ডেটা লেবেলারদের জীবন

আটশো বাক্য, চোদ্দশো চল্লিশ টাকা, একটা রাত

পর্ব ১৯ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

--- title: "ডেটা লেবেলারদের জীবন" subtitle: "আটশো বাক্য, চোদ্দশো চল্লিশ টাকা, একটা রাত" series: "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ" chapter: 2 chapter_title: "প্রথম আলো" part: 19 date: "2026-03-18" ---

যোসনার মা সেলাই করছে।

একটা নীল জামার হাতা লাগাচ্ছে। সেলাই মেশিনের শব্দ ঘরে ভরে আছে। ঠক ঠক ঠক ঠক। যোসনা পাশে বসে সুতা কাটছে। নীল সুতা। এই জামার সাথে মিলবে। তার মা বললো, "আরেকটু সোজা ধর।" যোসনা সোজা ধরলো।

বিকেল চারটা। গাজীপুরে রোদ কমে এসেছে। জানালা দিয়ে হলুদ আলো ঢুকছে। যোসনার মা দিনে চার-পাঁচটা জামা সেলাই করে। পাড়ার মেয়েরা আসে, কাপড় দেয়, মাপ দেয়, তিন-চার দিন পরে নিয়ে যায়। প্রতি জামায় দুশো থেকে তিনশো টাকা। ফ্যাক্টরি ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে এই কাজ।

যোসনা সুতা কাটতে কাটতে ভাবছে রাতের কথা। আজ রাতে আটশো বাক্য। আটশো বাক্য মানে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা মানে রাত দশটা থেকে ভোর তিনটা। ভোর তিনটায় সে ফোন বন্ধ করবে, চোখ বন্ধ করবে, সকাল আটটায় উঠবে, আবার মায়ের পাশে বসবে। সুতা কাটবে, বোতাম লাগাবে, ইস্ত্রি করবে।

সেলাই মেশিন থামলো। মা কাপড় ঘুরিয়ে ধরলো, দেখলো সেলাই সোজা হয়েছে কিনা। হয়েছে। মা আবার শুরু করলো।

যোসনার চোখ একটু ভারী। গতরাতে ঘুম কম হয়েছে। তার আগের রাতেও। তার আগের রাতেও। আসলে যোসনা মনে করতে পারে না শেষ কবে ভালো ঘুমিয়েছে। হয়তো মাস তিনেক আগে, যখন সে এই কাজটা শুরু করেনি।

মা বললো, "তোর চোখ লাল কেন?"

যোসনা বললো, "এমনি।"

মা আর কিছু বললো না। মায়েরা সব বোঝে, কিন্তু সব জিজ্ঞেস করে না।

সন্ধ্যা সাতটায় যোসনা রান্না করলো। ভাত, ডাল, আলু ভর্তা। ছোট ভাই রাকিব স্কুল থেকে ফিরে বই খুলে বসেছে। সে ক্লাস এইটে পড়ে। তার পরীক্ষা আসছে। যোসনা ভাতের থালা দিয়ে বললো, "পড়তে পড়তে খা।" রাকিব মাথা নাড়লো।

মা খেতে বসলো। খেতে খেতে বললো, "তুই সারারাত ফোনে কী করিস?"

যোসনা বললো, "পড়াশোনা।"

মা বললো, "কীসের পড়াশোনা?"

"অনলাইনে কোর্স করি।"

মা আর কিছু বললো না। সে জানে যোসনা এসএসসি পাশ। তার পরে পড়া হয়নি। টাকার অভাবে নয়, যোসনার ইচ্ছার অভাবেও নয়। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসার সামলাতে গিয়ে সময়ের অভাবে। মা ফ্যাক্টরিতে যেত, যোসনা ঘর সামলাতো, রাকিবকে স্কুলে পাঠাতো। পড়া আর হলো না।

রাত নয়টায় মা শুয়ে পড়লো। রাকিব পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লো বইয়ের উপর। যোসনা তার গায়ে একটা চাদর দিলো, বই সরিয়ে রাখলো।

রাত দশটা।

যোসনা ফোন খুললো। স্ক্রিনের আলো কম করলো যাতে মায়ের ঘুম না ভাঙে। প্ল্যাটফর্মে লগইন করলো। আজকের ব্যাচ রেডি। আটশো বাক্য। সেন্টিমেন্ট লেবেলিং। প্রতি বাক্যে এক টাকা আশি পয়সা। প্ল্যাটফর্ম কমিশন বাদে।

প্রথম বাক্য।

"আমার ছেলে পরীক্ষায় ভালো করেছে।"

ইতিবাচক।

"সরকার কিছুই করে না।"

নেতিবাচক।

"তুমি কি কাল আসবে?"

