জাহিদের ক্রেন এখন নিজেই চলে

রিয়াদে একটি বাংলাদেশি শ্রমিকের শেষ দিনগুলো

পর্ব ৪ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

দুপুরে রোদ এত তীব্র যে বালির ওপর থেকে বাতাস কাঁপে। জাহিদ একটু দূরে, অর্ধেক ছায়ায় বসে ভাত খাচ্ছে। তরকারি কম, ডাল বেশি। বারো বছর ধরে এই শহরে একই খাবার খেয়ে সে এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে স্বাদ আর কিছু মনে করিয়ে দেয় না। না বাড়ির কথা, না রশিদার হাতের রান্নার কথা। শুধু খায়। শেষ করে। উঠে দাঁড়ায়।

কিন্তু আজ ভাত খেতে খেতে সে সাইটের দিকে তাকিয়ে আছে।

ক্রেনটা নতুন। গত সপ্তাহে এসেছে। দেখতে আগেরগুলোর মতোই, হলুদ রঙ, লম্বা বুম, তারের জাল। কিন্তু ক্যাবে কেউ নেই। কেউ বসে নেই। কেউ লিভার ধরে নেই। ক্রেনটা নিজেই ঘুরছে, নিজেই থামছে, নিজেই লোড তুলছে। একটা সেন্সরের আলো জ্বলে, তারপর বুম ঘোরে, তারপর স্টিলের বিমটা এত ধীরে ধীরে নামে যে মনে হয় কেউ অদৃশ্য হাতে রাখছে।

জাহিদ চামচ থামিয়ে দেখে।

তার দল ওই একই কাজ করত। ছয়জন মিলে। রশি বাঁধা, সিগন্যাল দেওয়া, লোড গাইড করা। তিন ঘণ্টা লাগত চারটা বিম বসাতে। ক্রেনটা দশ মিনিটে একটা বসিয়ে ফেলল। কোনো চিৎকার নেই, কোনো হাত নাড়া নেই, কোনো ভুল নেই।

জাহিদ ভাতের প্লেটের দিকে তাকায়। তরকারির তেল জমে গেছে। সে প্লেট সরিয়ে রাখে।

---

বিকেলে সুপারভাইজর আবু তালাল সাইটে আসে। সৌদি, বয়স তিরিশের কম, সবসময় সানগ্লাস পরা। জাহিদকে সে চেনে। বারো বছর এখানে, একটা দিনও ছুটি মিস করেনি, কোনোদিন কোনো সমস্যা করেনি। তালাল মাঝে মাঝে তাকে "ইয়া জাহিদ" বলে ডাকে, যেটা এখানকার হিসেবে সম্মানের।

আজ তালাল ক্রেনের দিকে তাকিয়ে বলল, "শুফ, জাহিদ। ওয়াহিদ মিন আহসান। দেখো, এটা সেরাগুলোর একটা।"

জাহিদ মাথা নাড়ল।

তালাল আরেকটু এগিয়ে গেল, তারপর কাঁধের ওপর দিয়ে ফিরে তাকিয়ে বলল, একটু হালকা গলায়, যেভাবে মানুষ আবহাওয়ার কথা বলে, "আগামী বছর কম লোক লাগবে।"

সে চলে গেল। জাহিদ দাঁড়িয়ে রইল। বাক্যটা বাতাসে ভাসতে থাকল, যেন ধুলোর একটা স্তর, যেটা কোথাও বসছে না।

---

জাহিদের বয়স চুয়াল্লিশ। সে নেত্রকোণা থেকে এসেছে। দুই হাজার চোদ্দ সালে, মেজো মেয়ে ফারিনের জন্মের দুই মাস পরে। দালালকে দুই লাখ দিয়েছিল। সেই টাকা শ্বশুরের কাছ থেকে ধার। শ্বশুর মারা গেছেন, ধার শোধ হয়েছে, কিন্তু জাহিদ এখনো এখানে।

প্রতি মাসে সে রশিদাকে টাকা পাঠায়। নির্দিষ্ট অঙ্ক। কারিমের এজেন্টের মাধ্যমে। কারিম গ্রামেই থাকে, রশিদার বাড়ি থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ। জাহিদ রিয়াদ থেকে কারিমের হিসেবে টাকা পাঠায়, কারিম রশিদার হাতে দিয়ে আসে। এতে সুবিধা, ব্যাংকের ঝামেলা নেই। অসুবিধা, কারিম দুই শতাংশ রাখে। জাহিদ হিসেব করেছে, বারো বছরে কারিম তার কাছ থেকে প্রায় এক লাখ আশি হাজার টাকা কমিশন নিয়েছে। এটাও সে খাতায় লিখে রেখেছে।

