দুই টাকার মজুর
AI-এর পেছনের অদৃশ্য বাংলাদেশি শ্রমিক
--- title: "দুই টাকার মজুর" subtitle: "AI-এর পেছনের অদৃশ্য বাংলাদেশি শ্রমিক" series: "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ" part: 8 date: "2026-03-18" ---
রাত দুইটা বাজে।
তানিয়া ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনের নীল আলো তার মুখে পড়ছে। বনানীর ফ্ল্যাটে আর কেউ জেগে নেই। পাশের রুমে শিহাব ঘুমাচ্ছে, তানিয়ার কো-ফাউন্ডার, যে সন্ধ্যা সাতটায় ঘুমিয়ে পড়ে আর ভোর পাঁচটায় ওঠে। তানিয়া উল্টো। সে রাতের মানুষ। রাতে তার মাথা পরিষ্কার থাকে।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা প্ল্যাটফর্ম খোলা। DataLabel BD। বাংলাদেশি মাইক্রোটাস্ক প্ল্যাটফর্ম। তানিয়ার NLP স্টার্টআপের জন্য ট্রেনিং ডেটা দরকার। বাংলা বাক্য। হাজার হাজার বাংলা বাক্য। প্রতিটা বাক্যের পাশে একটা ট্যাগ লাগবে: এটা কি পজিটিভ? নেগেটিভ? প্রশ্ন? আবেগ? অনুরোধ? নির্দেশ?
কাজটা সহজ। যেকোনো বাংলা পড়তে পারে এমন মানুষ পারবে। মেশিন পারবে না। এই কাজটা মেশিনকে শেখানোর জন্যই মানুষ লাগে। মেশিনকে বাংলা শেখাতে গেলে মানুষ লাগে যারা বাংলা জানে। আর সেই মানুষগুলোর দাম? প্রতি টাস্ক দুই টাকা।
দুই টাকা।
তানিয়া প্রোফাইলগুলো স্ক্রল করছে। প্ল্যাটফর্মে প্রত্যেক লেবেলারের একটা ছোট বায়ো আছে। এক লাইনে একটা জীবন।
"মাদারীপুর, এসএসসি পাশ, রাতে ফ্রি থাকি।"
"চট্টগ্রাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, টিউশন ফি-র জন্য কাজ করি।"
"নোয়াখালী, স্কুল শিক্ষক, সংসার চালাতে বাড়তি আয় দরকার।"
"ঢাকা, ফ্রিল্যান্সার, কাজ কম তাই এখানে।"
তানিয়া চায়ের কাপে চুমুক দিলো। আজ তৃতীয় কাপ। সে প্রোফাইলগুলো পড়ছে একটার পর একটা। প্রতিটা প্রোফাইল একটা গল্প। কিন্তু কেউ গল্প শুনতে চায় না। দরকার শুধু তাদের হাত। তাদের চোখ। বাংলা পড়ার ক্ষমতা। প্রতি টাস্ক দুই টাকা।
তারপর একটা প্রোফাইলে তানিয়ার হাত থেমে গেলো।
"গাজীপুর, গার্মেন্টস শ্রমিকের পরিবার, রাতে কাজ করি।"
নাম: যোসনা আক্তার।
তানিয়া স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। গাজীপুর। গার্মেন্টস শ্রমিকের পরিবার। মানে এই মেয়ের মা অথবা বাবা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। হয়তো মা। বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে আশি ভাগ নারী শ্রমিক। হয়তো সেই রকম কেউ। রহিমার মতো কেউ, যার ফ্যাক্টরিতে এইমাত্র AI ক্যামেরা বসেছে, যার লাইনের দশজনের মধ্যে তিনজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে কারণ মেশিন বলেছে তারা স্লো।
রহিমার পাড়ার মেয়ে হতে পারে এই যোসনা।
তানিয়া ল্যাপটপ বন্ধ করলো। অন্ধকারে বসে রইলো কিছুক্ষণ।
