মিতু আর তানিয়া

যখন দুই পথ একটা অফিসে মিলে

পর্ব ২৭ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

--- title: "মিতু আর তানিয়া" subtitle: "যখন দুই পথ একটা অফিসে মিলে" series: "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ" chapter: 3 chapter_title: "ফাটল" part: 27 date: "2026-03-18" ---

বাসটা গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে ছেড়েছে সকাল আটটায়।

মিতু জানালার পাশে বসেছে। কাচে ধুলো। বাইরে গাজীপুরের রাস্তা, যেটা সে প্রতিদিন দেখে, কিন্তু আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে। কারণ আজ সে এই রাস্তা দিয়ে অন্যদিকে যাচ্ছে। প্রতিদিন সে গুলশানে যায়, বুটক্যাম্পে। আজ বনানী। ইন্টারভিউ।

বুটক্যাম্পের ইনস্ট্রাক্টর রাকিব ভাই গতকাল বলেছিলেন, "তানিয়া আপা একটা স্টার্টআপ চালায়। ওদের একটা ইন্টার্ন দরকার। আমি তোমার নাম দিয়েছি।"

মিতু জিজ্ঞেস করেছিল, "কেন আমার নাম?"

রাকিব ভাই বলেছিলেন, "তুমি কোড লেখো। অন্যরা কপি করে। তুমি লেখো।"

মিতু বুঝতে পারেনি এটা প্রশংসা কিনা। সে কোড কপি করে না কারণ সে কপি করতে জানে না। গুগল থেকে খুঁজে বের করতে তার ভয় লাগে, ভুল জিনিস কপি হয়ে যাবে। তাই সে নিজে লেখে। ভুল হয়। আবার লেখে। আবার ভুল হয়। তৃতীয়বার কাজ করে। এটা পদ্ধতি না, ভয় থেকে তৈরি অভ্যাস।

বাসে জনা ত্রিশেক মানুষ। পাশে একজন মহিলা বসে আছেন, কোলে একটা পলিথিনের ব্যাগ, ব্যাগে শাকপাতা। মিতুর কোলে একটা ফোল্ডার। ফোল্ডারের ভেতরে তার সিভি, একটা মাত্র পাতা। নাম, বুটক্যাম্পের নাম, যা যা শিখেছে তার তালিকা। কাজের অভিজ্ঞতার ঘরে কিছু নেই। মিতু সেই ঘরটা ফাঁকা রেখেছে। ফাঁকা ঘর দেখলে মনে হয় সিভিটা অসম্পূর্ণ। কিন্তু মিথ্যা লেখার চেয়ে ফাঁকা ভালো। এটা রহিমা শিখিয়েছে। "মিথ্যা বললে পরে ধরা খাবি। চুপ থাক, কিন্তু মিথ্যা বলবি না।"

বাস মহাখালী পার হলো। জ্যাম। মিতু ঘড়ি দেখলো। সাড়ে নয়টা। ইন্টারভিউ দশটায়। সময় আছে।

মিতু ফোনে বুটক্যাম্পের নোটস দেখলো। পাইথন। প্যান্ডাস। সাইকিট-লার্ন। এগুলো সে পারে। ভালো পারে কিনা জানে না। কিন্তু পারে। কোড চলে। আউটপুট আসে। এটুকু সে জানে।

জানালা দিয়ে বনানীর বিল্ডিংগুলো দেখা যাচ্ছে। কাচের দেয়াল। মিতু এইসব বিল্ডিংয়ের সামনে দিয়ে যায়, ভেতরে কখনো ঢোকেনি। ভেতরে কী থাকে সে জানে না। এসি থাকে, এটা জানে। গাজীপুরে তাদের ঘরে ফ্যান আছে, সেটাও সবসময় চলে না।

অফিসটা চারতলায়।

লিফটে উঠলো মিতু। লিফটের ভেতরে আয়না। মিতু নিজের দিকে তাকালো। সালোয়ার-কামিজ, কালো। চুল বাঁধা। মুখে কোনো মেকআপ নেই। চোখের নিচে একটু কালো, রাতে ঘুম কম হয়েছে। মিতু আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিলো।

