রশিদা একা শিখলো

প্রথম টাকা যেটা জাহিদের না

পর্ব ২৯ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

টিনের চালে লাউগাছ উঠেছে।

কবে উঠেছে রশিদা মনে করতে পারে না। গত বর্ষায় একটা বীজ পুঁতেছিল, চালের কিনারায়, যেখানে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ে। বীজটা গজিয়েছিল। তারপর লতা বেরিয়েছিল। তারপর লতা চালে উঠে গিয়েছিল। এখন পুরো চাল সবুজ। ঘরে আলো কম আসে। শাশুড়ি বলে, "এই গাছ কাট। ঘরে অন্ধকার।" রশিদা বলে, "কাটব না।" শাশুড়ি বলে, "কেন?" রশিদা বলে, "ভালো লাগে।"

এটুকুই। ভালো লাগে বলেই রাখা। কোনো কারণ দরকার নেই।

লাউ ধরেনি এখনো। হয়তো ধরবে। হয়তো ধরবে না। গাছটা আছে, এটাই যথেষ্ট।

সকালে উঠে রশিদা চাল ধুলো। মেয়ে সুমাইয়া স্কুলে গেছে। ছেলে ফারুক মাদ্রাসায়। শাশুড়ি উঠোনে বসে পান খাচ্ছে। বাড়িতে রশিদা একা।

জাহিদ আসছে।

দোহা থেকে। দুই সপ্তাহ হলো ফোনে বলেছে, "আমি আসতেছি। কাজ নাই।" তারপর থেকে টাকা আসেনি। আগে প্রতি মাসের পনেরো তারিখে টাকা আসত। কুড়ি হাজার। কখনো বাইশ। কখনো আঠারো। সেটা দিয়ে সংসার চলত। ভাড়া, বাচ্চাদের স্কুল, শাশুড়ির ওষুধ, চাল-ডাল-তেল। মাসের শেষে কিছু থাকত না, কিন্তু চলত।

এখন টাকা আসছে না। জাহিদ আসছে, কিন্তু এখনো আসেনি। ভিসা বাতিল হয়ে গেছে, টিকিট কাটতে দেরি হচ্ছে, কী একটা ঝামেলা। রশিদা পুরোটা বোঝে না। সে বোঝে টাকা নেই।

চালের ড্রামে চাল আছে আর এক সপ্তাহের। তেলের বোতলে তেল আছে তিন দিনের। শাশুড়ির ডায়াবেটিসের ওষুধ শেষ হয়ে গেছে গতকাল।

রশিদা উঠোনে গেল। কাপড় শুকাতে দিল। সুমাইয়ার স্কুলের জামা, ফারুকের পাঞ্জাবি, শাশুড়ির শাড়ি। নিজের একটা। কাপড় শুকানোর দড়িটা ঢিলে হয়ে গেছে। ঠিক করতে হবে। কিন্তু আজ না। আজ আরো দরকারি কাজ আছে। কী কাজ? রশিদা জানে না। এটাই সমস্যা। কিছু করার নেই, কিন্তু করার দরকার আছে। টাকা আনতে হবে। কীভাবে? রশিদা কোনোদিন টাকা আনেনি। জাহিদ আনত। রশিদা খরচ করত। এই ছিল ভাগাভাগি। দশ বছর ধরে।

শাশুড়ি ডাকল, "রশিদা, ওষুধ?"

"আনব, আম্মা।"

কিন্তু কীভাবে আনবে? ওষুধের দাম তিনশো টাকা। তিনশো টাকা কোথায়? ভাবী আশা করার কেউ নেই। বাবার বাড়িতে চাইতে পারে, কিন্তু বাবা নিজে অসুস্থ। ভাই চার সন্তানের বাবা, নিজেরই টানাটানি।

রশিদা উঠোনের কলপাড়ে গিয়ে মুখ ধুলো। ঠান্ডা পানি। চোখে লাগল। ভালো লাগল।

পাশের বাড়ির জরিনা এলো বিকেলে।

জরিনা রশিদার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। তার স্বামী মারা গেছে তিন বছর আগে। সে একা সংসার চালায়। কীভাবে চালায় পাড়ার কেউ ঠিক জানে না। জরিনা কারো কাছে ধার চায় না। কারো বাড়িতে কাজ করে না। কিন্তু তার ছেলে স্কুলে যায়, তার ঘরে চাল থাকে, তার শাড়ি পরিষ্কার থাকে।

"চা খাবি?" রশিদা জিজ্ঞেস করল।

"দে।"

রশিদা চা বানাতে গেল। চিনি কম দিল। চিনি বাঁচাতে হবে।

জরিনা চা খেতে খেতে বলল, "শুনলাম জাহিদ আসতেছে।"

"হ্যাঁ।"

"টাকা?"

