করিমের ফসল এবার বেশি
বেশি ধান, একই টাকা
১
করিমের দা-টার হাতল ভাঙা।
তিন সপ্তাহ হলো। বাঁশের হাতল, মাঝখানে ফেটে গেছে। তার দিয়ে বেঁধে রাখা, কিন্তু ঠিকমতো গ্রিপ হয় না। প্রতিদিন সকালে করিম ভাবে, আজ ঠিক করব। তারপর অন্য কিছু করে। মাঠে যায়, ফোন দেখে, সার দেয়, পানি দেয়। দা-টা পড়ে থাকে ঘরের কোণায়। হালিমা একদিন বলল, "দা-টা ঠিক করবে না?" করিম বলল, "করব।" সেটা গত সপ্তাহে। এখনো হয়নি।
কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো জরুরি না, কিন্তু দরকারি। সেগুলো কখনো হয় না।
আজ সকালে করিম মাঠে গেল, যথারীতি। চায়ের কাপ হাতে, আলের ওপর বসল। ধানগুলো দুলছে। ভালো দুলছে। পুষ্ট। শীষগুলো ভারী হয়ে নুয়ে পড়েছে। গত বছরের চেয়ে ভারী। করিম বুঝতে পারে, চোখ দিয়ে। তিরিশ বছর ধরে ধান দেখেছে, কোন শীষ ভালো আর কোন শীষ কম ভালো, এটা বুঝতে মাপামাপি লাগে না।
"তোরা এবার ভালো করেছিস," করিম বলল ধানগাছের দিকে তাকিয়ে। "ফোনের কথা শুনেছিস ভালোমতো।"
ধানগাছ কিছু বলল না। ধানগাছ কখনো কিছু বলে না। তবু করিমের মনে হলো, ধানগুলো একটু বেশি নড়ল। বাতাসের কারণে। কিন্তু মনে হলো, যেন একটু সায় দিচ্ছে।
ফোনের কথা শুনেছিল করিম। গাছফড়িংয়ের সতর্কতা, জিংকের পরামর্শ, পানি দেওয়ার সময়সূচি। সব মেনেছে। আর ধানও সায় দিয়েছে। এবারের ফসল ভালো। শুধু ভালো না, অনেক ভালো।
২
ধান কাটার দিন হালিমা বলল, "আজ মাছ রান্না করব।"
করিম বলল, "কেন?"
"এমনি। ভালো ফসল হয়েছে।"
হালিমা এরকম। কোনো কিছুর জন্য কারণ দেয়, কিন্তু কারণটা আসল কারণ না। আসল কারণ হলো হালিমা খুশি। স্বামীর মুখ ভালো দেখাচ্ছে কয়েকদিন ধরে। সোজা হয়ে হাঁটছে। চায়ের দোকানে জোরে কথা বলছে। হালিমা এটুকু দেখেই বোঝে, ফসল ভালো হয়েছে।
বাজারে গেল। রুই মাছ। বড় একটা। দেড় কেজি। সাথে সরিষা, কাঁচা মরিচ, হলুদ। হালিমার সরিষা বাটা দিয়ে মাছের ঝোল বিখ্যাত। বিখ্যাত মানে পাড়ায় বিখ্যাত। পাড়ার বাইরে কেউ জানে না। তবে পাড়ায় যারা জানে, তারা জানে।
দুপুরে মাছ ভাত হলো। করিম তিন থালা ভাত খেল। তৃতীয় থালায় হালিমা বলল, "আর?" করিম বলল, "আর।" হালিমা ভাত দিল। মাছের মাথাটা করিমের থালায়। মাছের মাথা করিম পায়, এটা তিরিশ বছরের নিয়ম। কোনোদিন ভাঙেনি।
খাওয়ার পর করিম ঘরের সামনে শুয়ে পড়ল। পেট ভরা। আকাশে মেঘ নেই। ভালো লাগছে। অনেকদিন পর ভালো লাগছে।
৩
ধান মাড়াই হলো। মাপা হলো। আগের বছরের চেয়ে বেশি। করিম পাকা হিসাব করল। গত বছর ১৫ মণ হয়েছিল। এবার সাড়ে ১৭ মণ। আড়াই মণ বেশি। এক বিঘা দুই কাঠা জমিতে এই ফলন ভালো। শুধু ভালো না, পীরগঞ্জের এই এলাকায় সবচেয়ে ভালো।
এটা পাড়ার লোকে জানল।
প্রথমে আজিজ এল। "কত হলো?"
