মিতুর বুটক্যাম্প
একটা হোয়াইটবোর্ড, একটা ধার করা কলম
১
বাসটা ছাড়ল সকাল সাতটায়।
গাজীপুর থেকে মোহাখালী। তিন ঘণ্টা। কখনো সাড়ে তিন। কখনো চার। ঢাকার ট্রাফিক একটা জীবন্ত প্রাণী, তার নিজের ইচ্ছা আছে, কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
মিতু বাসের জানালার পাশে বসল। জানালার কাচটা নেই। ভাঙা। ফ্রেমটা আছে, কিন্তু কাচ কেউ লাগায়নি। বাতাস সরাসরি মুখে আসছে। মিতুর দোপাট্টা উড়ছে, বাম কাঁধ থেকে খুলে পেছনে যাচ্ছে, মিতু টেনে আনছে, আবার উড়ছে। এটা পুরো রাস্তা চলল। মিতু একসময় ছেড়ে দিল। দোপাট্টা উড়ুক। ধরে ধরে কী হবে।
ব্যাগে একটা খাতা। একটা কলম। কলমটা ধার করা, পাশের বাসার সুমির কাছ থেকে। সুমি বলেছিল, "কেন? তোর কলম নাই?" মিতু বলেছিল, "আছে, কিন্তু কালি শেষ। কাল কিনব।" সুমি কলমটা দিয়ে বলল, "ফেরত দিস।" মিতু বলল, "দেব।"
কলমটা নীল। সাধারণ বলপয়েন্ট। দুই টাকা দামের হবে। কিন্তু মিতু এটা দিয়েই লিখবে আজ।
বাসের ভেতরে গরম। মার্চের গরম শুরু হয়ে গেছে। সিলিংয়ে একটা ফ্যান আছে, ঘোরে না। শোপিসের মতো ঝুলে আছে। ড্রাইভারের পাশে একটা ছোট ফ্যান আছে, সেটা শুধু ড্রাইভারের দিকে ঘোরে। গণতন্ত্রের এই রূপটা মিতু আগেও দেখেছে।
মিতু জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। গাজীপুরের রাস্তা। দুইপাশে ফ্যাক্টরি। বিল্ডিংয়ের গায়ে বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম, যেগুলোর কাপড় ভেতরে বানানো হয়। আম্মা এরকম একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। আঠারো বছর ধরে। মিতু জানে ফ্যাক্টরির ভেতরটা কেমন। ছোটবেলায় মাঝে মাঝে আম্মার সাথে গেছে, যেদিন স্কুল ছুটি থাকত। টিউবলাইটের সাদা আলো, সেলাই মেশিনের আওয়াজ, ঘামের গন্ধ। মিতুর ভালো লাগত না। আম্মা বলত, "ভালো লাগার জায়গা না এটা। কাজের জায়গা।"
আজ মিতু যাচ্ছে অন্য একটা জায়গায়। কোডিং বুটক্যাম্প। একটা ঢাকার স্টার্টআপ ফ্রি বুটক্যাম্প দিচ্ছে। মিতু অনলাইনে ফর্ম পূরণ করেছিল। ফোনে। দুই সপ্তাহ আগে মেসেজ এসেছে: "অভিনন্দন! আপনি নির্বাচিত হয়েছেন। তারিখ: ১৮ মার্চ। সময়: সকাল ১০টা। স্থান: মোহাখালী, টেকভিলেজ ভবন, ৮ম তলা।"
মিতু মেসেজটা তিনবার পড়েছিল। তারপর স্ক্রিনশট নিয়ে রেখেছিল। তারপর আম্মাকে বলেছিল।
আম্মা বলেছিল, "কোথায়?"
"মোহাখালী।"
"একা যাবি?"
"হ্যাঁ।"
আম্মা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, "বাস ভাড়া কত?"
