বেলাল ঢাকায় একা

রংপুরের ছেলে গাজীপুরের ফ্যাক্টরিতে

পর্ব ৭ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

বাসটা যখন ময়মনসিংহ পেরিয়ে ঢাকার দিকে ছুটছিল, বেলাল জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। ধানক্ষেত ছিল। তারপর ধানক্ষেত কমে গেল। তারপর ইটভাটা এলো, একটার পর একটা, লম্বা চিমনি থেকে কালো ধোঁয়া উঠছে। তারপর ফ্যাক্টরি এলো। ছোট ছোট কংক্রিটের বাক্সের মতো বিল্ডিং, গায়ে ইংরেজিতে নাম লেখা যা বেলাল পড়তে পারে না। জানালার বাইরে রংপুরের সবুজ ধীরে ধীরে গাজীপুরের ধূসর হয়ে গেল, আর বেলাল বুঝতে পারল সে এমন একটা জায়গায় যাচ্ছে যেখানে মাটির কোনো গন্ধ নেই।

তার বয়স বাইশ। শরীরে মাংস কম, হাড় বেশি। রংপুরের গঙ্গাচড়া থেকে এসেছে। তার বাবা করিম সারাজীবন ধান ফলিয়েছে, কিন্তু গত দুই বছরে ধানের দাম এমনভাবে পড়েছে যে জমি চাষ করা আর লাভজনক নেই। বেলালের মা বলেছে, "তুই যা, ঢাকায় যা। তোর মামার ছেলে ফারুক গাজীপুরে আছে, সে একটা কাজ দেখবে।"

ফারুক দেখেছে। একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে হেল্পারের কাজ। মাসে সাত হাজার টাকা। বেলাল জানে এটা কম, কিন্তু রংপুরে শূন্য টাকার চেয়ে সাত হাজার অনেক বেশি।

বাস থেকে নামার পর ফারুক তাকে নিয়ে গেল একটা টিনের ঘরে। ঘরে চারটা খাট, ছয়জন থাকে। বেলালের জায়গা হলো একটা খাটের অর্ধেক। মশারি নেই। ফ্যানের বাতাস অন্যদিকে যায়। ফারুক বলল, "অভ্যাস হয়ে যাবে।"

পরদিন সকাল সাতটায় ফ্যাক্টরিতে ঢুকল বেলাল।

---

ফ্যাক্টরিটা বেলালের কল্পনার চেয়ে আলাদা ছিল। সে ভেবেছিল গোলমাল হবে, সুপারভাইজার চিৎকার করবে, মেশিনের শব্দে কান পাতা যাবে না। গোলমাল আছে, মেশিনের শব্দও আছে, কিন্তু চিৎকার নেই। তার বদলে একটা বড় স্ক্রিন আছে।

স্ক্রিনটা লাইনের মাথায় দেওয়ালে লাগানো। টিভির মতো, কিন্তু টিভি না। এতে লেখা নেই, ছবি নেই, নাটক নেই। শুধু নাম আর সংখ্যা। লাইনে যত মানুষ কাজ করে, সবার নাম সেখানে। প্রতিটা নামের পাশে একটা সংখ্যা, সেটা প্রতি ঘণ্টায় বদলায়। আর প্রতিটা নামের পেছনে একটা রঙ আছে।

সবুজ মানে ঠিক আছে। হলুদ মানে ধীর। লাল মানে বিপদ।

বেলালকে বুঝিয়ে দিল পাশের মেয়েটা। তার নাম শিরিন, দুই বছর ধরে এই লাইনে কাজ করে। শিরিন বলল, "ওটার দিকে তাকাবি না। কাজ করবি। ওটা তোকে দেখছে, তুই ওটাকে দেখিস না।"

কিন্তু না দেখে থাকা যায় না।

বেলালের প্রথম কাজ ছিল সেলাই করা শার্টের বোতাম চেক করা আর ট্যাগ লাগানো। সহজ কাজ, কিন্তু গতি লাগে। লাইনে প্রতি ঘণ্টায় ষাটটা পিস বের হয়। বেলালকে প্রতিটা পিস ধরতে হবে, বোতাম গুনতে হবে, ট্যাগ লাগাতে হবে, পাশের ঝুড়িতে রাখতে হবে। এক মিনিটে একটা। ষাট সেকেন্ডে একটা শার্ট।

