জাহিদ নতুন দেশে
আগে হাত লাগতো, এখন মাথা লাগে
১
সৌদি আরবে বারো বছর কাটিয়েছে জাহিদ।
বারো বছর মানে চার হাজার তিনশো আশি দিন। জাহিদ গুনেনি। কিন্তু শরীর গুনেছে। পিঠে, হাঁটুতে, কাঁধে। প্রতিটা দিনের হিসেব শরীরে লেখা আছে।
রিয়াদে প্রথম এসেছিল ২০১৪ সালে। কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে। বাবার তিন বিঘা জমি বিক্রি করে দালালকে চার লক্ষ টাকা দিয়ে। বাবা বলেছিল, "তুই গেলে জমি আবার কিনতে পারবি। না গেলে জমিও যাবে, তুইও থাকবি।" বাবা ঠিকই বলেছিল। জাহিদ গেছে। জমি কেনেনি। কিন্তু ছোট ভাইয়ের বিয়ে দিয়েছে, মায়ের চোখের অপারেশন করিয়েছে, বাড়িতে টিনের বদলে পাকা ছাদ দিয়েছে।
রিয়াদে জাহিদ রাজমিস্ত্রির কাজ করত। বিল্ডিং বানানো। ইট, সিমেন্ট, রড। কখনো পঁয়তাল্লিশ তলা, কখনো ষাটতলা। রিয়াদে বিল্ডিং উঠছে যেন মাটি থেকে গাছ গজাচ্ছে। প্রতিটা বিল্ডিংয়ে জাহিদের মতো হাজার হাজার হাত কাজ করেছে। বিল্ডিং শেষ হলে কেউ জিজ্ঞেস করে না কার হাত ছিল। বিল্ডিং নিজের নামে দাঁড়িয়ে যায়। হাতগুলো ফিরে যায় লেবার ক্যাম্পে।
গত বছর জাহিদের কন্ট্রাক্ট শেষ হলো। কোম্পানি বলল, নবায়ন হবে না। কেন? কারণ আর অত লোক দরকার নেই। নতুন সিস্টেম এসেছে। মেশিন দিয়ে ইট গাঁথা হচ্ছে, ড্রোন দিয়ে সাইট মনিটরিং হচ্ছে, কম্পিউটারে প্ল্যানিং হচ্ছে। আগে যেখানে পঞ্চাশজন লাগত, এখন কুড়িজন। বাকি ত্রিশজনের দরকার নেই। জাহিদ সেই ত্রিশজনের একজন।
২
জাহিদ দেশে ফিরল না।
দেশে ফিরলে কী করবে? দাউদকান্দিতে কাজ নেই। ঢাকায় গিয়ে কী করবে? রিকশা চালাবে? রাজমিস্ত্রি? ঢাকায় রাজমিস্ত্রির দৈনিক মজুরি ছয়শো টাকা। রিয়াদে পেত দেড় হাজার রিয়াল, বাংলায় চল্লিশ হাজার টাকা। ছয়শো টাকায় কী হবে? রাশিদার ওষুধ, মায়ের খরচ, ছেলে ইমনের স্কুল, সব মিলিয়ে মাসে কমপক্ষে পঁচিশ হাজার টাকা লাগে। ছয়শো টাকা দিনে, মাসে আঠারো হাজার। চলবে না।
তাই জাহিদ কুয়েতে গেল।
একজন দালাল ধরল। দালালের নাম মনির। মনির কুমিল্লারই ছেলে। মনির বলল, "কুয়েতে কাজ আছে। কনস্ট্রাকশন। তোমার অভিজ্ঞতা আছে, সহজেই পাবা।" মনির দেড় লক্ষ টাকা নিল। জাহিদের জমানো টাকা থেকে।
কুয়েতে গিয়ে দেখল, কাজ সেভাবে নেই। যে কোম্পানির নাম মনির বলেছিল, সেই কোম্পানি জাহিদের ভিসার কথা জানে না। দালালি ভিসা। জাহিদ ফ্রি ভিসায় এসেছে। মানে কোনো কোম্পানির সাথে চুক্তি নেই। নিজে কাজ খুঁজতে হবে।