"যাওয়া-আসা দুইশো টাকা।"
আম্মা দুইশো টাকা দিয়েছিল। আলাদা করে রাখা টাকা থেকে। মিতু জানে, আম্মা মাসের শেষে কিছু টাকা আলাদা রাখে, একটা পুরনো বিস্কুটের টিনে। কারো জানার কথা না, কিন্তু মিতু জানে। মিতু সবকিছু জানে। আম্মার মতো চোখ পেয়েছে, সবকিছু দেখে।
২
বাস মোহাখালী পৌঁছাল সোয়া দশটায়। বিশ মিনিট দেরি। ট্রাফিক।
মিতু নামল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল। গাজীপুর আর মোহাখালী আলাদা দেশ। গাজীপুরে ফ্যাক্টরি, ধুলো, রিকশা, সরু গলি। মোহাখালীতে কাচের বিল্ডিং, এসি গাড়ি, মানুষের হাতে কফির কাপ। একই শহর, কিন্তু দুই জগৎ।
টেকভিলেজ ভবন খুঁজে পেতে পাঁচ মিনিট লাগল। কাচের বিল্ডিং। সামনে একটা গার্ড। মিতু বলল, "বুটক্যাম্প?" গার্ড বলল, "আটতলা। লিফটে যান।" মিতু লিফটে উঠল। লিফটের ভেতরে আয়না। মিতু নিজেকে দেখল। সালোয়ার-কামিজ, একটু কুঁচকে গেছে বাসের তিন ঘণ্টায়। দোপাট্টা এলোমেলো। চুল বাতাসে উড়ে জটলা হয়ে গেছে। মিতু হাত দিয়ে চুল একটু ঠিক করল। এটুকুই করা যায়।
আটতলায় দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এলো। এসি। মিতুর গায়ে বাসের তিন ঘণ্টার ঘাম। ঠান্ডা বাতাসে গায়ের ঘাম শুকিয়ে একটু কাঁপুনি লাগল। একটু।
ভেতরে বড় একটা ঘর। লম্বা টেবিল। চেয়ার। সামনে একটা হোয়াইটবোর্ড। দেয়ালে লেখা "কোড ফর বাংলাদেশ" আর "ফিউচার মেকার্স বুটক্যাম্প।" রঙিন অক্ষরে। পাশে কিছু স্টিকার, "উই বিল্ড," "লার্ন, কোড, রিপিট।"
ঘরে ইতিমধ্যে পনেরো-ষোলোজন বসে আছে। বেশিরভাগ মিতুর বয়সী, কুড়ি থেকে পঁচিশ। প্রত্যেকের সামনে ল্যাপটপ। খোলা। স্ক্রিনে রঙিন কোড, টার্মিনাল, ব্রাউজার। কেউ কেউ হেডফোন পরে আছে। কেউ কেউ পাশের জনের সাথে ইংরেজিতে কথা বলছে। "ইয়েস, আই ইউজড ফ্লাস্ক," "নো, জ্যাঙ্গো ইজ বেটার ফর দিস।"
মিতু একটা খালি চেয়ারে বসল। ব্যাগ থেকে খাতা বের করল। সুমির কলম বের করল। সামনে রাখল।
পাশের মেয়েটার ল্যাপটপে অ্যাপলের লোগো। ম্যাকবুক। মেয়েটা মিতুর দিকে তাকাল, মিতুর খাতা-কলম দেখল, একটু থামল, তারপর চোখ সরিয়ে নিল। কিছু বলল না। কিন্তু চোখটা বলল।
মিতু চোখটা দেখল। দেখেও না দেখার ভান করল। এই ধরনের চোখ সে চেনে। গাজীপুরে যখন কেউ জানে সে গার্মেন্টস এরিয়ার মেয়ে, এই চোখই দেখে। কৌতূহল না, দয়া না, শুধু একটা দূরত্ব। যেন মিতু অন্য কোনো প্রজাতি।
৩
ইন্সট্রাক্টরের নাম রাফি। তরুণ, চশমা পরা, টি-শার্টে একটা গিটহাবের লোগো। কথা বলে দ্রুত, ইংরেজি আর বাংলা মিশিয়ে।
"ওকে, ওয়েলকাম এভরিওয়ান। আজকে আমরা পাইথন ফান্ডামেন্টালস দিয়ে শুরু করব। হাউ মেনি অফ ইউ নো পাইথন?"
