সেলিনা একটি শিশু বাঁচালো
চরের জ্বরে যখন ট্যাবলেট কথা বলে
১
নৌকা ভিড়ল চরের ঘাটে।
ঘাট বলা ভুল। কাদামাটির একটা ঢাল, যেখানে দুইটা বাঁশ পোঁতা। বাঁশের মাথায় একটা লাল কাপড়ের টুকরো বাঁধা, যেন কেউ বুঝতে পারে এখানে নামতে হয়। কাপড়টা ছেঁড়া, রোদে পুড়ে প্রায় সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো বাঁধা আছে। কেউ বদলায়নি। কেউ বদলাবেও না। চরের মানুষ জিনিস বদলায় না, যতক্ষণ না জিনিসটা একেবারে শেষ হয়ে যায়।
সেলিনা নৌকা থেকে নামল। পায়ে কাদা লাগল। স্যান্ডেল খুলে হাতে নিল। খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করল। ব্যাগে ট্যাবলেট, সরকারি খাতা, নিজের খাতা, একটা ছোট ওষুধের বাক্স। ওষুধ বলতে প্যারাসিটামল, ওরস্যালাইন, আর কিছু ভিটামিন ট্যাবলেট। এটুকুই তার অস্ত্র।
রহমত চাচা নৌকায় বসে বললেন, "কতক্ষণ লাগব?"
"জানি না, চাচা। অপেক্ষা করেন।"
"অপেক্ষা ছাড়া আমার আর কাজ কী?" রহমত চাচা সিগারেট ধরালেন। চাচা সারাদিন অপেক্ষা করেন। নদীর ধারে, ঘাটে, বাজারে। অপেক্ষা তাঁর পেশা না, অভ্যাস। পেশা মাঝি, কিন্তু যাত্রী কম। সেলিনা নিয়মিত যাত্রী। মাসে দুই-তিনবার চরে যায়, রহমত চাচাই নিয়ে যান।
চরটার নাম দক্ষিণচর। সুনামগঞ্জের মূল ভূখণ্ড থেকে নদী পার হয়ে আসতে হয়। বর্ষায় চর ডুবে যায়। শীতে চর জেগে ওঠে। চরের মানুষ জলের সাথে ওঠানামা করে, যেভাবে নদীর পানি ওঠানামা করে। পার্থক্য হলো, পানি ফিরে আসে, মানুষ সবসময় ফেরে না।
সেলিনা হাঁটতে হাঁটতে ভাবল, সোহেল আজ স্কুলে কী করছে। ছেলেটা ইদানীং নৌকা আঁকে। স্কুলের খাতায়, বইয়ের মার্জিনে, পরীক্ষার খাতার পেছনে। প্রতিটা পাতায় একটা করে নৌকা। গত সপ্তাহে ক্লাস টিচার বললেন, "আপনার ছেলে গণিতের খাতায়ও নৌকা এঁকেছে।" সেলিনা বলল, "অঙ্কের উত্তর কি ঠিক দিয়েছে?" টিচার বললেন, "হ্যাঁ।" সেলিনা বলল, "তাহলে নৌকা আঁকুক।" টিচার আর কিছু বলেননি।
সেলিনা বোঝে না ছেলেটা কেন নৌকা আঁকে। হয়তো নদীর ধারে বড় হচ্ছে বলে। হয়তো মায়ের নৌকায় চড়া দেখে। হয়তো কোনো কারণ নেই। বাচ্চারা সবকিছু কারণ ছাড়াই করে। এটাই তাদের সুবিধা।
২
বাড়িটা চরের পশ্চিম মাথায়। টিনের ছাদ, মাটির দেয়াল। সামনে একটা পুকুর, পুকুরের পানি সবুজ। উঠোনে দুইটা মুরগি ঘুরছে। একটা ছাগল বাঁধা। ছাগলটা সেলিনার দিকে তাকিয়ে একবার ডাকল, তারপর আবার ঘাস খেতে লাগল।
সেলিনা দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকল, "আছেন?"
