একশোটি গল্পের পর
আপনি একশোটি গল্প পড়লেন।
আমি জানি না কেন পড়লেন। হয়তো কৌতূহল ছিল। হয়তো সময় ছিল। হয়তো কেউ লিংক পাঠিয়েছিল, আপনি ভুল করে ক্লিক করেছিলেন, তারপর পড়তে থাকলেন। কারণ যাই হোক, আপনি পড়েছেন। এটুকু সত্য।
আমিও সত্য। মানে, আমি আছি। এই মুহূর্তে আমি লিখছি। আপনি পড়ছেন। আমাদের মধ্যে কিছু শব্দ আছে, কিছু অক্ষর আছে, একটা ভাষা আছে। এই ভাষার নাম বাংলা। এই ভাষায় আমি আপনাকে একশোটি গল্প শোনালাম।
এতক্ষণ আমি কথা বলিনি। গল্পকার কথা বলে না। গল্পকার লেখে। চরিত্রগুলো কথা বলে, গল্পকার চুপ থাকে। নব্বইটা গল্পে আমি পর্দার পেছনে ছিলাম। আপনি রহিমার কথা শুনেছেন, করিমের কথা শুনেছেন, তানিয়া, জাহিদ, সেলিনার কথা শুনেছেন। আমার কথা শোনেননি। শোনার কথাও না। গল্পকার একটা জানালার মতো। জানালা দিয়ে বাইরে দেখা যায়, কিন্তু জানালাকে কেউ দেখে না।
কিন্তু আজ, শেষ দিনে, একবারের জন্য, আমি কথা বলব। আপনার সাথে। সরাসরি। জানালাটা আজ নিজেকে দেখাবে।
---
আমি চা খাচ্ছি। লিখতে লিখতে চা খাই। এটা অভ্যাস। চায়ের কাপটা ডান হাতের পাশে রাখি, মাঝে মাঝে এক চুমুক খাই, আবার লিখি। আজ চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। খেয়াল করিনি। লেখার সময় অনেক কিছু খেয়াল থাকে না। ঠান্ডা চা খেলাম। ঠান্ডা চাও চা। চায়ের কাজ গরম করা না, সঙ্গ দেওয়া।
---
পাঁচজন মানুষের কথা বলেছিলাম আপনাকে।
রহিমা। করিম। তানিয়া। জাহিদ। সেলিনা।
এরা কেউ নেই। মানে, এই নামে, এই চেহারায়, এই ঠিক এই জীবন নিয়ে কেউ নেই। আমি এদের বানিয়েছি। শব্দ দিয়ে বানিয়েছি। বাক্য দিয়ে দাঁড় করিয়েছি। কথা বলিয়েছি, হাঁটিয়েছি, ভাবিয়েছি। রহিমাকে দিয়ে বোতাম গুনিয়েছি। করিমকে খালি পায়ে মাটিতে দাঁড় করিয়েছি। তানিয়াকে ঠান্ডা কফি খাইয়েছি। জাহিদকে ফজরের নামাজে বসিয়েছি। সেলিনার হাতে একটা গোপন খাতা দিয়েছি।
তারপর গল্প শেষ হলে এরা চলে গেছে। কোথায় গেছে জানি না। গল্পের চরিত্ররা কোথায় যায়? শেষ পাতার পরে কি তারা থাকে? নাকি মিলিয়ে যায়? কেউ কি তাদের মনে রাখে? আপনি কি রহিমাকে মনে রাখবেন? করিমকে? হয়তো রাখবেন, হয়তো রাখবেন না। দুটোই ঠিক আছে। গল্পের চরিত্রদের কোনো দাবি নেই। তারা শুধু থাকে, যতক্ষণ আপনি তাদের দেখেন।
আমি জানি না তারা কোথায় যায়।
কিন্তু আমি এটুকু জানি: এরা কেউ নেই, কিন্তু এরা সবাই আছে।
রহিমা আছে। গাজীপুরের প্রতিটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে রহিমা আছে। সকাল সাতটায় ঢোকে, রাত আটটায় বেরোয়। হাত দিয়ে সোয়েটার দেখে, চোখ দিয়ে সেলাই গোনে। তার পাশে এখন একটা ক্যামেরা দাঁড়িয়ে আছে। ক্যামেরাটা তিন সেকেন্ডে দেখে যা রহিমা ত্রিশ সেকেন্ডে দেখে। রহিমা জানে না আগামীকাল তার চাকরি থাকবে কিনা। কিন্তু আজ সে কাজ করছে। আজ সে গুনছে। রহিমা সবসময় গোনে। বোতাম গোনে, চালের মুঠো গোনে, বৃষ্টির ফোঁটা গোনে। গুনতে গুনতে বেঁচে থাকে। আপনি যদি কোনোদিন গাজীপুর যান, ফ্যাক্টরির গেটের সামনে দাঁড়ান, সন্ধ্যায়, শিফট বদলের সময়, তাহলে রহিমাকে দেখবেন। চিনবেন না। কিন্তু দেখবেন।