সে ভাবছে। তিন মাস আগে সে এই স্টার্টআপ শুরু করেছে। বাংলা ভাষায় NLP। বাংলায় চ্যাটবট। বাংলায় কন্টেন্ট মডারেশন। কেউ বাংলা নিয়ে কাজ করে না বলেই তানিয়া করতে চায়। AI-এর দুনিয়ায় বাংলা প্রায় অদৃশ্য। তানিয়া সেটা বদলাতে চায়।
কিন্তু বদলাতে গেলে ডেটা লাগে। আর ডেটা মানে মানুষ। মানুষ মানে শ্রম। শ্রম মানে টাকা। আর টাকা? তানিয়ার স্টার্টআপের ফান্ডিং সীমিত। সিড রাউন্ডে যা পেয়েছে তা দিয়ে অফিস ভাড়া, সার্ভার খরচ, আর দুজনের বেতন চলে কোনোরকমে। ডেটা লেবেলিংয়ের জন্য আলাদা বাজেট বলে কিছু নেই। তাই এই প্ল্যাটফর্ম। প্রতি টাস্ক দুই টাকা।
তানিয়া আবার ল্যাপটপ খুললো।
যোসনা আক্তারের প্রোফাইলে ক্লিক করলো। মেয়েটার রেটিং ৪.৮ আউট অফ ৫। অ্যাকিউরেসি ৯৬%। সে গত তিন মাসে ১৪,০০০ টাস্ক কমপ্লিট করেছে। চৌদ্দ হাজার। তার মানে সে এই তিন মাসে এই প্ল্যাটফর্ম থেকে আটাশ হাজার টাকা আয় করেছে। মাসে সাড়ে নয় হাজার টাকার মতো। গাজীপুরে একটা গার্মেন্টস শ্রমিকের মিনিমাম ওয়েজ এখন বারো হাজার পাঁচশো টাকা।
যোসনা মিনিমাম ওয়েজের চেয়েও কম পাচ্ছে। রাত জেগে।
তানিয়া হিসাব করলো। ১৪,০০০ টাস্ক, প্রতিটাতে গড়ে ২০ সেকেন্ড ধরলে, সেটা প্রায় ৭৮ ঘণ্টা কাজ। তিন মাসে ৭৮ ঘণ্টা। ঘণ্টায় ৩৫৯ টাকা। এভাবে দেখলে খারাপ না। কিন্তু তানিয়া জানে, ২০ সেকেন্ড গড় ধরাটা ভুল। কারণ প্ল্যাটফর্মে লগইন করা, টাস্ক লোড হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা, ইন্টারনেট স্লো হলে বসে থাকা, ভুল টাস্ক রিজেক্ট হয়ে ফিরে আসা, এগুলো কেউ হিসাব করে না। আসল ঘণ্টায় আয় হয়তো একশো টাকাও না।
তানিয়া চতুর্থ কাপ কফি বানাতে উঠলো।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে পানি গরম করতে করতে সে ভাবছে তার বুয়েটের দিনগুলোর কথা। সিএসই ডিপার্টমেন্ট। সেখানে একটা কথা সবাই বলতো: "Data is the new oil." ডেটা হলো নতুন তেল। তানিয়া এখন বুঝছে, কথাটা কতটা সত্য। তেলের মতোই ডেটা মাটির নিচ থেকে তোলা হয়। আর যারা তোলে তারা তেলের দাম পায় না। তারা পায় মজুরি। দুই টাকা প্রতি টাস্ক।
কফি নিয়ে ফিরে এলো তানিয়া। ল্যাপটপে একটা স্প্রেডশিট খুললো। তার ব্যাচ রিকোয়েস্ট রেডি। ১০,০০০ বাংলা বাক্য। প্রতিটার জন্য সেন্টিমেন্ট লেবেল দরকার। মোট খরচ: ২০,০০০ টাকা। ডলারে ১৭০ এর মতো। এই টাকায় আমেরিকায় একজন ডেটা লেবেলার দুই ঘণ্টাও কাজ করবে না। বাংলাদেশে এই টাকায় শ-খানেক মানুষ কাজ করবে কয়েক দিন ধরে।
তানিয়া জানে এটা শোষণ। সে এটাও জানে এটা ছাড়া উপায় নেই।
সকালে শিহাব উঠে দেখবে তানিয়া এখনো জেগে আছে। সে কিছু বলবে না। শিহাব প্র্যাকটিক্যাল মানুষ। সে জানে তানিয়া মাঝে মাঝে এইসব নিয়ে ভাবে। সে আগেও বলেছে, "সবাই এই প্ল্যাটফর্মগুলো ইউজ করে। গুগল করে, মেটা করে, ওপেনএআই করে। তুমি একা দুনিয়া বদলাতে পারবে না।"