খাতাটা জাহিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। একটা সাধারণ খাতা, নীল মলাট, ওপরে আরবিতে কিছু লেখা যেটা সে পড়তে পারে না। দোকানদার বলেছিল তিন রিয়াল, জাহিদ দুই রিয়ালে কিনেছিল। সেই খাতায় প্রতিটা মাসের হিসেব আছে। তারিখ, অঙ্ক, কার মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, কী কাজে খরচ হবে।

"ফেব্রুয়ারি ২০২৫ -- ২৮,০০০ -- কারিম -- ফারিনের স্কুল" "মার্চ ২০২৫ -- ৩৫,০০০ -- কারিম -- বাড়ির টিন" "এপ্রিল ২০২৫ -- ২৫,০০০ -- কারিম -- রশিদার চিকিৎসা"

এভাবে পাতার পর পাতা। জাহিদের হাতের লেখা ছোট, পরিষ্কার, বাংলা অক্ষরগুলো সোজা। যে মানুষ দিনের বেলা ক্রেনের নিচে ইস্পাত ধরে, সে রাতে এই অক্ষরগুলো লেখে, যত্ন করে, যেন প্রতিটা সংখ্যা একটা প্রার্থনা।

---

রাত নয়টায় সে রশিদাকে ফোন করে। হোয়াটসঅ্যাপে। রশিদা প্রথমে ধরে না, তারপর ধরে। পেছনে টিভির আওয়াজ, সম্ভবত নাটক।

"কেমন আছো?" জাহিদ বলে।

"আছি। তুমি?"

"আছি।"

এই দুটো বাক্য দিয়ে তাদের প্রতিটা ফোনকল শুরু হয়। বারো বছর ধরে। এই "আছি"-র ভেতরে কী আছে সেটা কেউ জিজ্ঞেস করে না।

রশিদা বলে, "রাহাতের পরীক্ষা ভালো হয়েছে। ক্লাসে থার্ড।"

"ভালো।"

"ফারিন জিজ্ঞেস করে, আব্বু কবে আসবে।"

জাহিদ একটু চুপ থাকে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। লেবার ক্যাম্পের গলি, দূরে একটা মসজিদের মিনার, তার ওপরে আকাশ যেটা এখানে কখনো পুরো অন্ধকার হয় না।

"শিগগিরই।"

তিন বছর ধরে সে এই একই কথা বলছে। রশিদাও জানে। কিন্তু কেউ এটা নিয়ে কিছু বলে না। "শিগগিরই" একটা শব্দ না, একটা চুক্তি। যতদিন এই শব্দটা আছে, ততদিন সবকিছু ঠিক আছে এমন ভান করা যায়।

রশিদা বলে, "ফারিনের জুতো ছিঁড়ে গেছে।"

"পাঠাচ্ছি।"

"আর রান্নাঘরের চালটা..."

"হ্যাঁ, পাঠাচ্ছি।"

ফোন রেখে দেয়। কল চলেছে চার মিনিট বিশ সেকেন্ড। এটাও একটা হিসেব। জাহিদ সব হিসেব রাখে। কিন্তু এই হিসেবটা সে খাতায় লেখে না।

---

ক্যাম্পে ফেরার পর সে বিছানায় বসে। রুমে আরো তিনজন, সবাই বাংলাদেশি। শামীম সিলেট থেকে, দুই বছর হলো এসেছে। হাবিব কুমিল্লা, পাঁচ বছর। ইউসুফ ময়মনসিংহ, সাত বছর। কেউ কারো সাথে বেশি কথা বলে না। দিনের শেষে সবাই এত ক্লান্ত যে কথা বলার শক্তি থাকে না, আর এত একা যে কথা বলার ইচ্ছাও থাকে না।

শামীম ফোনে গেম খেলছে। হাবিব নামাজ পড়ছে। ইউসুফ ঘুমিয়ে গেছে। জানালার পাশে একটা প্লাস্টিকের বোতলে কেউ একটা মানিপ্ল্যান্ট লাগিয়েছে, কে লাগিয়েছে কেউ জানে না, কিন্তু কেউ ফেলেও দেয়নি।