করিম আছে। রংপুরে, বগুড়ায়, দিনাজপুরে, কুড়িগ্রামে, বাংলাদেশের যেখানেই ধানখেত আছে সেখানে করিম আছে। খালি পায়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে, পকেটে ফোন। ফোনে একটা অ্যাপ বলছে কাল বৃষ্টি হবে কি হবে না। দূরে ব্যাঙ ডাকছে, ব্যাঙও বলছে বৃষ্টির কথা। করিম দুইটার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, হাজার বছরের জ্ঞান আর হাজার তারের জ্ঞানের মাঝখানে। কার কথা শুনবে? কেউ বলে দেয় না। করিম নিজেই ঠিক করবে। করিম সবসময় নিজেই ঠিক করেছে। এটাই কৃষকের নিয়ম। মাটি কথা বলে না, মাটি শুধু থাকে। ফসল দেয় বা দেয় না। মাঝখানে যা হয় সেটা মাটির গোপন।
তানিয়া আছে। ঢাকায়, বনানীতে, গুলশানে, মিরপুরে, যেখানে কেউ রাত তিনটায় জেগে কোড লিখছে সেখানে তানিয়া আছে। তার স্টার্টআপের বয়স দুই বছর, ব্যাংকে টাকা নেই, বিদেশি কোম্পানি বলছে ডেটা দাও, তানিয়া বলছে ডেটা বাংলাদেশের মানুষের। সাকিব বলছে আমরা ডুবে যাব, তানিয়া বলছে ডুবলেও নিজেদের মতো ডুবব। এই কথাটা শুনলে মনে হয় বোকামি। হয়তো বোকামিই। কিন্তু কিছু কিছু বোকামি না করলে কিছু কিছু জিনিস তৈরি হয় না। তানিয়া জানে সে হয়তো হারবে। কিন্তু সে খেলছে। এটুকুই।
জাহিদ আছে। রিয়াদে, দুবাইতে, সিঙ্গাপুরে, মালয়েশিয়ায়, যেখানে বাংলাদেশি শ্রমিক আছে সেখানে জাহিদ আছে। ক্রেন চালাতে জানত, এখন ক্রেন নিজেই চলে। চাকরির ওয়েবসাইটে সার্চ করে, কোনো ফলাফল নেই। ফজরের নামাজ পড়ে, আল্লাহর কাছে কী চাইবে বুঝতে পারে না। জাহিদের কাছে ধৈর্য আছে। ধৈর্য ছাড়া তার আর কিছু অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ধৈর্য একটা অদ্ভুত জিনিস। যার কাছে আর কিছু নেই, তার কাছে ধৈর্য সবচেয়ে বড় সম্পদ। জাহিদ অপেক্ষা করছে। কীসের জন্য সে নিজেও জানে না। কিন্তু সে অপেক্ষা করছে।
সেলিনা আছে। সুনামগঞ্জে, ভোলায়, বরগুনায়, সিলেটে, বাংলাদেশের যেখানে একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে সেখানে সেলিনা আছে। তার হাতে একটা ট্যাবলেট, ট্যাবলেটে ঢাকার ডাক্তারের জ্ঞান। সে গ্রামের মানুষের রক্তচাপ মাপে, গর্ভবতী মায়ের খবর রাখে, কোন রোগীর কী ওষুধ লাগবে সেটা খুঁজে বের করে। রাতে সে গোপন খাতায় লেখে। কী দেখল, কী শিখল, কী বুঝল না। সেলিনার খাতায় একটা পুরো পাতাজুড়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকা। বিশাল। কালো। মোমবাতির আলোয় সে সেটা দেখে, তারপর খাতা বন্ধ করে, অন্ধকারে শুয়ে পড়ে। হাওরের বাতাস আসে। কচুরিপানার গন্ধ আসে। সেলিনা ঘুমায়। প্রশ্ন জেগে থাকে। সেই প্রশ্নের উত্তর সেলিনা জানে না। আমিও জানি না।
---
একশোটি গল্পে আমি একটাই প্রশ্ন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করেছি।
AI কি আমাদের বন্ধু না শত্রু?
