রহিমা এখন সুপারভাইজার

যখন হাত খালি থাকে, মন কোথায় যায়

পর্ব ১১ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

পাশের বাসার বিড়ালটা বাচ্চা দিয়েছে। তিনটা কালো, একটা সাদা।

রহিমা জানালা দিয়ে দেখল। সাদা বাচ্চাটা মায়ের পেটের নিচ থেকে বের হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কালো তিনটা ঘুমাচ্ছে। সাদাটা ঘুমায় না। চোখ বন্ধ, তবু নড়ে। রহিমার মনে হলো, বাচ্চাটা কিছু খুঁজছে। কী খুঁজছে সে জানে না। হয়তো বাচ্চাটাও জানে না।

সকাল ছয়টা। রহিমার আজ তাড়াতাড়ি যেতে হবে। সুপারভাইজারদের সাতটার আগে পৌঁছাতে হয়। আগে সাতটায় যেত, এখন সাড়ে ছয়টায়। আধা ঘণ্টা আগে।

আলম চা বানাচ্ছে। আলম এখন চা বানায়। রহিমা সুপারভাইজার হওয়ার পর থেকে। রহিমা কিছু বলেনি, আলম নিজে থেকে শুরু করেছে। একদিন সকালে উঠে দেখে চা তৈরি। রহিমা জিজ্ঞেস করল, "তুমি?" আলম বলল, "তোমার তো তাড়া।" ব্যস। এরপর থেকে প্রতিদিন।

আলম অনেক কিছু বলে না। কিন্তু করে।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে রহিমা ভাবল, ছয় মাস হয়ে গেল।

ছয় মাস আগে জাহিদ ডেকে বলেছিল, "রহিমা আপা, আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।"

জাহিদের গলার স্বরে অন্যরকম কিছু ছিল। ভালো অন্যরকম, না খারাপ অন্যরকম, রহিমা বুঝতে পারেনি। জাহিদ বলল, "ক্যামেরার সাথে আপনি সবচেয়ে ভালো কাজ করেন। ওপরওয়ালারা দেখেছে। আপনাকে সুপারভাইজার করতে চায়।"

রহিমা কিছু বলেনি। জাহিদ বলে গেল। "বেতন বাড়বে। আঠারো হাজার। ওভারটাইম আলাদা।"

আঠারো হাজার। বারো থেকে আঠারো। ছয় হাজার বেশি। রহিমা মনে মনে হিসাব করল। ভাড়া সাত, মিতুর কোচিং তিন, রাজুর স্কুল দুই। ছয় হাজার বেশি মানে মাসের শেষে হয়তো কিছু থাকবে। প্রথমবার।

"কী করতে হবে?"

"ক্যামেরার মনিটর দেখবেন। কোন সোয়েটারে সমস্যা ধরেছে, সেটা আলাদা করবেন। প্রতিদিনের রিপোর্ট তৈরি করবেন। লাইনের মেয়েদের বুঝিয়ে দেবেন কোথায় ভুল হচ্ছে।"

রহিমা বুঝল। সে আর সোয়েটার হাতে নেবে না। সে পর্দায় সোয়েটার দেখবে। ক্যামেরার চোখ দিয়ে।

"ঠিক আছে।"

প্রথম সপ্তাহ অদ্ভুত ছিল।

রহিমা একটা চেয়ারে বসে। সামনে মনিটর। মনিটরে সোয়েটার আসে, একটার পর একটা। ক্যামেরা দেখে, মনিটরে সবুজ বা লাল দেখায়। লাল হলে রহিমা একটা বোতাম টিপে সোয়েটারটা আলাদা লাইনে পাঠায়। সবুজ হলে কিছু করতে হয় না।

সবুজ। সবুজ। সবুজ। লাল। বোতাম। সবুজ। সবুজ।

সহজ।

রহিমার হাত টেবিলের ওপর পড়ে থাকে। আগে এই হাত সোয়েটার ধরত, উলটাত, সেলাই টানত, বোতাম গুনত। এখন শুধু বোতাম টিপে। একটা বোতাম। বারবার। সেই একটাই।

তৃতীয় দিনে রহিমা খেয়াল করল, সে মনিটরের সোয়েটার গুনছে। একশো তেরো। একশো চৌদ্দ। অভ্যাস যায় না। কিন্তু এই গোনায় কোনো মানে নেই। ক্যামেরাই গুনছে। মনিটরের কোণায় সংখ্যা দেখাচ্ছে। রহিমার গোনার দরকার নেই।

দরকার নেই, তবু সে গোনে।

বেতন পেল আঠারো হাজার দুইশো। দুইশো বেশি। কেন বেশি সে জানে না। জিজ্ঞেসও করল না। টাকা বেশি পেলে জিজ্ঞেস করতে নেই, এটা আলম শিখিয়েছে। "টাকা কম দিলে জিজ্ঞেস কর, বেশি দিলে চুপ থাক।" আলমের দর্শন।

রহিমা মিতুকে নিয়ে গেল গাজীপুর চৌরাস্তার কাছে একটা দোকানে। সেকেন্ড হ্যান্ড ল্যাপটপ বিক্রি করে। দোকানদার দেখাল কয়েকটা। রহিমা কিছু বোঝে না। মিতুকে বলল, "তুই দেখ।"

মিতু একটার পর একটা খুলল, দেখল, কিছু একটা টাইপ করল, বন্ধ করল। শেষে একটা বেছে নিল। ধূসর রঙ, একটু আঁচড় পড়া কোণায়।

"এটা, আম্মা। এটা ভালো।"

"কত?"