কয়েকজন হাত তুলল। পাঁচ-ছয়জন।
মিতু হাত তুলল।
রাফি মিতুর দিকে তাকাল। খাতা-কলম দেখল। ল্যাপটপ নেই দেখল। একটু থামল।
"তুমি পাইথন জানো?"
"হ্যাঁ।"
"কোথায় শিখেছ?"
"ফোনে। ইউটিউবে। খান একাডেমি।"
ঘরে একটু নিশ্চুপ হলো। রাফি মিতুর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কিছু একটা ভাবল। তারপর বলল, "একটু আসো তো সামনে।"
মিতু উঠে গেল। হোয়াইটবোর্ডের সামনে দাঁড়াল। পনেরোজন তার দিকে তাকাচ্ছে। পনেরোটা ল্যাপটপ খোলা।
রাফি একটা মার্কার দিল। নীল। বলল, "ফিজবাজ লেখো।"
মিতু মার্কারটা নিল। ক্যাপ খুলল।
ফিজবাজ। মিতু এটা ফোনে প্র্যাকটিস করেছে। রাতে, মেঝেতে বসে, ফোনের আলোতে। একটা ফ্রি কোডিং অ্যাপে। আম্মা পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে, রাজু ঘুমাচ্ছে, বাবা রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেছে। মিতু কোড লিখছে। ফোনের ছোট স্ক্রিনে। আঙুলের ডগায়।
হোয়াইটবোর্ডে লিখল:
``` for i in range(1, 101): if i % 15 == 0: print("FizzBuzz") elif i % 3 == 0: print("Fizz") elif i % 5 == 0: print("Buzz") else: print(i) ```
হাতের লেখা পরিষ্কার। ইন্ডেন্টেশন ঠিক। কোলন ঠিক জায়গায়। শতকরা চিহ্নগুলো স্পষ্ট। মিতু কোড লেখে যেভাবে আম্মা সোয়েটার দেখে, ধীরে, মনোযোগ দিয়ে, একটা ভুলও না রেখে।
সে থামল। মার্কারের ক্যাপ লাগাল।
রাফি হোয়াইটবোর্ডের দিকে তাকাল। কোডটা পড়ল। মিতুর দিকে তাকাল। আবার কোডের দিকে।
"পারফেক্ট," বলল।
ঘরে কেউ কিছু বলল না। শব্দ নেই। শুধু এসির হাম। পনেরোজন মিতুর দিকে তাকিয়ে আছে। ম্যাকবুকের মেয়েটাও। চশমা পরা একটা ছেলেও, যার ল্যাপটপে তিনটা প্রোগ্রামিং স্টিকার আছে।
পেছনের সারি থেকে কেউ ফিসফিস করল। একটা মেয়ে, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আইডি কার্ড গলায় ঝুলছে, পাশের জনকে বলল:
"ও কে?"
পাশেরজন ফিসফিস করে বলল, "গার্মেন্টস এরিয়া থেকে।"
মিতু শুনল। পরিষ্কার শুনল। ফিসফিস ভাবল ওরা, কিন্তু ঘরে এত চুপ যে সবাই শুনেছে। রাফিও শুনেছে। রাফি কিছু বলল না। মিতুও কিছু বলল না।
মিতু হোয়াইটবোর্ডের দিকে ফিরে তাকাল। কোডটার নিচে একটু জায়গা আছে। সে মার্কারের ক্যাপ আবার খুলল। আরেকটা লাইন লিখল:
``` # 15 check first to avoid redundant modulo ops ```
