বেলালের হাত থেমে গেলো

দুই বছরের হাত, দুই সপ্তাহের মেশিন

পর্ব ২৮ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

--- title: "বেলালের হাত থেমে গেলো" subtitle: "দুই বছরের হাত, দুই সপ্তাহের মেশিন" series: "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলাদেশ" chapter: 3 chapter_title: "ফাটল" part: 28 date: "2026-03-18" ---

বেলাল সকাল ছয়টায় ফ্যাক্টরিতে ঢোকে।

ঢোকার সময় গেটের পাশে ঘড়ি দেখে। অভ্যাস। ঘড়িটা দেয়ালে লাগানো, সাদা ডায়াল, কালো কাঁটা। ঘড়ির কাচে একটা ফাটল আছে, তিনটা থেকে নয়টা বরাবর তেরছা দাগ। কবে ফেটেছে কেউ জানে না। ঘড়ি চলে। ফাটল নিয়েই চলে।

বেলাল দুই বছর হলো এই ফ্যাক্টরিতে। রংপুর থেকে এসেছিলো। করিম চাচার কথায়। করিম বলেছিলো, "গাজীপুরে কাজ আছে। যা।" বেলাল গেছিলো। গাজীপুর তার ভালো লাগেনি। রংপুরে আকাশ বড়, এখানে ছোট। বিল্ডিংয়ে আটকে যায় আকাশ। কিন্তু কাজ আছে। কাজ থাকলে আকাশ ছোট হলেও চলে।

প্রথম মাসে তার হাতে ফোস্কা পড়েছিলো। সেলাই মেশিনের পেডাল, কাপড় ধরে রাখা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আঙুলের ডগায় কাপড়ের রেশা ঢুকে যেতো। রাতে হাত গরম পানিতে ডোবাতো। ফোস্কা ফেটে যেতো। নতুন চামড়া উঠতো। সেটাও ফেটে যেতো। তারপর একদিন ফোস্কা আর হলো না। চামড়া শক্ত হয়ে গেলো। ক্যালাস। হাতের তালুতে, আঙুলের ডগায়, বুড়ো আঙুলের গোড়ায়। বেলাল বুঝলো, হাত তৈরি হয়ে গেছে।

দুই বছরে বেলাল দ্রুত হয়েছে। লাইনে সে তৃতীয় দ্রুততম। তার ওপরে শুধু আনোয়ার ভাই আর শাহানা আপা। আনোয়ার ভাই পনেরো বছর ধরে সেলাই করছে। শাহানা আপা বারো বছর। বেলাল দুই বছরে তৃতীয়। এটা খারাপ না।

বেলালের ফোনে ওয়ালপেপার একটা ধানক্ষেতের ছবি। রংপুরের। সবুজ, দিগন্ত পর্যন্ত সবুজ, আকাশে সাদা মেঘ। এই ছবি সে তুলেছিলো গাজীপুরে আসার আগের দিন। ফোন পাল্টেছে একবার, পুরনোটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু ছবিটা সে রেখেছে। নতুন ফোনে দিয়েছে। ওয়ালপেপার বদলায়নি কোনোদিন।

আজ সকালে ফ্লোরে ঢুকে বেলাল দেখলো কোণায় নতুন কিছু মেশিন রাখা আছে। বড়। ঢাকনা দেওয়া। এখনো চালু হয়নি। পাশে কয়েকটা কার্টনের বাক্স। চায়নিজ লেখা।

দুপুরে ফ্লোর ম্যানেজার সবাইকে ডাকলো।

"আজ বিকেলে ম্যানেজমেন্ট থেকে একটা অ্যানাউন্সমেন্ট হবে। সবাই থাকবেন।"

আনোয়ার ভাই জিজ্ঞেস করলো, "কীসের?"

"বলবে।"

বেলাল কোণার মেশিনগুলোর দিকে তাকালো। যা বোঝার বুঝে গেছে। ফ্যাক্টরিতে নতুন মেশিন আসা মানে পুরনো কিছু যাওয়া। পুরনো মেশিন অথবা পুরনো মানুষ।

বিকেল চারটায় ম্যানেজমেন্টের লোক এলো। স্যুট পরা। টাই নেই, কিন্তু স্যুট পরা। তার পেছনে দুইজন, একজন চায়নিজ, একজন বাঙালি। চায়নিজ লোকটা মেশিনগুলোর ঢাকনা খুললো। সেলাই মেশিন। কিন্তু অন্যরকম। বড়। স্ক্রিন আছে। ক্যামেরা আছে। যন্ত্রের হাত আছে, যেটা কাপড় ধরে, ঘোরায়, সেলাই করে।