রশিদা চুপ করে রইল। জরিনার সামনে মিথ্যা বলার দরকার নেই। জরিনা জানে। পুরো পাড়া জানে।

"শোন," জরিনা বলল। "তুই সেলাই পারিস তো?"

"পারি।"

রশিদা সেলাই পারে। ভালোই পারে। বিয়ের আগে মায়ের কাছে শিখেছিল। থ্রি-পিস, ব্লাউজ, কামিজ, সালোয়ার। বিয়ের পর আর করেনি। জাহিদ বলেছিল, "তোমার কাজ করার দরকার নেই। আমি পাঠাচ্ছি তো।"

"তুই সেলাই কর। বাড়িতে বসেই করতে পারবি। আমি কাস্টমার দিতে পারব।"

"কাস্টমার কোথা থেকে পাবি?"

জরিনা ফোন বের করল। একটা বোতামওয়ালা ফোন। স্মার্টফোন না। সাধারণ ফোন। ছোট স্ক্রিন, বড় বোতাম।

"ফেসবুকে না," জরিনা বলল। "আমি নেত্রকোনা শহরের কয়েকটা গ্রুপে পোস্ট দিই। ফোনে অর্ডার আসে। সেলাই করে দিই। বিকাশে টাকা নিই।"

"বিকাশ?"

"হ্যাঁ। ফোনে টাকা আসে। হাতে ধরতে হয় না।"

রশিদা বিকাশের নাম শুনেছে। জাহিদ মাঝে মাঝে বিকাশে টাকা পাঠাত। রশিদা দোকানে গিয়ে তুলে আনত। কিন্তু নিজে বিকাশ চালানো? সেটা সে কখনো করেনি।

"আমি পারব?" রশিদা জিজ্ঞেস করল।

জরিনা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। রশিদার দিকে তাকাল। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তারপর বলল না। শুধু বলল, "পারবি।"

একটু চুপ থেকে আবার বলল, "আমিও পারতাম না। তিন বছর আগে। স্বামী মারা যাওয়ার পর কেউ একজন শেখাল। এখন পারি।"

রশিদা জিজ্ঞেস করল না কে শেখাল। জরিনাও বলল না। কিছু কিছু জিনিস বলার দরকার হয় না।

পরদিন জরিনা এলো। সাথে নিজের ফোন।

"তোর ফোন আন।"

রশিদা ফোন আনল। জাহিদ যাওয়ার আগে একটা ফোন কিনে দিয়ে গিয়েছিল। সস্তা ফোন। কল করা যায়, মেসেজ পাঠানো যায়। রশিদা শুধু কল করে। মেসেজ পড়তে পারে, কিন্তু লিখতে পারে না। অক্ষরগুলো খুঁজে পায় না।

জরিনা বসল। রশিদার ফোন হাতে নিল।

"দেখ। এই নম্বরে ডায়াল কর। *247#।"

রশিদা ডায়াল করল। স্ক্রিনে কিছু একটা এলো। বাংলায় লেখা।

"এখন 1 চাপ।"

রশিদা 1 চাপল।

"এখন তোর নম্বর দে।"

জরিনা ধাপে ধাপে দেখাল। রেজিস্ট্রেশন। পিন সেট করা। "পিন মানে তালা। তোর তালা। কেউ জানবে না। আমাকেও বলবি না।"

রশিদা পিন দিল। চারটা সংখ্যা। সুমাইয়ার জন্মসাল।

"এখন তোর বিকাশ আছে।"

রশিদা ফোনের দিকে তাকাল। কিছু বদলায়নি। একই ফোন। একই ছোট স্ক্রিন। কিন্তু ভেতরে কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে রশিদা ঠিক বুঝতে পারছে না।

জরিনা আরো দেখাল। টাকা পাঠানো। টাকা নেওয়া। ব্যালেন্স দেখা। "এই *247# দিয়ে সব হয়। ভুলবি না।"

রশিদা একটা কাগজে লিখে রাখল। *247#। কাগজটা আলনার নিচে রাখল, শাড়ির ভাঁজের ভেতর।

জরিনা প্রথম কাস্টমার দিল তিন দিন পর।

"আমার এক কাস্টমার আছে, শহরে। একটা থ্রি-পিস সেলাই করাতে চায়। কাপড় পাঠাবে বাসে। তুই মাপ নিয়ে করে দিবি। পাঁচশো টাকা।"

