রহিমার সহকর্মী চলে গেলো

পর্ব ২২ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

চিঠিগুলো সকাল দশটায় এলো। বাদামি খাম। দুইশোটা। রহিমার টেবিলে একটা বাক্সে রাখা। বাক্সটা কলার কার্টনের, একপাশে "ডেল মন্টে" লেখা।

রহিমা বাক্সটার দিকে তাকিয়ে রইলো।

ম্যানেজার সায়েম সাহেব বলেছেন, আজকের মধ্যে বিলি করতে হবে। কে কে যাচ্ছে তার তালিকা আছে। খামের ওপর নাম লেখা। রহিমার কাজ শুধু খামগুলো হাতে হাতে দেওয়া।

সে বাক্স থেকে প্রথম খামটা তুললো। নাম পড়লো। চিনে না। চতুর্থ তলার কেউ। সে খামটা আলাদা করে রাখলো।

দ্বিতীয় খাম। পঞ্চম তলা। চেনে না।

তৃতীয় খাম। চেনে না।

সে খামগুলো নাম ধরে ধরে আলাদা করতে লাগলো। তার তলার, অন্য তলার। একটা একটা করে।

সালেহা বেগম।

রহিমার হাত থামলো।

সে খামটা আবার পড়লো। সালেহা বেগম, তৃতীয় তলা, লাইন সাত।

লাইন সাত রহিমার লাইন। সালেহা রহিমার পাশের মেশিনে বসে। চৌদ্দ বছর ধরে।

রহিমা খামটা বাক্সে ফেরত রাখলো। তারপর আবার তুললো। নাম বদলায়নি।

---

সায়েম সাহেব গতকাল মিটিংয়ে বলেছিলেন, নতুন সিস্টেম হিসাব করেছে কোন লাইনগুলো একসাথে করা যায়। কোন কাজ কম মানুষে হবে। কোন মানুষ কম দরকার।

রহিমা জিজ্ঞেস করেছিল, "কীভাবে বাছলো?"

সায়েম সাহেব বললেন, "সিস্টেম বাছে। আমরা বাছি না।"

কথাটা শুনে রহিমার কেমন লেগেছিল সেটা সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারেনি। সিস্টেম বাছে। মানুষ বাছে না। তাহলে যে বাছা হলো, তার দায় কার?

সে জিজ্ঞেস করেনি।

---

রহিমা প্রথমে অন্য তলার খামগুলো দিয়ে এলো। চতুর্থ তলায় গিয়ে সুপারভাইজার শামীমার হাতে দিয়ে এলো বিশটা। পঞ্চম তলায় আরো বিশটা। ষষ্ঠ তলায় ত্রিশটা।

কেউ কেউ খাম খুলে পড়লো। কেউ কেউ খুললো না, ব্যাগে রাখলো। একজন মেয়ে, নাম জানে না রহিমা, খামটা পড়ে টেবিলে রেখে দিলো। তারপর আবার কাজে ফিরে গেলো। যেন কিছু হয়নি।

রহিমা নিজের তলায় ফিরে এলো। বাক্সে আর বিশটা খাম বাকি। এই বিশজন তার তলার।

সে একটা একটা করে দিতে লাগলো।

"জরিনা।"

জরিনা খামটা নিলো। কিছু বললো না। চোখ লাল হলো। চলে গেলো।

"নাজমা।"

নাজমা বললো, "কতদিনের মধ্যে?"