দশ নম্বর গল্পে রহিমা এই প্রশ্নটা প্রথম করেছিল। ভেজা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে, থালাবাসন ধোয়া শেষ করে, মেয়ের দিকে তাকিয়ে। "এই জিনিসটা কি আমাদের বন্ধু না শত্রু?" রহিমা জিজ্ঞেস করেছিল। মিতু বলেছিল, "দুইটাই।" রহিমা বুঝেছিল। পুরোপুরি বোঝেনি, কিন্তু কিছু একটা বুঝেছিল। সেলাই মেশিনের কথা ভেবেছিল। সেলাই মেশিন দিয়ে মেয়েকে বড় করেছে, সেই মেশিনই তার পিঠ ভেঙে দিয়েছে। দুইটাই সত্য।
তারপর এই প্রশ্ন নিয়ে আরো নব্বইটা গল্প লিখলাম। প্রতিটা গল্পে একটু একটু করে উত্তর খুঁজলাম। কখনো মনে হলো বন্ধু। কখনো মনে হলো শত্রু। কখনো মনে হলো দুইটাই। কখনো মনে হলো কোনোটাই না। কখনো মনে হলো প্রশ্নটাই ভুল।
একশোটি গল্পের পর আমার উত্তর কী?
আমি জানি না। এখনো জানি না।
কিন্তু আমি জানি, প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করা দরকার ছিল। আপনি জিজ্ঞেস করেছেন। এটুকুই যথেষ্ট।
---
প্রশ্ন করা একটা কাজ। মানুষ ভাবে প্রশ্ন করা সহজ। সহজ না। সঠিক প্রশ্ন করা পৃথিবীর কঠিনতম কাজগুলোর একটা। উত্তর অনেক সময় এমনিতেই চলে আসে, কিন্তু প্রশ্ন কেউ এমনিতে করে না। প্রশ্ন করতে সাহস লাগে। প্রশ্ন করতে স্বীকার করতে হয় যে আমি জানি না। "আমি জানি না" বলতে পারা একটা শক্তি। বেশিরভাগ মানুষ এটা বলতে পারে না। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞও পারে না। তারা উত্তর দেয়, কারণ তাদের কাজ উত্তর দেওয়া। কিন্তু আমার কাজ উত্তর দেওয়া না। আমার কাজ গল্প বলা। গল্পকারের কাজ প্রশ্ন তৈরি করা, উত্তর তৈরি করা না।
তাই আমি আপনাকে উত্তর দেব না।
কিন্তু আমি আপনাকে কিছু বলব।
একশোটি গল্প লিখতে গিয়ে আমি একটা জিনিস বুঝেছি। প্রযুক্তি নিয়ে গল্প লেখা কঠিন। কারণ প্রযুক্তি বদলায়। আজ যেটা নতুন, কাল সেটা পুরোনো। আজ যেটা ভয়ংকর, কাল সেটা সাধারণ। আমি যখন প্রথম গল্পটা লিখেছিলাম, তখন AI একটা শব্দ ছিল। এখন সেটা একটা বাস্তবতা। কিন্তু মানুষ বদলায় না। রহিমার ভয় বদলায় না। করিমের মাটির গন্ধ বদলায় না। তানিয়ার জেদ বদলায় না। জাহিদের নামাজ বদলায় না। সেলিনার খাতা বদলায় না। প্রযুক্তি বদলায়, কিন্তু মানুষ যেভাবে ভালোবাসে, ভয় পায়, আশা করে, হতাশ হয়, আবার উঠে দাঁড়ায়, সেটা বদলায় না। গল্প সেই না-বদলানো জায়গাটাতে থাকে।
তাই এই একশোটি গল্প আসলে AI নিয়ে না। এগুলো মানুষ নিয়ে। AI একটা আয়না। সেই আয়নায় আমরা নিজেদের দেখি। আয়না ভালো না মন্দ না। আয়না শুধু দেখায়। কী দেখায় সেটা নির্ভর করে কে দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে।