দরজায় নক করতে গিয়ে দেখলো দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকলো।

অফিসটা ছোট। তিনটে ডেস্ক। দুটোতে কেউ বসে আছে, হেডফোন কানে। একটা খালি। দেয়ালে একটা হোয়াইটবোর্ড, তাতে রঙিন মার্কার দিয়ে কিছু ডায়াগ্রাম আঁকা, মিতু বুঝলো না। পাশের দেয়ালে একটা পোস্টার। একজন মহিলার ছবি, পুরনো আমলের পোশাক, নিচে ইংরেজিতে কিছু লেখা। পোস্টারটা একটু বাঁকা হয়ে ঝুলছে। ডান দিকটা একটু নিচে নেমে গেছে। কেউ কোনোদিন সোজা করেনি। ছয় মাস হয়ে গেছে এভাবেই ঝুলছে। অফিসের সবাই দেখে, কেউ সোজা করে না। পোস্টারটা বাঁকাই থাকে।

"মিতু?"

একজন মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। চুল ছোট করে কাটা। জিন্স, সাদা টপ। হাতে একটা মগ, মগে কফি।

"জি।"

"আমি তানিয়া। বসো।"

মিতু বসলো। চেয়ারটা ঘুরে। মিতু এই ধরনের চেয়ারে বসেনি আগে। চেয়ারটা একটু ঘুরে গেলো, মিতু হাত দিয়ে ধরলো ডেস্কের কিনারা।

তানিয়া হাসলো। "চেয়ারটা একটু চঞ্চল। আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যাবে।"

মিতু কিছু বললো না। ফোল্ডারটা ডেস্কে রাখলো।

তানিয়া সিভিটা দেখলো। একটু সময় নিলো। একপাতা, বেশি সময় লাগার কথা না, কিন্তু তানিয়া পুরোটা পড়লো। কাজের অভিজ্ঞতার ফাঁকা ঘরটায় চোখ থামলো। কিছু বললো না।

"রাকিব তোমার কথা বলেছে। বলেছে তুমি ভালো শিখো।"

"জি।"

"কী শিখেছো বুটক্যাম্পে?"

মিতু বললো। পাইথন। ডেটা ক্লিনিং। বেসিক মেশিন লার্নিং। একটু ভিজুয়ালাইজেশন। কথাগুলো ছোট ছোট, যেন একটা করে পাথর রাখছে।

"প্রজেক্ট করেছো কোনো?"

"জি। একটা। বাংলাদেশের জেলাভিত্তিক তাপমাত্রার ডেটা নিয়ে। দশ বছরের ট্রেন্ড বের করেছিলাম।"

"ফলাফল কী ছিলো?"

"তাপমাত্রা বাড়ছে।"

তানিয়া একটু হাসলো। "সবাই জানে তাপমাত্রা বাড়ছে।"

"জি। কিন্তু কোন জেলায় কত বাড়ছে সেটা সবাই জানে না। রাজশাহীতে সবচেয়ে বেশি। সিলেটে কম।"

তানিয়া মাথা নাড়লো। "ভালো।"

একটু চুপচাপ। তানিয়া কফির মগ হাতে ঘোরালো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, "একটা কথা বলো। কেন প্রোগ্রামিং?"

মিতু ভেবেছিল এই প্রশ্ন আসবে। বুটক্যাম্পে একজন বলেছিল, "ইন্টারভিউতে জিজ্ঞেস করবে কেন এই ফিল্ড। একটা ভালো উত্তর রেডি রাখো।" মিতু একটা উত্তর রেডি করেছিল। প্যাশন, ভবিষ্যৎ, টেকনোলজি, এইসব শব্দ দিয়ে সাজানো।

কিন্তু এখন সেই সাজানো কথাগুলো মুখে এলো না।

মিতু বললো, "আম্মু সারাদিন বোতাম গোনে। আমি চাই কম্পিউটার গুনুক।"

তানিয়া কফির মগ থামিয়ে রাখলো।

পাঁচটা সেকেন্ড কেটে গেলো। অফিসের এসির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। পাশের ডেস্কে কেউ কিবোর্ডে টাইপ করছে। টকটক। টকটক।

তানিয়া বললো, "কবে থেকে জয়েন করতে পারবে?"