ভেতর থেকে একজন মহিলা বেরিয়ে এলেন। মুখে ক্লান্তি। চোখে ঘুমের অভাব। শাড়ির আঁচল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বললেন, "আসেন, আপা।"
নাম মরিয়ম। স্বামী শফিক জেলে। এখন নদীতে আছে। দুই সন্তান। বড়টা মেয়ে, আট বছর, স্কুলে গেছে। ছোটটা ছেলে, তিন বছর। নাম আরিফ।
আরিফই সমস্যা।
সেলিনা ভেতরে ঢুকে দেখল, ছেলেটা একটা পাটের বিছানায় শুয়ে আছে। শরীর ছোট, কিন্তু জ্বরে মুখ লাল। চোখ বন্ধ। শ্বাসটা একটু দ্রুত। গায়ে একটা পুরনো গামছা ঢাকা।
"কবে থেকে জ্বর?" সেলিনা জিজ্ঞেস করল।
"চার দিন।"
"কত জ্বর?"
"থার্মোমিটার নাই, আপা। কিন্তু গা পুড়ে যাচ্ছে।"
সেলিনা ছেলেটার কপালে হাত দিল। গরম। শুধু গরম না, যে ধরনের গরম হলে বুকটা চিনচিন করে। সেলিনার সাত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, এটা সাধারণ জ্বর না।
"ডাক্তার দেখিয়েছেন?"
মরিয়ম একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "কবিরাজ দেখেছে।"
সেলিনা কিছু বলল না। চরে ডাক্তার নেই। নিকটতম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নদী পার হয়ে, তারপর অটোতে আরো বিশ মিনিট। কবিরাজ আছে চরেই। কবিরাজ সুলেমান, পুরনো মানুষ, গাছ-গাছড়ার ওষুধ দেন। মানুষ বিশ্বাস করে, কারণ কবিরাজ কাছে আছে আর ডাক্তার দূরে। বিশ্বাস দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক।
"কবিরাজ কী বলেছে?"
"বাতাস লেগেছে বলেছে। তাবিজ দিয়েছে। পানি পড়া দিয়েছে।"
সেলিনা ছেলেটার গায়ে তাকাল। হাতে একটা সুতোয় তাবিজ বাঁধা। তাবিজটা ময়লা হয়ে গেছে।
"পানি পড়া খাইয়েছেন?"
"হ্যাঁ। কিন্তু জ্বর কমে না, আপা। কাল রাতে বমি করেছে। আজ সকালে নাক দিয়ে একটু রক্ত পড়েছে।"
সেলিনার হাত থামল। নাক দিয়ে রক্ত।
সে ব্যাগ থেকে ট্যাবলেটটা বের করল।
৩
ট্যাবলেটের স্ক্রিন জ্বলল। অ্যাপটা খুলল। নেটওয়ার্ক নেই, কিন্তু অ্যাপ অফলাইনে কাজ করে। এটুকু তানিয়া ঠিক করেছিল।
সেলিনা টাইপ করল:
"বয়স: ৩। লিঙ্গ: পুরুষ। লক্ষণ: চার দিনের উচ্চ জ্বর, বমি, নাক দিয়ে রক্তপাত, দ্রুত শ্বাস, খাওয়া বন্ধ।"
একটু ভেবে আরো লিখল: "এলাকায় মশার প্রকোপ বেশি। চর এলাকা। স্থির পানি আছে।"
"বিশ্লেষণ করুন" চাপল।
নীল বৃত্তটা ঘুরল। তিন সেকেন্ড। চার সেকেন্ড। পাঁচ সেকেন্ড।
স্ক্রিনে লাল রঙে লেখা ভেসে উঠল:
**জরুরি সতর্কতা: ডেঙ্গু জ্বরের উচ্চ সম্ভাবনা। হেমোরেজিক জটিলতার লক্ষণ উপস্থিত (নাক দিয়ে রক্তপাত)। অবিলম্বে হাসপাতালে স্থানান্তর প্রয়োজন। CBC ও NS1 Antigen পরীক্ষা জরুরি। বিলম্বে প্রাণঘাতী হতে পারে।**
সেলিনা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। ডেঙ্গু। হেমোরেজিক। তিন বছরের বাচ্চা।
চরে ডেঙ্গু। আগে শুধু ঢাকার রোগ ছিল। এখন সব জায়গায়।
সেলিনা ট্যাবলেট রেখে মরিয়মের দিকে তাকাল। গলার স্বর সমান রাখল। ভয় দেখানো যাবে না, কিন্তু বোঝাতে হবে।
"মরিয়ম আপা, আরিফকে এখনই সুনামগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।"
মরিয়মের মুখ শক্ত হয়ে গেল। "কেন? কী হইছে?"