জাহিদ খুঁজল। দুই মাস খুঁজল। কুয়েত সিটির বাইরে ফারওয়ানিয়া এলাকায় একটা ছোট ঘরে থাকে। আরো ছয়জন বাংলাদেশি। ঘরে একটা পাখা। গরমে ঘুম হয় না। সকালে উঠে বেরিয়ে পড়ে। নির্মাণ সাইটে সাইটে ঘোরে। জিজ্ঞেস করে, "লোক লাগবে?" বেশিরভাগ জায়গায় বলে, "না।" কোনো কোনো জায়গায় একদিন দুদিনের কাজ দেয়। দিনমজুরি। তারপর আবার খোঁজা।
তিন মাসে জাহিদ বুঝে গেল, কুয়েতেও আর আগের মতো নেই। এখানেও নতুন মেশিন। এখানেও কম লোকে বেশি কাজ। এখানেও জাহিদের মতো হাতের লোকদের দরকার কমছে।
৩
জাহিদ কাতারে গেল।
এবার দালাল ধরল না। নিজে একটা রিক্রুটিং এজেন্সিতে গেল। দোহায়। এজেন্সির অফিসটা ছোট, কিন্তু পরিষ্কার। দেয়ালে ঝকঝকে কাচের ফ্রেমে সার্টিফিকেট ঝোলানো।
রিক্রুটার একজন বাঙালি। নাম শফিক। শফিক দোহায় পনেরো বছর ধরে আছে। রিক্রুটিং ব্যবসা। শফিক জাহিদের কাগজপত্র দেখল। পাসপোর্ট, অভিজ্ঞতার সনদ, সৌদির কন্ট্রাক্ট পেপার।
"বারো বছর সৌদিতে ছিলা?"
"হ্যাঁ।"
"কনস্ট্রাকশন?"
"হ্যাঁ।"
শফিক কাগজগুলো টেবিলে রাখল। হেলান দিয়ে বসল। একটু চুপচাপ থাকল। তারপর বলল, "দেখো ভাই, সত্যি কথা বলি। কনস্ট্রাকশনে এখন মানুষের চাহিদা কমতেছে। সৌদিতে কমেছে, কুয়েতে কমেছে, কাতারেও কমতেছে। ওয়ার্ল্ড কাপের সময় যে চাহিদা ছিল, সেটা শেষ। এখন যে বিল্ডিং হচ্ছে, সেগুলো অন্য ধরনের। অটোমেশন, রোবোটিক্স, প্রিফ্যাব। আগে হাত লাগতো, এখন মাথা লাগে।"
আগে হাত লাগতো, এখন মাথা লাগে।
জাহিদ কিছু বলল না। বলার কিছু নেই। জাহিদের হাত আছে। শক্ত হাত। বড় হাত। আঙুলের মাথায় সিমেন্টের দাগ যে কোনোদিন যাবে না। এই হাত দিয়ে সে রিয়াদে বিল্ডিং তুলেছে। কুয়েতে দেয়াল গেঁথেছে। এই হাত দিয়ে সে মায়ের চোখ সারিয়েছে, ভাইয়ের বিয়ে দিয়েছে, বাড়ির ছাদ দিয়েছে।
কিন্তু এখন মাথা লাগে। জাহিদের মাথায় কী আছে? ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে। দাউদকান্দি হাই স্কুল। গণিতে ফেল করত। বাংলায় ভালো ছিল। কিন্তু বাংলায় ভালো হলে কাতারে কাজ হয় না।
শফিক বলল, "একটা জিনিস আছে। ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ। পুরনো বিল্ডিংয়ের মেইনটেন্যান্স। কিন্তু সেটার জন্য একটা সার্টিফিকেট কোর্স করতে হবে। তিন মাসের। খরচ আছে।"
"কত?"
"পঁচিশ হাজার কাতারি রিয়াল।"
দুই লক্ষ বাংলাদেশি টাকা। জাহিদের কাছে নেই।
"আর কোনো উপায়?"
