জাহিদের চুক্তি শেষ

পর্ব ২৬ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

কাতারের ভিসা রিনিউ হলো না।

জাহিদ জানত হবে না। গত দুই সপ্তাহ ধরে জানত। শফিকের রিক্রুটিং অফিস থেকে বলেছিল, "চেষ্টা করছি।" চেষ্টা করছি মানে হবে না, শুধু সরাসরি বলতে চায় না। জাহিদ বারো বছর গালফে আছে, সে চেনে এই ভাষা। "চেষ্টা করছি" মানে না। "দেখা যাক" মানে না। "ইনশাআল্লাহ" মানে কখনো কখনো হ্যাঁ, কিন্তু বেশিরভাগ সময় না।

তিন দিন আগে শফিক ফোন করল। "ভাই, হলো না। কোম্পানি বলেছে নতুন রিক্রুটমেন্ট বন্ধ। অটোমেশনে যাচ্ছে। কম লোক লাগবে।"

কম লোক লাগবে। রিয়াদে তালাল বলেছিল। কুয়েতেও শুনেছে। দোহাতেও শুনল। তিনটা দেশ, একটাই বাক্য।

জাহিদ কিছু বলল না।

"দেশে ফিরে যাও, ভাই। বিশ্রাম নাও। পরে দেখা যাবে।"

পরে দেখা যাবে। আরেকটা বাক্য যেটার কোনো মানে নেই।

দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ডিপার্চার হল। জাহিদ বসে আছে একটা ধূসর চেয়ারে। বোর্ডিং পাস হাতে। ঢাকা ওয়ান-ওয়ে। রিটার্ন নেই। আগে যখনই টিকিট কেটেছে, রিটার্ন থাকত। দুই সপ্তাহের ছুটি, তারপর ফিরে আসা। এবার ফেরা নেই।

তার ব্যাগ একটা। মাঝারি সাইজের। কালো। জিপারে একটু সমস্যা আছে, পুরো বন্ধ হয় না, একটা কাপড়ের টুকরো আটকে রেখেছে। ব্যাগের ভেতরে: দুই জোড়া জামা, একটা লুঙ্গি, একটা গামছা, প্যান্ট দুইটা, স্যান্ডেল একজোড়া, ক্ষুর, সাবান, একটা তোয়ালে, পাসপোর্ট কপি, কাগজপত্র একটা ফোল্ডারে, চার্জার, আর খাতা।

বারো বছরের জীবন এক ব্যাগে ঢুকে গেছে। জাহিদ ভাবে, এটা কম না বেশি। বারো বছরে কিছু জমেনি যেটা এই ব্যাগে ধরে না? জমেছে। কিন্তু সেগুলো ব্যাগে ঢোকে না। সেগুলো শরীরে আছে, পিঠে, হাঁটুতে, চোখের নিচে। কাঁধে যে ব্যথা হয়, সেটা রিয়াদের। হাঁটুতে যে শব্দ হয়, সেটা কুয়েতের। আর ভেতরে যে ক্লান্তি, সেটা তিনটা দেশের মিলিত।

বোর্ডিং পাসটায় একটা কফির দাগ। জাহিদ কফি খায় না। চা খায়। কফি সে কোনোদিন পছন্দ করেনি, তেতো লাগে। এই দাগ অন্য কারো। হয়তো চেক-ইন কাউন্টারের মেয়েটার, যে টিকিট প্রিন্ট করেছে। হয়তো আগের কোনো যাত্রীর। অন্য কারো চিহ্ন জাহিদের যাত্রায়।

সে রশিদাকে ফোন করল।

রিং হলো। এক। দুই। তিন। রশিদা ধরল।

"আসছি।"

এটুকুই বলল। "শিগগিরই" বলল না। বারো বছর ধরে "শিগগিরই" বলেছে। রশিদাও জানত, জাহিদও জানত, "শিগগিরই" একটা মিথ্যা যেটা দুজনে মিলে সত্য বানিয়ে রেখেছিল। আজ সেই শব্দটা দরকার নেই। আজ সত্যিই আসছে।

রশিদা কিছু বলল না। একটু চুপ। ফোনের ওপাশে কোনো শব্দ নেই। টিভি বন্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকাও নেই। হয়তো দুপুর, দুপুরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে না।

তারপর রশিদা বলল, "ঘর তৈরি আছে।"

তিনটা শব্দ। ঘর তৈরি আছে। এর মানে কী? ঘর পরিষ্কার করা আছে? বিছানা পাতা আছে? নাকি অন্য কিছু? জাহিদ জানে না। রশিদার কণ্ঠে কোনো আনন্দ ছিল না, কোনো অভিযোগও না। শুধু একটা তথ্য। ঘর তৈরি আছে। যেভাবে কেউ বলে, "বাজারে আলু আছে।"

জাহিদ বলল, "ইমনকে বলো না এখনো।"

"কেন?"