দোকানদার বলল, "বারো হাজার।"

রহিমার আগের এক মাসের বেতন। এখন দুই-তৃতীয়াংশ। সে টাকা দিল।

বাসায় ফিরে মিতু ল্যাপটপটা খুলল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। মিতুর মুখটাও জ্বলে উঠল। মিতু রহিমাকে জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে। মিতু বড় হয়ে গেছে, জড়িয়ে ধরলে রহিমার কাঁধ পর্যন্ত আসে।

"থ্যাংকিউ আম্মা।"

রহিমা মেয়ের চুলে হাত বুলাল। মিতুর চুল তার মতোই, ঘন, একটু এলোমেলো। চিরুনি দিলেও ঠিক থাকে না। রহিমার মায়েরও এরকম চুল ছিল। তিন প্রজন্মের এলোমেলো চুল।

সমস্যাটা লাঞ্চের সময় টের পেল।

আগে রহিমা লাইনের মেয়েদের সাথে বসে খেত। নাসরিন, সালমা, জরিনা, ফারজানা। একসাথে ভাত, একসাথে গল্প। কার স্বামী কী করেছে, কার শাশুড়ি কী বলেছে, কোন সিরিয়ালে কী হয়েছে। রহিমা সিরিয়াল দেখে না, কিন্তু শোনে। শোনায় তার আপত্তি নেই।

এখন রহিমা সুপারভাইজার। লাঞ্চে সে বসল যেখানে আগে বসত, নাসরিনের পাশে। নাসরিন একটু সরে বসল। একটুই। কেউ খেয়াল করবে না। কিন্তু রহিমা খেয়াল করল।

গল্প হলো। কিন্তু গল্পের ধরন বদলে গেছে। কেউ শাশুড়ির কথা বলল না। কেউ সিরিয়ালের কথা বলল না। সবাই যেন একটু সাবধানে কথা বলছে। রহিমা এখন "ওপরের লোক"। রহিমা এখন রিপোর্ট লেখে। রহিমা এখন জানে কে কতটা ভুল করে।

সালমা একবার রহিমার দিকে তাকাল। তাকানোটা ভয়ের না, সম্মানের না। অন্যকিছু। রহিমা সেটার নাম জানে না।

পরের দিন থেকে রহিমা লাঞ্চে আলাদা বসল। অফিসের ছোট ঘরটায়, যেটা সুপারভাইজারদের জন্য। ঘরে একটা টেবিল, একটা চেয়ার, দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারে কক্সবাজারের ছবি। রহিমা কক্সবাজার যায়নি কখনো।

সে একা ভাত খেল। ভাতের সাথে ডাল আর আলু ভাজি। চিবাতে চিবাতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ফ্লোরে মেয়েরা কাজ করছে। সেলাই মেশিনের আওয়াজ। সেই আওয়াজ, যেটা রহিমার হৃদপিণ্ডের তালে মিশে গিয়েছিল। এখন জানালার ওপাশে। একটা কাচ আর পাঁচ ফুট দূরত্ব।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে রহিমা হাত ধুচ্ছিল। সাবান দিয়ে। আলতো করে। হঠাৎ খেয়াল করল, হাতগুলো বদলে গেছে।

আগে রহিমার হাত রুক্ষ ছিল। আঙুলের ডগায় সুতার দাগ ছিল। তর্জনীর ওপরে একটা ছোট কাটা দাগ, তিন বছর আগে কাটিং টেবিলের কোণায় লেগেছিল। হাতের তালু শক্ত ছিল, কড়া পড়েছিল বছরের পর বছর সোয়েটার ধরে ধরে। সেই হাত দেখলেই বোঝা যেত, এই মানুষ কাজ করে। হাত দিয়ে কাজ করে।

এখন হাতগুলো নরম হয়ে আসছে। কড়াগুলো কমে যাচ্ছে। সুতার দাগ মুছে যাচ্ছে। ছয় মাসে হাত ভুলে যাচ্ছে কাপড়ের স্পর্শ।

রহিমা একটু বেশি সময় ধরে হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।

মিতু ল্যাপটপে কিছু করছে। ঘরের কোণায় বসে, কানে একটা তার গোঁজা, কী যেন শুনছে। মাঝে মাঝে মাথা দোলায়। পড়ছে, নাকি গান শুনছে, রহিমা জানে না।

"আম্মা, তুমি কি জানো সুপারভাইজার মানে কী?"

