জাহিদ দেশে ফিরলো

পর্ব ৩৪ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

বাস থেকে নামতেই গরম লাগল। নেত্রকোনার গরম। ঢাকার গরম আলাদা, সেটা গাড়ির ধোঁয়ার গরম, মানুষের ভিড়ের গরম। নেত্রকোনার গরম মাটির। রোদ সোজা মাটিতে পড়ে, মাটি গরম হয়ে ফেরত দেয়। এই গরম জাহিদের চেনা। বারো বছর পরেও চেনা।

বাসস্ট্যান্ডে জাহিদ দাঁড়িয়ে রইল। একটা ব্যাগ। কাঁধে। ভারী না। বারো বছরের জীবন এই একটা ব্যাগে আঁটে। একটা ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিল, একটা ব্যাগ নিয়ে ফিরলো। ব্যাগটা আলাদা, কিন্তু ওজন প্রায় একই।

রিকশা ডাকল। রিকশাওয়ালা বলল, "কই যাবেন?"

জাহিদ ঠিকানা বলল। রিকশাওয়ালা মাথা নাড়ল। চিনে।

রিকশায় বসে জাহিদ দুইপাশে তাকাল। বাজারটা বদলে গেছে। আগে যেখানে চায়ের দোকান ছিল সেখানে মোবাইল ফোনের দোকান। আগে যেখানে সেলুন ছিল সেখানে আরেকটা মোবাইল ফোনের দোকান। কাপড়ের দোকানটা আছে, কিন্তু সাইনবোর্ড বদলেছে। রাস্তা চওড়া হয়েছে কিছুটা। ড্রেন হয়েছে। ড্রেনে পানি জমে আছে, কিন্তু ড্রেন তো হয়েছে।

রিকশাওয়ালা বলল, "বিদেশ থেকে?"

"হুম।"

"কত বছর?"

"বারো।"

রিকশাওয়ালা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। বারো বছর শুনে কিছু বলার নেই। বারো বছর একটা সংখ্যা না, একটা জীবন।

বাড়ির সামনে রিকশা থামল।

জাহিদ নামল না। একটু বসে রইল। দেখল।

বাড়িটা আছে। টিনের ছাদ, ইটের দেয়াল। দেয়ালে সবুজ রং, তবে রং উঠে যাচ্ছে কিছু জায়গায়। গেটটা নতুন, পুরনোটা লোহার ছিল, এটাও লোহার কিন্তু ডিজাইন আলাদা। জাহিদের টাকায় করা হয়তো, সে জানে না, রশিদা কখনো বলেনি কোন টাকা দিয়ে কী করেছে, শুধু বলেছে "পাঠাইছো পাইছি।"

উঠোনে একটা গাছ। আমগাছ। জাহিদ দেখল আর চিনতে পারল না। এটা কি সেই গাছ? সে যেবার শেষ এসেছিল, বারো বছর আগে, উঠোনে একটা চারা লাগানো হয়েছিল। ছোট, হাঁটু সমান, একটা লাঠি দিয়ে ধরে রাখা হয়েছিল যেন হেলে না পড়ে। জাহিদ তখন রশিদাকে বলেছিল, "এত ছোট গাছে আম ধরবে?" রশিদা বলেছিল, "ধরবে। সময় লাগবে।"

গাছটা এখন বাড়ির চেয়ে উঁচু। ডালপালা ছড়িয়ে পুরো উঠোনে ছায়া ফেলেছে। কয়েকটা আম ঝুলছে। কাঁচা আম। সবুজ। মৌসুম আসেনি এখনো।

জাহিদ রিকশা থেকে নামল। ভাড়া দিল। রিকশাওয়ালা চলে গেল।

দরজা খোলা। গ্রামের বাড়িতে দরজা খোলাই থাকে দিনের বেলা।

জাহিদ উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠল। জুতা খুলল। বারান্দায় রশিদার স্যান্ডেল। বাচ্চাদের জুতা। একজোড়া ছোট, একজোড়া বড়।

রশিদা ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।

দুইজন দুইজনের দিকে তাকাল। কেউ কিছু বলল না।

রশিদা রোগা হয়েছে। মুখে বয়সের ছাপ, চোখের নিচে কালো, কিন্তু চোখ সেই একই। জাহিদ সেই চোখ চেনে। বিয়ের দিনেও এই চোখ, এখনো এই চোখ। চোখ বদলায় না।

