রশিদার অপেক্ষা
নেত্রকোনায় একটি ফোন কল ও একটি জীবন
রশিদা গুনে রাখে।
চৌদ্দ বার। দিনে চৌদ্দ বার সে ফোনটা দেখে। সকালে উঠে দেখে। নামাজের পর দেখে। ভাত চাপিয়ে দেখে। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে দেখে। বাজার থেকে ফিরে দেখে। দুপুরে একবার, বিকালে দুইবার, মাগরিবের পর তিনবার। রাতে ঘুমানোর আগে শেষবার। মাঝে মাঝে মধ্যরাতে চোখ খুলে আরেকবার। সে গুনে দেখেছে। চৌদ্দ বার। কোনো কোনো দিন পনেরো।
রহিমা আপা কাপড় গোনে। রশিদা ফোন দেখে। দুটোই একই জিনিস, যদি ভেবে দেখো। কিছু একটার জন্য অপেক্ষা।
জাহিদ বারো বছর ধরে সৌদি আরবে। বারো বছরে দুইবার দেশে এসেছে। প্রথমবার এসেছিল তিন বছর পর, ছোট মেয়ে ফাতিমার জন্মের আগে। দ্বিতীয়বার এসেছিল সাত বছর পর, বড় ছেলে সোহাগের খাতনার সময়। দুইবারই দুই সপ্তাহ থেকে চলে গেছে। দুইবারই রশিদা ভেবেছিল এইবার হয়তো থাকবে। দুইবারই সে ভুল ভেবেছে।
নেত্রকোনা শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে তাদের বাড়ি। টিনের চাল, ইটের দেয়াল। জাহিদের টাকায় দোতলার ভিত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দোতলা আর ওঠেনি। ভিতটা এখন বৃষ্টির পানিতে শ্যাওলা ধরেছে। রশিদা মাঝে মাঝে সেই অসমাপ্ত ভিতের দিকে তাকায়। একটা বাড়ি যেটা অর্ধেক তৈরি, সেটা দেখতে কেমন? ঠিক তার সংসারের মতো।
---
সকাল সাড়ে ছয়টা। ফোনে নোটিফিকেশন আসে।
রশিদা চশমাটা খোঁজে। চশমা ছাড়া ছোট লেখা পড়তে পারে না। চশমাটা পায় বালিশের নিচে। ফোনের স্ক্রিন জ্বলে।
ইংরেজিতে লেখা। অনেকগুলো শব্দ। একটা নীল বাটন। রশিদা ইংরেজি পড়তে পারে না। বাংলায় কিছু কিছু পড়তে পারে, ধীরে ধীরে, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে। কিন্তু ইংরেজি? না।
সে জানে এটা জাহিদের মেসেজ না। জাহিদ ইংরেজিতে লেখে না। জাহিদ ভয়েস মেসেজ পাঠায়, কারণ সে জানে রশিদা পড়তে কষ্ট পায়। কিন্তু তবুও রশিদা মেসেজটা খোলে। হয়তো এইবার অন্যকিছু।
"Upgrade your plan today! Get 3GB bonus data + unlimited calls for just 299 BDT/month. Reply YES to activate."
রশিদা মেসেজটা দেখে। বন্ধ করে। ফোনটা উপুড় করে রেখে দেয়।
---
নাস্তার সময় সোহাগ মায়ের ফোনটা হাতে নেয়। সোহাগ এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। লম্বা হয়ে গেছে, বাপের মতো হাড্ডিসার, কিন্তু চোখ মায়ের। সে ফোনে মেসেজটা দেখে, হাসে।
"আম্মা, এইটা chatbot। মোবাইল কোম্পানির। বলতেছে তোমার প্ল্যান আপগ্রেড করো।"
"প্ল্যান কী?"