জাহিদ ফোনে ইউটিউব খোলে। সে প্রতি রাতে বাংলাদেশের ভিডিও দেখে। খবর না, সেটা দেখলে ঘুম আসে না। সে দেখে গ্রামের ভিডিও। কেউ পুকুরে মাছ ধরছে, কেউ ধান কাটছে, কেউ নৌকায় বসে গান গাইছে। এগুলো দেখলে কিছুক্ষণের জন্য মনে হয় সে ওখানে আছে। তারপর ভিডিও শেষ হয়, পর্দায় আরেকটা ভিডিওর থাম্বনেইল আসে, এবং সে আবার রিয়াদে ফিরে আসে।

আজ রাতে ভিডিও দেখতে ইচ্ছে করছে না।

সে খাতাটা বের করে। নীল মলাটের খাতা। পেন্সিল দিয়ে নতুন লাইনে তারিখ লেখে। ২০২৬, মার্চ, ১৮। তারপর থামে।

অঙ্ক লেখার কথা। কত টাকা পাঠাবে, কার মাধ্যমে, কী কাজে। কিন্তু আজ অঙ্ক আসে না। আজ একটা বাক্য আসে। সে লেখে, ধীরে ধীরে, প্রতিটা অক্ষর আলাদা আলাদা করে, যেন কোনো পরীক্ষার উত্তর লিখছে যেটার নম্বর পাওয়ার কোনো উপায় নেই।

"ক্রেন এখন নিজেই চলে।"

পেন্সিল রেখে দেয়। বাক্যটার দিকে তাকায়। পাঁচটা শব্দ। এই পাঁচটা শব্দে তার বারো বছর আছে, দুই লাখ টাকার ঋণ আছে, কারিমের দুই শতাংশ কমিশন আছে, ফারিনের ছেঁড়া জুতো আছে, রশিদার "কবে আসবে" আছে, তালালের "কম লোক লাগবে" আছে।

সে খাতা বন্ধ করে।

---

ঘুম আসে না।

জাহিদ বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছাদে একটা ফাটল আছে, বাম দিক থেকে ডান দিকে চলে গেছে, একটা নদীর মতো। সে এই ফাটলটা বারো বছর ধরে দেখছে। কখনো ভেবেছে এটা পদ্মা, কখনো ভেবেছে সোমেশ্বরী। আজ রাতে সেটা শুধু একটা ফাটল।

পাশের রুম থেকে কারো নাক ডাকার আওয়াজ আসছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। এসি চলছে, কিন্তু ঘরটা গরম। এখানে সবকিছু গরম। বালি গরম, রাস্তা গরম, লোহা গরম, বাতাস গরম। শুধু মানুষগুলো ঠান্ডা। মানুষগুলো এত ঠান্ডা যে কেউ কাউকে ছুঁলে বোঝা যায় না।

জাহিদ উঠে জানালার কাছে যায়।

সাইটটা দেখা যায় এখান থেকে। রাতে কাজ বন্ধ, কিন্তু আলো জ্বলে। সারারাত আলো জ্বলে। নিরাপত্তার জন্য, তারা বলে। সাদা আলো, হলুদ আলো, মাঝে মাঝে একটা লাল আলো জ্বলে আবার নেভে। ক্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে, অন্ধকারে একটা কঙ্কালের মতো। কাল সকালে আবার চলবে। নিজে নিজে। কারো সাহায্য ছাড়া। কোনো ক্লান্তি ছাড়া। কোনো বাড়ি ফেরার ইচ্ছা ছাড়া।

জাহিদ ভাবে, ওই ক্রেনের কোনো খাতা নেই। কোনো রশিদা নেই। কোনো ফারিন নেই যে জিজ্ঞেস করবে আব্বু কবে আসবে। ক্রেনের "শিগগিরই" বলার দরকার নেই। ক্রেন শুধু কাজ করে। নিখুঁতভাবে। নিঃশব্দে। এবং এটাই সমস্যা।

জাহিদ জানালা থেকে সরে আসে। বিছানায় শোয়। চোখ বন্ধ করে।

ঘুম আসে না।

খাতাটা বালিশের নিচে। সেখানে একটা নতুন বাক্য আছে যেটা আগে কখনো ছিল না। বারো বছরে সে শুধু সংখ্যা লিখেছে। আজ প্রথমবার একটা বাক্য লিখেছে।