"ডেঙ্গু হতে পারে। নাক দিয়ে রক্ত পড়া ভালো লক্ষণ না। পরীক্ষা করাতে হবে। দেরি করা যাবে না।"
মরিয়ম চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "হাসপাতাল তো অনেক দূর, আপা।"
"জানি।"
"যাতায়াতে কত খরচ হবে?"
"সেটা আমি দেখছি।"
"আমার স্বামী নদীতে। ফোন করার উপায় নাই।"
"আপনি একা যেতে পারবেন। আরিফকে নিয়ে।"
মরিয়ম আরিফের দিকে তাকালেন। ছেলেটা ঘুমাচ্ছে। ঘুম না, জ্বরের ঘোরে চোখ বন্ধ। মুখটা ছোট, শুকনো। ঠোঁট ফাটা।
"কবিরাজ বলেছে দুইদিনে ভালো হয়ে যাবে," মরিয়ম বললেন। গলায় একটা আশা, যেটা সত্য না, কিন্তু ধরে রাখতে চান।
সেলিনা একটু সময় নিল। তারপর বলল, "মরিয়ম আপা, আমি সাত বছর ধরে এই কাজ করি। অনেক বাচ্চা দেখেছি। আরিফের যে লক্ষণ, সেটা দুইদিনে ভালো হওয়ার লক্ষণ না। আমি মিথ্যা বলব না আপনাকে।"
মরিয়ম সেলিনার দিকে তাকালেন। দুজন মায়ের চোখাচোখি হলো। সেলিনারও ছেলে আছে, মরিয়ম জানেন। এটা একটা ভাষা যেটা ট্যাবলেট বোঝে না, কিন্তু দুজন মা বোঝে।
"কিন্তু টাকা..." মরিয়মের গলা ভাঙল।
সেলিনা বলল, "আমি হাসপাতালে ফোন করছি।"
৪
সেলিনা বাইরে বেরিয়ে এলো। ফোনটা বের করল। নেটওয়ার্ক নেই। চরে নেটওয়ার্ক থাকে না। সেলিনা এটা জানে।
সে ঘাটের দিকে হাঁটল। নদীর ধারে কখনো কখনো একটু সিগন্যাল পাওয়া যায়। কেন, কেউ জানে না। হয়তো ওপারের টাওয়ার থেকে কিছুটা আসে। হয়তো ভাগ্য।
রহমত চাচা নৌকায় বসে ঘুমাচ্ছিলেন। সেলিনার পায়ের শব্দে জেগে উঠলেন।
"যাবি?"
"না, চাচা। ফোন করব।"
সেলিনা নদীর ধারে দাঁড়াল। ফোনটা একটু ওপরে ধরল। একটা বার। কাঁপছে। আছে না আছে, বোঝা যাচ্ছে না।
সে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের নম্বরে ফোন করল। রিং হলো। এক, দুই, তিন, চার। কেউ ধরল না। পাঁচ, ছয়। কেউ ধরল।
"সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল।"
"আমি সেলিনা, কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার, দক্ষিণচর থেকে বলছি। একটা তিন বছরের বাচ্চা, চার দিনের জ্বর, নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। ডেঙ্গু সন্দেহ। হেমোরেজিক রিস্ক আছে। অ্যাম্বুলেন্স নৌকা পাঠানো সম্ভব?"
