তানিয়ার বিবেকের দাম
--- title: "তানিয়ার বিবেকের দাম" subtitle: "টাকা নিলে টাকার কথা শুনতে হয়" series: "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ" chapter: 3 chapter_title: "ফাটল" part: 24 date: "2026-03-18" ---
ইমেইলটা এলো বৃহস্পতিবার সকালে।
তানিয়া অফিসে বসে কফি খাচ্ছিলো। পঞ্চম কাপ। সকাল এগারোটায় পঞ্চম কাপ মানে রাতে ঘুম হয়নি। রাতে ঘুম হয়নি কারণ সে মডেলের অ্যাকিউরেসি নিয়ে কাজ করছিলো। নব্বই দশমিক তিন থেকে একানব্বই দশমিক সাত। দেড় শতাংশ। দেড় শতাংশের জন্য চার ঘণ্টা জেগে। তারপর ঘুমিয়ে পড়লো চেয়ারে, ভোর চারটায়। সকাল আটটায় উঠে মুখ ধুয়ে আবার স্ক্রিনের সামনে বসলো।
ইমেইলটা পাঠিয়েছে মার্কাস। মার্কাস রায়ান। সিঙ্গাপুরের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের পার্টনার। ছয় মাস আগে তানিয়ার কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে। পাঁচ কোটি টাকা। সিড রাউন্ড। তানিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় অঙ্ক। সেদিন তানিয়া আর শিহাব মিলে বিরিয়ানি খেয়েছিলো, আনন্দে। শিহাব বলেছিলো, "এবার তো হয়ে গেলো।" তানিয়া বলেছিলো, "শুরু হলো।"
ইমেইলের সাবজেক্ট: "Q2 Review + Strategic Discussion."
তানিয়া খুললো।
মার্কাস লিখেছে: ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন দেখলাম। প্রবৃদ্ধি ভালো। আয় বাড়ছে। কিন্তু কথা হলো, বাংলা বাজার ছোট। ত্রিশ কোটি ভাষাভাষী, কিন্তু টাকা দেওয়ার মতো ক্রেতা কত? তোমাদের কি হিন্দি আর উর্দুতে বাড়ার পরিকল্পনা আছে? হিন্দি মানে পঞ্চাশ কোটি, উর্দু মানে আরো বিশ কোটি। দক্ষিণ এশিয়ার ভাষা-প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দাঁড় করালে মূল্যায়ন অনেক ভালো হবে সিরিজ এ-তে।
তানিয়া ইমেইলটা পড়লো। আবার পড়লো।
বাংলা বাজার ছোট।
সে চেয়ারে হেলান দিলো। জানালা দিয়ে বনানীর রাস্তা দেখা যায়। গাড়ি যাচ্ছে। একটা রিকশায় দুজন বসে আছে, একজনের কোলে একটা বাচ্চা। তানিয়া দেখলো কিন্তু ভাবলো না। সে ভাবছে মার্কাসের কথা।
জানালার পাশে একটা গাছ আছে। ছোট, টবে লাগানো। মানি প্ল্যান্ট। দুই মাস আগে মরে গেছে। পাতাগুলো শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে, কিছু কিছু ঝরে পড়েছে টবের মাটিতে। মাটি ফাটা। কেউ পানি দেয়নি। তাসনিম একবার বলেছিলো, "গাছটা ফেলে দিই?" শিহাব বলেছিলো, "পরে।" তানিয়া কিছু বলেনি। গাছটা এখনো সেখানে আছে। জানালার পাশে, রোদে, শুকনো, মৃত। কেউ ফেলে না, কেউ পানি দেয় না। গাছটা বসে আছে যেন কিছু একটা জিজ্ঞেস করছে, কিন্তু কী জিজ্ঞেস করছে কেউ জানে না।
শিহাব এলো এগারোটায়। হেডফোন কানে, কোল্ড ব্রু হাতে। বসলো, ল্যাপটপ খুললো, তারপর তানিয়ার দিকে তাকালো। তানিয়ার মুখ দেখে বুঝলো কিছু হয়েছে।
"কী?"