"সাড়ে সতেরো মণ।"
আজিজ চুপ করে গেল। তারপর বলল, "আমার বারো মণ।"
করিম কিছু বলল না। গত বছর গাছফড়িংয়ের সময় আজিজ ক্ষতি কম করতে পারত। ফোনের কথা মানলে। কিন্তু আজিজের কোনো ফোন ছিল না, এটাও সত্য। করিম বলল, "আগামী মৌসুমে আমার ফোন ব্যবহার করিস।"
আজিজ বলল, "থাক।" কিন্তু চলে গেল না। একটু দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, "তোর ফোন কী বলেছিল? সারের ব্যাপারে?"
করিম বলল। জিংকের কথা, পানির সময়সূচির কথা, পোকা আসার আগে কীটনাশকের কথা। আজিজ মন দিয়ে শুনল। যাওয়ার সময় বলল, "আমারে একটা ফোন জোগাড় করে দিতে পারবি?"
করিম বলল, "চেষ্টা করব।"
তারপর মতিন চাচা এল, হারুন এল, জব্বার এল। সবাই ফসলের খবর নিতে এল। সবাই জানতে চাইল, কী করেছে এবার আলাদা। করিম বলল, ফোনের কথা। সবাই ফোনটা দেখতে চাইল। করিম দেখাল। সবুজ আইকন, ধানের শীষ। কেউ কেউ ফোনটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল, যেন ফোনের পেছনে কিছু লেখা আছে, যেটা পড়লে সব বোঝা যাবে।
করিম ভালো লাগছে। পীরগঞ্জে সে কেউ না। এক বিঘা দুই কাঠা জমির একজন প্রান্তিক কৃষক। চায়ের দোকানে কেউ তার মতামত জিজ্ঞেস করে না। ইউনিয়ন পরিষদে তার কোনো গুরুত্ব নেই। কিন্তু আজ সবাই তার কাছে এসেছে। সবাই জানতে চাইছে। করিম জানে, আর সবাই জানতে চায়। এই অনুভূতিটা নতুন।
সে একটু সোজা হয়ে হাঁটল। বুক টান করে।
৪
বাজারে ধান নিয়ে গেল।
পীরগঞ্জের বড় হাট। প্রতি শনিবার। করিম আড়তদার মজিদের কাছে গেল, যথারীতি। মজিদের কাছে গত পনেরো বছর ধরে ধান বেচে। মজিদ দেখল, ওজন নিল।
"সাড়ে সতেরো মণ? ভালো হয়েছে।"
"হ্যাঁ। এবার ভালো।"
"দাম বলি?"
করিম অপেক্ষা করল। গত বছর মণপ্রতি ১,১০০ টাকা পেয়েছিল। সাড়ে সতেরো মণে হিসাব করলে প্রায় উনিশ হাজার। গত বছরের চেয়ে চার হাজার বেশি। মিতু যেভাবে হিসাব শেখায়, সেভাবে করিম মনে মনে গুণ করল।
মজিদ বলল, "মণ ৯৫০।"
করিম ভাবল, ভুল শুনেছে। "কত?"
"৯৫০। এবার দাম কম।"
"কেন কম?"
মজিদ হাত নাড়ল। "সবার ফসল ভালো হয়েছে। বেশি ধান আসছে বাজারে। চাহিদা তো একই। দাম কমবেই।"
করিম দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে হিসাব করল। সাড়ে সতেরো মণ, মণে ৯৫০। ষোলো হাজার ছয়শো পঁচিশ টাকা। গত বছর পনেরো মণে মণপ্রতি ১,১০০ পেয়েছিল। সেটা ছিল ষোলো হাজার পাঁচশো।
বেশি ধান। প্রায় একই টাকা।
করিম ধানের বস্তার দিকে তাকাল। সাড়ে সতেরো মণ ধান। আড়াই মণ বেশি। সেই আড়াই মণ ধান ফলাতে বেশি সার লেগেছে, বেশি পানি লেগেছে, বেশি কীটনাশক লেগেছে। সেই খরচটাও বেশি হয়েছে। হিসাব করলে, লাভ হয়তো আগের চেয়েও কম।
মজিদ বলল, "নেবে তো?"