শফিক মাথা নাড়ল। "অপেক্ষা করতে পারো। কখনো কখনো ছোটখাটো কাজ আসে। কিন্তু গ্যারান্টি নেই।"
৪
জাহিদ দোহার একটা লেবার ক্যাম্পে থাকে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ায়। ক্যাম্পে বারোজন থাকে একটা ঘরে। ছয়টা বাঙ্ক বেড। জাহিদের বেড ওপরের তলায়, জানালার পাশে। জানালা দিয়ে বাইরে শুধু আরেকটা বিল্ডিংয়ের দেয়াল দেখা যায়। ধূসর দেয়াল। কোনো ছবি নেই, কোনো রঙ নেই।
ক্যাম্পে একজন নেপালি আছে। নাম বীরেন্দ্র। বীরেন্দ্রের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। যেকোনো গান একবার শুনলেই সে শিস দিয়ে হুবহু বাজাতে পারে। হিন্দি গান, নেপালি গান, আরবি গান, যেকোনো গান। শিসের সুর এত পরিষ্কার, এত নিখুঁত, যেন বাঁশি বাজছে।
জাহিদ একদিন বীরেন্দ্রকে বলল, "একটা বাংলা গান পারবি?"
"কোন গান?"
জাহিদ গুনগুন করল। "আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে..."
বীরেন্দ্র শুনল। পুরোটা শুনল। তারপর শিস দিল। পুরো গানটা। একটা সুরও বাদ পড়ল না। জাহিদ চোখ বন্ধ করে শুনল। ক্যাম্পের গরম ঘরে বসে, কাতারের ধুলোভরা বাতাসে, একটা নেপালি ছেলের শিসে কুমিল্লার গান বাজছে।
সেদিন থেকে জাহিদ মাঝে মাঝে বীরেন্দ্রকে গান বলে। বীরেন্দ্র শিস দেয়। দুজনে বাঙ্কে বসে থাকে। বাইরে কাতারের রোদ, পঞ্চাশ ডিগ্রি তাপমাত্রা, বাতাসে বালির গন্ধ। ভেতরে শিসের সুর।
ক্যাম্পের অন্যরা প্রথম প্রথম তাকিয়ে দেখত। এখন আর দেখে না। অভ্যাস হয়ে গেছে।
৫
জাহিদের কাছে একটা খাতা আছে। ছোট, হাতের তালুর সমান। নীল মলাটের। এই খাতা সে রিয়াদ থেকে এনেছে। খাতায় সে হিসেব লেখে। কত টাকা পাঠালো, কত বাকি, কবে পাঠালো। রাশিদার জন্য কত, মায়ের জন্য কত, ইমনের স্কুলের জন্য কত।
খাতাটা পাতলা হয়ে আসছে। শেষ দিকের পাতাগুলোতে জাহিদ এখন ছোট ছোট করে লেখে। আগে বড় বড় অক্ষরে লিখত। এখন অক্ষরগুলো ছোট হয়ে গেছে। পাতা বাঁচাতে হবে। নতুন খাতা কেনার টাকা আছে, কিন্তু খরচ করতে চায় না। প্রতিটা রিয়াল হিসেব করে খরচ করতে হয়। ক্যাম্পের খাবার ক্যাম্পই দেয়। কিন্তু ফোনের বিল, বাসের ভাড়া, কাপড় ধোয়ার সাবান, এসব তো লাগে।
খাতার শেষ পাতায় জাহিদ লিখেছে:
রিয়াদ: ২০১৪-২০২৫ (১১ বছর ৮ মাস) কুয়েত: ২০২৫ (৩ মাস) কাতার: ২০২৬-?
