করিমের জমি বিক্রি

পর্ব ৩২ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

দলিলের কাগজটা হলুদ।

পুরনো হলুদ না, নতুন হলুদ। সরকারি কাগজের রঙ। স্ট্যাম্পের গন্ধ আছে, কালির গন্ধ আছে। দলিল লেখক আব্দুল হক সাহেব লিখেছেন, ঝকঝকে হাতের লেখা, যেন পরীক্ষার খাতায় লিখছেন। আব্দুল হক সাহেব চল্লিশ বছর ধরে দলিল লেখেন। তার হাতের লেখা দেখে বোঝা যায় না কাগজে কী লেখা। সুন্দর লেখা পড়তে সময় লাগে।

করিম কাগজের দিকে তাকিয়ে আছে। নিচে তার স্বাক্ষরের জায়গা। একটা লাইন টানা, তার ওপর লেখা "বিক্রেতা।"

ক্রেতা আনোয়ার হোসেন। আনোয়ার হোসেনের নাম করিম আগেও শুনেছে। নেত্রকোনা শহরে ব্যবসা করেন। মাছের আড়ত, চালের আড়ত, সার-বীজের দোকান। এখন কোল্ড স্টোরেজ বানাবেন। আধুনিক। কম্পিউটারে সব চলবে। কখন কতটুকু ঠান্ডা দিতে হবে, কতদিন রাখা যাবে, সব মেশিন বুঝে নেবে।

করিম কোল্ড স্টোরেজ বোঝে না। সে বোঝে জমি।

"আট লাখ টাকা। সোয়া বিঘা," আনোয়ার হোসেন বললেন। ভুল বলেছেন। সোয়া বিঘা না, দেড় বিঘার কম। এক দশমিক দুই বিঘা। কিন্তু আনোয়ার সাহেব গোল করে বলেন। ব্যবসায়ীরা গোল করে বলে।

করিম ঠিক করলো না। আট লাখ টাকায় ঠিক করার কিছু নেই।

আব্দুল হক সাহেব কলমটা এগিয়ে দিলেন। কালো কালির বলপয়েন্ট। করিম কলমটা হাতে নিলো।

হাত কাঁপছে। করিম কলমটা রাখলো টেবিলে। আবার তুললো। আবার রাখলো।

আব্দুল হক সাহেব কিছু বললেন না। তিনি চল্লিশ বছর ধরে এই দেখে আসছেন। যারা জমি বেচে, তাদের হাত কাঁপে। যারা জমি কেনে, তাদের হাত কাঁপে না। এটা একটা নিয়ম। আব্দুল হক সাহেব নিয়মটা জানেন। তাই তিনি অপেক্ষা করেন।

এই জমি করিমের দাদা আবুল কাসেম পরিষ্কার করেছিলেন।

কবে, সেটা করিম ঠিক জানে না। করিমের বাবা বলতেন, "তোর দাদা এই জমি জঙ্গল কেটে বানাইছে। কত সাপ মারছে, কত গাছ কাটছে, তারপর ধান লাগাইছে।" বাবা বলতেন গর্ব করে। যেন জঙ্গল কেটে জমি বানানো একটা যুদ্ধ জেতার মতো।

করিমের বাবা মারা গেছেন বারো বছর আগে। মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, "জমি বেচিস না।" করিম বলেছিলো, "বেচবো না।" বাবা মারা গেলেন। করিম জমি রাখলো।

তারপর বন্যা এলো। ২০২৪ সালে। পুরো ফসল গেলো। ধার করলো করিম। সার কিনলো, বীজ কিনলো, আবার লাগালো। ফসল হলো কিছু। ধারের টাকা শোধ হলো না পুরো। আবার ধার। আবার ফসল। আবার বন্যা না, এবার দাম পড়ে গেলো। চালের দাম পড়লো, ধানের দাম পড়লো। বেলাল তখন গাজীপুরে গেলো কাজে। বেলালের টাকা দিয়ে কিছু ধার শোধ হলো।

তারপর বেলালের চাকরি গেলো। ফ্যাক্টরিতে নতুন মেশিন এসেছে, বেলালের লাইন বন্ধ হয়েছে। বেলাল ফোন করেছিলো, বলেছিলো, "চাচা।" শুধু "চাচা।" বাকিটা করিম বুঝে নিয়েছিলো।

ধার বাড়তে লাগলো। সুদ বাড়তে লাগলো। মহাজন তিনবার এসেছে, চায়ের দোকানে বসে কথা বলেছে, গলা নামিয়ে, যেভাবে মহাজনেরা বলে যখন তারা জানে টাকা আসবে না।