তানিয়া ল্যাপটপ ঘুরিয়ে ইমেইলটা দেখালো।
শিহাব পড়লো। একবার। তারপর চেয়ারে বসে কফিতে চুমুক দিলো।
"আশ্চর্য কিছু না," শিহাব বললো। "ওরা তো এটাই বলবে। বড় বাজার, বেশি মূল্যায়ন। ওদের হিসেব এরকমই।"
"আমি বাংলার জন্যই বানিয়েছি এটা।"
"জানি।"
"হিন্দিতে গেলে মনোযোগ সরে যাবে। আমাদের পুরো প্রশিক্ষণ-উপাত্ত বাংলায়। মডেল বাংলায় তৈরি। হিন্দিতে যেতে হলে আবার শূন্য থেকে শুরু।"
শিহাব বললো, "টাকা নিলে টাকার কথা শুনতে হয়।"
তানিয়া চুপ করে রইলো।
শিহাব ঠিক বলেছে। পাঁচ কোটি টাকা। সেই টাকায় অফিস চলছে, বেতন হচ্ছে, সার্ভার চলছে, তাসনিমের ইন্টার্নশিপ চলছে। টাকা একটা চুক্তি। চুক্তিতে লেখা আছে: বিনিয়োগকারী চাইবে লাভ। লাভ মানে বড় বাজার। বড় বাজার মানে বাংলার বাইরে। এটা তানিয়া জানতো। কিন্তু জানা আর মুখোমুখি হওয়া এক না।
দুপুরে তানিয়া আরেকটা কাজ করলো। ডেটা লেবেলারদের রেট বাড়ালো।
গত ছয় মাস ধরে ওদের রেট ছিলো এক টাকা আশি পয়সা প্রতি বাক্য। তানিয়া জানে এটা কম। সে জানে গাজীপুরে মেয়েরা রাত জেগে এই কাজ করে। সে জানে রুমা আর যোসনা আর তাদের মতো আরো দুশো জন রাত দশটা থেকে ভোর তিনটা পর্যন্ত বাক্য লেবেল করে, চোখ জ্বালায়, ঘুম নষ্ট করে, যাতে তানিয়ার মডেল বাংলা বুঝতে পারে। তানিয়ার মডেলের পেছনে এই দুশো জন মানুষের দুশো জোড়া চোখ।
সে রেট বাড়ালো দুই টাকা পঞ্চাশ পয়সায়।
মাসে চৌত্রিশ লাখ বেশি। তানিয়ার পেটের ভেতর কিছু একটা শক্ত হয়ে গেলো। কোম্পানির অ্যাকাউন্টে এখনো আছে। কিন্তু টিকে থাকার সময় কমবে। আঠারো মাস থেকে চোদ্দো মাস হয়ে যাবে।
সে রেট আপডেট করলো প্ল্যাটফর্মে। একটা নোটিফিকেশন গেলো সব লেবেলারদের কাছে: "আপনার নতুন রেট: ২.৫০ টাকা/বাক্য। কার্যকর আগামীকাল থেকে।"
শিহাব দেখলো। কিছু বললো না। শিহাব জানে তানিয়া এটা করবে। তানিয়া আগেও বলেছিলো, "ওদের রেট বাড়াতে হবে।" শিহাব বলেছিলো, "বিনিয়োগকারীকে কী বলবে?" তানিয়া বলেছিলো, "বলবো সত্য।"
সত্য। সত্য হলো মানুষকে ন্যায্য দাম দিতে হয়। সত্য হলো এক আশি দিয়ে রাত জাগানো ঠিক না। সত্য হলো এরা ভিন্ন কোনো গ্রহের প্রাণী না, এরা তানিয়ার দেশের মেয়ে, তানিয়ার ভাষায় কথা বলে, তানিয়ার মডেলকে সেই ভাষা শেখাচ্ছে।
কিন্তু সত্য একটা স্প্রেডশিটে ফেরত আসে ভিন্নভাবে।
পরের সপ্তাহে মার্কাসের বিশ্লেষক ইমেইল করলো। মিশেল। মিশেল ট্যান। ইমেইলে একটা হিসেবের ছক সংযুক্ত। সাবজেক্ট: "COGS Analysis - Q2."
মিশেল লিখেছে: "তোমাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ডেটা লেবেলিং খরচ আগের তিনমাসের চেয়ে বেশি। কেন?"
