রহিমার শেষ দিন

পর্ব ৩১ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

দেয়ালে একটা ফাটল আছে।

রহিমা আঠারো বছর ধরে এই ফাটল দেখে আসছে। যেদিন প্রথম কারখানায় ঢুকেছিলো, সেদিন ফাটলটা ছিলো একটা চুলের মতো সরু রেখা, তৃতীয় তলার সিঁড়ির পাশের দেয়ালে, প্লাস্টারের নিচে হালকা একটা দাগ। কেউ খেয়াল করতো না। রহিমা করতো। সে সবকিছু গোনে, সবকিছু দেখে, সবকিছু খেয়াল করে। এটা তার ভালো গুণ নাকি খারাপ গুণ সেটা সে জানে না।

ফাটলটা প্রতি বছর একটু একটু বেড়েছে। বর্ষায় বাড়তো, শীতে থামতো। কোনো বছর বেশি বাড়তো, কোনো বছর কম। রহিমা মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে দেখতো, যেভাবে মানুষ বাচ্চার বেড়ে ওঠা দেখে। ফাটলটা তার পরিচিত। কারখানার আর কিছু তার এত পরিচিত না।

আজ সকালে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে রহিমা দেখলো ফাটলটা জানালায় পৌঁছে গেছে। তৃতীয় তলার সিঁড়ির পাশের জানালা, যেটা দিয়ে নিচের চা-দোকান দেখা যায়, সেই জানালার কাঠের ফ্রেম পর্যন্ত ফাটল গেছে। আঠারো বছরে সিঁড়ির নিচ থেকে জানালা পর্যন্ত।

রহিমা একটু দাঁড়ালো। ফাটলের দিকে তাকালো। ফাটলটা এখন একটা নদীর মতো। ছোট নদী, শুকনো, প্লাস্টারের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। রহিমা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখলো। প্লাস্টার একটু খসে পড়লো। সাদা গুঁড়ো তার আঙুলে লাগলো।

সে আঙুল ঝেড়ে তার ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলো।

ঘরে ঢুকে বসলো।

ঘর বলতে একটা ছোট অফিস। একটা টেবিল, একটা চেয়ার, দেয়ালে একটা হোয়াইটবোর্ড, টেবিলে একটা কম্পিউটার। এই ঘরটা রহিমার পাঁচ বছর ধরে। তার আগে সে ফ্লোরে বসতো, মেশিনের পাশে, সবার সাথে। সুপারভাইজর হওয়ার পর ঘর পেয়েছে। ছোট ঘর, কিন্তু ঘর। দরজা বন্ধ করা যায়। একা বসা যায়।

কম্পিউটারের পর্দা জ্বলছে। নতুন সিস্টেম। ছয় মাস আগে বসেছে। একটা ড্যাশবোর্ড। সব লাইনের উৎপাদন দেখা যায়, প্রতিটা মেশিনের গতি, প্রতিটা অপারেটরের আউটপুট, ত্রুটির হার, সময়ের হিসাব। রহিমার কাজ ছিলো এই সব দেখা, বোঝা, সিদ্ধান্ত নেওয়া। কোন লাইনে সমস্যা, কোন অপারেটরের সাহায্য দরকার, কোথায় ঠিক করতে হবে। রহিমা এটা ভালো পারতো। আঠারো বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে পারতো। চোখ দিয়ে দেখতো, কান দিয়ে শুনতো, মেশিনের আওয়াজ শুনে বুঝতো কোথায় সুতা আটকেছে।

ড্যাশবোর্ড এখন সেটা নিজে করে।

রহিমা জানতো। ধীরে ধীরে বুঝেছে। ড্যাশবোর্ড আসার পর তার কাজ কমেছে। আগে সে প্রতিদিন ফ্লোরে যেতো, প্রতিটা লাইন দেখতো। এখন ড্যাশবোর্ড দেখলেই হয়। ড্যাশবোর্ড নিজেই বলে দেয় কোন লাইনে সমস্যা, কোথায় ত্রুটি বেশি, কোথায় গতি কমেছে। রহিমাকে শুধু দেখতে হয়। মাঝে মাঝে সে ভাবে, ড্যাশবোর্ড যখন সব বলে দিচ্ছে, তখন সে কী করছে? সে ড্যাশবোর্ড দেখছে। ড্যাশবোর্ডই তো দেখানোর জন্য। তাহলে রহিমা দরকার কেন? যে কেউ দেখতে পারে।