ওপাশে একটু চুপ। তারপর একটা গলা বলল, "কোন চর?"
"দক্ষিণচর। নদী ঘাট থেকে পনেরো মিনিট।"
"অ্যাম্বুলেন্স বোট এখন তাহিরপুরে আছে। ফিরতে দুই ঘণ্টা লাগবে।"
"দুই ঘণ্টা অনেক বেশি।"
"আপা, আমরা তো একটাই বোট পেয়েছি।"
সেলিনা চুপ করল। এটা রাগ করার জায়গা না। একটাই বোট। পুরো জেলায় একটা অ্যাম্বুলেন্স বোট। সেটা এখন তাহিরপুরে। দক্ষিণচর থেকে সুনামগঞ্জ সদর অন্য দিকে। সেলিনা রাগ করবে কার ওপর?
"ঠিক আছে, বোটটা পাঠান। আমি এদিক থেকে নৌকায় বাচ্চাটাকে নিয়ে নদী পার করি। ওপারে ঘাটে বোট পৌঁছালে সেখান থেকে নিয়ে যাবেন।"
"আচ্ছা, ব্যবস্থা করছি। রোগীর নাম?"
"আরিফ। বাবা শফিক। মা মরিয়ম। তিন বছর।"
ফোন রাখল। সিগন্যাল চলে গেছে।
সেলিনা রহমত চাচার দিকে তাকাল।
"চাচা, একটা বাচ্চাকে ওপারে নিয়ে যেতে হবে। এখনই।"
রহমত চাচা সিগারেট ফেলে দিলেন। কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। নৌকার দড়ি খুললেন।
৫
মরিয়মকে রাজি করাতে আরো দশ মিনিট লাগল।
মরিয়ম বললেন, "বড় মেয়ে স্কুল থেকে ফিরলে কে দেখবে?"
"পাশের বাড়ির কাউকে বলে যান।"
"স্বামীকে জানাব কিভাবে?"
"ফিরলে জানবে। এখন বাচ্চাটা আগে।"
মরিয়ম আরিফকে কোলে তুলে নিলেন। ছেলেটা জ্বরের ঘোরে একটু নড়ল, কিন্তু চোখ খুলল না। মরিয়ম একটা পুঁটলিতে কিছু কাপড় আর একটা গামছা নিলেন। পুঁটলিটা ছোট। যে মানুষ হঠাৎ করে কোথাও যায়, তার পুঁটলি সবসময় ছোট হয়।
নৌকায় ওঠার সময় মরিয়ম একবার পেছনে তাকালেন। বাড়িটার দিকে। টিনের ছাদ রোদে চকচক করছে। ছাগলটা এখনো ঘাস খাচ্ছে।
সেলিনা নৌকার সামনে বসল। মরিয়ম আরিফকে নিয়ে মাঝখানে। রহমত চাচা বৈঠা ধরলেন।
নদীতে স্রোত আছে। রহমত চাচা জোরে বৈঠা চালালেন। সেলিনা আরিফের দিকে তাকাল। ছেলেটার শ্বাস দ্রুত। ঠোঁট শুকনো। কপালে ঘাম।
সেলিনা ব্যাগ থেকে একটা ওরস্যালাইনের প্যাকেট বের করল। পানির বোতলে গুলে আরিফের ঠোঁটে ধরল। ছেলেটা একটু খেল। একটু ছড়িয়ে পড়ল গালে।
মরিয়ম চুপ করে বসে আছেন। কান্না নেই। কান্না পরে আসবে, যখন ভয়টা কমবে। ভয়ের সময় মানুষ কাঁদে না, ভয়ের পরে কাঁদে। সেলিনা এটা জানে।
ওপারে পৌঁছাতে বিশ মিনিট লাগল। ঘাটে অ্যাম্বুলেন্স বোট নেই। আসতে আরো সময় লাগবে। সেলিনা ঘাটে একটা চায়ের দোকানে গেল। দোকানদারকে বলল, "ভাই, হাসপাতালের বোট আসবে। এই মা আর বাচ্চাটা এখানে বসবে। একটু দেখবেন।"
দোকানদার তাকাল। কিছু জিজ্ঞেস করল না। একটা বেঞ্চ দেখিয়ে দিল।
সেলিনা মরিয়মকে বলল, "আপা, বোট আসবে। এখানে বসে থাকেন। বোট এলে বলবেন সেলিনা পাঠিয়েছে। আপনার আর আরিফের নাম ওরা জানে।"
মরিয়ম বললেন, "আপনি যাবেন না?"