শিহাব ভুল বলে না। কিন্তু শিহাব ঠিকও বলে না।
তানিয়া যোসনার প্রোফাইলে আবার ফিরে গেলো। মেয়েটা কখন কাজ করে দেখলো। অ্যাক্টিভিটি লগ: রাত ১০টা থেকে ভোর ৩টা। প্রতিদিন। সাত দিন সপ্তাহে।
রাত দশটায় গাজীপুরে কী হয়? ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তায় রিকশাওয়ালারা কমে আসে। টিনের চালের ঘরগুলোতে বাতি জ্বলে। যোসনা হয়তো একটা পুরনো ফোনে কাজ করে। হয়তো একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড ল্যাপটপে। হয়তো বাসার ওয়াইফাই নেই, মোবাইল ডেটা দিয়ে কাজ করে। প্রতি জিবি ডেটার দাম হয়তো তার আয়ের একটা বড় অংশ খেয়ে ফেলে।
তানিয়া ভাবলো, যোসনা কি জানে সে কী করছে? মানে, সে জানে সে বাক্যের পাশে পজিটিভ-নেগেটিভ ট্যাগ দিচ্ছে। কিন্তু সে কি জানে এই ট্যাগগুলো দিয়ে কী হবে? যে এই ডেটা দিয়ে একটা মডেল ট্রেইন হবে? যে সেই মডেল দিয়ে বাংলা ভাষার সেন্টিমেন্ট বোঝা যাবে? যে সেই মডেল হয়তো একদিন কোনো কর্পোরেশন কিনবে, এবং সেই কর্পোরেশন কোটি কোটি টাকা আয় করবে? আর যোসনা পাবে দুই টাকা প্রতি টাস্ক?
পঞ্চম কাপ কফি।
তানিয়ার হাত কাঁপছে। ক্যাফেইন, নাকি অন্য কিছু, সে নিজেও জানে না।
সে একটা কথা ভাবছে যেটা তাকে কামড়াচ্ছে ভেতর থেকে। সে বাংলা NLP বানাচ্ছে বাংলা ভাষার মানুষের জন্য। সেই মানুষগুলোর মধ্যে যোসনাও আছে। এই AI যখন রেডি হবে, যখন বাংলায় চ্যাটবট কাজ করবে, যখন বাংলা কন্টেন্ট অটোমেটিক মডারেট হবে, তখন যোসনার কী হবে? যোসনার এই দুই টাকার কাজটুকুও থাকবে না। কারণ মডেল তখন নিজেই পারবে। যোসনা নিজের কাজ নিজেই খেয়ে ফেলবে, এটুকুও জানবে না।
তানিয়ার মনে পড়লো তার থিসিসের কথা। সে বুয়েটে আন্ডারগ্র্যাডে একটা পেপার লিখেছিলো: "Bangla Sentiment Analysis: Challenges and Opportunities." সেই পেপারে সে লিখেছিলো বাংলা ভাষায় AI-এর সম্ভাবনা কত বিশাল। সে লেখেনি কার ঘাড়ে চড়ে সেই সম্ভাবনা দাঁড়াবে।
তানিয়া ব্রাউজারের ট্যাব বদলালো। যোসনার প্রোফাইল থেকে ব্যাচ রিকোয়েস্ট পেজে গেলো। ১০,০০০ বাক্য। সেন্টিমেন্ট লেবেলিং। প্রতি টাস্ক ২ টাকা। এস্টিমেটেড কমপ্লিশন: ৩-৫ দিন। কোয়ালিটি গ্যারান্টি: ৯৫%+ অ্যাকিউরেসি।
৯৫% অ্যাকিউরেসি। মানে এই মানুষগুলো প্রায় পারফেক্ট কাজ করবে। দুই টাকায়।
তানিয়ার মনে হলো সে একটা জালের মধ্যে আটকে আছে। সে যদি এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার না করে, তাহলে ডেটা পাবে না। ডেটা না পেলে মডেল ট্রেইন হবে না। মডেল না হলে প্রোডাক্ট হবে না। প্রোডাক্ট না হলে কোম্পানি টিকবে না। কোম্পানি না টিকলে বাংলা NLP-এর স্বপ্ন শেষ। আবার, সে যদি এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, তাহলে সে সেই সিস্টেমের অংশ হয়ে যাচ্ছে যেটা যোসনাদের দুই টাকায় খাটায়।