করিম সিদ্ধান্ত নিলো।

হালিমাকে বললো রাতে। ভাত খাওয়ার পর। বারান্দায় বসে। হালিমা কিছু বললো না। চুপচাপ শুনলো। তারপর ভেতরে চলে গেলো। সেই রাতে হালিমা কথা বলেনি আর। পরদিনও বেশি কথা বলেনি। তার পরদিনও না।

হালিমার বাবার জমি ছিলো। হালিমার বাবাও বিক্রি করেছিলেন। হালিমা জানে জমি বিক্রির মানে কী। তাই সে কথা বলে না। কথা বলে লাভ নেই।

করিম কলম ধরে বসে আছে। আব্দুল হক সাহেবের অফিস। ছোট ঘর। দেয়ালে ক্যালেন্ডার, একটা ঘড়ি যেটা পাঁচ মিনিট এগিয়ে, একটা ফ্যান ঘুরছে। আনোয়ার হোসেন চেয়ারে বসে আছেন, ফোনে কিছু দেখছেন, অপেক্ষা করছেন।

করিম সই করলো।

হাত কেঁপেছে। সই-এর শেষের দিকটা একটু বাঁকা হয়ে গেছে। কিন্তু হয়ে গেছে। আব্দুল হক সাহেব কাগজটা নিলেন, দেখলেন, মাথা নাড়লেন।

আনোয়ার হোসেন ফোন রেখে একটা চেক বের করলেন। ব্যাংকের চেক। আট লাখ টাকা। করিমের নামে। করিম চেকটা হাতে নিলো। কাগজ। আরেকটা কাগজ। একটা কাগজে জমি চলে গেলো, আরেকটা কাগজে টাকা এলো।

আনোয়ার হোসেন বললেন, "জমিটা ভালো জায়গায়। রোডের কাছে। কোল্ড স্টোরেজের জন্য পারফেক্ট।"

করিম কিছু বললো না। আনোয়ার হোসেন কোল্ড স্টোরেজের জন্য পারফেক্ট বলছেন। করিমের দাদা ধান লাগানোর জন্য জঙ্গল কেটেছিলেন। করিম ধান ফলিয়েছে তিরিশ বছর। এখন সেই জমিতে সবজি রাখা হবে ঠান্ডা ঘরে। মেশিন দেখবে কোন সবজি কতটা পাকলো।

আনোয়ার হোসেন উঠে দাঁড়ালেন। হাত বাড়ালেন। করিম হাত মেলালো। আনোয়ারের হাত নরম। করিমের হাত শক্ত। দুটো হাত মিলে একটা কাজ শেষ হলো।

আনোয়ার হোসেন চলে গেলেন। তার গাড়ি ছিলো বাইরে। সাদা পিকআপ ভ্যান। গাড়ি স্টার্ট হলো, ধুলো উড়লো, গাড়ি চলে গেলো। আব্দুল হক সাহেব দলিলটা তার ফাইলে রাখলেন। ফাইলটা আলমারিতে ঢোকালেন। আলমারিতে আরো অনেক ফাইল আছে। অনেক দলিল। অনেক জমি বিক্রি। অনেক কাঁপা হাত।

করিম উঠলো। আব্দুল হক সাহেবকে সালাম দিলো। আব্দুল হক সাহেব বললেন, "খোদা হাফেজ।" করিম বের হলো।

করিম আব্দুল হক সাহেবের অফিস থেকে বের হলো। রোদ। দুপুরের রোদ। রাস্তায় একটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। করিম রিকশায় উঠলো না।

সে হাঁটতে লাগলো।

বাড়ি গেলো না। সে জমির দিকে গেলো।

রাস্তা থেকে একটা মাটির পথ। পথের দুইপাশে আমগাছ। গরমে আম পাকেনি এখনো, কিন্তু গাছে সবুজ আম ঝুলে আছে। ছোটবেলায় করিম এই আম পেড়ে খেতো। কাঁচা আম লবণ দিয়ে। জিভ টক হয়ে যেতো। মা বকতো।

মাটির পথ শেষ হলো। সামনে জমি।

এক দশমিক দুই বিঘা। ধানক্ষেত। এখন ধান নেই। কাটা হয়ে গেছে। শুধু কুঁড়ে পড়ে আছে। মাটি শুকনো। ফাটল ধরেছে কোথাও কোথাও। ক্ষেতের মাঝে একটা পুরনো আল, উঁচু, সেটা দিয়ে হাঁটা যায়।