রশিদাও তাকাচ্ছে। জাহিদের দাড়িতে সাদা। গালের হাড় বের হয়ে এসেছে। কপালে বলিরেখা। হাত রুক্ষ, কালো, কাজের হাত। বারো বছর কাতারের রোদে পুড়েছে, ইট বহন করেছে, সিমেন্ট মিশিয়েছে। শরীরে সেসবের দাগ আছে।

"আইছো?" রশিদা বলল।

"আইছি।"

এটুকুই। এর বেশি কী বলবে? বারো বছরের কথা কয়টা শব্দে বলা যায়? বলা যায় না। তাই বলে না।

ভেতরের ঘর থেকে একটা মেয়ে বেরিয়ে এলো। ছোট। পাঁচ বছর। জাহিদ দেখল, চিনতে পারল না। মানে, জানে এ তার মেয়ে। ফোনে দেখেছে। কিন্তু ফোনের ছবি আর সামনে দাঁড়ানো মানুষ এক না। ফোনে ছবি স্থির, মানুষ নড়ে, কথা বলে, তাকায়।

মেয়েটা জাহিদের দিকে তাকাল। তারপর রশিদার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। রশিদার শাড়ি ধরল।

"রুমা, আব্বু আইছে।" রশিদা বলল।

রুমা তাকাল। কিন্তু আব্বু চেনে না। ফোনে দেখেছে, কিন্তু ফোনের মানুষ ছোট, স্ক্রিনের ভেতর থাকে। এই মানুষ বড়, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ঘাম হচ্ছে, গন্ধ আছে। এটা কি সেই মানুষ?

জাহিদ হাঁটু গেড়ে বসল। "রুমা।"

রুমা কিছু বলল না। রশিদার শাড়ি আরো শক্ত করে ধরল।

জাহিদ উঠে দাঁড়াল। কিছু বলল না। কী বলবে? মেয়ে তাকে চেনে না। এটা কারো দোষ না। সময়ের দোষ। দূরত্বের দোষ। বারো বছরের দোষ।

বড় ছেলে এলো বিকেলে। স্কুল থেকে ফিরল। নাম সাব্বির। জাহিদ যখন গিয়েছিল, সাব্বির চার বছর। এখন ষোলো। জাহিদের চেয়ে লম্বা। জাহিদ পাঁচ ফুট ছয়, সাব্বির অন্তত দুই ইঞ্চি বেশি।

সাব্বির ব্যাগ রাখল। জাহিদের দিকে তাকাল।

"আব্বু।"

"কেমন আছিস?"

"ভালো।"

এটুকুই। ষোলো বছরের ছেলে বাবাকে কী বলবে? সে বাবাকে চেনে, কিন্তু জানে না। চেনা আর জানা আলাদা। চেনা মানে মুখ চেনে, নাম জানে, সম্পর্ক জানে। জানা মানে অন্য কিছু। জানা মানে কখন রাগ করে, কখন হাসে, কোন খাবার পছন্দ, কোন গান শুনলে চুপ হয়ে যায়, ঘুমের আগে কোনদিকে ফেরে। এসব সাব্বির জানে না।

সাব্বির ভেতরে গেল। কাপড় বদলাতে।

জাহিদ বারান্দায় বসে রইল।

ঘরটা ছোট।

জাহিদ ঘরে ঢুকল। বিছানা। আলমারি। একটা টেবিল। দেয়ালে ক্যালেন্ডার, কোনো একটা ওষুধ কোম্পানির। জানালায় পর্দা, নীল রঙের, নতুন দেখাচ্ছে।

বিছানায় বসল। তোশক নতুন। পুরনো তোশকটা চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল, সেটা জাহিদ মনে আছে। এটায় তুলা আছে, বসলে বোঝা যায়। জাহিদের টাকায় কেনা হয়তো। সে প্রতি মাসে পাঠাত, রশিদা খরচ করত। কী কিনেছে কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি। রশিদাও বলেনি। টাকা পাঠানো আর টাকা খরচ করা, দুটো আলাদা জীবন। দুজনে দুটো জীবন যাপন করেছে, একটা ছাদের নিচে না থেকেও।