জাহিদ জানে না কেন। হয়তো চায় নিজে বলতে। হয়তো চায় ছেলে দরজায় এসে দেখুক বাবা এসেছে। হয়তো ভয় পাচ্ছে ছেলে জিজ্ঞেস করবে, "আবার কবে যাবা?" এবার উত্তর হবে, "যাব না।" সেটা ভালো খবর কিনা জাহিদ জানে না।

"ঠিক আছে," রশিদা বলল।

ফোন রাখল।

পাশের চেয়ারে একটা লোক বসে আছে। বাংলাদেশি। চেহারা দেখে বোঝা যায়। গায়ের রঙ, চোখের ধরন, শার্টের ধরন। লোকটার হাতে একটা ছোট প্যাকেট, উপহারের মোড়ক দেওয়া, হলুদ রিবন। সম্ভবত বাচ্চার জন্য কিছু।

জাহিদ ভাবল, জিজ্ঞেস করবে কিনা। গালফে বাংলাদেশি দেখলে মানুষ কথা বলে। "কোন জেলা?" এটাই প্রথম প্রশ্ন। তারপর, "কতদিন?" তারপর, "কেমন আছে দেশে?"

লোকটা আগে বলল। "ভাই, ঢাকা?"

"হ্যাঁ।"

"আমিও। ঈদে যাচ্ছি। আবার ফিরব। কনস্ট্রাকশনে আছি।"

জাহিদ মাথা নাড়ল।

"আপনিও কনস্ট্রাকশন?"

"ছিলাম।"

লোকটা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। "ছিলাম" শব্দটার ভেতরে একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ আছে। লোকটা সেটা বুঝল।

জাহিদ লোকটার দিকে তাকাল। তিরিশ-বত্রিশ বছর হবে। শরীর শক্ত। হাতের পেশি দড়ির মতো। এই লোকটা আরো দশ বছর কাজ করবে, হয়তো পনেরো। তারপর তার সাথেও এই কথা হবে। "ছিলাম।" হয়তো তখন "কম লোক লাগবে" না, অন্য কিছু বলবে। কিন্তু ফল একই হবে।

জাহিদ লোকটাকে ঈর্ষা করল। খুব সংক্ষিপ্ত ঈর্ষা। এক মুহূর্তের। তারপর চলে গেল। ঈর্ষা রাখার মতো শক্তিও নেই।

বিমানে উঠল। সিট জানালার ধারে। ব্যাগ ওপরের তাকে রাখল। বসল। সিটবেল্ট বাঁধল।

সিটের পকেট থেকে ম্যাগাজিনটা বের করল, তারপর আবার রেখে দিল। পড়ার ইচ্ছে নেই। ম্যাগাজিনে কাতারের ছবি, হোটেলের বিজ্ঞাপন, পারফিউমের বিজ্ঞাপন। এসব জাহিদের জন্য না। কোনোদিনই ছিল না।

বিমান ছাড়ল। জানালা দিয়ে দোহা ছোট হয়ে যাচ্ছে। বিল্ডিংগুলো খেলনার মতো। রাস্তাগুলো সুতোর মতো। কোথাও একটা সাইট আছে যেখানে জাহিদ কাজ খুঁজতে গিয়েছিল। কোথাও একটা ক্যাম্প আছে যেখানে বীরেন্দ্র শিস দিত। বীরেন্দ্র কুয়েতে চলে গেছে। যাওয়ার আগে বলেছিল, "জাহিদ ভাই, ফোন করিও।" জাহিদ করবে না। ফোন করলে কী বলবে? "আমি দেশে ফিরে গেছি"? এই বাক্যটা গালফে পরাজয়ের ভাষা।

মেঘের ওপর দিয়ে বিমান চলছে। নিচে শুধু সাদা। কোনো দেশ নেই, কোনো সীমানা নেই। শুধু মেঘ।

জাহিদ ব্যাগ থেকে খাতাটা বের করল। নীল মলাট। পাতা প্রায় শেষ। শেষ কয়েকটা পাতায় ছোট ছোট অক্ষরে হিসেব। কবে কত টাকা পাঠিয়েছে, কার মাধ্যমে, কী কাজে। শেষ এন্ট্রি আট মাস আগের। তারপর আর কিছু পাঠাতে পারেনি। আট মাসের ফাঁকা পাতা। জাহিদ ফাঁকা পাতাগুলোর দিকে তাকাল। সাদা পাতা। কিছু লেখা নেই। আট মাস ধরে কিছু ঘটেনি যেটা লেখার যোগ্য। কাজ খুঁজেছে, পায়নি। আবার খুঁজেছে, আবার পায়নি। একই দিন বারবার।