করিম আলে উঠলো। হাঁটতে লাগলো। ক্ষেতের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো।

চারদিকে খোলা। আকাশ বড়। রংপুরের আকাশ। বেলাল বলতো গাজীপুরে আকাশ ছোট। এখানে আকাশ বড়। দিগন্ত দেখা যায়। দূরে তালগাছ দাঁড়িয়ে আছে, একটা, দুইটা, তিনটা। পাখি ডাকছে কোথাও। কোন পাখি করিম জানে না। সে পাখি চেনে না। সে ধান চেনে। মাটি চেনে। বৃষ্টি চেনে। রোদ চেনে।

করিম নিচে তাকালো।

মাটি।

এই মাটিতে সে তিরিশ বছর ধরে ধান লাগিয়েছে। বীজ ছিটিয়েছে, চারা রোপণ করেছে, আগাছা তুলেছে, সার দিয়েছে, পানি দিয়েছে। এই মাটি তার হাতের স্পর্শ চেনে। করিমের পায়ের ছাপ আছে এই মাটিতে। বর্ষায় কাদায় ডুবে থেকেছে, রোদে পুড়ে শুকিয়েছে, শীতে ভোরের কুয়াশায় ভিজে থেকেছে।

করিম বসলো। আলের ওপর। পা ঝুলিয়ে দিলো ক্ষেতের মাটিতে।

সে কাটা ধানের কুঁড়ের দিকে তাকালো। কুঁড়েগুলো সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। ছোট ছোট। হলুদ। শুকনো।

"আমাকে মাফ করো," করিম বললো।

কুঁড়েগুলো কিছু বললো না। বাতাস বইলো। কুঁড়ে দুললো একটু। তারপর আবার স্থির।

করিম আবার বললো, "মাফ করো।" গলা ভাঙলো। চোখে পানি এলো কিনা সে জানে না। রোদে চোখ ঝাপসা হয়। রোদের দোষও হতে পারে।

ধানের কুঁড়ে কিছু বললো না। কোনোদিন বলেনি। ধান কথা বলে না। মাটি কথা বলে না। জমি কথা বলে না। এরা শুধু থাকে। মানুষ আসে, মানুষ যায়। এরা থাকে।

কিন্তু এবার করিম যাচ্ছে না। জমিই যাচ্ছে। জমি অন্য কারো হচ্ছে। আনোয়ার হোসেনের। যিনি কোল্ড স্টোরেজ বানাবেন। এই মাটি কেটে ফেলা হবে। সমতল করা হবে। কংক্রিট ঢালা হবে। দেয়াল উঠবে। ছাদ হবে। ভেতরে ঠান্ডা মেশিন বসবে। মেশিন চলবে। ধান আর হবে না এই মাটিতে।

করিম উঠলো। আলে দাঁড়িয়ে একবার চারদিকে তাকালো। আকাশ, মাটি, তালগাছ, পাখির ডাক। সব আছে। সব থাকবে। শুধু এই জমি আর করিমের না।

সে হাঁটতে লাগলো। আল দিয়ে। ধীরে ধীরে। তাড়া নেই কোথাও।

আলের শেষে একটা পুরনো বটগাছ। ছোট বটগাছ। বড় হতে পারেনি, কেউ ছেঁটে দিয়েছিলো কয়েক বছর আগে, বিদ্যুতের তার লাগছিলো বলে। বটগাছের নিচে একটা পাটাতন ছিলো, পচে গেছে। করিম ছোটবেলায় এই পাটাতনে বসে ভাত খেতো। দুপুরে। মাঠ থেকে বাবা ডাকতো, "করিম, ভাত আন।" করিম ভাত নিয়ে আসতো, বটগাছের নিচে বসে দুজন খেতো। গরম ভাত, ডাল, কাঁচামরিচ। ভাতের ধোঁয়া উঠতো। পিঁপড়ে আসতো। বাবা পিঁপড়ে তাড়াতো। করিম হাসতো।

করিম বটগাছ ছেড়ে রাস্তার দিকে হাঁটলো।

বাড়ি ফিরলো করিম।

উঠোনে ঢুকে দেখলো হালিমা ভেতরে। দরজা বন্ধ। বন্ধ মানে ভেজানো, চিটকিনি দেওয়া না। হালিমা বাইরে আসেনি। আসবে না। করিম জানে। হালিমা জানে করিম জমি বিক্রি করতে গেছে। হালিমা এই মুহূর্তে করিমের মুখ দেখতে চায় না। একজন মানুষ যে তার দাদার জমি বিক্রি করে ফিরে এসেছে, তার মুখে কী থাকে? লজ্জা? কষ্ট? স্বস্তি? হালিমা জানতে চায় না।