প্রথম ঘণ্টায় বেলাল করল বত্রিশটা।

স্ক্রিনে তার নামের পাশে সংখ্যা উঠল: ৩২। আর রঙ হলো হলুদ।

বেলাল জানে না এই সিস্টেমটা কী। কেউ তাকে বলেনি এটাকে কী বলে। সুপারভাইজার শুধু বলেছে, "স্ক্রিনে তোমার নাম সবুজ রাখো।" বেলাল বোঝে না কীভাবে একটা যন্ত্র তার কাজ গুনছে। সে দেখতে পায় না কোনো ক্যামেরা, কোনো সেন্সর। কিন্তু স্ক্রিন জানে। স্ক্রিন সবকিছু জানে।

দ্বিতীয় ঘণ্টায় বেলাল চেষ্টা করল দ্রুত হতে। হাত নাড়াল তাড়াতাড়ি। বোতাম গুনল চোখের এক পলকে। ট্যাগ লাগাল টান দিয়ে। করল আটত্রিশটা।

স্ক্রিনে: ৩৮। এখনো হলুদ।

তৃতীয় ঘণ্টায়: ৪১। হলুদ।

চতুর্থ ঘণ্টায় বেলালের ডান হাতের তর্জনীর ডগা কেটে গেল ট্যাগের ধারালো কোনায়। রক্ত পড়ল শার্টের উপর। সে থামল, আঙুল মুখে দিল। পনেরো সেকেন্ড নষ্ট। সেই ঘণ্টায় করল ছত্রিশটা। স্ক্রিনে তার নাম লাল হয়ে গেল।

লাল।

বেলাল লাল রঙটার দিকে তাকিয়ে থাকল। মনে হলো পুরো ফ্যাক্টরি তার দিকে তাকাচ্ছে। কেউ তাকায়নি অবশ্য। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু স্ক্রিনে লাল নামটা ঝুলে আছে, আর বেলালের মনে হলো নিজেকে সবাই দেখতে পাচ্ছে, ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।

সুপারভাইজার এলো না। চিৎকার করল না। কিছুই বলল না। শুধু স্ক্রিনটা আছে।

---

দুপুরে আধ ঘণ্টা বিরতি। ভাত, ডাল, একটুকরো মাছ। বেলাল খেতে বসল শিরিনের পাশে।

"তোর আঙুল কেটেছে," শিরিন বলল।

"হ্যাঁ।"

"ব্যান্ডেজ লাগা। ওখানে আছে।" সে দেওয়ালের দিকে ইশারা করল। একটা ছোট বাক্সে কিছু ব্যান্ডেজ আর ডেটল রাখা।

বেলাল ব্যান্ডেজ লাগাল। জিজ্ঞেস করল, "স্ক্রিনে ষাট করতে হয়?"

শিরিন হাসল। হাসিটা খুশির না। "ষাট করতে পারলে সবুজ থাকবি। পঞ্চাশের নিচে গেলে হলুদ। চল্লিশের নিচে লাল।"

"তুই কত করিস?"

"পঞ্চান্ন, আটান্ন। কোনোদিন বাষট্টিও করেছি।"

"আমি বত্রিশ করলাম প্রথম ঘণ্টায়।"

শিরিন কিছু বলল না। ভাত খেল। তারপর বলল, "প্রথম সপ্তাহে সবাই লাল থাকে। অভ্যাস হয়ে যায়। হাত শিখে যায়।"

বেলাল তার ব্যান্ডেজ করা আঙুলের দিকে তাকাল। "হাত শেখে কীভাবে?"

"রক্ত পড়ে, তারপর চামড়া শক্ত হয়ে যায়। তারপর আর কাটে না।"

---

বিকেলে বেলাল আবার লাইনে দাঁড়াল। এবার সে চেষ্টা করল না ভাবতে। শুধু হাত চালাল। ধর, গোন, লাগা, রাখ। ধর, গোন, লাগা, রাখ। একই কাজ। বারবার। মেশিনের মতো।

পঞ্চম ঘণ্টায়: ৪৪। হলুদ।

ষষ্ঠ ঘণ্টায়: ৪৬। হলুদ।

সপ্তম ঘণ্টায় বেলালের বাম হাতের মাঝের আঙুলেও কেটে গেল। এবার সে থামল না। রক্ত পড়তে দিল শার্টের উপর। শার্টটা নষ্ট হয়ে গেল, কিন্তু সে থামেনি। করল ৪৮।

এখনো হলুদ।

সন্ধ্যা ছটায় শিফট শেষ হলো। বেলাল দুই হাত ধুল বাথরুমের কলে। পানি লাল হয়ে গেল। দুটো আঙুলে কাটা, আরো তিনটায় ফোসকা। নখের নিচে একটা কালো দাগ, চাপ লেগে রক্ত জমেছে।

ফারুকের সাথে টিনের ঘরে ফিরে বেলাল চুপচাপ বসে রইল। ফারুক বলল, "কেমন হলো?"

"কঠিন।"

"প্রথম দিন সবার কঠিন লাগে।"

রাত নটায় বেলাল বাবাকে ফোন করল।

করিম ফোন ধরল তিন রিংয়ের পর। গলায় ক্লান্তি। রংপুরে এখন ধান কাটার সময়, কিন্তু করিমের ধান এবার ভালো হয়নি। এক বিঘা জমিতে যা ফলেছে তা দিয়ে সার আর সেচের খরচও উঠবে না।

"বাবা, আমি ফ্যাক্টরিতে ঢুকেছি।"

"ভালো।"

"কাজটা অনেক তাড়াতাড়ি করতে হয়।"

করিম চুপ করে রইল। তারপর বলল, "মাটি ভালো ছিল।"

বেলাল কিছু বলল না। বাবার কথাটা তার কানে ঘুরতে লাগল। মাটি ভালো ছিল। হ্যাঁ, মাটি ভালো ছিল। ধানক্ষেতে কোনো স্ক্রিন ছিল না যে তার নাম লাল করে দেবে। গরু দিয়ে হাল চাষ করতে কারো সাথে প্রতিযোগিতা ছিল না। সকালে কাজ শুরু হতো, বিকেলে শেষ হতো, মাঝখানে আমগাছের ছায়ায় বসে মুড়ি খাওয়া যেত। কেউ গুনত না সে ঘণ্টায় কত কাজ করল।

"বাবা, এখানে একটা স্ক্রিন আছে।"

"কীসের স্ক্রিন?"

"সবার নাম থাকে। কে কত কাজ করেছে। আমার নাম লাল হয়ে গেছিল।"

করিম আবার চুপ। তারপর বলল, "ঘুমা। কাল সকালে উঠতে হবে।"

ফোন রেখে বেলাল শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করলে স্ক্রিনটা দেখতে পেল। সবুজ, হলুদ, লাল। নাম আর সংখ্যা। তার নাম: বেলাল, ৩৬, লাল। চোখ খুলল। অন্ধকার ঘর, পাশে ফারুকের নাক ডাকার শব্দ, দূরে একটা কুকুর ডাকছে।

---

দ্বিতীয় দিনে বেলাল একটু ভালো করল। প্রথম ঘণ্টায় ৩৮, দ্বিতীয়তে ৪২। কিন্তু হাতের কাটাগুলো আবার খুলে গেল। ব্যান্ডেজ ভিজে গেল ঘামে আর রক্তে। সে নতুন ব্যান্ডেজ নিল না। চামড়া শক্ত হতে হবে, শিরিন বলেছে।

তৃতীয় দিনে বিকেলের দিকে সুপারভাইজার এলো। লম্বা, পাতলা একটা লোক, চোখে চশমা। সে বেলালের পাশে দাঁড়াল, কিছু বলল না, শুধু দেখল। তারপর বলল, "বোতাম দুইবার গুনছ। একবার গুনবে। চোখ দিয়ে গুনবে, আঙুল দিয়ে না।"

বেলাল বুঝল। সে আঙুল দিয়ে একটা একটা করে বোতাম ছুঁয়ে গুনছিল। চোখ দিয়ে এক পলকে গুনতে পারলে সময় বাঁচবে। সে চেষ্টা করল। পাঁচটা বোতাম, এক পলকে দেখে নেওয়া যায়। ছয়টা হলে একটু কঠিন।

চতুর্থ দিনে বেলাল পঞ্চাশ করল এক ঘণ্টায়। স্ক্রিনে তার নাম সবুজ হলো। প্রথমবার।

সবুজ দেখে বেলালের বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। গর্ব? স্বস্তি? নাকি অন্যকিছু? সে বুঝতে পারল না। শুধু বুঝল যে একটা যন্ত্রকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে, আর সেটাতে তার ভালো লাগছে। এই ভালোলাগাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিল।

---

এক সপ্তাহ পর বেলাল অভ্যস্ত হয়ে গেল। হলুদ আর দেখে না, কখনো কখনো পঞ্চান্ন ছুঁয়ে যায়। হাতের কাটাগুলোতে নতুন চামড়া উঠেছে, পুরু আর শক্ত। আঙুলের ডগায় আর বেদনা নেই। শিরিন ঠিকই বলেছিল, চামড়া শিখে যায়।