জাহিদ আজকের তারিখ লিখল। তারিখের পাশে একটা শব্দ:

"ফেরত।"

এটুকুই। আর কিছু লিখল না। কত টাকা নিয়ে ফিরছে, সেটা লিখল না। কত টাকা ধার আছে, সেটা লিখল না। কী করবে দেশে গিয়ে, সেটা লিখল না। একটা শব্দ। "ফেরত।" বারো বছর ধরে সংখ্যা লিখেছে এই খাতায়। দুইবার বাক্য লিখেছে। প্রথমবার রিয়াদে, "ক্রেন এখন নিজেই চলে।" দ্বিতীয়বার আজ, "ফেরত।" দুটো বাক্যের মাঝে সব সংখ্যা।

কয়েক ঘণ্টা পর ক্যাপ্টেন ঘোষণা দিল। ল্যান্ডিংয়ের প্রস্তুতি। জাহিদ জানালা দিয়ে নিচে তাকাল।

বাংলাদেশ সবুজ।

ওপর থেকে দেখলে শুধু সবুজ। নদী আছে, রুপালি সুতোর মতো, এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে। ক্ষেত আছে, পুকুর আছে, গ্রাম আছে। সব সবুজে মেশানো। কোথায় গ্রাম শেষ, কোথায় ক্ষেত শুরু, ওপর থেকে বোঝা যায় না।

জাহিদ মনে করার চেষ্টা করল, দেশটা এত সবুজ ছিল কিনা। বারো বছর আগে যখন ছেড়ে গিয়েছিল, তখন কি এত সবুজ ছিল? হয়তো ছিল। হয়তো সে ভুলে গেছে। গালফে সবকিছু বালির রঙ। রাস্তা, বিল্ডিং, মাটি, আকাশের ধুলো, সব একই রঙ। সেই রঙে চোখ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সবুজটা এখন নতুন লাগছে। নিজের দেশ নতুন লাগছে।

সে কী অনুভব করছে বুঝতে পারছে না। আনন্দ? না। স্বস্তি? না। ভয়? একটু। লজ্জা? একটু। কিছু একটা আছে যেটার নাম সে জানে না। হয়তো শব্দটা আছে, বাংলায় বা অন্য কোনো ভাষায়, কিন্তু জাহিদ জানে না। যে মানুষ বারো বছর পর ফিরছে, হাতে কাজ নেই, পকেটে টাকা কম, শরীরে ক্লান্তি, কিন্তু নিচে তার দেশ সবুজ, সেই মানুষটার অনুভূতির জন্য হয়তো কোনো শব্দ নেই। হয়তো দরকারও নেই।

বিমান নামল। চাকা রানওয়ে ছুঁল। ঝাঁকুনি। পাশের লোকটা, ঈদে যাওয়া কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার, হলুদ রিবনের প্যাকেটটা শক্ত করে ধরল।

জাহিদ সিটবেল্ট খুলল। উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ নামাল। একটা ব্যাগ। হালকা।

বিমান থেকে নামার সময় দরজায় একটু থামল। বাইরের বাতাস ভেতরে ঢুকল। গরম, ভেজা, ভারী বাতাস। গালফের গরম শুকনো, ছুরির মতো। এটা আলাদা। এই গরমে পানি আছে, মাটি আছে, ঘাসের গন্ধ আছে।

জাহিদ সিঁড়ি দিয়ে নামল। রানওয়ে। ঢাকা। তার দেশ।

খাতাটা ব্যাগের ভেতরে। একটা নতুন শব্দ নিয়ে। "ফেরত।" এরপর কী লিখবে, জাহিদ জানে না। হয়তো আবার সংখ্যা। হয়তো আরো একটা বাক্য। হয়তো কিছুই না।

বাইরে বাংলাদেশের আকাশ। ধূসর, একটু মেঘলা, বৃষ্টি হতে পারে, নাও পারে। জাহিদ মনে করে, এই আকাশটা সবসময় এরকমই ছিল। কিছু বদলায়নি। নাকি সবই বদলে গেছে। ওপর থেকে সবুজ দেখেছে। এখন মাটিতে দাঁড়িয়ে সবুজ দেখতে পাচ্ছে না। শুধু কংক্রিট, গাড়ি, মানুষ, ধোঁয়া।

সবুজটা মনে আছে। ওপর থেকে দেখেছে। সেটুকু মনে আছে।