"আমাকে চরে ফিরতে হবে। আরো রোগী আছে। কিন্তু আমি হাসপাতালে ফোন করে জানাব।"
মরিয়ম সেলিনার হাত ধরলেন। কিছু বললেন না। শুধু ধরে রইলেন। তারপর ছেড়ে দিলেন।
সেলিনা রহমত চাচার নৌকায় উঠল। নৌকা ফিরে চলল দক্ষিণচরের দিকে।
৬
তিন দিন পর খবর এলো।
আরিফের ডেঙ্গু পজিটিভ। NS1 পজিটিভ। প্লেটলেট কাউন্ট কম ছিল, কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা শুরু হওয়ায় সামলে গেছে। ছেলেটা হাসপাতালে আছে। ভালো হচ্ছে।
সেলিনা খবরটা ফোনে পেল। উপজেলা হেলথ অফিসার জানালেন। বললেন, "ভালো কাজ করেছেন, সেলিনা। আরেকটু দেরি হলে বিপদ হতো।"
সেলিনা বলল, "ধন্যবাদ, স্যার।"
ফোন রাখল। বারান্দায় বসে রইল। সোহেল ভেতরে পড়ছে। মা রান্নাঘরে। হাওরের পানিতে বিকেলের আলো পড়েছে। সোনালি।
সোহেল বেরিয়ে এলো। হাতে খাতা।
"আম্মা, দেখো।"
খাতা খুলে দেখাল। গণিতের পাতা। যোগ-বিয়োগ। পাতার কোণায় একটা নৌকা আঁকা। নৌকাটা এবার একটু বড়। আগে ছোট ছোট আঁকত, এবার প্রায় অর্ধেক পাতা জুড়ে। নৌকায় একটা মানুষ বসে আছে। মানুষটার মাথায় লম্বা চুল। মা।
"সুন্দর," সেলিনা বলল।
সোহেল ফিরে গেল। সেলিনা নৌকার ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর চোখ সরিয়ে নিল।
৭
এক সপ্তাহ পর মরিয়ম ফিরলেন। আরিফকে নিয়ে। ছেলেটা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে। রোগা হয়ে গেছে, কিন্তু চোখ খোলা। চোখে আলো আছে। তিন বছরের বাচ্চার চোখে যে ধরনের আলো থাকে, সেটা, বুঝে উঠতে না পারার আলো, সেটা ফিরে এসেছে।
মরিয়ম সেলিনার বাড়িতে এলেন। হাতে একটা কাচের বয়াম। বয়ামের ভেতরে আম-কাসুন্দি। ঘরে বানানো। কাঁচা আমের সাথে সরিষা, হলুদ, লঙ্কা, তেল। বয়ামের মুখে কাপড় দিয়ে বাঁধা।
"আপনার জন্য," মরিয়ম বললেন।
সেলিনা বয়ামটা হাতে নিল। ভারী। ভালো করে বানিয়েছেন, বোঝা যায়। আমের গন্ধ পাচ্ছে, ঝাঁঝালো, টক, সরিষার তীব্রতা।
"এত কষ্ট করলেন কেন?"