তানিয়া স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলো। কেন। ইংরেজিতে একটা শব্দ: why. তাকে ব্যাখ্যা করতে হবে কেন সে মানুষকে আরেকটু বেশি টাকা দিচ্ছে। একটা স্প্রেডশিটের কাছে।
সে উত্তর লিখতে বসলো। লিখলো: "আমরা উপাত্তের মান উন্নত করতে লেবেলারদের হার বাড়িয়েছি। ভালো হার মানে ভালো লেবেলার ধরে রাখা যায়, ছেড়ে যাওয়া কমে, মান বাড়ে।"
সে এটা লিখলো কারণ এটা সত্য। কিন্তু পুরো সত্য না। পুরো সত্য হলো: সে রেট বাড়িয়েছে কারণ আগের রেটটা অন্যায় ছিলো। কিন্তু "অন্যায়" শব্দটা একটা বিনিয়োগকারীকে লেখা ইমেইলে দেওয়া যায় না।
তানিয়া ইমেইল পাঠালো। তারপর চেয়ারে হেলান দিলো। ছাদের দিকে তাকালো। অফিসের সিলিং সাদা। একটা দাগ আছে, পানি চুইয়ে পড়ার। কবে থেকে আছে জানে না।
সন্ধ্যায় শিহাব চলে গেলো। তাসনিম চলে গেলো। অফিসে তানিয়া একা।
সে ল্যাপটপে পুরনো ফাইল খুঁজলো। দুই বছর আগের। পিচ ডেক। প্রথম পিচ ডেক, যেটা দিয়ে সে ফান্ডিং খুঁজতে শুরু করেছিলো। ফাইলের নাম: "NovaBangla_Pitch_v1.pptx।"
খুললো।
স্লাইড এক। বড় করে লেখা: "ত্রিশ কোটি বাংলাভাষীর জন্য।"
নিচে ছোট করে: "বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস ইঞ্জিন।"
তানিয়া স্লাইডটা দেখলো। দুই বছর আগে সে এই স্লাইড বানিয়েছিলো রাত তিনটায়। তখন অফিস ছিলো না, বনানীর ফ্ল্যাটের বসার ঘরে বসে বানিয়েছিলো। শিহাব পাশে বসে কোড লিখছিলো। চায়ের কাপ তিনটা জমে গেছিলো টেবিলে। তানিয়া স্লাইডটা বানিয়ে শিহাবকে দেখিয়েছিলো। শিহাব বলেছিলো, "ভালো। কিন্তু 'ত্রিশ কোটি' দিয়ে শুরু কর, সংখ্যাটা ধাক্কা দেয়।" তানিয়া তাই করেছিলো।
ত্রিশ কোটি। সংখ্যাটা তখন ছিলো গর্বের। এখন সেটা একটা হিসেবের ঘরে "ছোট।"
তানিয়া স্লাইড বন্ধ করলো।
স্প্রেডশিট খুললো। এই মাসের খরচের হিসেব। ডেটা লেবেলিং: চৌত্রিশ লাখ বেশি। সার্ভার: একই। বেতন: একই। অফিস ভাড়া: একই। শুধু ডেটা লেবেলিং বেড়েছে।
সে সংখ্যাগুলো দেখলো। তারপর একটা নতুন কলাম বানালো। কলামের নাম দিলো: "সংশোধিত লেবেলিং খরচ।" সে হিসেব করলো। যদি রেট দুই টাকা ত্রিশ পয়সা রাখে, দুই পঞ্চাশর বদলে? তাহলে বাড়তি খরচ চৌত্রিশ লাখ না, চব্বিশ লাখ। সেটা দেখতে ভালো। বিনিয়োগকারীর চোখে কম খারাপ।
কিন্তু দুই তিরিশ মানে বিশ পয়সা কম। প্রতি বাক্যে বিশ পয়সা। আটশো বাক্যে একশো ষাট টাকা। মাসে পাঁচ হাজার টাকা কম। যোসনার জন্য, রুমার জন্য, গাজীপুরের সেই মেয়েদের জন্য যাদের চোখ জ্বলে রাত জেগে।
তানিয়া কিবোর্ডে হাত রাখলো। সে কী করবে? দুই পঞ্চাশ রাখবে নাকি দুই তিরিশ করবে? পার্থক্যটা ছোট। কিন্তু ছোট পার্থক্যই তো সবকিছু।