করিম উঠোনে দাঁড়ালো।

দরজার পাশে একটা দা রাখা আছে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে। দা-এর হাতলটা ভাঙা। কবে ভেঙেছে করিম মনে করতে পারে না। অনেকদিন। হাতলের কাঠ ফেটে গেছে, একটা টুকরো আলগা হয়ে ঝুলে আছে। করিম বলেছিলো ঠিক করবে। ঠিক করেনি। ঠিক করা হয়নি। দা-টা সেখানেই আছে, ভাঙা হাতল নিয়ে, দেয়ালে ঠেস দিয়ে।

করিম দা-এর দিকে তাকালো। তারপর ভেতরে গেলো না। বারান্দায় বসলো।

পকেটে চেক। আট লাখ টাকা। কাল ব্যাংকে যেতে হবে। চেক ভাঙাতে হবে। মহাজনের টাকা দিতে হবে। তিন লাখ মহাজনের। বাকি পাঁচ লাখ। পাঁচ লাখ দিয়ে কী হয়? বেলালকে কিছু দেওয়া যায়। বেলাল এখন রংপুরে, কাজ নেই। হালিমার ওষুধ, বাড়ির ছাদ মেরামত, শীতের কাপড়। তিন বছর? চার বছর? তারপর?

তারপর করিম জানে না।

সে বারান্দায় বসে আছে। সামনে উঠোন। উঠোনে একটা নিমগাছ। নিমগাছটা করিমের বাবা লাগিয়েছিলেন। সেটাও পুরনো। পাতা ঝরছে কিছু। নতুন পাতা গজাচ্ছে কিছু। গাছের কিছু যায় আসে না। গাছ জমির কথা জানে না। গাছ শুধু জানে মাটি, পানি, রোদ।

হালিমা ভেতর থেকে বললো, "ভাত দিই?"

"দে।"

হালিমা ভাত দিলো। ডাল, আলুভর্তা, শুকনো মরিচ ভাজা। করিম খেতে বসলো। হালিমা সামনে বসলো না। রান্নাঘরে চলে গেলো।

করিম একা খাচ্ছে। ভাতে ডাল মাখাচ্ছে। মুখে তুলছে। চিবাচ্ছে। গিলছে। আবার মুখে তুলছে। যান্ত্রিকভাবে। ক্ষুধা আছে কিনা জানে না। শরীরের অভ্যাস। দুপুরে ভাত খায়। তাই খাচ্ছে।

খাওয়া শেষ হলো। হাত ধুলো। থালাটা রান্নাঘরের দরজার কাছে রাখলো। হালিমা ভেতর থেকে নিয়ে গেলো। দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না। কথা হওয়ার দরকার নেই। কী বলবে? "হয়ে গেছে"? হালিমা জানে। "আট লাখ"? হালিমা জানে। "মহাজনকে দিতে হবে"? হালিমা জানে।

যখন সব জানা থাকে, তখন কথা বলা একটা বোঝা। চুপ থাকা সহজ।

বারান্দায় ফিরে এলো।

দা-টা দেয়ালে ঠেস দিয়ে আছে। ভাঙা হাতল। আলগা কাঠ। করিম তাকালো। তারপর চোখ সরিয়ে নিলো।

সন্ধ্যা নামছে। আকাশে লাল রঙ। দূরের তালগাছগুলো কালো দেখাচ্ছে আকাশের গায়ে। কোথাও আজান দিচ্ছে। দূরে। মসজিদের মাইক ভাঙা, আওয়াজ ফেটে ফেটে আসছে।

করিম বারান্দায় বসে আছে। তার দাদার বাড়ি। তার বাবার বারান্দা। তার নিমগাছ। কিন্তু জমি আর তার না।

অন্ধকার নামলো। হালিমা আলো জ্বালালো ঘরে। হলুদ আলো বারান্দায় পড়লো। করিমের ছায়া পড়লো উঠোনে। লম্বা ছায়া। বড় ছায়া।

করিম বসে রইলো। জমির দিকে মুখ করে। জমি দেখা যায় না অন্ধকারে। কিন্তু করিম জানে কোনদিকে। তিরিশ বছর ধরে জানে। চোখ বন্ধ করলেও জানবে। জমি সেদিকে। যেদিকে সবসময় ছিলো। আছে। কিন্তু আর তার না।