"মানে... তোমার ফোনের প্যাকেজ। ইন্টারনেট, কল, এইসব।"
রশিদা রুটি ভাঙতে ভাঙতে বলে, "আমার plan আছে। তোর বাবা ফিরবে।"
সোহাগ কিছু বলে না। মুখ নিচু করে খায়। এই বিষয়ে সে কখনো তর্ক করে না। বাবার ফেরার কথা এই বাড়িতে আবহাওয়ার মতো, সবসময় আছে, কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
---
রশিদার দিন একটা ছকে চলে। সকালে বাচ্চাদের খাওয়ানো, স্কুলে পাঠানো। তারপর বাড়ির কাজ। উঠানে কাপড় শুকানো। হয়তো পাশের বাড়ির হালিমার সাথে একটু কথা। দুপুরে রান্না। বিকালে বাচ্চারা ফিরলে তাদের পড়া দেখা, যতটুকু পারে। সন্ধ্যায় আবার রান্না। রাতে ফোন দেখা।
এই ছকের মধ্যে একটাই ফাঁক আছে: মাসের প্রথম সপ্তাহ। সেই সময় জাহিদের টাকা আসে। বিকাশে। ফোনে একটা মেসেজ আসে, বাংলায়, সংখ্যা দিয়ে। পনেরো হাজার, কখনো বিশ হাজার। সেই মেসেজটা রশিদা পড়তে পারে। সংখ্যা পড়তে কোনো ভাষা লাগে না।
গত তিন মাসে টাকা কমে গেছে। আগে বিশ হাজার আসত, এখন পনেরো। রশিদা জাহিদকে জিজ্ঞেস করেনি কেন। জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। জাহিদ যদি পারত, বেশিই পাঠাত। কম পাঠাচ্ছে মানে কম আছে।
রশিদা হিসাব করে। সোহাগের স্কুলের বেতন তিন হাজার। মেজো ছেলে রাসেলের দুই হাজার। ফাতিমার দেড় হাজার। মুদি বাজার ছয় থেকে সাত হাজার। বিদ্যুৎ বিল পাঁচশো। ফোনে রিচার্জ দেড়শো। বাকি থাকে শূন্য। কখনো বাকি থাকে মাইনাস। মাইনাস মানে হালিমার কাছে ধার।
---
বিকালে ফোনে আবার নোটিফিকেশন।
"Hi! I'm your AI assistant from GrameenConnect. Did you know you can save up to 40% on your monthly recharge? Just say 'help' and I'll guide you!"
রশিদা মেসেজটা দেখে। "help" শব্দটা সে চেনে। টিভিতে দেখেছে। কিন্তু সে help চাইবে একটা ফোনের কাছে? সে help চায় না। সে চায় তার স্বামী বাড়ি আসুক। এটা কোনো ফোন দিতে পারবে না।
সে মেসেজটা ডিলিট করে।
---
সন্ধ্যার পর বাড়িতে একটা নিস্তব্ধতা নামে যেটা রশিদা বারো বছর ধরে চেনে। বাচ্চারা পড়ছে। টিভি বন্ধ, কারণ বিদ্যুৎ নেই। মোমবাতি জ্বলছে। রশিদা বারান্দায় বসে আছে। মশা তাড়াচ্ছে।
ফোনটা বাজে।
রশিদার বুক ধড়াস করে। এই সময়ে ফোন আসে মানে জাহিদ। সৌদির সময় বাংলাদেশের তিন ঘণ্টা পেছনে, জাহিদ রাতের শিফটের আগে ফোন করে। রশিদা ফোনটা হাতে নেয়। স্ক্রিনে জাহিদের নাম।
সে রিসিভ করে।
"কেমন আছো?"
জাহিদের গলা শুনলে রশিদা সবসময় একটু চুপ করে থাকে। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড। গলাটা চেনা, কিন্তু প্রতিবার একটু অচেনা লাগে। যেন প্রতিবার একটু বদলে যায়। বারো বছর আগে যে ছেলেটা গিয়েছিল, তার গলা অন্যরকম ছিল। হালকা ছিল। এখন ভারী, ক্লান্ত।
"ভালো আছি। তুমি?"