নিরপেক্ষ।

"আমি খুব ক্লান্ত।"

নেতিবাচক।

যোসনা বাক্য পড়ে, ভাবে, ট্যাপ করে। পড়ে, ভাবে, ট্যাপ করে। পড়ে, ভাবে, ট্যাপ করে। প্রতিটা বাক্যে চার-পাঁচ সেকেন্ড। কিন্তু মাঝে মাঝে বাক্যগুলো কঠিন হয়।

"এত কষ্ট করে কী লাভ হলো।"

নেতিবাচক? নাকি নিরপেক্ষ? যে বলছে সে হতাশ, কিন্তু সে প্রশ্ন করছে। প্রশ্ন মানে তো নিরপেক্ষ হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্নের ভেতরে একটা কষ্ট আছে। যোসনা নেতিবাচক দিলো।

পরের বাক্য।

"বাজারে সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে কিন্তু কিছু করার নেই।"

নেতিবাচক। এটা সহজ।

"আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।"

ইতিবাচক। এটাও সহজ।

"কিছু বলার নেই।"

এটা কী? নেতিবাচক? নিরপেক্ষ? যে বলছে সে কি রাগ করে বলছে? নাকি সত্যিই কিছু বলার নেই? যোসনা জানে না। সে নিরপেক্ষ দিলো।

একশো বাক্য শেষ। ফোনের ঘড়িতে রাত সাড়ে দশটা। আরো সাতশো বাকি।

যোসনা উঠে পানি খেলো। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। পাড়ার রাস্তায় কেউ নেই। একটা কুকুর হাঁটছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তার ছায়া লম্বা।

ফোন হাতে নিয়ে আবার বসলো।

"শিক্ষকরা আমাদের দেশের সম্পদ।"

ইতিবাচক।

"আমি আর পারছি না।"

নেতিবাচক।

"কাল বৃষ্টি হবে।"

নিরপেক্ষ।

বাক্যগুলো কোথা থেকে আসে যোসনা জানে না। কে লেখে এই বাক্যগুলো? কোন মানুষের মুখের কথা এগুলো? নাকি কেউ বানিয়ে লেখে? যোসনা কখনো এই প্রশ্ন করেনি। করার দরকার নেই। তার কাজ পড়া আর ট্যাপ করা। ইতিবাচক। নেতিবাচক। নিরপেক্ষ। তিনটা বোতাম। পুরো পৃথিবী তিনটা বোতামে ভাগ করা যায়।

রাত বারোটায় যোসনার ফোনে একটা মেসেজ এলো। রুমা।

"জেগে আছিস?"

"হ্যাঁ। কাজ করছি।"

"আমিও।"

রুমা পাশের বাড়িতে থাকে। সেও ডেটা লেবেলিং করে। যোসনাই শিখিয়েছে। তিন মাস আগে যোসনা যখন শুরু করলো, রুমা জিজ্ঞেস করেছিলো কী করে। যোসনা দেখালো। রুমা বললো, "এইটুকু কাজ? এত সোজা?" যোসনা বললো, "সোজা। কিন্তু অনেক।"

রুমা এখন একটা আলাদা প্ল্যাটফর্মে কাজ করে। সেখানে রেট ভালো। প্রতি বাক্যে দুই টাকা বিশ পয়সা।

রুমা মেসেজ দিলো: "তুই কত পাচ্ছিস?"

"এক আশি।"

"আমার এইটায় দুই বিশ। আয় এইখানে।"

"বাক্য কেমন?"