স্যুটওয়ালা বললো, "এগুলো নতুন প্রজন্মের সেলাই মেশিন। এআই-চালিত। এগুলো কাপড় নিজে পজিশন করতে পারে, সেলাই করতে পারে, ত্রুটি ধরতে পারে। একটা মেশিন তিনজন অপারেটরের কাজ করতে পারে।"

ফ্লোরে চুপচাপ। সেলাই মেশিনের আওয়াজ বন্ধ। সবাই শুনছে।

"আমরা দুটো লাইন রিস্ট্রাকচার করবো। লাইন সাত আর লাইন আট। এই দুটো লাইনে নতুন মেশিন বসবে। যারা এই লাইনে আছেন, তাদের সাথে আলাদা করে কথা হবে।"

লাইন সাত। বেলালের লাইন।

বেলাল তার হাতের দিকে তাকালো। ক্যালাস। দুই বছরের ক্যালাস। হাতের তালুতে চামড়া মোটা হয়ে গেছে, রঙ একটু হলুদ, আঙুলের ডগায় শক্ত। এই হাত দিয়ে সে দিনে তিনশো পিস সেলাই করে। ভুল হয় কম। গতি ভালো।

মেশিনটার দিকে তাকালো। মেশিনের হাত। লোহার। ক্যালাস নেই। ক্লান্তি নেই। মেশিনের হাত তিনগুণ দ্রুত।

দুই সপ্তাহ। স্যুটওয়ালা বললো দুই সপ্তাহের মধ্যে ট্রানজিশন হবে। দুই সপ্তাহ।

বেলাল ফোন বের করলো। করিম চাচাকে কল দিলো।

তিনবার রিং।

"বেলাল?"

"চাচা।"

"কী হইছে?"

"ফ্যাক্টরিতে নতুন মেশিন আইছে। আমার লাইন বন্ধ হবে।"

করিম চুপ। একটু পরে বললো, "মানে চাকরি যাবে?"

"হুম।"

আবার চুপ। তারপর করিম বললো, "বাড়ি আয়।"

বেলাল জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। গাজীপুরের রাস্তা। রিকশা, সিএনজি, মানুষ। ধুলো।

"বাড়িতে কী আছে?"

করিম কিছু বললো না। দুইজনেই জানে উত্তরটা। করিম জমি বেচে দিয়েছে। দুই বিঘা ছিলো। ধান হতো। কিন্তু বন্যায় দুইবার ফসল গেলো, ধার বাড়লো, শেষে জমি গেলো। এখন করিমের বাড়ি আছে, উঠোন আছে, কিন্তু জমি নেই। জমি ছাড়া রংপুরে ফিরে কী করবে বেলাল? দোকানে কাজ? রিকশা চালানো? সেটা গাজীপুরেও করা যায়।

"চাচা?"

"হুম?"

"কিছু না।"

ফোন কেটে গেলো।

বেলাল ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকালো। ধানক্ষেতের ওয়ালপেপার। সবুজ। আকাশে সাদা মেঘ। সেই দিনটার কথা মনে পড়লো। গাজীপুরে আসার আগের দিন। বিকেলে ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিলো। তখন ক্ষেত করিম চাচার ছিলো। এখন ক্ষেত অন্য কারো। ছবিটা বেলালের।

দুই সপ্তাহ কেটে গেলো।

বেলাল প্রতিদিন কাজ করলো। ঠিক সময়ে ঢুকলো, ঠিক সময়ে বের হলো। সেলাই করলো। তিনশো পিস। কখনো তিনশো দশ। কখনো দুইশো নব্বই। কিন্তু প্রতিদিন করলো। শেষ দিনও করলো।

শেষ দিনে এইচআর থেকে একটা কাগজ দিলো। সেপারেশন লেটার। তিন মাসের বেতন দেবে। গ্র্যাচুইটি। ট্রেনিং প্রোগ্রামে যোগ দেওয়ার সুযোগ আছে, অন্য কাজ শেখার জন্য। বেলাল কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখলো।

জিনিসপত্র গোছালো। বেশি কিছু নেই। একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে সব ধরে যায়। একটা লুঙ্গি, যেটা সে লাঞ্চের পর পাল্টে নিতো। একটা গামছা। একটা সাবানের কৌটা, প্রায় শেষ। একটা ছোট তোয়ালে। লকার থেকে এগুলো বের করে ব্যাগে ভরলো।

আনোয়ার ভাই এসে কাঁধে হাত রাখলো। কিছু বললো না। শুধু হাত রাখলো। বেলাল মাথা নাড়লো। শাহানা আপা দূর থেকে তাকালো। তার চোখে কিছু ছিলো, ভয় হতে পারে, কারণ লাইন আটও বন্ধ হবে, শাহানা আপার লাইন।

বেলাল প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে নিয়ে ফ্লোর থেকে বের হলো। সিঁড়ি দিয়ে নামলো। গেটের কাছে এসে থামলো।