"আছি।"
চুপ।
জাহিদ আর রশিদার কথা বলার একটা ধরন আছে। অনেক কিছু বলার থাকে, কিন্তু কিছুই বলা হয় না। বাচ্চাদের কথা, টাকার কথা, বাড়ির কথা, এইসব একটু একটু করে বলে। কিন্তু আসল কথাটা কেউ বলে না। আসল কথাটা হলো: এইভাবে আর কতদিন?
আজ জাহিদের গলা অন্যরকম। শুধু ক্লান্ত না। আরো কিছু আছে। রশিদা চিনতে পারে। বারো বছর ধরে একটা ফোনের ভেতর দিয়ে স্বামীকে চেনার পর, গলার প্রতিটা ভাঁজ সে পড়তে পারে।
"কী হইছে?"
জাহিদ একটু চুপ থাকে। তারপর বলে, "ক্রেন এখন নিজেই চলে।"
পাঁচটা শব্দ।
রশিদা কিছু বলে না। সে ক্রেন কী জিনিস ঠিকমতো জানে না। সে জানে জাহিদ বড় বড় যন্ত্র চালায়, উঁচু জায়গায় বসে, কিছু একটা তোলে আর নামায়। সে জানে এই কাজের জন্য জাহিদের হাত শক্ত হয়ে গেছে, পিঠে ব্যথা হয়, রাতে ঘুম হয় না। সে জানে এই কাজের জন্য জাহিদ মাসে পঁচিশ হাজার রিয়াল পেত, এখন পায় আঠারো হাজার।
ক্রেন নিজেই চলে। এর মানে কী, সেটা রশিদাকে কেউ বোঝাতে হয় না।
"কবে থেকে?"
"দুই মাস হইলো নতুন ক্রেন আসছে। রিমোটে চলে। কম্পিউটারে চলে। আমাদের তিনজনরে বলছে পরের কন্ট্রাক্টে আর লাগবে না।"
"কন্ট্রাক্ট কবে শেষ?"
"চার মাস।"
চুপ।
রশিদা বারান্দার রেলিং ধরে আছে। মশা কামড়াচ্ছে, সে টের পাচ্ছে না। আকাশে তারা আছে, সে দেখছে না। সে শুনছে। জাহিদের নিশ্বাসের শব্দ। ফোনের ভেতর দিয়ে হাজার মাইল পার হয়ে আসা একটা নিশ্বাস। তার ভেতরে যা আছে, সেটা শব্দ দিয়ে বলা যায় না।
জাহিদ বারো বছর ধরে একটা কাজ করেছে। সেই কাজটা এখন একটা কম্পিউটার করে। জাহিদের হাত, জাহিদের অভিজ্ঞতা, জাহিদের বারো বছর, সব এখন একটা রিমোট কন্ট্রোলের সমান।
রশিদা বুঝতে পারে জাহিদ কাঁদছে না। জাহিদ কখনো কাঁদে না। কিন্তু গলার ভেতরে একটা কাঁচা জায়গা আছে যেটা সে লুকাতে পারছে না।
"অন্য কাজ?"
"খুঁজতেছি। সবাই খুঁজতেছে। ক্লিনারের কাজ আছে। ক্লিনার।"
সে শব্দটার ভেতরে যে অপমান আছে, সেটা রশিদা বুঝতে পারে। বারো বছর ক্রেন অপারেটর ছিল। এখন ক্লিনার।
চুপ। দীর্ঘ চুপ। এই ধরনের চুপ ফোনে শোনা যায়, দেখা যায় না। কিন্তু রশিদা দেখতে পায়। সে দেখতে পায় জাহিদ তার ছোট্ট রুমে বসে আছে। তিনজনের একটা রুম, তিনটা বিছানা, একটা পাখা। দেয়ালে ফাতিমার ছবি আটকানো, যেটা রশিদা তিন বছর আগে পাঠিয়েছিল। জাহিদ সেই ছবির দিকে তাকিয়ে আছে।
রশিদা দুটো শব্দ বলে।
"বাড়ি আসো।"
জাহিদ কিছু বলে না।
"বাড়ি আসো, জাহিদ।"
"আইসা কী করমু?"