ঘরটা ছোট মনে হচ্ছে। আগে এত ছোট ছিল না। নাকি ছিল? জাহিদ নিশ্চিত না। হয়তো সে বড় হয়ে গেছে। কাতারে সে যে ঘরে থাকত, সেটাও ছোট ছিল, আটজন একসাথে, কিন্তু সেই ঘরটা আলাদা ছোট। ওখানে ছোট মানে কষ্ট। এখানে ছোট মানে... কী? জাহিদ জানে না।

সে ব্যাগ থেকে একটা খাতা বের করল। পুরনো। মলাট ছেঁড়া। ভেতরে হাতে লেখা। আরবি, বাংলা, কিছু হিসাব, কিছু তারিখ, কিছু নাম। বারো বছরের খাতা। প্রতিটা পাতায় একটু একটু করে সময় আছে। কাতারের গরম আছে, ক্যাম্পের গন্ধ আছে, বেতনের হিসাব আছে, পাঠানো টাকার হিসাব আছে, একটা পাতায় রশিদার নাম লেখা, কোনো কারণ ছাড়াই, শুধু নাম।

জাহিদ খাতাটা তাকে রাখল। আলমারির পাশে। যেখানে রশিদার শাড়ি ভাঁজ করা, সেই তাকে। খাতাটা শাড়ির পাশে শুয়ে পড়ল, যেভাবে ক্লান্ত মানুষ বিছানায় পড়ে।

রশিদা চা বানাল।

দুটো কাপ। একটায় চিনি বেশি। জাহিদ চিনি বেশি খায়, রশিদা মনে আছে। বারো বছর পরেও মনে আছে। কিছু কিছু জিনিস শরীর মনে রাখে, মাথা ভুলে গেলেও।

চা নিয়ে এলো। জাহিদকে দিল। নিজের কাপ হাতে নিল। দুজনে বসল। বিছানার ওপর। পাশাপাশি। মাঝে একটু ফাঁক। বারো বছরের ফাঁক।

জাহিদ চায়ে চুমুক দিল।

চা। লিকার চা। আদা দেওয়া। এলাচ নেই। দুধ নেই। রশিদা এভাবেই বানায়। সরু কাচের কাপে। কাপটা গরম, হাতে ধরতে গেলে আঙুল পোড়ে, কিন্তু সেই পোড়াটা চেনা। কাতারে সে যে চা খেত, সেটা কার্ডামম চা, আরবদের, কাপও আলাদা, স্বাদও আলাদা। খারাপ না, কিন্তু এটা না।

এই চা।

জাহিদ চুমুক দিল। আরেকটা। চা গরম, গলা পুড়ছে, কিন্তু পোড়াটা ভালো লাগছে। এই স্বাদ বারো বছর ধরে মনে ছিল। ঠিক এই স্বাদ না, একটা ছায়া। যেভাবে স্বপ্নে মানুষের মুখ দেখা যায়, কিন্তু জেগে উঠলে মুখটা ঝাপসা হয়ে যায়, সেভাবে চায়ের স্বাদটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার পরিষ্কার।

বারো বছরে সবচেয়ে ভালো চা।

জাহিদের চোখ ভিজে গেল। সে জানে না কেন। চায়ের জন্য না। চায়ের জন্য কেউ কাঁদে না। রশিদার জন্য? রুমার জন্য? সাব্বিরের জন্য? বারো বছরের জন্য? হয়তো সবকিছুর জন্য। হয়তো কিছুর জন্যও না। কখনো কখনো কান্না আসে, কোনো কারণ ছাড়াই। শরীর কাঁদে, মাথা জানে না কেন।

জাহিদ কাঁদল। আস্তে। শব্দ নেই। শুধু চোখ থেকে পানি গড়িয়ে গালে পড়ছে, দাড়ি ভিজছে। কাপ হাতে ধরে আছে। চায়ে লবণ পড়ছে।

রশিদা কিছু বলল না। তাকাল না। পাশে বসে আছে, নিজের চায়ে চুমুক দিচ্ছে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। উঠোনে আমগাছের ছায়া লম্বা হয়ে আসছে, বিকেলের রোদ কমছে।

রশিদা জানে জাহিদ কাঁদছে। জাহিদও জানে রশিদা জানে। কেউ কিছু বলে না। কিছু বলার দরকার নেই।