সে শিহাবের কথা ভাবলো। "সবাই এই প্ল্যাটফর্মগুলো ইউজ করে।"
হ্যাঁ, সবাই করে। সেটাই তো সমস্যা।
তানিয়া একটু হাসলো। বিশ্রী একটা হাসি। সে নিজেকে বললো, তুমি তো ভালো মানুষ হতে চেয়েছিলে। তুমি তো বাংলাদেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলে। তুমি তো AI-কে বাংলায় কথা বলাতে চেয়েছিলে। এখন কী হলো? তুমি এখন সেই সিস্টেমের আরেকটা দাঁত।
রাত তিনটা বাজে।
যোসনা আক্তার এখনো অনলাইন। তার প্রোফাইলের সবুজ বাতি জ্বলছে। সে এখন কাজ করছে। কারো জন্য বাক্য ট্যাগ করছে। পজিটিভ। নেগেটিভ। প্রশ্ন। দুই টাকা। দুই টাকা। দুই টাকা।
তানিয়া ভাবলো, যোসনার ঘরে এখন কী হচ্ছে? হয়তো তার মা ঘুমাচ্ছে। সারাদিন ফ্যাক্টরিতে দাঁড়িয়ে কাপড় সেলাই করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে পড়েছে। হয়তো যোসনা ফোনের আলো কম করে কাজ করছে যাতে কাউকে ডিস্টার্ব না করে। হয়তো বাইরে গাজীপুরের রাস্তায় কুকুর ডাকছে। হয়তো পাশের ঘরে তার ছোট ভাই ঘুমাচ্ছে যে সকালে স্কুলে যাবে।
আর তানিয়া বনানীতে বসে পঞ্চম কাপ কফি শেষ করছে।
দুজনেই জেগে আছে। দুজনেই কাজ করছে। দুজনেই বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করছে। একজন জানে সে কী বানাচ্ছে। আরেকজন জানে না।
তানিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
সে ভাবলো, পরে। পরে ঠিক করবো। কোম্পানি দাঁড়ালে, ফান্ডিং আসলে, তখন এই লেবেলারদের ভালো পে করবো। তখন যোসনাদের ফেয়ার ওয়েজ দেবো। তখন একটা ভালো সিস্টেম বানাবো। এখন চলুক। এখন দরকার। এখন ছাড়া উপায় নেই।
তানিয়া জানে, "পরে" কখনো আসে না। স্টার্টআপের দুনিয়ায় "পরে" একটা মিথ্যা কথা যেটা সবাই নিজেকে বলে। আজকে দুই টাকা, কাল দুই টাকা, পরশু দুই টাকা। ইনভেস্টররা চাইবে মার্জিন বাড়াতে। বোর্ড চাইবে খরচ কমাতে। দুই টাকা তিন টাকা হবে না। হয়তো দেড় টাকা হবে।
কিন্তু তানিয়া এখন এইসব ভাববে না।
সে ব্যাচ রিকোয়েস্ট পেজে ফিরে গেলো। মাউস কার্সর "Submit" বাটনের উপর। তার হাত কি কাঁপছে? না। তার হাত স্থির। তানিয়া স্থির মেয়ে। সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সে তিন মাস আগে সবকিছু ছেড়ে স্টার্টআপ শুরু করেছে, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তানিয়া "Submit" ক্লিক করলো না। সে আরেকটু স্ক্রল করলো। প্রাইসিং অপশনে গেলো। দুই টাকা ডিফল্ট। তিন টাকা প্রিমিয়াম। পাঁচ টাকা "ফেয়ার ওয়েজ" ট্যাগ।
পাঁচ টাকা ফেয়ার ওয়েজ। তার মানে দুই টাকা আনফেয়ার, এটা প্ল্যাটফর্মও জানে। তারা এটার নাম দিয়েছে "ফেয়ার ওয়েজ"। একটা ট্যাগ। একটা ব্যাজ। পাঁচ টাকায় বিবেক কেনা যায়।
পাঁচ টাকায় খরচ হবে ৫০,০০০ টাকা। আড়াই গুণ বেশি। তানিয়ার বাজেট টাইট। প্রতিটা টাকা গোনা।
তানিয়া দুই টাকা সিলেক্ট করলো।