সে এই প্রশ্নটা নিজেকে করেনি। মানুষ এরকম প্রশ্ন নিজেকে করে না। মানুষ জানে, কিন্তু জিজ্ঞেস করে না। জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসবে, আর উত্তরটা যদি খারাপ হয়? তাহলে তো সেটা নিয়ে বাঁচতে হবে। না জানলে অন্তত একটু আশা থাকে।

রহিমার ঘরে একটা জানালা আছে। জানালা দিয়ে নিচের রাস্তা দেখা যায়। রিকশা যাচ্ছে, মানুষ হাঁটছে, দূরে একটা চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে। রহিমা প্রতিদিন এই জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। বেলা বারোটার দিকে রোদ সরাসরি জানালায় পড়ে, টেবিলে একটা চৌকোনা আলো তৈরি হয়, রহিমা তখন পর্দা টানে। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো তার দিনের অংশ। আঠারো বছরের অভ্যাস।

সকাল দশটায় সায়েম সাহেব ঘরে এলেন।

সায়েম সাহেব এখন জেনারেল ম্যানেজার। ছয় মাস আগে প্রমোশন হয়েছে। আগে ফ্লোর ম্যানেজার ছিলেন। রহিমার ওপরের মানুষ। সায়েম সাহেব ভালো মানুষ না খারাপ মানুষ সেটা রহিমা কখনো ভাবেনি। সে শুধু জানে সায়েম সাহেব কথা কম বলেন, ডান হাতে কলম ঘোরান যখন চিন্তা করেন, আর চা খান দুধ ছাড়া।

সায়েম সাহেবের হাতে একটা খাম।

বাদামি খাম।

রহিমা দেখলো। চিনে ফেললো। ছয় মাস আগে এইরকম খাম দুইশোটা একটা কলার কার্টনে করে তার টেবিলে এসেছিলো। সে সেগুলো বিলি করেছিলো। তলায় তলায়। লাইনে লাইনে। সালেহাকে দিয়েছিলো। জরিনাকে দিয়েছিলো। নাজমাকে দিয়েছিলো। পারভীনকে দিয়েছিলো। দুইশো জনকে দিয়েছিলো।

এবার খাম একটা।

সায়েম সাহেব খামটা টেবিলে রাখলেন। কিছু বললেন না। তারপর বললেন, "রহিমা আপা, বসুন।"

রহিমা বসেই আছে। সে সায়েম সাহেবের দিকে তাকালো।

"নতুন সিস্টেমে সুপারভাইজর পদটা আর নেই। ড্যাশবোর্ড সব দেখাচ্ছে। ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত।"

রহিমা কিছু বললো না।

"দুই মাসের বেতন দেবে। গ্র্যাচুইটি আছে। আঠারো বছরের, ভালো অঙ্ক হবে।"

রহিমা খামটার দিকে তাকালো। বাদামি খাম। একই খাম। একই মাপ। একই কাগজ।

"চা খাবেন?" সায়েম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন। অভ্যাসবশত। কেউ এলে তিনি চা অফার করেন।

"না।"

সায়েম সাহেব একটু দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, "আপনি চাইলে আজকে যেতে পারেন, মাসের শেষেও যেতে পারেন।"

"ঠিক আছে।"

সায়েম সাহেব চলে গেলেন। দরজা খোলা রেখে গেলেন।

রহিমা খামটা তুললো।

ওজন হালকা। একটা কাগজ। তার ভেতরে কয়েকটা শব্দ। সেই শব্দগুলো বলছে রহিমা আর আসবে না।

সে খামটা খুললো। কাগজটা বের করলো। পড়লো। "সেপারেশন লেটার" লেখা ওপরে। নিচে তার নাম, পদবি, যোগদানের তারিখ, শেষ কর্মদিবস। সব ইংরেজিতে।

সে কাগজটা ভাঁজ করলো। ধীরে, সমানভাবে। প্রথমে অর্ধেক, তারপর আবার অর্ধেক। চারভাগ।

সালেহাও এইভাবে ভাঁজ করেছিলো। সেদিন। ছয় মাস আগে। রহিমা যখন খামটা বাড়িয়ে দিয়েছিলো, সালেহা খুলে পড়েছিলো, তারপর ভাঁজ করে ব্যাগে রেখেছিলো। কাঁদেনি। বলেছিলো, "চা খাওয়াও তো শেষবারের মতো।"