কাপড় এলো পরদিন। নীল কটন। ভালো কাপড়। রশিদা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। কাপড়ের মান বোঝা রশিদার শরীরে আছে। আঙুলে আছে। এটা ভালো কাপড়।

সেলাই মেশিনটা ছিল ঘরের কোণায়। মায়ের দেওয়া। বিয়ের সময় সাথে এসেছিল। সাত বছর হলো চালায়নি। রশিদা কভার সরাল। ধুলো উড়ল। প্যাডেলে পা দিল। একটু শক্ত। তেল দরকার। সেলাই মেশিনের তেল বাড়িতে নেই। জরিনার কাছ থেকে আনল।

তেল দিল। প্যাডেলে পা দিল। মেশিন ঘুরল। আওয়াজটা চেনা। সাত বছর আগের আওয়াজ। রশিদার হাত মনে রেখেছে কাপড় কীভাবে ধরতে হয়, কীভাবে ঘোরাতে হয়, কোথায় থামতে হয়।

প্রথম সেলাইটা একটু বাঁকা হলো। রশিদা থামল। সুই তুলল। সেলাই খুলল। আবার করল। এবার সোজা।

সন্ধ্যায় শাশুড়ি এসে দাঁড়াল দরজায়। সেলাই মেশিনের আওয়াজ শুনে এসেছে।

"কী করছিস?"

"সেলাই।"

"কার?"

"একজনের।"

শাশুড়ি আর কিছু বলল না। একটু দাঁড়িয়ে দেখল। তারপর চলে গেল। শাশুড়ি জানে টাকা নেই। শাশুড়ি জানে ওষুধ নেই। শাশুড়ি কিছু বলে না। চুপচাপ থাকে। এটাও একধরনের সাহায্য।

রাতে মোমবাতির আলোয় সেলাই করল রশিদা। বিদ্যুৎ আসেনি। লোডশেডিং। মোমবাতির আলোয় কাপড়ের রঙ ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু হাত বোঝে। আঙুল বোঝে। সুই কোথায় যাচ্ছে, সুতা কোথায় যাচ্ছে, হাত জানে।

দুই দিন লাগল। থ্রি-পিস তৈরি হলো। রশিদা দেখল। সেলাই সোজা। ফিটিং ঠিক আছে। গলার কাটটা একটু গভীর হয়ে গেছে, কিন্তু কাস্টমার যেভাবে বলেছে সেভাবেই।

জরিনাকে দেখাল। জরিনা বলল, "ভালো হয়েছে।"

"সত্যি?"

"সত্যি। তুই আগেও পারতি। ভুলে গেছিলি।"

রশিদা কিছু বলল না। ভুলে গেছিল? না, ভোলেনি। হাত ভোলেনি। চোখ ভোলেনি। শুধু করেনি। করার কথা ছিল না। জাহিদ পাঠাচ্ছিল, করার দরকার ছিল না। দরকার না থাকলে মানুষ করে না। দরকার হলে করে। এখন দরকার হয়েছে। এখন করছে।

কাপড় ভাঁজ করে পলিথিনে মুড়ল রশিদা। সুমাইয়াকে ডাকল। "এটা নিয়ে যা, বাসস্ট্যান্ডে শামসু ভাইকে দিবি। বলবি নেত্রকোনা শহরে নাসরিন বেগমের কাছে পৌঁছে দিতে।" সুমাইয়া পলিথিন নিয়ে দৌড়ে গেল।

জরিনা কাস্টমারকে ফোন করল।

দুই দিন পর ফোন বাজল।

রশিদা ফোন তুলল। একটা মেসেজ। বাংলায় লেখা। রশিদা ধীরে ধীরে পড়ল।

"আপনার বিকাশ একাউন্টে 500 টাকা জমা হয়েছে।"

রশিদা মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

পাঁচশো টাকা।

এটা জাহিদের পাঠানো টাকা না। এটা কারো দয়া না। এটা ধার না। এটা রশিদার টাকা। রশিদার হাতের কাজের টাকা। রশিদার সেলাই মেশিনের আওয়াজের টাকা।

রশিদা ফোন হাতে নিয়ে বসে রইল। উঠোনে বসে। শাশুড়ি ঘরের ভেতরে। বাচ্চারা স্কুলে। বাড়িতে কোনো আওয়াজ নেই। শুধু দূরে একটা কাক ডাকছে। আর টিনের চালে লাউগাছের পাতা বাতাসে নড়ছে। সবুজ ছায়া পড়ছে উঠোনে।

