সেলিনাকে কে দেখছে

পর্ব ২৫ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

সুপারভাইজর নাজমুল সাহেবের ঘরটা ছোট। একটা টেবিল, দুইটা চেয়ার, দেয়ালে প্রধানমন্ত্রীর ছবি আর একটা ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারটা এখনো গত মাসে আটকে আছে, কেউ উলটায়নি। এসি নেই, সিলিং ফ্যান ঘুরছে, কিন্তু গরম বাতাসই ঘুরছে।

সেলিনা চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে। নাজমুল সাহেব বলেছিলেন, "একটু আসেন, কথা আছে।" গলার স্বরে কোনো উষ্ণতা ছিল না। সেলিনা চেনে এই স্বর। যে মানুষ ভালো কিছু বলতে যাচ্ছে, তার গলায় একটু আলো থাকে। নাজমুল সাহেবের গলায় আলো ছিল না।

সে ঘরে ঢুকলেন। হাতে একটা কাগজ। এ-ফোর সাইজ। প্রিন্ট করা। টেবিলে রাখলেন, সেলিনার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন, যেভাবে ডাক্তার রোগীকে এক্স-রে দেখান।

সেলিনা কাগজটার দিকে তাকাল।

একটা টেবিল। কলামগুলো ইংরেজিতে। "Date", "Time", "Location", "Duration", "Status"। নিচে সারি সারি ডেটা। কিছু সারি সবুজ। কিছু হলুদ। দুইটা লাল।

"এটা কী?" সেলিনা জিজ্ঞেস করল। জানে, কিন্তু জিজ্ঞেস করল।

"আপনার ট্যাবলেটের ট্র্যাকিং ডেটা। গত সপ্তাহের।"

নাজমুল সাহেব কাগজটায় আঙুল রাখলেন। একটা হলুদ সারিতে।

"মঙ্গলবার, সকাল এগারোটা বেয়াল্লিশ। আপনি দক্ষিণচরে ছিলেন। এখান থেকে দক্ষিণচর যাওয়ার রুট হলো ঘাট থেকে নৌকা, তারপর সোজা পশ্চিমে। কিন্তু আপনি পশ্চিমে যাননি। আপনি দক্ষিণে গেছেন। পুরো পঁয়তাল্লিশ মিনিট একটা চায়ের দোকানে ছিলেন।"

সেলিনা কিছু বলল না।

"চায়ের দোকানে পঁয়তাল্লিশ মিনিট, সেলিনা আপা।" নাজমুল সাহেব চেয়ারে হেলান দিলেন। "ডিউটি আওয়ারে।"

সেলিনা বলল, "সেই দোকানটা রোগীর বাড়ির পাশে। আমি রোগীর মাকে খুঁজছিলাম। মা দোকানে ছিলেন। সেখানে বসে আমি রোগীর হিস্ট্রি নিয়েছি। চা খাইনি।"

"ট্যাবলেট তো বলছে আপনি সেখানে পঁয়তাল্লিশ মিনিট ছিলেন।"

"ছিলাম। কাজ করছিলাম।"

নাজমুল সাহেব কিছু বললেন না। আঙুল সরিয়ে নিলেন আরেকটা সারিতে। এটা হলুদ না, লাল।

"মঙ্গলবারেই। দক্ষিণচরে রোগী দেখতে গেছেন, কিন্তু রুট অনুযায়ী যাননি। সিস্টেম বলছে 'অনুমোদিত রুট থেকে বিচ্যুতি।'"

সেলিনা বলল, "অনুমোদিত রুট মানে কী? চরে তো রাস্তা নেই। কাদা আছে, পানি আছে, মানুষ যেদিক দিয়ে পারে হাঁটে। আমি আলীর বাড়ি যাচ্ছিলাম, তার মেয়ের টিকা দিতে। ওদিক দিয়ে গেলে কাদা কম।"

"সিস্টেমে তো আলীর বাড়ির লোকেশন আলাদা দেখাচ্ছে।"

"লোকেশন ভুল। চরে গুগল ম্যাপ কাজ করে না ঠিকমতো। আমি তিন বছর ধরে আলীর বাড়ি যাই, আমি জানি কোনদিকে।"

নাজমুল সাহেব ভ্রু তুললেন। কাগজটার দিকে তাকালেন, যেভাবে মানুষ আয়নায় তাকায়, নিজেকে দেখতে না, অন্যকে দেখাতে।