রহিমা বলল, "জানি তো। আমিই তো সুপারভাইজার।"

"না, মানে শব্দটার মানে। সুপার মানে ওপরে, ভাইজার মানে যে দেখে। ওপর থেকে যে দেখে।"

রহিমা কিছু বলল না। ওপর থেকে যে দেখে। সে এখন ওপর থেকে দেখে। মনিটরে। চেয়ারে বসে। মেয়েদের কাজ দেখে, সোয়েটারের ত্রুটি দেখে, সংখ্যা দেখে। সব দেখে। কিন্তু ছোঁয় না।

একদিন ক্যামেরায় সমস্যা হলো। সকাল দশটায় মনিটর কালো হয়ে গেল। টেকনিশিয়ান আসতে দুপুর লাগবে।

জাহিদ বলল, "রহিমা আপা, আপাতত আপনি হাতে চেক করুন। পুরোনো পদ্ধতিতে।"

রহিমা উঠে দাঁড়াল। লাইনে গেল। একটা সোয়েটার হাতে নিল।

ওজন। নরম। উলের গন্ধ। সুতার টান। বোতাম। সেলাই।

রহিমার হাত কাঁপল না। হাত মনে রেখেছে। আঠারো বছরের স্মৃতি ছয় মাসে যায় না।

সে দ্রুত দেখতে লাগল। একটা, দুটো, তিনটা। ত্রিশ সেকেন্ডে একটা। পুরোনো গতি। সোয়েটারের ভেতরে আঙুল চালিয়ে সেলাই পরীক্ষা করল, বোতামে টান দিল, কাঁধের সংযোগটা দেখল।

একটা সোয়েটারে ডান কাঁধের সেলাই আলগা। রহিমা আলাদা করে রাখল।

নাসরিন পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। থামল। রহিমাকে দেখল। রহিমা সোয়েটার হাতে নিয়ে দেখছে, আগের মতো। নাসরিন কিছু বলল না। কিন্তু মুখে একটু হাসি ছিল। ছোট হাসি।

দুপুরে টেকনিশিয়ান এল। ক্যামেরা ঠিক হলো। রহিমা আবার চেয়ারে ফিরে গেল। মনিটরের সামনে।

সে হাতের দিকে তাকাল। দুই ঘণ্টা কাজ করেছে মাত্র। কিন্তু তর্জনীতে সুতার একটা টানের চিহ্ন। লাল, সরু, ছোট। কাল মুছে যাবে।

রহিমা চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন কেউ কিছু ফিরিয়ে দিয়ে আবার নিয়ে নিয়েছে।

রাতে মিতু ল্যাপটপে কিছু লিখছে। রাজু ঘুমিয়ে গেছে। আলম এখনো ফেরেনি।

রহিমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। পাশের বাসার বিড়ালটা উঠানে বসে আছে, বাচ্চাগুলো তার চারপাশে। সাদা বাচ্চাটা একটু দূরে সরে গেছে, একটা পাতার সাথে খেলছে। কালো তিনটা মায়ের গায়ে গুঁতো দিচ্ছে।

রহিমা ভাবল, সাদাটা বড় হলে কেমন দেখতে হবে। পাড়ায় সাদা বিড়াল কম। সবাই খেয়াল করবে। সবাই বলবে, "ও দেখ, ওটা ওই বাসার।" সাদা বিড়ালটা আলাদা হয়ে যাবে, নিজে কিছু না করেই।

মিতু ভেতর থেকে ডাকল, "আম্মা, তুমি কী করছ?"

"কিছু না।"

"ঘুমাবে না?"

"যাচ্ছি।"

রহিমা ভেতরে এল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল।

মনে হলো, আজ সারাদিন সে কিছু তৈরি করেনি। একটা সোয়েটার ধরেনি, একটা সুতা কাটেনি, একটা বোতাম লাগায়নি। সে দেখেছে। শুধু দেখেছে। মনিটরে সবুজ আর লাল। সবুজ মানে ভালো, লাল মানে খারাপ। বোতাম টিপেছে। সংখ্যা লিখেছে। রিপোর্ট পাঠিয়েছে।

বেশি টাকা পেয়েছে।

চোখ খুলল। ছাদের দিকে তাকাল। টিনের ছাদ। সেই একই ছাদ। কিছু বদলায়নি। শুধু রহিমার হাত বদলেছে।

পাশের ঘর থেকে ল্যাপটপের আলো আসছে। মিতু পড়ছে। সেই ল্যাপটপ, যেটা রহিমার নতুন বেতনে কেনা।

রহিমা দুই হাত বুকের ওপর রাখল। নরম হাত। পরিষ্কার নখ। কোনো দাগ নেই।

বাইরে সাদা বিড়ালের বাচ্চাটা ডাকছে। পাতলা গলায়। কী চায় সে? দুধ? মা? নাকি এমনি ডাকছে, কোনো কারণ ছাড়াই?

রহিমা গুনতে শুরু করল। ডাকগুলো। এক। দুই। তিন।

ঘুম আসার আগে সে বারোটা পর্যন্ত গুনল।