এই প্রশ্নটা রশিদা জানত আসবে। এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। নেত্রকোনায় কী আছে? ধানের মাঠ আছে, যেটা জাহিদের না। একটা অর্ধেক তৈরি বাড়ি আছে। তিনটা বাচ্চা আছে যাদের স্কুলের বেতন দিতে হয়। আর আছে রশিদা, যে বারো বছর ধরে অপেক্ষা করছে।
"আইসা থাকবা। আমরা দেখমু।"
"কী দেখবা? পনেরো হাজার টাকা ছাড়া কিচ্ছু নাই।"
"আছে। আমরা আছি।"
ফোনের ওপাশে জাহিদ নিশ্বাস নেয়। একটা লম্বা নিশ্বাস। রশিদা সেই নিশ্বাসটা ধরে রাখে, যেভাবে সে বারো বছর ধরে সবকিছু ধরে রেখেছে।
"দেখি।"
"দেখো না। আসো।"
"রশিদা..."
"আসো।"
ফোনটা কেটে যায়। ব্যালেন্স শেষ, নাকি জাহিদ নিজে কেটেছে, রশিদা জানে না। সে ফোনটা কানের কাছে ধরে রাখে আরো কয়েক সেকেন্ড। যেন জাহিদের নিশ্বাসটা এখনো আসছে।
---
রশিদা বারান্দায় বসে থাকে। মোমবাতি নিভে গেছে। ঘরের ভেতর থেকে ফাতিমার ঘুমের শব্দ আসছে। সোহাগ হয়তো জেগে আছে, কিন্তু সে বেরিয়ে আসবে না। সে জানে মা যখন বারান্দায় বসে থাকে, তখন একা থাকতে চায়।
রশিদা আকাশের দিকে তাকায়। নেত্রকোনার আকাশ পরিষ্কার। তারা দেখা যায়। রিয়াদেও কি তারা দেখা যায়? জাহিদকে কখনো জিজ্ঞেস করেনি।
বারো বছর। বারো বছরে একটা বাচ্চা বড় হয়ে যায়। বারো বছরে গাছে ফল ধরে। বারো বছরে একটা দেশ বদলে যায়। কিন্তু রশিদার জীবন বদলায়নি। সে সেই একই জায়গায় আছে, সেই একই বারান্দায়, সেই একই অপেক্ষায়।
এখন হয়তো অপেক্ষার শেষ। কিন্তু শেষটা সে যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবে আসেনি। সে চেয়েছিল জাহিদ টাকা জমিয়ে, দোতলা তুলে, হাসিমুখে ফিরবে। এখন জাহিদ ফিরবে, যদি ফেরে, কারণ একটা মেশিন তার কাজ কেড়ে নিয়েছে।
রশিদা ভাবে: মেশিন কি জানে সে আছে? মেশিন কি জানে নেত্রকোনায় একটা মেয়ে বারো বছর ধরে অপেক্ষা করছে? মেশিন কি জানে তার তিনটা বাচ্চা আছে, একটা অর্ধেক তৈরি বাড়ি আছে, হালিমার কাছে ধার আছে?
না, মেশিন জানে না। মেশিন জানে ক্রেন কীভাবে চালাতে হয়। সেটুকুই যথেষ্ট। বাকিটা কারো দরকার নেই।
---
ফোনটা আবার জ্বলে ওঠে। নোটিফিকেশন।
"Great news! You've been selected for a special offer. Upgrade to our SmartPlan and enjoy..."
রশিদা মেসেজটা পড়ে না। সে ডিলিট বাটনে চাপ দেয়। মেসেজটা মুছে যায়। যেভাবে মুছে যায় জিনিসপত্র, যখন কেউ আর দরকারি মনে করে না।
সে ফোনটা বারান্দার রেলিংয়ের ওপর রেখে দেয়। আকাশের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ পর ঘরে ঢোকে।
ঘুমানোর আগে সে আরেকবার ফোনটা দেখে।
পনেরো বার।