তারপর লাল সারিটা।

"বৃহস্পতিবার। সকাল দশটা থেকে দুপুর বারোটা। দুই ঘণ্টা। আপনার ট্যাবলেট অফলাইন ছিল। কোনো ডেটা নেই। কোনো লোকেশন নেই। দুই ঘণ্টা আপনি কোথায় ছিলেন, সিস্টেম জানে না।"

সেলিনা একটু সোজা হয়ে বসল।

"ওই দুই ঘণ্টায় আমি নৌকায় ছিলাম। হাওরে টাওয়ার নেই। নেটওয়ার্ক নেই। ট্যাবলেট অফলাইন হয়ে যায়। এটা নতুন কিছু না, প্রতি সপ্তাহেই হয়। আমি দক্ষিণচর থেকে বিষ্ণুপুর যাচ্ছিলাম, সেখানে একটা গর্ভবতী মাকে দেখতে। নৌকায় দেড় ঘণ্টা, তারপর আরো আধঘণ্টা হাঁটা।"

নাজমুল সাহেব কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

"ডেটাতে তো দেখাচ্ছে না।"

সেলিনা বলল, "হাওরে নেটওয়ার্ক নেই বলে ডেটায় দেখাবে না। এটা ট্যাবলেটের সীমাবদ্ধতা, আমার না।"

নাজমুল সাহেব কাঁধ ঝাঁকালেন। "আমি বুঝি, সেলিনা আপা। কিন্তু ওপর থেকে রিপোর্ট চেয়েছে। তারা এই ডেটা দেখবে। তারা ওপর থেকে দেখবে। তারা হাওর দেখেনি, নৌকা দেখেনি, কাদা দেখেনি। তারা শুধু এই কাগজটা দেখবে।"

"তাহলে তাদের হাওরে এসে দেখতে বলুন।"

নাজমুল সাহেব একটু হাসলেন। হাসিটা মানানসই না। যে মানুষ নিজেও জানে কথাটা সত্য, কিন্তু সত্যটা কাজে লাগে না, সেই মানুষের হাসি এরকম হয়।

"এই ডেটা বলছে তুমি ঠিকমতো কাজ করছো না।"

সেলিনা চুপ করে তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না। বলার মতো কিছু বাকি ছিল না।

সেলিনা উঠে দাঁড়াল। চেয়ারটা একটু পেছনে সরল।

"আমি যেতে পারি?"

নাজমুল সাহেব মাথা নাড়লেন।

সেলিনা দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। বারান্দায় রুবিনা বসে ছিল, সেও ডাক পেয়েছে সম্ভবত। রুবিনা তাকাল। সেলিনা কিছু বলল না। সোজা হেঁটে গেল।

বাইরে রোদ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উঠোনে একটা নিমগাছ। গাছের নিচে দুইটা ছাগল বাঁধা, কার ছাগল কেউ জানে না, কিন্তু প্রতিদিন সেখানে থাকে। সেলিনা গাছের নিচে দাঁড়াল। একটু ছায়া পেল। হাত দিয়ে মুখ মুছল। ঘাম, না অন্য কিছু, বোঝা গেল না।

সে ব্যাগ থেকে নিজের খাতাটা বের করল। সরকারি খাতা না, নিজের খাতা। যেটায় ছক নেই, কলাম নেই। শুধু সত্য।

পেন নিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লিখল, নিমগাছের ছায়ায়, ছাগলদুটোর পাশে:

"ট্যাবলেট আমাকে বাঁচায়। ট্যাবলেট আমাকে দেখে। দুটোই সত্য।"

খাতা বন্ধ করল। ব্যাগে রাখল।

অটোস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে লাগল। আজ আর কোনো ভিজিটে যাবে না। বাড়ি ফিরবে। শরীরে ক্লান্তি, মাথায় কিছু একটা ভারী, যেটা ক্লান্তি না। ক্লান্তি হলে ঘুমালে চলে যায়। এটা ঘুমালেও যাবে না।

বাড়িতে ফিরে সেলিনা দেখল সোহেল স্কুল থেকে ফিরেছে। উঠোনে বসে কিছু আঁকছে। খাতা খুলে, রঙ পেন্সিল দিয়ে। মা রান্নাঘরে।

"কী আঁকছিস?" সেলিনা জিজ্ঞেস করল।

"আম্মার ছবি। স্কুলে দিতে হবে।"

সেলিনা পাশে বসল। খাতার দিকে তাকাল।

ছবিতে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শাড়ি পরা। মাথায় লম্বা চুল। পায়ে স্যান্ডেল। কিন্তু হাত তিনটা।

"তিনটা হাত কেন?"

