মিতু যখন কোড শেখে

একটি গার্মেন্টস শ্রমিকের মেয়ের গোপন জীবন

পর্ব ৬ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

রাহিমা নাক ডাকে।

খুব জোরে না। মৃদু একটা শব্দ। শ্বাস ভেতরে টানে, একটু থামে, তারপর ছেড়ে দেয়। আবার টানে। আবার থামে। আবার ছাড়ে। সারাদিন বারো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে শার্টের বোতাম গুনলে রাতে এমনই হয়। শরীর এত ক্লান্ত থাকে যে ঘুমের মধ্যেও হাড়গুলো কাঁদে।

মিতু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। অপেক্ষা করে।

রাত দশটা বাজে। গাজীপুরের এই এক কামরার ভাড়া ঘরে তিনজন মানুষ। রাহিমা, মিতু, আর মিতুর ছোট ভাই রাসেল। রাসেল আম্মুর পাশে গুটিশুটি মেরে ঘুমাচ্ছে। রাহিমার নাক ডাকার ছন্দ এখন সমান হয়ে এসেছে। মানে গভীর ঘুম।

মিতু চোখ খোলে।

ধীরে ধীরে কম্বলের নিচ থেকে আম্মুর ফোনটা বের করে। ফোনের স্ক্রিনে একটা লম্বা চিড় আছে, উপর থেকে নিচে, নদীর মতো। তিন মাস আগে রাহিমার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। নতুন কেনার সামর্থ্য নেই। এই চিড়ওয়ালা ফোনেই চলে সব।

মিতু ব্রাইটনেস একদম কমিয়ে দেয়। সবচেয়ে কম। তারপর কম্বলটা মাথার উপর টেনে নেয়। কম্বলের ভেতরে এখন একটা ছোট্ট গুহা। সেই গুহায় ফোনের আলো মিতুর মুখে পড়ে। নীলচে আলো। চোখদুটো জ্বলে।

সে YouTube খোলে।

---

তিন মাস আগের কথা।

স্কুলের কম্পিউটার ল্যাবে স্যার একদিন Python দেখিয়েছিলেন। স্ক্রিনে কিছু ইংরেজি শব্দ লেখা হলো, তারপর Enter চাপতেই কম্পিউটার উত্তর দিলো। স্যার বললেন, "এটাকে বলে প্রোগ্রামিং। তোমরা কম্পিউটারকে বলছো কী করতে হবে, সে করছে।"

ক্লাসের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। কম্পিউটার ল্যাবে পাঁচটা কম্পিউটার, তিনটা চালু হয়। বাকি দুইটায় ধুলো জমে আছে। কিন্তু মিতুর মাথায় সেদিন কিছু একটা ঢুকে গেলো। ঠিক বুঝতে পারেনি কী। শুধু মনে হলো, এটা জাদু।

তুমি কিছু লিখবে। কম্পিউটার সেটা করবে। তুমি আদেশ দেবে। সে মানবে।

মিতুর জীবনে কেউ কখনো তার আদেশ মানেনি। সে আদেশ পায়। দেয় না।

সেদিন রাতে আম্মুর ফোনে সে সার্চ করলো: "Python programming Bangla tutorial free." YouTube-এ অনেক ভিডিও পেলো। একজন ভাইয়া খুব সহজ করে বোঝাচ্ছেন। তার চ্যানেলের নাম মনে নেই মিতুর, কিন্তু ভাইয়ার গলার স্বর মনে আছে। শান্ত, ধীর, যেন কোনো তাড়া নেই।

সেই রাতে মিতু প্রথম জানলো: print মানে ছাপাও।

print("আমি মিতু")

ফোনের স্ক্রিনে এই লাইনটা দেখে সে হাসলো। তারপর ভিডিওটা পজ করে নিজে নিজে মুখে বললো, "প্রিন্ট, ব্র্যাকেট, কোটেশন, আমি মিতু, কোটেশন, ব্র্যাকেট।" মুখস্থ করে ফেললো। ঘুমানোর আগে তিনবার আওড়ালো।

পরদিন স্কুলের ল্যাবে গিয়ে চালু কম্পিউটারে টাইপ করলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো:

আমি মিতু

মিতু চেয়ারে বসে হাত মুঠো করলো। বুকের ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠলো। সে জানে না সেটাকে কী বলে। বড়রা বলে "আত্মবিশ্বাস।" মিতু শুধু জানে, ভালো লেগেছে।

---

তারপর থেকে প্রতি রাতে।

রাহিমা ঘুমালে মিতু জেগে ওঠে। কম্বলের গুহায় ঢোকে। ফোনে ভিডিও দেখে। কানে ইয়ারফোন। ভলিউম কম। ব্রাইটনেস কম। সব কম। শুধু শেখার ইচ্ছাটা বেশি।