জাহিদের কাপ খালি হলো।

রশিদা উঠল। রান্নাঘরে গেল। আবার চা নিয়ে এলো। জাহিদের কাপে ঢালল। চিনি বেশি।

জাহিদ কাপটা হাতে নিল। গরম। আঙুল পুড়ছে।

চুমুক দিল।

সন্ধ্যায় বাল্ব জ্বালাতে গিয়ে জাহিদ দেখল সুইচের জায়গা বদলেছে। আগে দরজার ডানপাশে ছিল, এখন বামে। অন্ধকারে ডানদিকে হাত বাড়িয়ে খুঁজল, পেল না। বামে পেল।

ছোট একটা জিনিস। কিন্তু এটুকুতেই বোঝা যায়, বাড়ি চলেছে। তাকে ছাড়া। সুইচ বদলেছে, দরজা বদলেছে, তোশক বদলেছে, গাছ বড় হয়েছে। সব হয়েছে। সে ছাড়া।

রুমা রশিদার কোলে বসে ভাত খাচ্ছে। সাব্বির নিজে খাচ্ছে। জাহিদ পাশে বসে আছে। রশিদা তাকেও ভাত দিয়েছে। ডাল, মাছ ভাজা, আলু ভর্তা। সাধারণ খাবার। কিন্তু রশিদার রান্না। এই মাছ ভাজার গন্ধ কাতারে স্বপ্নে পেত মাঝে মাঝে। ঘুম থেকে উঠে বুঝত স্বপ্ন, তখন গন্ধটা চলে যেত।

এখন স্বপ্ন না। মাছ সামনে। গন্ধ সত্যি।

"খাও।" রশিদা বলল।

জাহিদ খেল।

রুমা মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। আড়চোখে। এখনো ভয় পাচ্ছে, কিন্তু ভয়টা কমছে। বাচ্চারা এরকম, ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়। এক সপ্তাহ পর হয়তো কোলে উঠবে। দুই সপ্তাহ পর হয়তো "আব্বু" বলবে। একমাস পর হয়তো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। হয়তো।

সাব্বির খেয়ে উঠে গেল। "পড়তে যাচ্ছি।"

"কী পড়িস?"

"এসএসসি। পরের বছর।"

জাহিদ মাথা নাড়ল। সাব্বির ভেতরে গেল।

জাহিদ ভাবল, ছেলে পরের বছর পরীক্ষা দেবে। বারো বছর আগে যে ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াত, সে এখন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাহিদ কোনো পরীক্ষায় পাশ করেনি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। তারপর কাতার।

রশিদা থালা গুছিয়ে রান্নাঘরে গেল।

রাতে জাহিদ বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। টিনের ছাদ। ফ্যান ঘুরছে। মশারি টাঙানো। রশিদা পাশে শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুমায়নি। জাহিদ বুঝতে পারে। ঘুমন্ত মানুষের শ্বাস আলাদা।

পাশের ঘরে সাব্বির আর রুমা।

বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। দূরে কুকুর ডাকছে। আমগাছের পাতায় বাতাস লাগছে, একটা শব্দ হচ্ছে, মৃদু, যেন কেউ কাগজ উলটাচ্ছে।

জাহিদ ভাবল, কাল থেকে কী করবে? কোনো চাকরি নেই। ফ্যাক্টরি নেই নেত্রকোনায়। কৃষি আছে, কিন্তু জমি নেই। দোকান দিতে পারে, কিন্তু কিসের দোকান? পকেটে যে টাকা আছে, তা দিয়ে ছয় মাস চলবে। তারপর?

তারপরের কথা কাল ভাববে। আজ না।

আজ শুধু এটুকু: সে বাড়িতে। নিজের বিছানায়। নতুন তোশকে। পাশে রশিদা। পাশের ঘরে ছেলেমেয়ে। বাইরে আমগাছ, যেটা বারো বছর আগে চারা ছিল, এখন ছায়া দেয়।

রশিদা ফিসফিস করে বলল, "ঘুমাও।"

জাহিদ চোখ বন্ধ করল।

উঠোনে আমগাছের একটা ডাল বাতাসে নড়ল। পাতা থেকে একটা শিশির বিন্দু পড়ল মাটিতে। কেউ দেখল না। কেউ শুনলও না। রাত গভীর হলো।