একটা কমেন্ট। কেন সে ১৫ আগে চেক করেছে, ৩ আর ৫ আলাদা আলাদা আগে না। অপটিমাইজেশন। ছোট, কিন্তু সচেতন।
মিতু মার্কারটা রাফিকে ফেরত দিল। গিয়ে তার চেয়ারে বসল। খাতা খুলল। কলম তুলল। কিছু লিখল না। শুধু বসে রইল।
রাফি বলল, "ওকে, লেটস কন্টিনিউ।" প্রেজেন্টেশন শুরু করল।
৪
বুটক্যাম্প চলল সারাদিন। সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা। মাঝে লাঞ্চ ব্রেক। লাঞ্চে বিরিয়ানি এলো। ক্যাটারিং থেকে। মিতু একটা প্লেট নিয়ে কোণায় বসে খেল। কেউ তার পাশে বসল না। মিতু এটা নিয়ে ভাবল না।
দুপুরে প্র্যাক্টিক্যাল সেশন। সবাই ল্যাপটপে কোড লিখছে। মিতু খাতায় লিখছে। হাতে। কলমে। রাফি একবার এসে দেখল, বলল, "তুমি চাইলে আমার ল্যাপটপে প্র্যাকটিস করতে পারো।" মিতু বলল, "থাক। আমি খাতায় করছি। রাতে ফোনে রান করব।"
রাফি কিছু বলল না। চলে গেল।
মিতু খাতায় কোড লিখল। ফাংশন, লুপ, কন্ডিশন। হাতে লেখা কোড কাগজে অন্যরকম দেখায়। স্ক্রিনে কোড ঝকঝকে, রঙিন, সিনট্যাক্স হাইলাইটেড। কাগজে কোড শুধু কালো অক্ষর, নীল কালিতে, সুমির কলমে। কিন্তু লজিকটা একই। কাগজে লিখলেও ১ আর ০ একই কাজ করে।
বিকেলের সেশনে রাফি একটা চ্যালেঞ্জ দিল। একটা লিস্ট থেকে ডুপ্লিকেট বের করার প্রোগ্রাম। পনেরো মিনিট সময়।
মিতু খাতায় লিখল। তিন মিনিটে। সেট ব্যবহার করে। ক্লিন, সিম্পল।
পাশের ছেলেটা, তিনটা স্টিকারওয়ালা ল্যাপটপ, দশ মিনিটেও শেষ করতে পারল না। ডিকশনারি দিয়ে চেষ্টা করছে, জটিল করে ফেলেছে। মিতু দেখল, কিন্তু কিছু বলল না। অন্যের কোডে কথা বলা ভদ্রতা না।
৫
বিকেল পাঁচটায় বুটক্যাম্প শেষ হলো।
রাফি বলল, "নেক্সট সেশন আগামী শনিবার। যারা সিলেক্টেড হবে, মেসেজ পাবে।"
মানে, সবাই আসবে না পরেরবার। বাছাই হবে। কে থাকবে, কে বাদ যাবে।
মিতু ব্যাগ গুছিয়ে উঠল। বের হতে গেলে রাফি ডাকল।
"এই, একটু দাঁড়াও।"
মিতু দাঁড়াল।
"তোমার নাম কী?"
"মিতু।"
"মিতু কী?"
"মিতু। রহিমা আক্তারের মেয়ে।"
রাফি একটু হাসল। "আমি বলছি, ফুল নেম।"
"মিতু আক্তার।"
"তুমি কোথায় পড়ো?"
"পড়ি না। মানে, অনলাইনে পড়ি। ইউটিউবে। ফোনে।"
"কলেজ?"
"এইচএসসি পাস।"
রাফি একটু চুপ করল। মিতুর খাতাটার দিকে তাকাল। খাতায় সারাদিনের কোড। পরিষ্কার হাতের লেখায়। ইন্ডেন্টেশন বজায় রেখে। প্রতিটা ভেরিয়েবলের নাম মিনিংফুল।
"তুমি ভালো কোড লেখো," রাফি বলল।
"ধন্যবাদ।"
"ল্যাপটপ নেই?"
"না।"
রাফি কিছু বলতে যাচ্ছিল, থামল। হয়তো ল্যাপটপ দেওয়ার কথা বলতে যাচ্ছিল। হয়তো কোনো স্কলারশিপের কথা। হয়তো দয়া। মিতুর মুখ দেখে থেমে গেল। মিতুর মুখে দয়া নেওয়ার ভাব নেই। মিতুর মুখে আম্মার মুখ। একই চোয়াল। একই ভ্রু। একই একগুঁয়ে চোখ।
"ওকে। নেক্সট উইক দেখা হবে," রাফি বলল।
"হুম।"
মিতু বের হয়ে গেল।
৬
লিফটে নামতে নামতে মিতু ভাবল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মেয়েটা কী ভাবছে এখন। "গার্মেন্টস এরিয়া থেকে।" কথাটা সত্য। মিতু গার্মেন্টস এরিয়া থেকে। গাজীপুরের টঙ্গী, যেখানে ফ্যাক্টরির চিমনির ধোঁয়া আর সেলাই মেশিনের আওয়াজ বাতাসে মিশে আছে। যেখানে মিতুর আম্মা প্রতিদিন সকাল সাতটায় ঢোকে, সন্ধ্যা সাতটায় বের হয়। যেখানে মিতুর বাবা রাতে রিকশা চালায়।
গার্মেন্টস এরিয়া থেকে। এটা একটা ঠিকানা, একটা পরিচয়, একটা সীমানা। এই সীমানার ভেতরের মানুষ কোড লিখবে, এটা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মেয়েটার ক্যালকুলেশনে ছিল না।
মিতু রাস্তায় বেরিয়ে এলো। মোহাখালীর রাস্তায় রোদ। ঘাম। গাড়ির হর্ন। সে বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটল।
বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মিতু ফোনটা বের করল। ফোনে নোটিফিকেশন নেই। আম্মা ফোন করেনি, আম্মা জানে মিতু বুটক্যাম্পে আছে। রাজু মেসেজ করেছে: "আম্মাকে বল ফুটবল কিনে দিতে।" মিতু মেসেজটা দেখল, রিপ্লাই করল না।
বাস এলো। মিতু উঠল। আবার জানালার পাশে। আবার সেই ভাঙা জানালা। এবার অন্য দিকের জানালা, এটাতে কাচ আছে, কিন্তু কাচে একটা লম্বা ফাটল। ফাটলের ভেতর দিয়ে বাইরে দেখা যায়, যেন পৃথিবীটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে।
মিতু খাতাটা বের করল। সারাদিনের কোড দেখল। পাতায় পাতায় নীল কালিতে লেখা। ফিজবাজ, ফাংশন, লুপ, ডুপ্লিকেট ফাইন্ডার। প্রতিটা লাইন ঠিক আছে। মিতু জানে ঠিক আছে। চেক করার দরকার নেই। কিন্তু আবার দেখল। আম্মার মতো। আম্মা সোয়েটার গুনে, মিতু কোড গোনে।
বাস চলল। গাজীপুরের দিকে। তিন ঘণ্টা। দোপাট্টা আবার উড়ছে, এবার ডান কাঁধ থেকে। মিতু ধরল না। উড়ুক।
বাসের জানালা দিয়ে বাতাস আসছে। গরম বাতাস। মার্চের। মিতু খাতাটা বন্ধ করে ব্যাগে রাখল। সুমির কলমটা ব্যাগের পকেটে গুঁজল। কাল ফেরত দিতে হবে।
চোখ বন্ধ করল। ঘুমাল না। শুধু চোখ বন্ধ করে রইল।
হোয়াইটবোর্ডের সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তটা মনে পড়ল। মার্কার হাতে। পনেরোজন তাকিয়ে আছে। নীল কালিতে কোড লিখছে। for i in range। প্রতিটা অক্ষর পরিষ্কার। প্রতিটা লাইন জায়গামতো।
"গার্মেন্টস এরিয়া থেকে।"
মিতু মনে মনে হাসল। একটু। তারপর হাসিটা চলে গেল।
বাস থামল। ট্রাফিক। মিতু চোখ খুলল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকান। দোকানের সামনে একটা ছোট ছেলে বসে আছে, খাতায় কিছু আঁকছে। কী আঁকছে দেখা যায় না। হয়তো নৌকা। হয়তো বাস। হয়তো এমন কিছু যেটার কোনো নাম নেই।
বাস আবার চলল।
মিতু বসে রইল। ব্যাগে একটা খাতা। ব্যাগের পকেটে একটা ধার করা কলম। সন্ধ্যার আলো কমে আসছে। গাজীপুরের ফ্যাক্টরিগুলোর জানালায় আলো জ্বলে উঠছে, একটা একটা করে, যেন কেউ তারা জ্বালাচ্ছে মাটিতে।