প্রথম সপ্তাহে সে শিখলো variable কী।

নাম = "মিতু" বয়স = ১৬

এটা তার কাছে অদ্ভুত লাগলো। কম্পিউটারকে বলে দিচ্ছে, "নাম" মানে "মিতু।" কম্পিউটার মনে রাখছে। মানুষের মতো। কিন্তু মানুষের চেয়ে ভালো, কারণ কম্পিউটার ভোলে না।

দ্বিতীয় সপ্তাহে শিখলো if-else।

যদি বৃষ্টি হয়, ছাতা নাও। না হলে, রোদে যাও।

এটা তো মিতু আগে থেকেই জানে। প্রতিদিন এমন সিদ্ধান্ত নেয়। যদি চাল আছে, ভাত রান্না করো। না হলে, পান্তা খাও। যদি আম্মু বকে, চুপ থাকো। না হলে, কথা বলো। জীবনটাই তো if-else।

তৃতীয় সপ্তাহে শিখলো loop।

for i in range(10): print("আমি পারবো")

দশবার। "আমি পারবো" দশবার। কম্বলের নিচে ফোনের স্ক্রিনে এই দশটা লাইন দেখে মিতুর চোখ ভেজা হয়ে গেলো। কেন? সে নিজেও জানে না। হয়তো কারণ কেউ তাকে আগে বলেনি "আমি পারবো।" সে নিজেকে নিজে বলছে। দশবার।

চতুর্থ সপ্তাহে শিখলো list।

বোতাম = ["সাদা", "কালো", "নীল", "লাল"]

এখানে এসে মিতু থামলো। বোতাম। আম্মু সারাদিন বোতাম গোনে। শার্টের বোতাম। হাজার হাজার বোতাম। ছয়টা বোতাম প্রতি শার্টে। কতগুলো শার্ট দিনে? রাহিমা একবার বলেছিল, "হিসাব রাখি না। গুনতে গুনতে আঙুল অবশ হয়ে যায়।"

মিতুর মাথায় একটা আইডিয়া এলো।

---

পরের দুই সপ্তাহ মিতু অন্য কিছু শেখেনি।

সে একটা প্রোগ্রাম লিখতে চায়। আম্মু বারো ঘণ্টা শিফটে কাজ করে। বারো ঘণ্টা। মিতু চায় কম্পিউটার সেই বারো ঘণ্টা গুনুক। প্রতি ঘণ্টায় বলুক কত বাকি আছে। আম্মুর জন্য একটা ঘড়ি। সাধারণ ঘড়ি না, শিফটের ঘড়ি। যেটা বলবে: "৪ ঘণ্টা হয়েছে, ৮ বাকি।" যেটা বলবে: "১০ ঘণ্টা হয়েছে, আর ২টা।"

স্কুলের ল্যাবে গিয়ে সে কোড লিখতে শুরু করলো। ধৈর্য তার আম্মুর কাছ থেকে শেখা। বারো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বোতাম গোনা মানুষের মেয়ে অপেক্ষা করতে জানে।

প্রথম দিন কাজ হলো না। কোড ভুল দিলো। লাল লাল লেখা। মিতু ভয় পেলো না। ভুল মানে শেখার সুযোগ। YouTube-র ভাইয়া বলেছিলেন, "ভুল তোমার শত্রু না, বন্ধু। সে তোমাকে বলছে কোথায় সমস্যা।"

দ্বিতীয় দিন আবার চেষ্টা। আবার ভুল। কিন্তু এবার অন্য ভুল। মানে আগের সমস্যা সে ঠিক করেছে। এগিয়ে যাচ্ছে।

তৃতীয় দিন।

মিতু কোড রান করলো।

স্ক্রিনে এলো:

ঘণ্টা ১: ১১ বাকি। হিম্মত রাখো। ঘণ্টা ২: ১০ বাকি। ... ঘণ্টা ১১: আর ১টা! ঘণ্টা ১২: শিফট শেষ। বাড়ি যাও।

বারোটা লাইন। প্রতিটা লাইনে একটা সংখ্যা। সহজ। কিন্তু মিতু "হিম্মত রাখো" লাইনটা নিজে যোগ করেছে। কোডে সেটা লেখার সময় তার হাত একটু থেমেছিল।

মিতু চেয়ারে হেলান দিলো। স্কুলের ল্যাবের ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ার। কিন্তু সেই মুহূর্তে সেটা সিংহাসন।

---

সেদিন রাতে মিতু ঘুমায়নি।

রাহিমা ফ্যাক্টরি থেকে ফিরেছে রাত সাড়ে নয়টায়। ওভারটাইম ছিল। পা ফুলে আছে। মিতু আম্মুর জন্য ভাত আর ডাল গরম করে রেখেছিল। রাহিমা খেলো, রাসেলকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো। দশ মিনিটে ঘুমিয়ে গেলো।

মিতু অপেক্ষা করলো না আজ। সে আম্মুকে ডাকবে।

"আম্মু।"

রাহিমা নড়লো না।

"আম্মু, একটু ওঠো।"

রাহিমা চোখ খুললো। ঘুমে ভারী চোখ। "কী হইছে? শরীর খারাপ?"