"মাস শেষে।"

নাজমা মাথা নাড়লো।

"পারভীন।"

পারভীন খামটা নিয়ে বললো, "ঠিক আছে।" তারপর ওয়াশরুমে চলে গেলো। ফিরলো দশ মিনিট পরে। চোখ ধোয়া।

রহিমা গুনে গুনে দিচ্ছে। সতেরো, আঠারো, উনিশ। একটা বাকি।

সালেহা।

---

সালেহার সাথে রহিমার প্রথম দেখা ২০১৩ সালে। রহিমা তখন নতুন এসেছে কারখানায়। সালেহা পুরোনো। সালেহা দেখিয়ে দিয়েছিল মেশিন কীভাবে চালাতে হয়। সুতো কোথায় ঢোকাতে হয়। প্যাডেলে কতটুকু চাপ দিতে হয়।

সালেহা বলেছিল, "তোমার হাত কাঁপছে। ভয় পাইও না। মেশিন তোমাকে কামড়াবে না।"

তারপর চৌদ্দটা বছর পাশাপাশি বসে কাজ করেছে। প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা। কখনো কখনো রাত আটটা। একসাথে চা খেয়েছে। একসাথে ঝগড়া করেছে লাইন ম্যানেজারের সাথে। একসাথে বেতন বাড়ানোর দাবি করেছে।

সালেহা প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে পিঠা আনতো। ঘরে বানানো, চিতই পিঠা, খেজুরের গুড় দিয়ে। একটা টিফিন ক্যারিয়ারে করে। সবাইকে দিতো। রহিমার জন্য আলাদা করে রাখতো দুটো বেশি, কারণ রহিমা চিতই পিঠা খুব পছন্দ করে।

এবার পহেলা বৈশাখে পিঠা আসবে না।

---

রহিমা সালেহার কাছে গেলো।

সালেহা মেশিনে কাজ করছে। মাথা নিচু। সুতো চলছে। মেশিনের আওয়াজে কথা শোনা যায় না ভালো করে। রহিমা পাশে দাঁড়ালো।

সালেহা মুখ তুললো।

রহিমা খামটা বাড়িয়ে দিলো।

সালেহা খামটার দিকে তাকালো। রহিমার মুখের দিকে তাকালো। আবার খামের দিকে।

সে মেশিন বন্ধ করলো। খামটা নিলো। খুললো। ভেতরের কাগজটা পড়লো। ভাঁজ করলো। আবার খামের ভেতরে রাখলো। খামটা ব্যাগে রাখলো।

কাঁদলো না।

"চা খাওয়াও তো শেষবারের মতো," সালেহা বললো।

---

কারখানার নিচতলায় একটা চায়ের দোকান। দোকান বলতে একটা কাঠের তাক, তার ওপর একটা কেটলি, কয়েকটা কাচের গ্লাস। দোকানদার বুড়ো মতিন। মতিন সবাইকে "মা" বলে ডাকে।

"দুই চা দাও, মতিন চাচা," রহিমা বললো।

মতিন চা ঢাললো। ফেনা উঠলো। দুধ মেশালো।

রহিমা আর সালেহা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চা খেতে লাগলো। কেউ কথা বলছে না।

চায়ের ধোঁয়া উঠছে।

সালেহা বললো, "তুই আমাকে চিঠি দিতে এসেছিলি, তোর কী অবস্থা হয়েছিল বল তো?"

রহিমা কিছু বললো না।

"আমি জানি," সালেহা বললো। "তোকে দিয়ে এই কাজ করানোটাও একটা জিনিস।"

রহিমা চায়ে চুমুক দিলো।

সালেহা বললো, "আমার জন্য কষ্ট পাস না। চৌদ্দ বছর চাকরি করেছি। খারাপ না।"

"তারপর?"

"তারপর দেখা যাবে। আমার মেয়ে তো বড় হয়ে গেছে। ওর একটা চাকরি হলে চলে যাবে।"

"আর তুই?"

সালেহা হাসলো। হাসিটা অদ্ভুত। মুখে হাসি, চোখে কিছু নেই।

"আমি তো আছিই।"

চা শেষ হলো। সালেহা গ্লাসটা মতিনের তাকে রাখলো। রহিমার দিকে তাকালো।

"যাই।"

"এখন?"