প্রশ্নচিহ্নটা জাহিদ নিজে দিয়েছে। কতদিন থাকবে? জানে না। কাজ পাবে? জানে না। ভিসা থাকবে? জানে না। ভিজিট ভিসায় এসেছে। তিন মাসের। আরো এক মাস বাকি। এক মাসের মধ্যে কাজ না পেলে অবৈধ হয়ে যাবে। অবৈধ হলে ধরা পড়লে জেল, জরিমানা, তারপর দেশে ফেরত।
৬
রাশিদাকে আজকাল কম ফোন করে জাহিদ।
আগে প্রতিদিন করত। সৌদিতে থাকতে রাত দশটায়, ওখানকার সময়ে রাত সাড়ে এগারোটায়, ফোন করত। রাশিদা অপেক্ষা করে থাকত। ইমনকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে, নিজে জেগে বসে থাকত।
এখন সপ্তাহে দুইবার করে। কখনো একবার।
ফোন করলে কী বলবে? "কাজ পাইনি" বলবে? "টাকা নেই" বলবে? "ভিসা শেষ হয়ে যাচ্ছে" বলবে? রাশিদা কী করবে শুনে? চিন্তা করবে। ঘুম হবে না। মায়ের কাছে কাঁদবে। মা বলবে, "আল্লাহ ভরসা।" আল্লাহ ভরসা ঠিক আছে, কিন্তু ভিসার মেয়াদ বাড়ায় না।
গতকাল ফোন করেছিল। রাশিদা বলল, "তুমি ভালো?"
"ভালো।"
"খাচ্ছ?"
"খাচ্ছি।"
"ইমন তোমার সাথে কথা বলবে।"
ইমনের বয়স নয়। ক্লাস ফোরে পড়ে। জাহিদ যখন সৌদিতে গিয়েছিল, ইমন তখন মায়ের পেটে। জাহিদ ছেলেকে দেখেছে মোট চারবার। চার বছরে একবার দেশে আসত, দুই সপ্তাহ থেকে আবার চলে যেত। ইমন বাবাকে চেনে ফোনের স্ক্রিনে। ছোট একটা মুখ, দানাদানা ছবি, কখনো কখনো ভেঙে যায়, কখনো আটকে যায়।
"বাবা, তুমি কি ঈদে আসবা?"
"দেখি বাবা।"
"আমার বন্ধু রাফিনের বাবা ঈদে একটা সাইকেল কিনে দিয়েছে। লাল সাইকেল।"
"তোকেও কিনে দেব।"
"কবে?"
"পরে।"
ইমন চলে গেল। রাশিদা আবার ফোন ধরল।
"তুমি সত্যি ভালো?"
"সত্যি ভালো।"
রাশিদা কিছু বলল না। দুজনে চুপচাপ থাকল। ফোনের ওপাশে দাউদকান্দির রাত। ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ হয়তো আসছে। জাহিদ শুনতে পায় না। ফোনের মাইক ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ ধরে না।
"টাকা পাঠাতে পারছ না, বুঝতে পারছি," রাশিদা বলল। গলার স্বর সমান। অভিযোগ নেই। শুধু বলল, যেভাবে আকাশের রঙ বলে, "আজ মেঘলা।"
"পাঠাব। একটু সময় লাগবে।"
"আমি সেলাইয়ের কাজ নিয়েছি। পাড়ার কাজলু আপার কাছ থেকে। একটু একটু আসে।"
জাহিদের বুকে কিছু চেপে বসল। রাশিদা সেলাইয়ের কাজ নিয়েছে। মানে টাকা দরকার, যা জাহিদ পাঠাতে পারছে না। রাশিদা অভিযোগ করেনি। সেটাই বেশি কষ্টের।
"ফোন রাখি। ইমনকে পড়াতে হবে।"
"রাখ।"
ফোন কেটে গেল। জাহিদ ফোনটা বিছানায় রাখল। স্ক্রিন কালো হয়ে গেল। কাতারের রাত। বাইরে কোথাও নির্মাণের শব্দ। এখানে রাতেও নির্মাণ হয়। মেশিনের শব্দ। মানুষের গলা শোনা যায় না।
৭