করিম বলল, "নেব। আর কোথায় যাব।"
৫
বাড়ি ফিরে করিম খাটের ওপর বসল। পকেট থেকে ফোন বের করল।
স্ক্রিনে একটা নতুন বিজ্ঞপ্তি। কৃষকবন্ধু। খুলল।
"অভিনন্দন! আপনার এই মৌসুমের ফলন গত মৌসুমের তুলনায় ১৮% বেশি। চমৎকার ফসল! আপনি কৃষকবন্ধুর পরামর্শ অনুসরণ করে দারুণ ফল পেয়েছেন।"
করিম স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
চমৎকার ফসল।
সে বাজার থেকে ষোলো হাজার ছয়শো পঁচিশ টাকা নিয়ে ফিরেছে। গত বছর পেয়েছিল ষোলো হাজার পাঁচশো। পার্থক্য একশো পঁচিশ টাকা। সারের খরচ বেশি হয়েছে প্রায় আটশো টাকা। কীটনাশকের খরচ বেশি হয়েছে তিনশো। মোটামুটি হিসাবে, সে আসলে প্রায় এক হাজার টাকা কম পেয়েছে গত বছরের চেয়ে।
ফোন বলছে চমৎকার।
করিম ফোনটা খাটের ওপর রেখে দিল। উঠে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। তার মাঠ দেখা যায় এখান থেকে। কিছু ধান কাটা হয়েছে, কিছু বাকি। কাটা মাঠে নাড়ার সারি, সোনালি রঙ।
হালিমা ভেতরে এল। "কত পেলে?"
"ষোলো হাজার ছয়শো।"
হালিমা একটু থামল। গত বছর কত পেয়েছিল সে মনে রেখেছে। হালিমা সব মনে রাখে। "ধান তো বেশি হয়েছিল?"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে?"
করিম বলল, "সবার ধান বেশি হয়েছে। দাম কমে গেছে।"
হালিমা চুপ করে গেল। একটু পর বলল, "মাছের তরকারি আছে। খাবে?"
"পরে।"
হালিমা চলে গেল। সে কিছু বলল না। হালিমা জানে, কখন কিছু বলতে হয় আর কখন চুপ থাকতে হয়। তিরিশ বছরের সংসারে এটা শেখা হয়ে গেছে।
৬
সন্ধ্যায় করিম উঠানে বসে আছে। আকাশে তারা উঠছে। পীরগঞ্জের আকাশ। একই তারা, গত বছরও ছিল, তার আগের বছরও ছিল।
ফোনটা পকেটে। স্ক্রিন নেভানো। চমৎকার ফসলের অভিনন্দন চুপ হয়ে গেছে।
করিম ভাবল, ফোন ঠিকই বলেছিল। ফসল ভালো হয়েছে। সত্যিই ভালো হয়েছে। আড়াই মণ বেশি। জিংকের পরামর্শ কাজ করেছে, গাছফড়িংয়ের সতর্কতা কাজ করেছে, পানির হিসাব কাজ করেছে। ফোন ভুল বলেনি।
কিন্তু ফোন সবটা বলেনি।
ফোন বলেনি, সবাই একই পরামর্শ পেলে সবার ফসল বাড়বে। সবার ফসল বাড়লে বাজারে বেশি ধান আসবে। বেশি ধান আসলে দাম কমবে। দাম কমলে বেশি ধানেও একই টাকা। এটা ফোন বলেনি। হয়তো ফোন জানে না। হয়তো জানে, কিন্তু এটা ফোনের কাজ না।
ফোনের কাজ ফসল বাড়ানো। ফসলের দাম ফোনের বিষয় না।
করিম উঠে দাঁড়াল। ঘরের কোণায় গেল। দা-টা পড়ে আছে। ভাঙা হাতল। তার দিয়ে বাঁধা। তিন সপ্তাহ ধরে পড়ে আছে।
করিম দা-টা হাতে তুলে নিল। হাতলটা ধরল। তারের বাঁধন আলগা হয়ে গেছে। একটু জোরে ধরলেই হাতল খুলে যায়। নতুন বাঁশ লাগাতে হবে। পেছনের ঝোপে বাঁশ আছে, একটা কেটে মাপমতো কেটে লাগালেই হয়ে যায়। আধা ঘণ্টার কাজ।
কিন্তু আজ না। কাল করবে।
করিম দা-টা আবার রেখে দিল। ঘরের কোণায়।
উঠানে ফিরে এল। বসল। ফোনটা বের করল। স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
"চমৎকার ফসল!"
করিম ফোনটা আবার পকেটে রাখল।
হালিমা দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, "কী হলো?"
করিম বলল, "কিছু না।"
উঠে মাঠের দিকে হাঁটতে লাগল। সন্ধ্যার আলো কমে আসছে। মাঠের ওপর একটা বক উড়ে গেল, সাদা, ধীরে। করিম মাঠের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। কাটা নাড়ার ওপর। পায়ের নিচে শুকনো নাড়ার আওয়াজ।
সে দাঁড়িয়ে রইল। চারদিকে তার জমি। এক বিঘা দুই কাঠা। সাড়ে সতেরো মণ ধান দিয়েছে এই মাটি। চমৎকার ফসল।
বাতাস বইছে। করিমের চুল নড়ছে। পশ্চিম আকাশে একটু লাল আভা আছে এখনো।
করিম দাঁড়িয়ে রইল।