"মাসের শেষে যেতে বললেও আজকে যাবো। বসে থেকে কী করবো? মেশিনে কাজ করবো আর ভাববো, এই শেষ দিন, ওই শেষ দিন? না।"

রহিমা কিছু বলতে পারলো না।

সালেহা ব্যাগটা কাঁধে তুললো। একটা কালো ব্যাগ, কাঁধের সেলাই ছেঁড়া। সালেহা সেলাই করে করে ব্যাগটা তিন বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে।

"খোদা হাফেজ," সালেহা বললো।

"খোদা হাফেজ।"

সালেহা গেটের দিকে হাঁটতে লাগলো। রহিমা দাঁড়িয়ে দেখলো। সালেহা গেট পার হলো। রাস্তায় বের হলো। রিকশায় উঠলো। রিকশা চলে গেলো।

রহিমা চায়ের গ্লাসটা তাকে রাখলো।

---

তৃতীয় তলায় ফিরে রহিমা বসলো তার চেয়ারে। সামনে পর্দা জ্বলছে। সিস্টেমের পর্দা। সংখ্যা দেখাচ্ছে। আজকের উৎপাদন, গতকালের উৎপাদন, এই সপ্তাহের গড়।

সংখ্যা ভালো। আগের চেয়ে ভালো। কম মানুষে বেশি কাজ। এটাই তো চাওয়া হয়েছিল। সিস্টেম বলেছে কোন লাইনগুলো জোড়া লাগানো যায়। সিস্টেম বলেছে কোন মানুষগুলো দরকার নেই। সিস্টেম ঠিকই বলেছে। সংখ্যা তো ভালো।

রহিমা পর্দা থেকে চোখ সরালো।

সে চেয়ারগুলোর দিকে তাকালো। সালেহার চেয়ারটা খালি। পাশের চেয়ারটাও খালি। জরিনার। তার পাশেরটা, নাজমার, সেটাও মাস শেষে খালি হবে।

রহিমা গুনলো।

খালি চেয়ার এখন পাঁচটা। মাস শেষে বারোটা হবে। তার তলায় বারোটা মানুষ কমবে। বারোটা মেশিন বন্ধ হবে। বা বন্ধ হবে না, অন্য লাইনে সরিয়ে নেবে, কম মানুষ দিয়ে চালাবে।

সে আবার পর্দায় তাকালো।

সংখ্যাগুলো সত্যিই ভালো আজকে। গত সপ্তাহের চেয়ে বারো শতাংশ বেশি উৎপাদন। প্রতিটা লাইনে সময় কমেছে। অপচয় কমেছে।

কিন্তু বারোটা চেয়ার খালি হচ্ছে।

রহিমা সংখ্যা গুনতে ভালোবাসে। ছোটবেলা থেকে। সে সবকিছু গোনে। সিঁড়ির ধাপ, জানালার শিক, ছাদের টিন। মিতু বলে, "মা তুমি অদ্ভুত।" রাজু বলে, "মা পাগল।" আলম কিছু বলে না, আলম নিজেও গোনে, রিকশার চাকার ঘূর্ণন গোনে।

আজকে রহিমা বারোটা চেয়ার গুনলো।

সন্ধ্যায় কারখানা বন্ধ হলো। রহিমা উঠলো। ব্যাগ তুললো। সিঁড়ি দিয়ে নামলো। সে সিঁড়ির ধাপ গুনলো না আজকে।

গেটে এসে দাঁড়ালো।

বাইরে রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আলমের রিকশা না, অন্য কারো। আলম আজকে অন্যদিকে গেছে।

রহিমা হাঁটতে শুরু করলো।

তার মাথায় একটা সংখ্যা ঘুরছে। বারো। বারোটা চেয়ার। বারোটা মানুষ। বারোটা পরিবার।

সালেহার চিতই পিঠার কথা মনে পড়লো।

রহিমা থামলো না। সে হাঁটতে লাগলো। সামনে রাস্তা। রাস্তায় মানুষ। কেউ ফিরছে ঘরে, কেউ যাচ্ছে কোথাও। সবাই হাঁটছে।

কারখানার তৃতীয় তলায়, বন্ধ ঘরে, আলো নিভে গেছে। বারোটা খালি চেয়ার অন্ধকারে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে।