সেলিনার হাতে জাদুর ট্যাবলেট
সুনামগঞ্জের হাওরে যখন AI আসে
*সুনামগঞ্জের হাওরে যখন AI আসে*
---
নৌকাটা একটু ডানে কাত হলে সেলিনার বুকটা ধক করে ওঠে। প্রতিদিন ওঠে। সাত বছর ধরে এই নৌকায় চড়ে, তবু অভ্যাস হয়নি। মাঝি রহমত চাচা বলেন, "ভয় পাস ক্যান? পানিতে পড়লেও তোরে ধরুম।" সেলিনা বলে, "চাচা, আমি পানিতে পড়লে আপনি আগে নৌকা বাঁচাবেন। আমাকে না।" রহমত চাচা হাসেন। কথাটা সত্য, তাই হাসেন।
চারদিকে পানি। হাওর মানেই পানি। আকাশ আর পানির মাঝখানে একটা পাতলা সবুজ রেখা, সেটাই গ্রাম। সেলিনা ফোনটা বের করে দেখে, নেটওয়ার্ক নেই। সুনামগঞ্জের এই অংশে নেটওয়ার্ক একটা গুজবের মতো, কেউ কেউ পেয়েছে বলে দাবি করে, কিন্তু প্রমাণ কেউ দেখাতে পারে না।
সেলিনা কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার। সরকারি ভাষায় "স্বাস্থ্য সহকারী।" বেতন আসে, কিন্তু দেরিতে আসে। কখনো দুই মাস, কখনো তিন মাস। সেলিনার মা বলেন, "তোর বাবা বেঁচে থাকলে তোরে এই চাকরি করতে দিত না।" সেলিনা বলে, "বাবা বেঁচে থাকলে আমাকে তালাকও দিত না আমির।" মা চুপ হয়ে যান। এই যুক্তিতে মা সবসময় হারেন।
আট বছরের ছেলে সোহেল স্কুলে যায়। মায়ের সাথে থাকে। সোহেলের বাবা আমির ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করে, মাসে একবার ফোন করে, টাকা পাঠায় না। সেলিনা ভাবে, তালাক দিয়ে ভালোই করেছে। অন্তত ফোনে মিথ্যা শোনা লাগে না। তালাক একটা সৎ জিনিস, সেলিনা মনে করে।
আজ সেলিনা যাচ্ছে তাহিরপুরে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটা ট্রেনিং। সরকারি ট্রেনিং মানেই বিস্কুট, চা, আর একটা সাইনবোর্ডের সামনে গ্রুপ ছবি। তারপর সার্টিফিকেট। ট্রেনিংয়ে কী শেখানো হলো সেটা কেউ মনে রাখে না, কিন্তু বিস্কুটের ব্র্যান্ড সবাই মনে রাখে। গত ট্রেনিংয়ে "ড্যানিশ" ছিল, তার আগেরবার "টিপটপ।"
নৌকা থেকে নেমে সেলিনা অটোতে উঠল। তাহিরপুর যেতে আরো বিশ মিনিট। অটোতে আরো তিনজন স্বাস্থ্য সহকারী। সবাই চেনা। রুবিনা, পারভীন, আর জোহরা আপা। জোহরা আপা বিশ বছর ধরে এই কাজ করেন, উনার কাছে সব রোগের একটাই ওষুধ: প্যারাসিটামল আর উপদেশ। "জ্বর? প্যারাসিটামল খাও। কাশি? প্যারাসিটামল খাও আর গরম পানি খাও।" সেলিনা মনে মনে ভাবে, জোহরা আপা নিজেই একটা যন্ত্র, শুধু একটাই হিসেব জানেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঢুকে দেখে, আজকের ট্রেনিং একটু আলাদা। ঢাকা থেকে দুইজন এসেছে। একজন মেয়ে, চুল ছোট করে কাটা, জিন্স পরা, ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। আরেকজন ছেলে, চশমা পরা, খুব চুপচাপ। সাইনবোর্ডে লেখা: "ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: AI-চালিত রোগ নির্ণয় প্রশিক্ষণ।" সেলিনা পড়ে মনে মনে হাসে। হাওরে মানুষের পানি খাওয়ার ঠিক নেই, সেখানে AI।
চা আর বিস্কুট এলো। এবার "প্রিয়া গোল্ড।" নতুন ব্র্যান্ড। রুবিনা ফিসফিস করে বলল, "ঢাকা থেকে আসলে বিস্কুটও ভালো আসে।"
ঢাকার মেয়েটার নাম তানিয়া। তানিয়া প্রেজেন্টেশন শুরু করল। প্রজেক্টর নেই, তাই ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখাচ্ছে। পেছনের সারি থেকে কিছুই দেখা যায় না, কিন্তু কেউ অভিযোগ করে না। সরকারি ট্রেনিংয়ে অভিযোগ করা মানে পরের ট্রেনিংয়ে নাম কাটা।
তানিয়া বলল, "আপনাদের প্রত্যেককে একটা করে ট্যাবলেট দেওয়া হবে। এই ট্যাবলেটে একটা অ্যাপ আছে। আপনারা রোগীর লক্ষণ ইনপুট দেবেন, বাংলায়। অ্যাপটি সম্ভাব্য রোগ নির্ণয় করবে, রেফারেল সাজেস্ট করবে।"
সেলিনা হাত তুলল। "ইন্টারনেট লাগবে?"
তানিয়া হাসল। "না। অফলাইনেও কাজ করবে। ডেটা পরে সিঙ্ক হবে, যখন নেটওয়ার্ক পাবে।"
"পরে মানে কবে?" সেলিনা বলল। "আমাদের এলাকায় নেটওয়ার্ক ঈদের চাঁদের মতো, মাঝে মাঝে দেখা যায়।"
কয়েকজন হাসল। তানিয়া একটু থমকে গেল, তারপর বলল, "আমরা সেটা নিয়ে কাজ করছি।"
সেলিনা ভাবল, "আমরা সেটা নিয়ে কাজ করছি" এই বাক্যটা বাংলাদেশের জাতীয় মটো হওয়া উচিত।
ট্যাবলেটগুলো বিতরণ হলো। সাদা রঙের, পেছনে সরকারি লোগো, সাথে একটা বিদেশি কোম্পানির নাম। সেলিনা ট্যাবলেটটা হাতে নিয়ে উলটে-পালটে দেখল। হালকা। তার ছেলে সোহেল এটা পেলে খুশি হতো।
তানিয়া দেখালো কিভাবে অ্যাপটা ব্যবহার করতে হয়। "রোগীর বয়স, লিঙ্গ, লক্ষণ লিখুন। তারপর 'বিশ্লেষণ করুন' বাটনে চাপুন।"
সেলিনা অ্যাপটা খুলল। "রোগীর লক্ষণ" ঘরে টাইপ করল:
"মাথাব্যথা। ক্লান্তি। সরকারের ওপর রাগ।"
"বিশ্লেষণ করুন" চাপল।
স্ক্রিনে ঘুরল একটা নীল বৃত্ত। তারপর উত্তর এলো: "অপর্যাপ্ত তথ্য। অনুগ্রহ করে আরো নির্দিষ্ট লক্ষণ প্রদান করুন।"
সেলিনা হেসে ফেলল। জোরে। পাশে বসা পারভীন জিজ্ঞেস করল, "কী হলো?" সেলিনা স্ক্রিন দেখালো। পারভীন পড়ে মুখ টিপে হাসল।
"সরকারের ওপর রাগ" এর জন্য এখনো কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি, সেলিনা ভাবল। হয়তো কোনোদিন হবেও না।
ট্রেনিং শেষ হলো। গ্রুপ ছবি হলো। সার্টিফিকেট হলো। সেলিনা ট্যাবলেটটা ব্যাগে রেখে নৌকায় উঠল। রহমত চাচা জিজ্ঞেস করলেন, "কী পাইলি আজকে?" সেলিনা বলল, "একটা জাদুর বাক্স, চাচা। রোগ ধরবে।" রহমত চাচা বললেন, "কবিরাজও রোগ ধরে, তারপরেও মানুষ মরে।" সেলিনা কিছু বলল না। রহমত চাচার কথায় একটা সত্যি আছে যেটা অস্বীকার করা কঠিন।
---
তিন সপ্তাহ গেল। ট্যাবলেটটা সেলিনার ব্যাগে থাকে, মাঝে মাঝে বের করে দেখে। দুই-একবার ব্যবহার করেছে, সাধারণ কেস, জ্বর-সর্দি-ডায়রিয়া। ট্যাবলেট যা বলেছে, সেলিনা আগে থেকেই জানত। তাই ট্যাবলেটের ওপর তার আস্থা বাড়েনি, কমেওনি। একটা নিরপেক্ষ সম্পর্ক।
একদিন বিকেলে সেলিনা দক্ষিণপাড়ায় ভিজিটে গেল। আমেনা বিবির বাড়ি। আমেনা বিবির নাতি রাসেল, ছয় বছর। তিন সপ্তাহ ধরে কাশি। সেলিনা আগেও দেখেছে, সর্দি-কাশির ওষুধ দিয়েছে। কিন্তু কাশি যাচ্ছে না।
"ওজন কমছে না?" সেলিনা জিজ্ঞেস করল।
আমেনা বিবি বললেন, "খায় না তো, ওজন কমবে না?"
সেলিনা রাসেলকে দেখল। ছেলেটা রোগা, চোখ গর্তে ঢুকে গেছে। রাতে ঘাম হয়, আমেনা বিবি বললেন। জ্বর আসে, যায়। কাশিতে কখনো কখনো একটু রক্ত।
সেলিনার ভেতরে কিছু একটা নড়ল। সে ব্যাগ থেকে ট্যাবলেটটা বের করল।
"বয়স: ৬। লিঙ্গ: পুরুষ। লক্ষণ: তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী কাশি, মাঝে মাঝে রক্তমিশ্রিত কফ, রাতে ঘাম, ওজন হ্রাস, বিরতিহীন জ্বর।"
"বিশ্লেষণ করুন" চাপল।
নীল বৃত্তটা ঘুরল। এবার একটু বেশি সময় নিল। তারপর স্ক্রিনে এলো:
**সতর্কতা: যক্ষ্মা (Tuberculosis) এর উচ্চ ঝুঁকি সনাক্ত হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জেলা হাসপাতালে রেফার করুন। Sputum AFB পরীক্ষা এবং Chest X-ray প্রয়োজন।**
সেলিনা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। যক্ষ্মা। ছয় বছরের একটা বাচ্চার যক্ষ্মা। সে তিন সপ্তাহ ধরে সর্দি-কাশির ওষুধ দিয়েছে।
তার হাত কাঁপল। রাগে না, ভয়ে। নিজের ওপর রাগ। কেন ভাবেনি? লক্ষণগুলো সামনে ছিল। তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, রক্তমিশ্রিত কফ, রাতের ঘাম। বইয়ে পড়েছে। ট্রেনিংয়ে শিখেছে। কিন্তু ভাবেনি। কারণ ছয় বছরের বাচ্চাদের যক্ষ্মা হয় না, এটা মাথায় বসে গেছিল। মিথ্যা তথ্য, মাথায় পাকাপাকি বসে গেছিল।
সেলিনা আমেনা বিবিকে বলল, "রাসেলকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কাল।"
"কেন? কী হইছে?" আমেনা বিবির চোখে ভয়।
"কিছু পরীক্ষা দরকার। আমি রেফারেল লেটার লিখে দিচ্ছি।"
"হাসপাতালে কত খরচ হবে?"
