মেঝেতে বসে আছে। কোলের ওপর একটা খাতা। ফোনে কেউ একজন ইংরেজিতে কিছু বলছে। মিতু শুনছে, খাতায় লিখছে। মুখটা একটু কাত করে, যেভাবে রহিমা সোয়েটারের সেলাই দেখার সময় মুখ কাত করে।
মেয়েটা তার মতো দেখতে। একই চোয়াল। একই ভ্রু। একই একগুঁয়ে চোখ।
কিন্তু মেয়েটা তার মতো হবে না। হওয়া যাবে না। রহিমা এজন্য প্রতিদিন চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করে। এজন্য ওভারটাইম করে। এজন্য শরীর ভেঙে যাচ্ছে জেনেও সকাল সাতটায় ফ্যাক্টরিতে ঢোকে। মিতু পড়বে। মিতু চাকরি করবে। মিতু অফিসে বসবে। মিতুর হাতে সোয়েটার থাকবে না, কম্পিউটার থাকবে।
মিতু ফোনের স্ক্রিন সোয়াইপ করল। নতুন একটা পেজ খুলল। রহিমা দেখল, স্ক্রিনে অনেক ইংরেজি লেখা। একটা শব্দ চিনল। "এআই"।
মিতু এআই নিয়ে পড়ছে।
রহিমার বুকে কিছু একটা নড়ে উঠল। আনন্দ? গর্ব? হতে পারে। কিন্তু তার সাথে আরেকটা কিছু মিশে আছে। সেটা কী, রহিমা বুঝতে পারল না। চিনতেও পারল না। শব্দটা তার জানা নেই।
রহিমা শুধু দেখল, মেয়েটা পড়ছে। এটুকুই।
রহিমা দরজা থেকে সরে এলো। বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল।
তিন সেকেন্ড।
একটা ক্যামেরা তিন সেকেন্ডে দেখে যা রহিমা ত্রিশ সেকেন্ডে দেখে। দশগুণ দ্রুত। ক্যামেরা ক্লান্ত হয় না। ক্যামেরার চোখ ঝাপসা হয় না। ক্যামেরা দুই মিলিমিটার মিস করে না।
আঠারো বছর।
রহিমা আঠারো বছর ধরে সোয়েটার দেখছে। কত হাজার সোয়েটার তার হাত দিয়ে গেছে সে জানে না। গুনতে পারেনি। এটাই একমাত্র জিনিস যেটা সে গুনতে পারেনি।
টিনের চালে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। মার্চের বৃষ্টি। আগে আগে এসে গেছে। টিপটিপ। টিপটিপ। রহিমা গুনল। এক ফোঁটা। দুই ফোঁটা। তিন ফোঁটা।
পাশের ঘর থেকে ফোনের আলো এখনো আসছে।
মিতু পড়ছে।
রহিমা গুনছে।