সে ভাবলো মার্কাসের কথা। মার্কাস ভালো মানুষ না খারাপ মানুষ সেটা প্রশ্ন না। মার্কাস একজন বিনিয়োগকারী। তার কাজ টাকা দিয়ে বেশি টাকা ফেরত আনা। সে যখন বলে "বাংলা বাজার ছোট," সে মিথ্যা বলে না। সে তার হিসেবে সত্য বলে। কিন্তু তানিয়ার হিসেবে ত্রিশ কোটি মানুষ ছোট না।
দুটো সত্য। একটা হিসেবের ঘরে ধরে, আরেকটা ধরে না।
তানিয়া স্প্রেডশিটে দুই পঞ্চাশ রাখলো। বদলালো না।
তারপর মার্কাসকে রিপ্লাই লিখতে বসলো। হিন্দি আর উর্দু নিয়ে।
সে লিখলো: "মার্কাস, ধন্যবাদ। হিন্দি আর উর্দু নিয়ে আমরা ভাবছি। তবে এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য বাংলা মডেলের নির্ভুলতা শতভাগ করা।"
এটা অর্ধেক সত্য। পুরো সত্য হলো: তানিয়া হিন্দিতে যেতে চায় না। কিন্তু "চাই না" লেখা যায় না।
সে ইমেইল পাঠালো। ল্যাপটপ বন্ধ করলো। উঠে দাঁড়ালো।
অফিসে সব লাইট জ্বলছে। কেউ নেই। শিহাবের ডেস্কে কোল্ড ব্রুর খালি বোতল। তাসনিমের ডেস্কে একটা খোলা খাতা, কিছু লেখা। হোয়াইটবোর্ডে আগামী সপ্তাহের ডেমোর তারিখ। জানালার পাশে মরা গাছটা।
তানিয়া ব্যাগ তুলে নিলো। লাইট বন্ধ করলো। দরজা লক করলো।
লিফটে দাঁড়িয়ে সে ফোন বের করলো। পিচ ডেকের ফাইলটা আবার খুললো। স্লাইড এক। "ত্রিশ কোটি বাংলাভাষীর জন্য।" সে তাকিয়ে রইলো। লিফট নিচে নামলো। দরজা খুললো। তানিয়া বের হলো।
বাইরে বনানীর রাস্তা। সন্ধ্যার ট্র্যাফিক। হর্ন বাজছে। একটা চা-ওয়ালা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চা ঢালছে, ধোঁয়া উঠছে কেটলি থেকে। তানিয়া রিকশায় উঠলো।
বাসায় ফিরে সে আবার ল্যাপটপ খুললো। স্প্রেডশিটটা আবার খুললো। সংখ্যাগুলো দেখলো। সংখ্যার কোনো বিবেক নেই। সংখ্যা শুধু বলে: তুমি এত খরচ করছো, তোমার এত আছে, তুমি এতদিন টিকবে।
তানিয়া "সংশোধিত লেবেলিং খরচ" কলামটা মুছে দিলো। দুই তিরিশ-এর হিসেব উড়িয়ে দিলো। দুই পঞ্চাশ রইলো।
তারপর স্প্রেডশিট খোলা রাখলো। কিবোর্ডে হাত রাখলো। একটা একটা করে সংখ্যা ঠিক করতে লাগলো। অন্যান্য খরচ থেকে কোথায় কমানো যায় সেটা খুঁজতে লাগলো। সার্ভারের খরচ কমানো যায় কিনা। অফিস ছোট করা যায় কিনা। তার নিজের বেতন কমানো যায় কিনা।
ষষ্ঠ কাপ কফি।
রাত এগারোটায় সে স্প্রেডশিট সেভ করলো। মার্কাসকে পাঠানোর জন্য তৈরি। সংখ্যাগুলো ঠিক আছে। লেবেলিং খরচ বেড়েছে, কিন্তু অন্যান্য জায়গায় কমিয়ে মোট খরচের গতি আগের কাছাকাছি রাখা গেছে। টিকে থাকার সময় পনেরো মাস। আগে আঠারো ছিলো। কমেছে, কিন্তু এখনো টিকবে।
তানিয়া ল্যাপটপ বন্ধ করলো। টেবিলে ছয়টা কফির কাপ। সে কাপগুলো তুলে সিংকে রাখলো। ধোয়ার শক্তি নেই। কাল ধোবে।
অফিসে, অন্ধকারে, জানালার পাশে মরা গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলো পড়েছে শুকনো পাতায়। কেউ নেই। গাছটা শুধু আছে।