সেলিনা জানে, যক্ষ্মার চিকিৎসা ফ্রি। সরকারি প্রোগ্রাম। কিন্তু যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ফ্রি না। হাওর থেকে সুনামগঞ্জ সদর যেতে নৌকা, অটো, বাস। আমেনা বিবির সেই টাকা আছে কিনা সেলিনা জানে না।
"চিকিৎসা ফ্রি। যাতায়াতের ব্যবস্থা আমি করছি।"
সেলিনা নিজের পকেট থেকে টাকা দিল না, কারণ নিজের পকেটে টাকা নেই। কিন্তু উপজেলা হেলথ অফিসে ফোন করল, রেফারেল ট্রান্সপোর্ট ফান্ডের কথা বলল। ফান্ড আছে কিনা নিশ্চিত না, কিন্তু চেষ্টা করল।
পরের দিন আমেনা বিবি রাসেলকে নিয়ে গেলেন। সেলিনা রেফারেল লেটার লিখে দিল, সাথে ট্যাবলেটের রিপোর্টের একটা প্রিন্ট। তানিয়া দেখিয়েছিল কিভাবে প্রিন্ট করতে হয়, সেদিন সেলিনা মনোযোগ দেয়নি, কিন্তু মনে ছিল।
---
এক সপ্তাহ পর খবর এলো। রাসেলের Sputum পজিটিভ। যক্ষ্মা। DOTS প্রোগ্রামে চিকিৎসা শুরু হয়েছে।
সেলিনা খবরটা শুনে চুপ করে বসে রইল। বারান্দায়। সামনে হাওরের পানি। আকাশে মেঘ। সোহেল ভেতরে পড়ছে, "আ-তে আম, আ-তে আবার।"
ছেলেটা বেঁচে গেল। আরো দুই সপ্তাহ দেরি হলে ফুসফুসের অবস্থা খারাপ হতো। ছয় বছরের বাচ্চা। ছয় বছর মাত্র পৃথিবীতে আছে।
সেলিনার দুইটা খাতা আছে। একটা সরকারি। সেখানে সে লেখে পরিষ্কার, সুন্দর হাতের লেখায়, যা লিখতে হয়: ভিজিটের সংখ্যা, রোগীর নাম, রোগ, ওষুধ, রেফারেল। সরকারি খাতা পরিষ্কার, ঝকঝকে, মিথ্যায় ভরা না, কিন্তু অসম্পূর্ণ।
আরেকটা খাতা আছে। সেটা সেলিনার নিজের। সেখানে সে লেখে যা মনে আসে। কোনো ছক নেই, কোনো কলাম নেই। শুধু সত্য।
সেলিনা নিজের খাতাটা বের করল। পেন নিল। লিখল:
"১৮ মার্চ। আজ ট্যাবলেট একটা বাচ্চা বাঁচালো। রাসেল, ৬ বছর, আমেনা বিবির নাতি। যক্ষ্মা। আমি ধরতে পারিনি। ট্যাবলেট ধরেছে।"
একটু থামল। কলমটা ঘোরাল।
তারপর আবার লিখল:
"কিন্তু ট্যাবলেট আমাকে track করছে কিনা জানি না। আমি কোথায় যাই, কাকে দেখি, কী লিখি, সব কি ঢাকায় যাচ্ছে? তানিয়া বলেছিল ডেটা সিঙ্ক হবে। কার সাথে সিঙ্ক হবে? কে দেখবে? আমি জিজ্ঞেস করিনি। করলেও উত্তর পেতাম কিনা জানি না।"
সেলিনা খাতাটা বন্ধ করল। ট্যাবলেটটা টেবিলে রাখা। স্ক্রিন বন্ধ, কিন্তু একটা ছোট সবুজ আলো জ্বলছে। চার্জিং ইন্ডিকেটর, হয়তো। অথবা অন্য কিছু।
সেলিনা আলোটার দিকে তাকিয়ে রইল। সবুজ আলোটা জ্বলছে। নিভছে না।
---
বাইরে হাওরের পানিতে চাঁদের আলো পড়েছে। সোহেল ঘুমিয়ে গেছে। সেলিনার মা রান্নাঘরে থালা-বাসন ধুচ্ছেন।
সেলিনা সরকারি খাতাটা খুলল। পরিষ্কার হাতে লিখল:
"রোগী: রাসেল, ৬ বছর। রোগ: যক্ষ্মা (সন্দেহভাজন, পরে নিশ্চিত)। রেফারেল: সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল। ফলাফল: চিকিৎসা শুরু হয়েছে।"
একটা লাইনও বেশি লিখল না। একটা লাইনও কম লিখল না।
দুইটা খাতা। দুইটা সত্য। একটা সরকারের জন্য, একটা নিজের জন্য।
আর ট্যাবলেট? ট্যাবলেট হয়তো তৃতীয় একটা সত্য তৈরি করছে। সেলিনার অজান্তে। কোথাও একটা সার্ভারে।
কিন্তু রাসেল বেঁচে আছে।
সেলিনা ট্যাবলেটটা উলটে রাখল, যেন সবুজ আলোটা না দেখা যায়।