"একই। পজিটিভ নেগেটিভ।"

যোসনা ভাবলো। চল্লিশ পয়সা বেশি। আটশো বাক্যে তিনশো বিশ টাকা বেশি। মাসে প্রায় দশ হাজার টাকা বেশি। দশ হাজার টাকা। রাকিবের প্রাইভেট টিউটরের খরচ।

"লিংক দে।"

রুমা লিংক দিলো। যোসনা নতুন প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খুললো। নাম, ফোন নম্বর, বিকাশ নম্বর। একটা ছোট টেস্ট দিতে হলো। বিশটা বাক্য লেবেল করো। যোসনা দিলো। রেজাল্ট: পাশ।

পরের রাত থেকে যোসনা নতুন প্ল্যাটফর্মে কাজ শুরু করলো।

বাক্যগুলো একই রকম।

"আজ আমার জন্মদিন।"

ইতিবাচক।

"কেউ মনে রাখেনি।"

নেতিবাচক।

"তুমি কি জানো সময় কখন?"

নিরপেক্ষ।

একই বাক্য। একই তিনটা বোতাম। শুধু প্রতিটা বোতামের দাম চল্লিশ পয়সা বেশি। যোসনা পুরনো প্ল্যাটফর্মে যে ব্যাচ শুরু করেছিলো সেটা অসম্পূর্ণ রেখে চলে এলো। ওদিকে কেউ হয়তো খেয়াল করেছে যে লেবেলার ৭৭৪৩ আর কাজ করছে না। হয়তো খেয়াল করেনি। হয়তো ওই ব্যাচটা আরেকজনকে দেওয়া হয়েছে। যোসনা জানে না, জানার দরকারও নেই।

সে যে জিনিসটা তৈরি করতে সাহায্য করছে সেটা তার কথা মনে রাখবে না।

রুমা পরের দিন সকালে চা খেতে এলো। দুজনে উঠোনে বসে চা খাচ্ছে। রুমা বললো, "গতরাতে কয়টা করলি?"

"ছয়শো। শেষ করতে পারিনি। ঘুম চলে এসেছিলো।"

"আমি সাতশো করেছি। কিন্তু চোখ জ্বলছে।"

রুমা চায়ে চুমুক দিলো। "তোর মা কি জানে?"

"না।"

"আমার মাও জানে না। আমি বলেছি ফেসবুকে থাকি।"

দুজনে চুপ করে চা খেলো। বাতাসে শীতের শেষের গন্ধ। ফেব্রুয়ারি শেষ হচ্ছে। গাজীপুরের গাছগুলোতে নতুন পাতা আসছে।

রুমা বললো, "তুই জানিস এই বাক্যগুলো দিয়ে কী হয়?"

যোসনা বললো, "কম্পিউটারকে শেখায়।"

"কী শেখায়?"

"বাংলা বুঝতে।"

রুমা হাসলো। "কম্পিউটার বাংলা বুঝবে? আমার ভাই বাংলা বোঝে না, কম্পিউটার বুঝবে?"

যোসনাও হাসলো। কিন্তু সে জানে কথাটা সত্যি। প্ল্যাটফর্মের ওয়েবসাইটে লেখা আছে: "আপনার কাজ বাংলা ভাষাকে AI-এর জন্য প্রস্তুত করছে।" যোসনা জানে AI কী সেটা পুরোপুরি না। সে জানে এটা এমন কিছু যা নিজে নিজে কাজ করে। রোবটের মতো। কিন্তু রোবট না।

যোসনা জানে তার কাজ গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্ল্যাটফর্ম তাকে টাকা দিচ্ছে। টাকা দিলে কাজ গুরুত্বপূর্ণ। না দিলে না। এটুকুই।

বিকেলে মায়ের পাশে বসে সুতা কাটতে কাটতে যোসনা মেঝেতে পড়ে থাকা একটা সবুজ সুতার টুকরো তুলে নিলো। ছোট্ট। আধা ইঞ্চি। সে এটা পকেটে রাখলো। তার মা যখন কাপড় কাটে, সেলাই করে, তখন নানা রঙের সুতার টুকরো পড়ে থাকে মেঝেতে। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, সাদা, কালো। যোসনা এগুলো জমায়। একটা পুরনো দিয়াশলাইয়ের বাক্সে রাখে। সে এগুলো দিয়ে কিছু একটা বানাচ্ছে। কী বানাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে বলে না। রুমাও জিজ্ঞেস করেছে। মাও। যোসনা শুধু হাসে।

দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা প্রায় ভরে গেছে। রঙিন সুতায় ঠাসা।

রাত হলো। মা শুলো। রাকিব শুলো। যোসনা ফোন খুললো।

নতুন প্ল্যাটফর্ম। নতুন ব্যাচ। আটশো বাক্য।

"আমাদের গ্রামে একটাই হাসপাতাল।"

নিরপেক্ষ।

"ছেলেটা অনেক ভালো।"

ইতিবাচক।

"কেন এমন হয় বারবার।"

নেতিবাচক।

যোসনার চোখ জ্বলছে। গতরাতেও জ্বলেছিলো। তার আগের রাতেও। ফোনের আলো চোখে লাগে। সে একটা পুরনো চশমা পরে কাজ করে, তার বাবার ছিলো, পাওয়ার ঠিক না কিন্তু চোখে কিছু একটা থাকলে ভালো লাগে।

তিনশো বাক্যের পর যোসনা থামলো। চোখ বন্ধ করলো। অন্ধকারে লাল লাল আলো দেখা যায়, ফোনের আফটারইমেজ। সে গুনলো। তিনশো বাক্য, দুই টাকা বিশ পয়সা করে, ছয়শো ছেষট্টি টাকা। আরো পাঁচশো বাক্যে এক হাজার একশো দশ টাকা। মোট এক হাজার সাতশো ছিয়াত্তর টাকা। প্ল্যাটফর্ম কমিশন বাদে চোদ্দশো কিছু।

চোদ্দশো টাকা। একটা রাত। আটশো বাক্য। দুটো চোখ।

যোসনা আবার ফোন খুললো।

"আমি তোমাকে ভালোবাসি।"

ইতিবাচক।

সে ভাবলো, কে বলেছে এই কথা? কোন মানুষ? কাকে বলেছে? সে কি জানে তার কথাটা এখন গাজীপুরের একটা টিনের ঘরে, একটা মেয়ের ফোনে, রাত একটায়, একটা বোতামের অপেক্ষায়? ইতিবাচক। ট্যাপ। পরের বাক্য।

"আর কতদিন এভাবে চলবে।"

যোসনা থামলো। বাক্যটা পড়লো আবার। আর কতদিন এভাবে চলবে। নেতিবাচক? নিরপেক্ষ?

সে নেতিবাচক দিলো।

পরের বাক্য।

পরের বাক্য।

পরের বাক্য।

ভোর তিনটায় আটশো বাক্য শেষ হলো। ফোনে নোটিফিকেশন এলো: "ব্যাচ সম্পন্ন। আয়: ১,৪৪০ টাকা। পেমেন্ট ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে।"

যোসনা ফোন রেখে দিলো। চোখ বন্ধ করলো। পাশের ঘরে মা ঘুমাচ্ছে। রাকিব ঘুমাচ্ছে। পাড়ায় সবাই ঘুমাচ্ছে। পাশের বাড়িতে রুমাও হয়তো এইমাত্র তার ব্যাচ শেষ করেছে।

দুটো মেয়ে। দুটো ফোন। দুটো রাত।

সকালে মা যখন সেলাই মেশিনে বসলো, যোসনা পাশে এসে বসলো। চোখের নিচে কালো দাগ। মা তাকালো কিন্তু কিছু বললো না। যোসনা মেঝে থেকে একটা লাল সুতার টুকরো তুলে পকেটে রাখলো।

মা বললো, "তুই এই সুতা কুড়িয়ে কী করিস?"

যোসনা বললো, "কিছু না।"

মা হাসলো। "পাগলী।"

সেলাই মেশিন চলতে লাগলো। ঠক ঠক ঠক ঠক। যোসনা সুতা কাটতে লাগলো। বাইরে রোদ উঠেছে। গাজীপুরের ফ্যাক্টরির সাইরেন বাজছে। কোথাও একটা রিকশার ঘণ্টা বাজলো।

যোসনার পকেটে দিয়াশলাইয়ের বাক্স। ভেতরে জমানো সুতার টুকরোগুলো নরম, উষ্ণ, রঙিন। সে এগুলো দিয়ে কী বানাবে কেউ জানে না। যোসনাও হয়তো জানে না। হয়তো জানে।

আজ রাতে আরো আটশো বাক্য।