গুলশান আর রংপুরের মাঝে

পর্ব ২১ · ৫ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

তানিয়া সকাল থেকে চেয়ারের চাকাটা নিয়ে যুদ্ধ করছে। একটা চাকা কিচকিচ করে। সে পাত্তা দেয় না। আজকে অন্য যুদ্ধ। গুলশানের একটা কো-ওয়ার্কিং স্পেসে বিকেলে তার প্রদর্শনী। সাতটা বিনিয়োগকারী আসবে। ছয়জন ঢাকার, একজন সিঙ্গাপুরের।

সে পঞ্চম কাপ কফি শেষ করে কিবোর্ডে হাত রাখে।

---

রফিক সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বের হলো। চার কিলোমিটার হাঁটতে হবে। উপজেলা ডিজিটাল সেন্টার। একটা সরকারি ফর্ম জমা দিতে হবে। কৃষি ভর্তুকির জন্য। তার বাবা আজিজ বলেছে, "ফর্মটা ছাড়া টাকা আসবে না। যা।"

রফিকের বয়স উনিশ। পায়ে হাওয়াই চটি। রাস্তার ধুলো পায়ের আঙুলের ফাঁকে ঢুকে যায়।

---

তানিয়ার দলে তিনজন। তানিয়া, সাকিব আর নিলা। সাকিবের কাজ ব্যাকএন্ড। নিলার কাজ ডিজাইন। তানিয়ার কাজ সব।

সে মডেলটা শেষবারের মতো চালালো। রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা দিলো ইনপুটে।

"আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়।"

মডেল ইংরেজিতে অনুবাদ করলো। তারপর ফরাসিতে। তারপর জাপানিতে। প্রতিটা অনুবাদের সাথে ছন্দের বিশ্লেষণ দিলো। কোন শব্দ হারালো, কোন অর্থ বদলালো, সব দেখালো।

তানিয়া সন্তুষ্ট নয়। তানিয়া কখনো সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু এটা চলবে।

---

রফিক হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, ভর্তুকির টাকা কবে আসবে। গত বছরও আবেদন করেছিল তার বাবা। টাকা আসেনি। এবার নতুন নিয়ম, সব অনলাইনে। কাগজে আর নেবে না।

রাস্তার পাশে একটা পুকুর। পুকুরে কচুরিপানা। সবুজ এত ঘন যে পানি দেখা যায় না। রফিক থামে না।

---

গুলশানের ঘরটা সাজানো হয়েছে। সাদা দেয়াল, সাদা টেবিল। ক্যাটারিংয়ের লোকেরা ছোট ছোট স্যান্ডউইচ সাজাচ্ছে। প্রতিটা স্যান্ডউইচে একটা করে জলপাই গাঁথা আছে কাঠির মাথায়।

তানিয়া ছয় নম্বর কফি খাচ্ছে।

নিলা বললো, "তুই মরে যাবি।"

"আগে প্রদর্শনীটা হোক।"

---

ডিজিটাল সেন্টার একটা টিনের ঘর। বাইরে একটা সাইনবোর্ড, নীল অক্ষরে লেখা "ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার।" অক্ষরগুলো কিছুটা মুছে গেছে।

রফিক ভেতরে ঢুকলো।

একটা টেবিল। টেবিলের ওপর একটা কম্পিউটার। কম্পিউটারের পর্দা কালো।

"ভাই, কম্পিউটার চলে না?" রফিক জিজ্ঞেস করলো।

সেন্টারের লোকটা চেয়ারে বসে মোবাইলে কিছু দেখছিল। মুখ না তুলে বললো, "তিন সপ্তা ধরে বন্ধ। মাদারবোর্ড গেছে।"

"কবে ঠিক হবে?"

"জানি না। ঢাকায় লিখেছি। উত্তর আসেনি।"

রফিক দাঁড়িয়ে রইলো।

"আর কোনো উপায়?"

"পৌরসভায় যাও। ওখানে একটা সেন্টার আছে।"

পৌরসভা আরো ছয় কিলোমিটার।

---

বিনিয়োগকারীরা আসতে শুরু করলো। তিনটায়। ঠিক সময়ে। এটা তানিয়াকে অবাক করলো। ঢাকায় কেউ ঠিক সময়ে আসে না।

প্রথমে আসলো একজন লম্বা মানুষ, ধূসর স্যুট। তারপর দুইজন একসাথে। তারপর বাকিরা।

সিঙ্গাপুরের লোকটা ভিডিও কলে যুক্ত হলো। তার পেছনে একটা জানালা। জানালার বাইরে আকাশ পরিষ্কার।

তানিয়া শুরু করলো।

---

রফিক ফিরে এলো সেন্টার থেকে। সে বাবাকে কী বলবে ভাবতে লাগলো। ফর্ম জমা হয়নি। কম্পিউটার নষ্ট। আরেকটা সেন্টার আরো দূরে।

সে হাঁটতে লাগলো।

রাস্তায় একটা দোকান। দোকানে একজন বৃদ্ধ লোক বসে আছে। সামনে কয়েকটা কাঁচের বয়ামে মুড়ি, চানাচুর। রফিক থামলো। পকেটে দশ টাকা আছে। সে কিছু কিনলো না। আবার হাঁটতে লাগলো।

---

তানিয়া পর্দায় মডেলটা চালাচ্ছে।

জীবনানন্দ দাশের "বনলতা সেন।" প্রথম লাইন ঢুকিয়ে দিলো।

"হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে..."

মডেল অনুবাদ করলো। শুধু অনুবাদ না, ব্যাখ্যাও দিলো। কেন "হাঁটিতেছি" শব্দটা "হাঁটছি" থেকে আলাদা। ক্রিয়ার ভেতরে সময়ের ওজন কীভাবে বদলায়। চলমানতার একটা ক্লান্তি আছে "হাঁটিতেছি"তে যা "হাঁটছি"তে নেই।

ঘরে নীরবতা।

তারপর তালি।

ধূসর স্যুটের লোকটা বললো, "চমৎকার।"

সিঙ্গাপুরের পর্দায় ছোট মাথাটা ঝুঁকে কিছু লিখলো।

---

রফিকের বাবা আজিজ উঠোনে বসে ধান শুকাচ্ছিল। রফিককে দেখে বুঝে গেলো।

"হয়নি?"

"কম্পিউটার নষ্ট।"

আজিজ কিছু বললো না। সে ধান উলটাতে লাগলো। কাঠের একটা হাতলওয়ালা জিনিস দিয়ে, যেটার নাম রফিক ভুলে গেছে।

"পৌরসভায় গেলে হতো," রফিক বললো।

"আরো ছয় কিলোমিটার?"

"হ্যাঁ।"

"কাল যাবি?"

রফিক ভাবলো। কাল বাজারের দিন। বাজারে যেতে হবে বাবার সাথে। পরশু? পরশু অন্য কাজ।

"দেখি," সে বললো।

আজিজ আবার কিছু বললো না। সূর্য হেলে পড়ছে। ধানের ওপর আলো হলুদ।

---

তানিয়ার প্রদর্শনী শেষ হলো পাঁচটায়। বিনিয়োগকারীরা স্যান্ডউইচ খেলো। কফি খেলো। কথা বললো। সিঙ্গাপুরের লোকটা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো।

একটা মোবাইল বেজে উঠলো। লালনের গান। "খাঁচার ভিতর অচিন পাখি।"

কেউ ফোনটা তুললো না।

আবার বাজলো।

তানিয়া চারপাশে তাকালো। সবাই তাকালো। কেউ নিজের পকেটে হাত দিলো না। কেউ বললো না "আমার।"

তৃতীয়বার বাজলো। তারপর থামলো।

সাকিব ফিসফিস করে বললো, "ভূতের ফোন।"

তানিয়া হাসলো না।

বিনিয়োগকারীরা চলে গেলো। ধূসর স্যুটের লোকটা বলে গেলো, "আমরা কথা বলবো।" এর মানে কী সেটা তানিয়া জানে। হয় ফোন আসবে, নয় আসবে না।

সে সাত নম্বর কফি ঢাললো।

নিলা বললো, "তুই সত্যিই মরে যাবি।"

তানিয়া কফিতে চুমুক দিলো। জানালা দিয়ে গুলশানের রাস্তা দেখা যায়। গাড়ির সারি। লাইটের ঝলকানি। সবকিছু ঝকঝক করছে।

---

রফিক সন্ধ্যায় আবার বের হলো। এবার কোনো কাজ নেই। এমনি। বাড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগে না।

সে গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলো। একই রাস্তা। সকালেও এই রাস্তায় হেঁটেছে। এখন অন্ধকার নামছে। গাছগুলোর চেহারা বদলে গেছে। সকালে যে গাছ সবুজ ছিল, সন্ধ্যায় সে কালো।

দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে।

রফিক ভাবলো, ফর্মটা কবে জমা দিতে পারবে। পরের সপ্তাহে? তার পরের সপ্তাহে? কম্পিউটার ঠিক হবে তো? পৌরসভায় গেলে কি তাকে আবার ফেরাবে? সেখানেও কি কম্পিউটার নষ্ট?

সে জানে না।

রাস্তার ওপর একটা বাতি জ্বলছে। টিমটিম করে। রফিকের ছায়া তার পেছনে পড়েছে। সে যত এগিয়ে যায়, ছায়াটা তত লম্বা হয়। একটু পরে ছায়াটা এত লম্বা হলো যে রাস্তার শেষ দেখা যায় না।

রফিক হাঁটতে থাকলো।