রহিমা কাগজটা ব্যাগে রাখলো।

সালেহা সেদিন চা চেয়েছিলো। রহিমা আজ চায়নি। সায়েম সাহেব অফার করেছিলেন, রহিমা বলেছে "না।" কেন বললো সে জানে না। হয়তো সালেহার কথা মনে পড়েছে। সালেহার সাথে সেটা শেষবারের চা ছিলো। রহিমা আর কোনো শেষবারের চা চায় না।

সে কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকালো। ড্যাশবোর্ড জ্বলছে। সংখ্যা চলছে। উৎপাদন চলছে। ত্রুটির হার কমেছে। গতি বেড়েছে। সবকিছু ভালো। ড্যাশবোর্ডের হিসেবে সবকিছু আগের চেয়ে ভালো।

রহিমা কম্পিউটার বন্ধ করলো। পর্দা কালো হলো।

সে ড্রয়ার খুললো। ভেতরে কিছু নেই তেমন। একটা কলম, একটা ছোট আয়না, একটা চিরুনি, একটা পুরনো ক্যালকুলেটর যেটা আর চলে না। সে কলমটা নিলো। আয়না আর চিরুনি নিলো। ক্যালকুলেটরটা রেখে দিলো।

ব্যাগ তুললো। দরজার কাছে গিয়ে একবার ঘুরে তাকালো।

ঘরটা ছোট। কিন্তু এই ঘরে পাঁচ বছর কেটেছে। প্রতিদিন সকাল আটটায় ঢুকেছে, সন্ধ্যা ছয়টায় বের হয়েছে। এই চেয়ারে বসে চা খেয়েছে, ফোনে কথা বলেছে, মিতুর স্কুলের কথা শুনেছে, আলমকে বলেছে কটায় আসতে হবে। এই টেবিলে উৎপাদনের হিসাব করেছে, ত্রুটি খুঁজেছে, সমাধান খুঁজেছে। এই হোয়াইটবোর্ডে মার্কার দিয়ে লাইনের নম্বর লিখেছে, তারিখ লিখেছে, মুছে আবার লিখেছে।

হোয়াইটবোর্ডে এখনো কিছু লেখা আছে। গতকালের। রহিমা মুছলো না। কেউ একদিন মুছবে। অথবা মুছবে না।

সে ঘর থেকে বের হলো।

রহিমা ফ্লোরে গেলো না।

সে সোজা সিঁড়ি দিয়ে নামলো। তৃতীয় তলা, দ্বিতীয় তলা, প্রথম তলা। সিঁড়ির ধাপ গুনলো না। আজকে গোনার ইচ্ছা নেই।

সিঁড়ির পাশের দেয়ালে ফাটলটা আছে। আঠারো বছরের ফাটল। নিচ থেকে জানালা পর্যন্ত। রহিমা থামলো না। দেখলো, কিন্তু থামলো না।

নিচতলায় মতিনের চায়ের দোকান। মতিন আজও আছে। কেটলি থেকে ধোঁয়া উঠছে। মতিন রহিমাকে দেখে বললো, "মা, চা?"

"না, মতিন চাচা।"

মতিন কিছু বললো না। রহিমা কখনো চা ফেরায় না। আঠারো বছরে একদিনও ফেরায়নি। আজ ফিরিয়েছে। মতিন বুঝলো কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলো না। মতিন বুড়ো মানুষ। বুড়ো মানুষেরা জানে কখন জিজ্ঞেস করতে হয়, কখন চুপ থাকতে হয়।

রহিমা গেটের দিকে হাঁটলো। গেটের কাছে সিকিউরিটি গার্ড মজিদ। মজিদ বসে আছে প্লাস্টিকের চেয়ারে, হাতে একটা খবরের কাগজ। কাগজটা উলটো ধরা, মজিদ ছবি দেখছে।

রহিমা গেটের কাছে এলো।

মজিদ মুখ তুললো। "আপা, আজ তাড়াতাড়ি?"

রহিমা কিছু বললো না। মাথা নাড়লো।

মজিদ গেট খুললো। রহিমা বের হতে যাচ্ছে।

"আপা।"

রহিমা ঘুরে তাকালো।

"কাল আসবেন তো?"