রশিদা ফোনের স্ক্রিনে আবার তাকাল। 500 টাকা। সংখ্যাটা ছোট। পৃথিবীর হিসেবে কিছুই না। কিন্তু রশিদার হিসেবে এটা অন্য কিছু। কী সেটা, সে ভাষায় বলতে পারবে না। সে পড়াশোনা করা মানুষ না। সে বড় বড় কথা জানে না। সে শুধু জানে, এই টাকাটা তার।

কতক্ষণ বসে ছিল রশিদা জানে না। বিকেলের রোদ সরে গেল। ছায়া লম্বা হলো। সুমাইয়া স্কুল থেকে ফিরল।

"আম্মু, কী হইছে?"

রশিদা তাকাল। সুমাইয়া দাঁড়িয়ে আছে গেটের কাছে। স্কুলের সাদা জামা ধুলোয় ময়লা হয়ে গেছে। চুলের বেণি খুলে গেছে। পায়ে স্যান্ডেল নেই, হাতে ধরা।

"কিছু না।"

কিন্তু রশিদা হাসল। ছোট একটা হাসি। ঠোঁটের কোণায়। চোখে না, মুখে। যে হাসি আসে যখন মানুষ বুঝতে পারে সে এমন কিছু পারে যেটা সে জানত না সে পারে।

সুমাইয়া কিছু বলল না। ভেতরে চলে গেল। ব্যাগ ফেলে পানি খেতে গেল।

রশিদা ফোনটা শাড়ির আঁচলে মুড়ে রাখল।

সন্ধ্যায় জরিনা এলো।

"টাকা পেয়েছিস?"

"পেয়েছি।"

"আরো দুইটা অর্ডার আছে। একটা সালোয়ার-কামিজ, একটা ব্লাউজ। পারবি?"

"পারব।"

জরিনা চলে গেল। রশিদা সেলাই মেশিনের কাছে গেল। কভারটা আবার সরাল। মেশিনটার গায়ে হাত রাখল। ঠান্ডা লোহা। পুরনো। কালো রঙ কিছু জায়গায় উঠে গেছে। প্যাডেলের রাবার ক্ষয়ে গেছে। কিন্তু মেশিন চলে। সুই ওঠে, সুই নামে। সুতা যায়, সেলাই হয়।

রাতে বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে রশিদা বিছানায় বসল। ফোন খুলল। *247#। ব্যালেন্স দেখল। 500 টাকা।

পাঁচশো টাকা দিয়ে কী হয়? শাশুড়ির একদিনের ওষুধ হয়। সুমাইয়ার খাতা-কলম হয়। দুই কেজি চাল হয়। বেশি কিছু না।

কিন্তু রশিদা হিসেব করতে লাগল। দুইটা অর্ডার আসছে। সালোয়ার-কামিজ আটশো, ব্লাউজ তিনশো। মোট এগারোশো। প্লাস এই পাঁচশো। মোট ষোলোশো। এক সপ্তাহে ষোলোশো।

মাসে? রশিদা গুনল। আঙুলে গুনল। চার সপ্তাহে ছয় হাজার। যদি অর্ডার বাড়ে? আট হাজার? দশ হাজার?

জাহিদ পাঠাত কুড়ি হাজার। রশিদা কোনোদিন কুড়ি হাজার কামাতে পারবে না। সে জানে। কিন্তু ছয় হাজার? আট হাজার? সেটা সে পারবে।

রশিদা ফোন বন্ধ করল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল।

তারপর আবার চোখ খুলল। উঠে বসল। আলনার কাছে গেল। শাড়ির ভাঁজের ভেতর থেকে কাগজটা বের করল। যেটায় *247# লেখা। কাগজের উলটো পিঠে একটা কলম দিয়ে লিখল:

কামিজ -- ৫০০ সালোয়ার-কামিজ -- ৮০০ ব্লাউজ -- ৩০০ থ্রি-পিস -- ৫০০

এটা রেট লিস্ট। রশিদার প্রথম রেট লিস্ট। সে জানে না এটাকে রেট লিস্ট বলে। সে শুধু জানে, দাম লিখে রাখলে ভুলে যাওয়ার ভয় নেই।

কাগজটা আবার শাড়ির ভাঁজে রাখল।

বিছানায় ফিরল। এবার ঘুম এলো।

বাইরে টিনের চালে লাউগাছ চুপচাপ বসে আছে। কেউ তাকে পানি দেয়নি আজ। কিন্তু গাছ আছে। বেড়ে যাচ্ছে। কোনো কারণ ছাড়াই।