মিতু বুঝলো না। "মানে?"

"মানে তুমি সিলেক্টেড। কবে থেকে আসতে পারবে?"

মিতুর মুখ একটু খুললো। তারপর বন্ধ করলো। তারপর বললো, "আগামীকাল।"

তানিয়া হাসলো। "পরশু থেকে আসো। আগামীকাল শনিবার।"

মিতু মনে করতে পারলো না আজ শুক্রবার কিনা। তারপর মনে পড়লো, আজ শুক্রবার। বুটক্যাম্প ছুটি ছিলো বলেই আজ ইন্টারভিউতে আসতে পেরেছে। সে মাথা নাড়লো।

তানিয়া বেতনের কথা বললো। একটা সংখ্যা। মিতু সংখ্যাটা শুনলো। সংখ্যাটা তার আম্মুর বেতনের চেয়ে বেশি। ইন্টার্নশিপের বেতন। প্রথম চাকরি নয়, শুধু ইন্টার্নশিপ, আর সেটাই আম্মুর আঠারো বছরের বেতনের চেয়ে বেশি।

মিতু কিছু বললো না। শুধু মাথা নাড়লো।

অফিসের বাথরুমে ঢুকে মিতু দরজা বন্ধ করলো।

বাথরুমটা পরিষ্কার। সাদা টাইলস। একটা ছোট আয়না। একটা তোয়ালে ঝুলছে হুকে। মিতু কমোডের ঢাকনার ওপর বসলো। ফোন বের করলো। হাত কাঁপছে একটু। ভয় না, অন্য কিছু। সে আম্মুর নম্বরে কল দিলো।

তিনবার রিং হলো।

"কী রে?"

"আম্মু, চাকরি হয়ে গেছে।"

এক সেকেন্ড চুপ। তারপর রহিমা বললো, "চাকরি? কোথায়?"

"বনানীতে। একটা অফিসে। কম্পিউটারের কাজ।"

"কম্পিউটারের কাজ মানে?"

"কোড লেখা। ডেটা নিয়ে কাজ করা।"

রহিমা চুপ। তারপর জিজ্ঞেস করলো, "বেতন কত?"

মিতু সংখ্যাটা বললো।

রহিমা চুপ হয়ে গেলো। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড। চার সেকেন্ড। পাঁচ সেকেন্ড।

তারপর বললো, "ভালো। এখন কাজ করো।"

গলার স্বর সমান। রহিমার গলার স্বর সবসময় সমান। খুশি হলেও সমান, রাগ করলেও সমান। মিতু জানে, এটা সমান না। এটা চাপা। রহিমা চাপতে জানে।

"আম্মু?"

"হুম?"

"তুমি ঠিক আছো?"

"আছি। যা, কাজ করো। ফোনে টাকা নষ্ট করিস না।"

ফোন কেটে গেলো।

মিতু বাথরুমের আয়নায় তাকালো। চোখ লাল। কখন লাল হলো বুঝতে পারেনি। সে মুখে পানি দিলো। তোয়ালে দিয়ে মুছলো। বাইরে বের হলো। অফিসে ফিরে এসে দেখলো তানিয়া একটা ল্যাপটপ বের করে রাখছে।

"এটা তোমার। অফিসের।"

মিতু ল্যাপটপটা হাতে নিলো। নতুন না, কিন্তু পরিষ্কার। স্ক্রিন বড়। কিবোর্ডের অক্ষরগুলো স্পষ্ট। মিতু বুটক্যাম্পে ধার করা ল্যাপটপ ব্যবহার করতো, যেটার তিনটে কি কাজ করতো না। এটার সব কি কাজ করে।

"শুক্রবার তো ছুটি," তানিয়া বললো। "তুমি চাইলে ল্যাপটপটা নিয়ে যাও। সেটআপ করে ফেলো। রবিবার আসবে।"