মরিয়ম কিছু বললেন না। আরিফ তাঁর কোলে বসে চারদিকে তাকাচ্ছে। ছেলেটা সেলিনাকে চেনে না। সেদিন জ্বরের ঘোরে ছিল, কিছু মনে থাকার কথা না। কিন্তু মরিয়ম মনে রেখেছেন। মায়েরা মনে রাখেন।
মরিয়ম চলে গেলেন।
সেলিনা বয়ামটা রান্নাঘরে রাখল।
৮
সন্ধ্যায় সেলিনা ভাত রাঁধল। ডাল। একটু আলু ভর্তা। তারপর বয়ামটা খুলল।
আম-কাসুন্দি। চামচ দিয়ে একটু তুলে ভাতের পাশে রাখল। সোহেলকে দিল একটু। মাকে দিলেন।
প্রথম কামড়ে সেলিনার চোখ বড় হলো। টক, ঝাল, একটু মিষ্টি, সরিষার ঝাঁঝ নাকে গেল। মরিয়ম ভালো বানিয়েছেন। খুব ভালো বানিয়েছেন। কাঁচা আম পাকা না, কচি, সেই আম দিয়ে বানালে এই স্বাদ হয়। সেলিনার দাদি বানাতেন এরকম। দাদি মারা গেছেন বহু বছর আগে, কিন্তু স্বাদটা মনে আছে। কিছু কিছু স্মৃতি জিহ্বায় থাকে, মাথায় না।
সোহেল বলল, "আম্মা, এটা কে দিয়েছে?"
"একজন মা। তার ছেলে অসুস্থ ছিল। ভালো হয়ে গেছে।"
"তুমি ভালো করেছ?"
সেলিনা একটু ভাবল। তারপর বলল, "ট্যাবলেট বলেছে কী হয়েছে। আমি নিয়ে গেছি হাসপাতালে। ডাক্তার ভালো করেছে। সবাই মিলে।"
সোহেল এই উত্তরে সন্তুষ্ট হলো। ভাত খেতে লাগল। ভাতের সাথে আম-কাসুন্দি। মুখ ভেংচে বলল, "ঝাল!" কিন্তু আবার নিল।
সেলিনার মা বললেন, "ভালো বানাইছে।"
"হুম।"
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে সেলিনা নিজের খাতাটা বের করল। পেন নিল। একটু ভাবল।
লিখল:
"আজ একটা বাচ্চা বাঁচলো। ট্যাবলেটের কারণে? আমার কারণে? দুটোই?"
কলমটা থামল। সেলিনা লাইনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তিনটা প্রশ্নচিহ্ন। উত্তর নেই।
ট্যাবলেট ডেঙ্গু ধরেছে। সেলিনা ট্যাবলেট ছাড়া ডেঙ্গু ধরতে পারত কিনা, সে জানে না। হয়তো পারত। নাক দিয়ে রক্ত পড়া দেখে সন্দেহ হতো। হয়তো হতো না। হয়তো আরো দুইদিন প্যারাসিটামল দিয়ে অপেক্ষা করত। দুইদিন পর হয়তো দেরি হয়ে যেত।
কিন্তু ট্যাবলেট নৌকায় ওঠেনি। ট্যাবলেট মরিয়মকে রাজি করায়নি। ট্যাবলেট হাসপাতালে ফোন করেনি। ট্যাবলেট আরিফের ঠোঁটে ওরস্যালাইন ধরেনি। ট্যাবলেট রহমত চাচাকে বলেনি, "এখনই চলেন।"
সেলিনা খাতা বন্ধ করল। ট্যাবলেটটা টেবিলে রাখা। স্ক্রিন বন্ধ। সবুজ আলো জ্বলছে না, চার্জ শেষ। আজ সন্ধ্যায় চার্জ দিতে ভুলে গেছে।
কাল দেবে।
সেলিনা উঠে রান্নাঘরে গেল। বয়ামটা খুলল। আরেক চামচ আম-কাসুন্দি নিল। এমনি। ভাত ছাড়া। টক-ঝাল স্বাদটা জিভে ছড়িয়ে গেল।
বাইরে নদীর পানিতে চাঁদ উঠেছে। অর্ধেক চাঁদ। অর্ধেকটা পানিতে, অর্ধেকটা আকাশে।