রহিমা তাকিয়ে রইলো মজিদের দিকে। মজিদ জানে না। মজিদের কাছে খবর পৌঁছায়নি। মজিদ ভাবছে আজ তাড়াতাড়ি যাচ্ছে, কাল আবার আসবে, পরশুও আসবে, যেভাবে আঠারো বছর এসেছে।

"হ্যাঁ।"

রহিমা বের হয়ে গেলো।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে রহিমা ভাবলো, সে কেন মিথ্যা বললো।

মজিদকে বলতে পারতো, "না, আর আসবো না।" বলতে পারতো, "আজ শেষ দিন।" বলতে পারতো কিছু একটা যেটা সত্য। কিন্তু সে বললো "হ্যাঁ।"

হ্যাঁ মানে কাল আসবে। কাল আসবে না। সে জানে। মজিদ জানে না। কাল সকালে মজিদ অপেক্ষা করবে। রহিমা আসবে না। মজিদ বুঝবে। কেউ একটা বলবে। মজিদ মাথা নাড়বে। তারপর পরের দিন আবার গেট খুলবে, অন্য কেউ আসবে, কিংবা কেউ আসবে না, গেট একসময় বন্ধ হয়ে যাবে।

রহিমা রিকশার দিকে তাকালো। আলমের রিকশা আসবে সন্ধ্যায়। এখন দুপুর। আলম জানে না। মিতু জানে না। রাজু জানে না।

সে হাঁটতে শুরু করলো।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে কী বলবে? আলম জিজ্ঞেস করবে, "আজ তাড়াতাড়ি?" মিতু জিজ্ঞেস করবে, "মা, কী হইছে?" রাজু কিছু জিজ্ঞেস করবে না, রাজু কখনো জিজ্ঞেস করে না। রহিমা কী বলবে? "আমার চাকরি নেই"? এভাবে? এত সোজা? নাকি আস্তে আস্তে বলবে, "কারখানায় কিছু বদল হচ্ছে"? সেটাও সত্য। বদল হচ্ছে। বদলটা হলো রহিমা আর নেই।

ব্যাগে একটা বাদামি খাম। ভেতরে একটা কাগজ। কাগজে তার আঠারো বছরের শেষ।

রাস্তায় রোদ। গাজীপুরের রোদ তীব্র, ছায়া কম। রহিমা হাঁটছে। তার পায়ের নিচে রাস্তা গরম।

সে ভাবছে সালেহার কথা। সালেহা সেদিন বলেছিলো, "মাসের শেষে যেতে বললেও আজকে যাবো। বসে থেকে কী করবো?" সালেহা সেদিন চলে গিয়েছিলো। রিকশায় উঠেছিলো। রিকশা চলে গিয়েছিলো।

রহিমাও আজ চলে যাচ্ছে। মাসের শেষে যেতে পারতো। কিন্তু সেটা মানে আরো কুড়ি দিন সেই ঘরে বসে ড্যাশবোর্ড দেখা, যেটা তার ছাড়াও চলবে। সেটা সে পারবে না।

সালেহা কেমন আছে? রহিমা জানে না। ফোন করেনি। সালেহাও করেনি। ছয় মাস। চৌদ্দ বছর পাশাপাশি বসে কাজ করার পর ছয় মাসে একটাও ফোন নেই। কেন? রহিমা জানে না। হয়তো রহিমা সেই খামের সাথে জড়িয়ে গেছে সালেহার মাথায়। রহিমা মানেই বাদামি খাম। হয়তো সালেহা রহিমাকে দোষ দেয়। হয়তো দেয় না। হয়তো শুধু ভুলে গেছে। মানুষ ভুলে যায়। যে জায়গা ব্যথা দেয়, সেই জায়গার মানুষকেও ভুলে যায়।

রহিমা একটা রিকশা ডাকলো। রিকশায় উঠলো। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করলো, "কোথায়?"

"বাসা।"

রিকশা চললো। রাস্তায় গাড়ি, রিকশা, মানুষ। কারখানার বিল্ডিং পেছনে পড়ে যাচ্ছে। তৃতীয় তলার জানালা ছোট হয়ে যাচ্ছে। রহিমার ঘরের জানালা। আলো জ্বলছে। কম্পিউটার বন্ধ, কিন্তু আলো জ্বলছে। সে আলো নেভাতে ভুলে গেছে।

রিকশা ঘুরলো। বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে না আর।

রহিমা সামনের দিকে তাকালো। রাস্তা। রাস্তার দুইপাশে দোকান। মানুষ চলছে। রোদ পড়ছে। কোথাও একটা মাইকে আজান দিচ্ছে, জোহরের আজান, মসজিদ কাছে কোথাও।

রহিমার ব্যাগে একটা বাদামি খাম। একটা কলম। একটা ছোট আয়না। একটা চিরুনি। আঠারো বছরের জিনিসপত্র।

রিকশার চাকা ঘুরছে। রাস্তা চলছে। রহিমা বসে আছে।