সোহেল একটু চুপ করে ভাবল। তারপর বলল, "একটা হাতে তোমার খাতা। আরেকটা হাতে ট্যাবলেট। তারপর আরেকটা হাত লাগে রোগী ধরতে। তিনটাই দরকার। তাই তিনটা দিলাম।"

সেলিনা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তিন হাতের মা। একটায় খাতা, একটায় ট্যাবলেট, একটায় রোগী। সোহেল ঠিক করতে পারেনি কোনটা বাদ দেবে, তাই কোনোটাই বাদ দেয়নি।

আট বছরের ছেলে। সে জানে না ট্র্যাকিং ডেটা কী, সে জানে না অনুমোদিত রুট কী, সে জানে না ওপর থেকে কে দেখছে। সে শুধু জানে তার মায়ের দুটো হাত দিয়ে কুলায় না।

"সুন্দর হয়েছে," সেলিনা বলল।

সোহেল খুশি হলো। আঁকতে লাগল। ছবিতে এখন নৌকা যোগ করছে। প্রতিটা ছবিতে সোহেল নৌকা রাখে, যেভাবে কেউ কেউ ছবির কোণায় সূর্য আঁকে।

রাতে সবাই খেয়ে দেয়ে ঘুমানোর জন্য তৈরি হলো। মা শুয়ে পড়লেন। সোহেল বিছানায়, চোখ বন্ধ, কিন্তু এখনো ঘুমায়নি, পা নাড়াচ্ছে, যেভাবে বাচ্চারা ঘুমের আগে করে।

সেলিনা টেবিলে ট্যাবলেটটা রাখল। প্রতিরাতে রাখে। চার্জ দিতে হবে, তাই প্লাগে লাগাল। স্ক্রিন বন্ধ। কিন্তু ছোট সবুজ আলোটা জ্বলে উঠল। চার্জিং ইন্ডিকেটর। অথবা অন্য কিছু। সেলিনা কোনোদিন নিশ্চিত হতে পারেনি এটা শুধুই চার্জিং আলো কিনা।

আগে সে ট্যাবলেটটা উলটে রাখত। মুখ নিচে দিয়ে। আলোটা যেন না দেখা যায়। একটা ছোট প্রতিবাদ। চোখের আড়ালে রাখলে হয়তো চোখও আড়ালে থাকে, এরকম একটা বিশ্বাস।

আজ রাতে সে উলটাল না।

ট্যাবলেটটা সোজা রাখল। স্ক্রিন ওপরে। সবুজ আলো জ্বলছে। সেলিনা বিছানায় শুয়ে আলোটার দিকে তাকিয়ে রইল।

উলটে রাখলেও আলো জ্বলে। সোজা রাখলেও জ্বলে। সেলিনা দেখুক বা না দেখুক, ট্যাবলেট তার কাজ করে। দেখে, রেকর্ড করে, পাঠায়। সেলিনার অনুমতি লাগে না।

তাহলে উলটে রেখে কী লাভ?

সেলিনা তাকিয়ে রইল। সবুজ আলো। ছোট, গোল, স্থির। অন্ধকার ঘরে একমাত্র আলো। হাওরের বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। সোহেল পা নাড়ানো বন্ধ করেছে, ঘুমিয়ে গেছে। মায়ের নাক ডাকছে, আস্তে আস্তে।

সবুজ আলোটা জ্বলছে।

সেলিনা চোখ বন্ধ করল না। তাকিয়ে রইল। আলোটা যেন তাকেও দেখছে। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে। কে কাকে দেখছে বোঝার উপায় নেই।

বাইরে হাওরের পানিতে বাতাস লাগছে। নৌকা কোথাও দুলছে। রহমত চাচার নৌকা হয়তো, অথবা অন্য কারো। এই শব্দটা সেলিনা ছোটবেলা থেকে শোনে। পানিতে নৌকা দোলার শব্দ। এটা তার ঘুমপাড়ানি গান।

আজ ঘুম আসছে না।

সবুজ আলো জ্বলছে।