"না। একটা জিনিস দেখাবো।"

"কাইল দেখাইস।"

"না, এখন দেখাও লাগবে।"

রাহিমা উঠে বসলো। বিরক্ত না, অবাক। মিতু এমন জেদ করে না সাধারণত। চুপচাপ মেয়ে। পড়াশোনা করে, রান্না করে, ছোট ভাইয়ের দেখভাল করে। কিছু চায় না কখনো।

মিতু ফোনটা আম্মুর হাতে দিলো। স্ক্রিনে বারোটা লাইন। প্রতিটায় ঘণ্টার হিসাব। শেষ লাইনে লেখা: "শিফট শেষ। বাড়ি যাও।"

রাহিমা স্ক্রিনের দিকে তাকালো।

"এইটা কী?"

"তোমার শিফটের ঘড়ি। আমি বানাইছি। বারো ঘণ্টা গোনে, বলে কত বাকি।"

রাহিমা বুঝলো না পুরোটা। কিন্তু সে বুঝলো একটা জিনিস: তার মেয়ে কিছু একটা বানিয়েছে। সেই জিনিসটা তার বারো ঘণ্টার কথা জানে। যে বারো ঘণ্টা রাহিমা প্রতিদিন দাঁড়িয়ে কাটায়, সেই বারো ঘণ্টা।

"কবে শিখলি?"

"তিন মাস হইলো। রাতে তোমার ফোনে।"

রাহিমা মিতুর দিকে তাকালো। মিতুর চোখে ফোনের নীলচে আলো। ষোলো বছরের মেয়ে। পাতলা। চুল বাঁধা। স্কুলের ইউনিফর্মটা এখনো গায়ে, খোলেনি।

রাহিমা আবার স্ক্রিনের দিকে তাকালো। "শিফট শেষ। বাড়ি যাও।"

তারপর রাহিমার চোখ থেকে পানি পড়লো।

মিতু আম্মুর কাছে এসে বসলো। "আম্মু, কাঁদো কেন?"

রাহিমা হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছলো। নাক টানলো। মিতুর দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলো।

"ধুলা পড়েছে।"

মিতু কিছু বললো না। সে জানে ধুলা পড়েনি। সে জানে আম্মু কাঁদছে। কিন্তু সে এটাও জানে, কিছু কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করতে নেই। কিছু কান্না শুধু হতে দিতে হয়।

রাহিমা ফোনটা মিতুর হাতে ফেরত দিলো। বললো, "শুয়ে পড়। কাল স্কুল আছে।"

মিতু শুয়ে পড়লো। রাহিমাও শুয়ে পড়লো। রাসেল ঘুমের মধ্যে একটু নড়ে আম্মুর কাছে ঘেঁষে এলো।

ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেলো।

কিন্তু মিতু ঘুমায়নি। সে কম্বলের নিচে ফোনটা আবার বের করলো। ব্রাইটনেস কম। ভলিউম কম। সব কম।

সে পরের ভিডিওটা চালু করলো। আজকের বিষয়: function।

function মানে একটা কাজকে নাম দিয়ে রাখা। যখন দরকার, নাম ধরে ডাকলেই কাজটা হয়ে যায়।

মিতু ভাবলো, আম্মুর জীবনটাও একটা function। প্রতিদিন একই কাজ। ঘুম থেকে ওঠা। রান্না। ফ্যাক্টরি। বোতাম। ফ্যাক্টরি। বাসা। রান্না। ঘুম। আবার ওঠা। আবার সব আবার।

কিন্তু মিতু একটা নতুন function লিখবে। তার নিজের জন্য। সেই function-এর নাম সে এখনো ঠিক করেনি। হয়তো ভবিষ্যৎ। হয়তো মুক্তি। হয়তো শুধু "মিতু।"

বাইরে গাজীপুরের রাত। দূরে কোনো কুকুর ডাকছে। পাশের ঘরে কারো টিভি চলছে, আওয়াজ চাপা। বিদ্যুৎ একবার কেঁপে উঠলো, তারপর স্থির হলো।

মিতু ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। নীলচে আলো তার মুখে। চিড়ওয়ালা স্ক্রিন। ভাঙা ফোন। কিন্তু সেই ভাঙা ফোনের ভেতরে একটা পুরো পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবীতে মিতু যা খুশি হতে পারে।

রাহিমা নাক ডাকে। মৃদু। শ্বাস ভেতরে টানে, একটু থামে, তারপর ছেড়ে দেয়।

মিতু কোড লেখে।