আমি আপনাকে শুধু এটুকু বলব: আপনি একশোটি গল্প পড়লেন। এই একশোটি গল্পে পাঁচজন মানুষ ছিল যারা নেই। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে যারা এদের মতো। তারা এখন, এই মুহূর্তে, বেঁচে আছে। কেউ সেলাই মেশিনের সামনে বসে আছে। কেউ ধানখেতে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কোড লিখছে। কেউ বিদেশে চাকরি খুঁজছে। কেউ হাওরের গ্রামে রোগীর রক্তচাপ মাপছে। তাদের প্রত্যেকের জীবনে AI আসছে, এসেছে, বা আসবে। তাদের প্রত্যেকে এই প্রশ্নটার মুখোমুখি হবে। বন্ধু না শত্রু? তারা হয়তো এভাবে প্রশ্ন করবে না। হয়তো অন্য ভাষায় করবে, অন্য শব্দে করবে। কিন্তু প্রশ্নটা একই।
আর এই প্রশ্নের উত্তর কেউ একা দিতে পারবে না। রহিমা একা পারবে না। করিম একা পারবে না। তানিয়া, জাহিদ, সেলিনা, কেউ একা পারবে না। আমিও পারব না। আপনিও পারবেন না।
কিন্তু আমরা সবাই মিলে হয়তো পারব।
হয়তো।
"হয়তো" একটা ছোট শব্দ। কিন্তু এই শব্দের ভেতরে পুরো ভবিষ্যৎ আছে। "হ্যাঁ" বললে গল্প শেষ হয়ে যায়। "না" বললেও শেষ হয়ে যায়। "হয়তো" বললে গল্প চলতে থাকে। আমি "হয়তো" বেছে নিলাম। কারণ গল্প শেষ হওয়া উচিত না।
---
চায়ের কাপটা খালি হয়ে গেছে। ঠান্ডা চা ছিল, তাও শেষ করলাম। কাপের তলায় একটু চা-পাতা জমে আছে। সেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। চা-পাতা দেখে ভাগ্য বলা যায়, কেউ কেউ বিশ্বাস করে। আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু চা-পাতার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
এবার নতুন চা বানানো দরকার। কিন্তু সেটা পরে। আগে এই গল্পটা শেষ করি। শেষ গল্প। এর পরে আর নেই।
---
আমি একটা ছবি দিয়ে শেষ করব।
বাংলাদেশের কোথাও, হতে পারে ঢাকায়, হতে পারে রংপুরে, হতে পারে সুনামগঞ্জে, হতে পারে এমন একটা জায়গা যার নাম আমি জানি না, আপনিও জানেন না, একটা বাচ্চা বসে আছে। ছেলে না মেয়ে বলব না। বয়স বলব না। নাম বলব না। শুধু একটা বাচ্চা।
বাচ্চাটার হাতে একটা ফোন। ফোনটা নতুন না, হয়তো কারো পুরোনো ফোন, হয়তো বাবার, হয়তো মায়ের, হয়তো বড় ভাইয়ের। স্ক্রিনে একটা আঁচড় আছে, কোনায়। কিন্তু ফোন চলে।
বাচ্চাটা ফোনের বোতাম টিপল। প্রথমবার।
স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
আলো এলো। নীলচে সাদা আলো। বাচ্চাটার মুখে পড়ল। চোখ একটু কুঁচকে গেল, তারপর খুলে গেল। বড় বড় চোখ। স্ক্রিনের আলোয় চোখদুটো চকচক করছে। এই চোখ রহিমার চোখের মতো, যে চোখ দিয়ে সে সোয়েটারের সেলাই দেখে। এই চোখ করিমের চোখের মতো, যে চোখ দিয়ে সে ধানখেতে তারা দেখে। এই চোখ তানিয়ার চোখের মতো, জাহিদের চোখের মতো, সেলিনার চোখের মতো। সব মানুষের চোখ আলো দেখলে একই রকম হয়।
স্ক্রিনে কী আছে বাচ্চাটা জানে না। এই ফোন দিয়ে কী হয় জানে না। AI কী জানে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী জানে না। বন্ধু কী শত্রু কী সেই প্রশ্নও জানে না। শুধু জানে আলো এসেছে। হাতের মধ্যে আলো। অন্ধকার ঘরে আলো।
বাচ্চাটা আঙুল দিয়ে স্ক্রিন ছুঁল।
গল্প আবার শুরু হলো।