ঘড়িটা দেখলো। সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। ঘড়ির কাচে সেই ফাটল। তিন থেকে নয়। ঘড়ি চলছে। ফাটল নিয়েই চলছে।

গেটের বাইরে পা রাখতে গিয়ে বেলাল ডানদিকে তাকালো। ফ্যাক্টরির দোতলায় একটা ঘর, কাচের জানালা। আলো জ্বলছে। ওটা কোয়ালিটি সেকশনের অফিস। রহিমা আপার ঘর।

রহিমা আপাকে বেলাল চেনে। সবাই চেনে। আঠারো বছর ধরে আছেন। ফ্যাক্টরির সবচেয়ে পুরনো কর্মী। কথা বলেছে কয়েকবার। রহিমা আপা বলেছিলেন, "দ্রুত হও, কিন্তু ভুল কোরো না। দ্রুত আর তাড়াহুড়ো এক জিনিস না।" বেলাল মনে রেখেছিলো।

রহিমা আপার ঘরে আলো জ্বলছে। রহিমা আপা এখনো কাজ করছে। ক্যামেরা মেশিন আসার পরেও রহিমা আপা আছে। কীভাবে আছে বেলাল জানে না। হয়তো অন্য কাজ দিয়েছে। হয়তো ক্যামেরার পাশে বসে ক্যামেরা যা দেখে সেটা দেখছে। হয়তো ক্যামেরাকে শেখাচ্ছে। বেলাল জানে না।

বেলাল ভেতরে যায়নি। রহিমা আপার কাছে গিয়ে কী বলবে? বিদায় নেবে? রহিমা আপা ব্যস্ত। বেলাল যাওয়ার কথা বললে রহিমা আপা কী বলবে? "ভালো থাকো"? বলবে হয়তো। কিন্তু সেটা শুনে বেলালের কী হবে?

বেলাল গেটের বাইরে বের হলো।

রাস্তায় হাঁটছে বেলাল।

প্লাস্টিকের ব্যাগ ডান হাতে। ব্যাগটা হালকা। দুই বছরের জিনিসপত্র একটা ব্যাগে ধরে যায়। দুই বছরের ক্যালাস একটা ব্যাগে ধরে না।

গাজীপুরের রাস্তায় সন্ধ্যার আলো। দোকানগুলোতে বাতি জ্বলছে। চায়ের দোকানে লোক বসে আছে। একটা রিকশায় একজন মহিলা বাচ্চা কোলে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে একটা কুকুর শুয়ে আছে। বেলাল হাঁটছে।

সে ভাবছে কোথায় যাবে। রংপুরে যাওয়ার কিছু নেই। গাজীপুরে থাকার কিছু নেই। ঢাকায় যাবে? কী করবে ঢাকায়? আরেকটা ফ্যাক্টরি? সেখানেও মেশিন আসবে। রিকশা চালাবে? সেটাও মেশিন নেবে, বেলাল শুনেছে ইলেকট্রিক রিকশা আসছে। ড্রাইভার? গাড়ি চালাতে জানে না। দোকান? পুঁজি নেই।

বেলাল থামলো। রাস্তার পাশে একটা বেঞ্চ। চায়ের দোকানের। বসলো। চা অর্ডার করলো না। শুধু বসলো।

হাতের দিকে তাকালো।

ডান হাতের তালু। ক্যালাস। শক্ত চামড়া। হলুদ রঙ। প্রথম মাসে ফোস্কা পড়েছিলো। দ্বিতীয় মাসে ফোস্কা কমেছিলো। তৃতীয় মাসে চামড়া শক্ত হয়েছিলো। ছয় মাসে হাত তৈরি হয়েছিলো। দুই বছরে হাত পাকা হয়েছিলো।

মেশিনগুলো দুই সপ্তাহে বসেছে। আনপ্যাক, সেটআপ, ক্যালিব্রেশন, ট্রায়াল রান। দুই সপ্তাহ।

বেলাল হাত মুঠো করলো। তারপর খুললো। আবার মুঠো করলো। আবার খুললো।

হাতগুলো কাজ চায়। দুই বছর ধরে এই হাত প্রতিদিন কাজ করেছে। সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা। কাজ না করলে হাত অস্থির হয়। যেমন পা অস্থির হয় হাঁটতে না পারলে। হাত একটু কাঁপছে। ক্লান্তি না। খালি হাতের কাঁপুনি।

বেলাল উঠলো। হাঁটতে শুরু করলো। কোথায় যাচ্ছে সে জানে না। শুধু হাঁটছে। প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে।

পেছনে ফ্যাক্টরির বিল্ডিং। দোতলার জানালায় আলো। রহিমা আপার ঘর। আলো জ্বলছে।

বেলাল পেছনে তাকালো না। সে হাঁটছে।