কিন্তু রাতে, ঘুমানোর আগে, বেলাল তার হাতের দিকে তাকায়। এক সপ্তাহ আগেও এই হাত দিয়ে সে গরুকে ঘাস খাইয়েছে, পুকুরে মাছ ধরেছে, আম পাড়তে গাছে উঠেছে। এখন এই হাত মেশিনের একটা অংশ। ষাট সেকেন্ডে একটা শার্ট, ষাট সেকেন্ডে একটা শার্ট, ষাট সেকেন্ডে একটা শার্ট। হাত আর তার নিজের নেই, হাত ফ্যাক্টরির।

একদিন লাঞ্চের সময় বেলাল লক্ষ করল লাইনের শেষ মাথায় একজন মেয়ে বসে আছে। অন্য সবার চেয়ে আলাদা। সে স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু ভয়ে না। মনোযোগ দিয়ে। যেমন করে বেলালের বাবা আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি বোঝার চেষ্টা করে, সেভাবে। শিরিন বলল, "ও রহিমা। তিন বছর হলো এই লাইনে। ওকে কোনোদিন লাল হতে দেখিনি।"

বেলাল রহিমার দিকে তাকাল। রহিমা তার দিকে তাকায়নি।

---

দুই সপ্তাহ পর, একটা শুক্রবার রাতে, বেলাল আবার বাবাকে ফোন করল।

"বাবা, আমি এখন পঞ্চান্ন করি।"

"কীসের পঞ্চান্ন?"

"ঘণ্টায় পঞ্চান্নটা শার্ট।"

করিম কিছু বলল না। ফোনের ওপারে বাতাসের শব্দ, হয়তো উঠানে বসে আছে। রংপুরে এখন শীত শেষ হচ্ছে, রাতে একটু ঠান্ডা থাকে।

"বাবা?"

"তোর হাত কেমন?"

বেলাল তার ডান হাতের দিকে তাকাল। তর্জনীতে একটা শক্ত, কালচে দাগ, যেখানে কেটেছিল। মাঝের আঙুলে পুরু চামড়া। বুড়ো আঙুলের নখের নিচে কালো দাগটা এখনো আছে।

"ভালো আছে।"

"মিথ্যা বলিস না।"

বেলাল চুপ করে রইল।

করিম বলল, "তোর দাদা সারাজীবন হাল চাষ করেছে। তার হাতেও কড়া ছিল। কিন্তু সেই কড়া মাটি থেকে হয়েছিল। তোর কড়া কীসের?"

বেলালের উত্তর ছিল না।

"মাটি ভালো ছিল, বেলাল।"

ফোন রেখে বেলাল বিছানায় বসে রইল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুরু হলো। গাজীপুরে বৃষ্টি এলে রাস্তা কাদামাখা হয়, নর্দমা উপচে পড়ে, টিনের ঘরে পানি ঢোকে। রংপুরে বৃষ্টি এলে ধানক্ষেতে পানি জমে, ব্যাঙ ডাকে, মাটি থেকে একটা গন্ধ ওঠে যেটা বেলাল চিনতে পারে চোখ বন্ধ করেও।

সে দুই হাত মেলে ধরল সামনে। ব্যান্ডেজের দাগ, কাটার দাগ, ফোসকার দাগ, পুরু চামড়া। বাইশ বছরের হাত, দেখতে বিয়াল্লিশের মতো।

বেলাল ভাবল, বাবা ঠিকই বলে। মাটি ভালো ছিল।

কিন্তু মাটি আর কোথায়?

ধান ফলিয়ে সংসার চলে না। জমি বিক্রি হয়ে গেছে কাকার কাছে। রংপুরে ফিরে গেলে কী করবে? রিকশা চালাবে? কিন্তু রংপুরেও এখন ইলেকট্রিক রিকশা চলে, সেগুলোও একদিন চালকবিহীন হবে, শিরিন বলেছে।

বেলাল তার রক্ত লাগা হাত দুটো হাঁটুর উপর রাখল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। কাল সকাল সাতটায় আবার ফ্যাক্টরি। আবার স্ক্রিন। আবার নাম আর সংখ্যা। সবুজ, হলুদ, লাল।

সবুজ থাকতে হবে।

বেলাল চোখ বন্ধ করল। ঘুম এলো না। স্ক্রিনটা চোখের পেছনে জ্বলছে।