আজ সকালে জাহিদ আবার বেরিয়েছে। বাসে করে আল ওয়াকরা। একটা নতুন প্রজেক্ট শুরু হচ্ছে শুনেছে। বড় প্রজেক্ট। হোটেল। জাহিদ সাইটে গিয়ে দেখল, সাইটের সামনে ভিড়। ত্রিশ-চল্লিশজন দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশি, ভারতীয়, নেপালি, শ্রীলঙ্কান। সবাই কাজ খুঁজছে।
একজন ফোরম্যান এসে বলল, "দশজন লাগবে। শুধু যাদের ওয়েল্ডিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে।"
জাহিদ ওয়েল্ডার না। সে রাজমিস্ত্রি। জাহিদ দাঁড়িয়ে রইল। বাকি তিরিশজনও দাঁড়িয়ে রইল।
ফোরম্যান দশজনকে নিয়ে ভেতরে গেল। বাকিরা ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগল। জাহিদ চলে গেল না। দাঁড়িয়ে রইল। সাইটের বাইরে একটা কংক্রিটের ব্লকের ওপর বসল। রোদ মাথার ওপর। গরম। গামছা দিয়ে ঘাম মুছল।
সাইটের ভেতরে একটা মেশিন কাজ করছে। বড়, হলুদ রঙের। জাহিদ আগে এই মেশিন দেখেনি। মেশিনটা ইট গাঁথছে। একটার পর একটা। সোজা লাইনে। কোনো মিস্ত্রি নেই। একজন লোক পাশে দাঁড়িয়ে মেশিনের স্ক্রিনে কিছু দেখছে। ব্যস। মেশিন আর একজন লোক। জাহিদের কাজ করছে দুজনে মিলে।
জাহিদ উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ কাঁধে নিল। বাস স্টপের দিকে হাঁটতে লাগল।
ক্যাম্পে ফিরে বাঙ্কে উঠল। খাতাটা বের করল। কিছু লিখবে ভেবেছিল। কী লিখবে? কাজ হয়নি। এটা লেখার দরকার নেই। প্রতিদিনই তো হয় না।
খাতাটা বন্ধ করল। বালিশের নিচে রাখল।
বীরেন্দ্র নিচের বাঙ্কে শুয়ে ছিল। বলল, "জাহিদ ভাই, গান?"
জাহিদ কিছু বলল না। একটু পরে বলল, "আজ থাক।"
বীরেন্দ্র আর কিছু বলল না।
জাহিদ জানালার দিকে তাকাল। ধূসর দেয়াল। দেয়ালের ওপরে একটুকরো আকাশ। নীল। কাতারের আকাশ সবসময় নীল। মেঘ হয় না। বৃষ্টি হয় না। শুধু নীল। ক্লান্তিকর নীল।
জাহিদ চোখ বন্ধ করল। ভাবল, আর কোন দেশ বাকি আছে? ওমান? বাহরাইন? সেখানেও কি একই কথা? আগে হাত লাগতো, এখন মাথা লাগে?
বারো বছরের হাত। এই হাত দিয়ে সে কত ইট তুলেছে গুনতে পারবে না। কত বালতি সিমেন্ট বহন করেছে হিসেব নেই। কত তলা উঠেছে তার হাতে। কিন্তু হাতের হিসেব কেউ রাখে না। বিল্ডিং দাঁড়িয়ে থাকে। হাত ফিরে যায়।
বীরেন্দ্র নিচ থেকে আস্তে আস্তে শিস দিতে শুরু করল। জাহিদ গান বলেনি, কিন্তু বীরেন্দ্র নিজে থেকে দিচ্ছে। গানটা চেনা। সেদিনের সেই গান। "আমায় ভাসাইলি রে..."
জাহিদ চোখ খুলল না। শুনতে লাগল। শিসের সুর ক্যাম্পের গরম ঘরে ভাসছে। বাইরে কাতারের রোদ। ভেতরে একটা নেপালি ছেলের শিসে ভাটিয়ালি সুর।
খাতার পাতা কমে আসছে। অক্ষর ছোট হয়ে আসছে। দেশ বদলাচ্ছে, কিন্তু উত্তর বদলাচ্ছে না।
জাহিদের হাত দুটো বুকের ওপর রাখা। বড় হাত। শক্ত হাত। চুপচাপ।