তারপর মুছে দিলো। তিন টাকা সিলেক্ট করলো। তারপর সেটাও মুছে দিলো। পাঁচ টাকা সিলেক্ট করলো। ৫০,০০০ টাকা। ছোট স্ক্রিনে বড় সংখ্যা। তারপর সেটাও মুছে দিলো।
তানিয়া চেয়ারে হেলান দিলো। সিলিংয়ের দিকে তাকালো। সিলিংয়ে কিছু নেই। একটা ফ্যান ঘুরছে।
সে ভাবছে, সে যদি পাঁচ টাকা দেয়, তাহলে কি যোসনা পাঁচ টাকা পাবে? নাকি প্ল্যাটফর্ম কমিশন কেটে নেবে? প্ল্যাটফর্ম ত্রিশ পার্সেন্ট রাখে। তার মানে পাঁচ টাকায় যোসনা পাবে সাড়ে তিন টাকা। দুই টাকায় পাবে এক টাকা চল্লিশ পয়সা। এক টাকা চল্লিশ পয়সায় একটা বাক্য পড়া, বোঝা, ট্যাগ দেওয়া।
তানিয়া ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকলো।
সে জানে কাল সকালে শিহাব জিজ্ঞেস করবে, "ডেটা অর্ডার দিলি?" তানিয়া বলবে, "হ্যাঁ।" শিহাব বলবে, "কত পড়লো?" তানিয়া একটা সংখ্যা বলবে। শিহাব মাথা নাড়বে। তারপর তারা কোড লিখবে, মডেল ট্রেইন করবে, প্রোডাক্ট বানাবে। কেউ যোসনার কথা জিজ্ঞেস করবে না। কেউ জানবেও না যে যোসনা বলে কেউ আছে।
যোসনার প্রোফাইলের সবুজ বাতি এখনো জ্বলছে।
তানিয়া দুই টাকা সিলেক্ট করলো। টোটাল: ২০,০০০ টাকা। ১৭০ ডলার। পুরো ব্যাচ। ১০,০০০ বাক্য। ৩-৫ দিন।
সে টাইপ করলো:
"Accept task batch."
এন্টার চাপলো।
স্ক্রিনে একটা সবুজ নোটিফিকেশন: "Batch submitted successfully. Estimated completion: 3-5 business days."
তানিয়া ল্যাপটপ বন্ধ করলো। এবার সত্যিই বন্ধ করলো।
অন্ধকারে বসে রইলো।
গাজীপুরে যোসনা আক্তারের ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো। নতুন ব্যাচ। ১০,০০০ টাস্ক। প্রতি টাস্ক ২ টাকা। প্ল্যাটফর্ম কমিশন বাদে ১ টাকা ৪০ পয়সা। যোসনা ফোনের স্ক্রিনে তাকালো। পাশে চায়ের কাপ, ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সে একটু চা খেলো। তারপর "Accept" বাটনে ট্যাপ করলো। কাজ শুরু করলো।
"আমাদের দেশ সুন্দর।" পজিটিভ। "বেকারত্ব বাড়ছে।" নেগেটিভ। "তুমি কি ভালো আছো?" প্রশ্ন। "কিছুই ভালো লাগে না।" নেগেটিভ।
দুই টাকা। দুই টাকা। দুই টাকা। দুই টাকা।
ভোরের আলো ফুটছে। গাজীপুরে ফ্যাক্টরির সাইরেন বাজবে একটু পরেই। যোসনার মা উঠবে। চুলায় ভাত চাপাবে। তারপর হেঁটে যাবে ফ্যাক্টরিতে। যোসনা তখন ঘুমাবে। বিকেলে উঠে আবার ফোন খুলবে। নতুন টাস্ক। নতুন বাক্য। নতুন ট্যাগ।
বনানীতে তানিয়া বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ঘুম আসছে না। তার মাথায় একটা লাইন ঘুরছে, যেটা সে নিজেই একদিন তার পিচ ডেকে লিখেছিলো:
"আমরা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য AI বানাচ্ছি।"
বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য। যোসনাও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ। রহিমাও। করিমও। সবাই।
তানিয়া চোখ বন্ধ করলো।
কফির পাঁচটা কাপ সিংকে পড়ে আছে।