মিতু ল্যাপটপটা ব্যাগে ভরলো। ভারী। কিন্তু ভালো ভারী।

সে সিঁড়ি দিয়ে নামলো। লিফটে না, সিঁড়ি দিয়ে। কেন সিঁড়ি দিয়ে সে জানে না। হয়তো একটু বেশি সময় চেয়েছিলো। বিল্ডিং থেকে বের হতে হতে ভাবতে চেয়েছিলো। কী ভাবতে চেয়েছিলো সেটাও সে জানে না।

রাস্তায় বের হয়ে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ালো। গাজীপুরের বাস আসবে। রোদ উঠেছে।

গাজীপুরে রহিমা ফোন রেখে দিলো।

ফ্যাক্টরির ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে মেশিনের আওয়াজ। সালমা পাশ দিয়ে হেঁটে গেলো, রহিমা দেখলো না। নাসরিন কিছু জিজ্ঞেস করলো, রহিমা শুনলো না।

রহিমা তার নিজের জামার বোতামের দিকে তাকালো।

একটা। দুইটা। তিনটা। চারটা। পাঁচটা।

পুরনো অভ্যাস। সবকিছু গুনলে জিনিস হারায় না। রহিমা ছোটবেলা থেকে গোনে। চাল গোনে, টাকা গোনে, সোয়েটারের বোতাম গোনে, সিঁড়ির ধাপ গোনে। গোনা তার নিরাপত্তা। সংখ্যা মিথ্যা বলে না। সংখ্যা কম হলে বোঝা যায় কিছু হারিয়েছে। সংখ্যা বেশি হলে বোঝা যায় কিছু বেড়েছে।

মিতুর বেতনের সংখ্যাটা রহিমার মাথায় ঘুরছে।

সংখ্যাটা রহিমার নিজের বেতনের চেয়ে বেশি। ইন্টার্নশিপ। মেয়ে এখনো চাকরিতে ঢোকেনি, শুধু শিখতে যাচ্ছে, আর তার বেতন আম্মুর চেয়ে বেশি। রহিমা আঠারো বছর ধরে বোতাম গুনেছে, সেলাই দেখেছে, চোখ খারাপ করেছে, কোমর ব্যথা সহ্য করেছে।

কিন্তু রহিমা হিসেব করছে না এইভাবে। রহিমা হিসেব করছে অন্যভাবে। মিতুর বেতন বেশি মানে মিতুর সংসার চলবে। মিতু আর ফ্যাক্টরিতে আসবে না। মিতুর হাতে বোতাম থাকবে না। মিতুর চোখ ঝাপসা হবে না।

রহিমার চোখ ঝাপসা হচ্ছে। এখন না, আস্তে আস্তে। ডাক্তার বলেছে চশমা লাগবে। রহিমা চশমা কেনেনি। চশমা কিনলে সবাই জানবে চোখ খারাপ। চোখ খারাপ জানলে ফ্যাক্টরি ভাববে সে কাজ পারে না। তাই চশমা কেনা হয়নি।

কিন্তু এখন চশমার কথা ভাবছে না রহিমা। সে ভাবছে, মেয়ে অফিসে বসবে। এসির নিচে। কম্পিউটারের সামনে। বনানীতে।

রহিমা আবার বোতাম গুনলো। একটা। দুইটা। তিনটা। চারটা। পাঁচটা। ঠিক আছে। একটাও কম নেই।

সন্ধ্যায় রহিমা বাসায় ফিরলো। মিতু বসে আছে। কোলে একটা ল্যাপটপ। নতুন না, কিন্তু পরিষ্কার। মিতু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে, মুখ একটু কাত করে, যেভাবে রহিমা সোয়েটার দেখে।

রহিমা কিছু বললো না। রান্নাঘরে ঢুকলো। ভাত বসালো। মরিচ কাটলো। ডাল চাপালো।

রাতে, সবাই ঘুমিয়ে গেলে, রহিমা বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। পাশের ঘর থেকে ল্যাপটপের নীল আলো আসছে। মিতু এখনো বসে আছে। কী করছে রহিমা জানে না। কোড লিখছে হয়তো। কম্পিউটারকে গুনতে শেখাচ্ছে হয়তো।

রহিমা চোখ বন্ধ করলো। পাশের ঘর থেকে আলো আসছে।

আলোটা নীল।