সেলিনার বদলি
১
চিঠিটা একটা খাম থেকে বের করে নাজমুল সাহেব টেবিলে রাখলেন। সেলিনার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন, যেভাবে সবসময় দেন, কাগজটা সামনে রেখে অপেক্ষা করেন যে পড়ুক।
সেলিনা পড়ল।
"বদলি আদেশ। সেলিনা আক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা, বদলি হইলেন ছাতকের দোয়ারাবাজার ইউনিয়নের অন্তর্গত কুশিয়ারা চরে। কারণ: ফিল্ড রোটেশন।"
ফিল্ড রোটেশন।
সেলিনা শব্দটা পড়ল। আবার পড়ল। তিন বছর এখানে আছে। তিন বছর আগে যখন এখানে এসেছিল, তখনো কেউ বলেনি "ফিল্ড রোটেশন।" পাঁচ বছর ধরে যে শাম্মী আপা একই জায়গায় আছে, তাকে কেউ বদলি করেনি। রুবিনা তিন বছর ধরে একই ওয়ার্ডে, তাকেও না।
শুধু সেলিনা।
সেলিনা জানে কেন। নাজমুল সাহেবও জানেন। দুজনেই জানে, কিন্তু কেউ বলবে না। বলার দরকার নেই। কিছু কিছু সত্য বলা হয় না, বোঝা যায়।
"কবে থেকে?" সেলিনা জিজ্ঞেস করল।
"পরের সপ্তাহে।"
সেলিনা মাথা নাড়ল। চিঠিটা ভাঁজ করল। ব্যাগে রাখল।
নাজমুল সাহেব বললেন, "আমার কিছু করার ছিল না।"
সেলিনা কিছু বলল না। উঠে দাঁড়াল। দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
২
কুশিয়ারা চর সম্পর্কে সেলিনা যা জানে তা হলো: কেউ সেখানে যেতে চায় না।
চরটা ছাতক থেকে নৌকায় দেড় ঘণ্টা। নদীর মাঝখানে একটুকরো মাটি, বর্ষায় অর্ধেক ডুবে যায়, শীতে জেগে ওঠে। বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল টাওয়ার নেই। নদীর এপার থেকে কখনো কখনো একটু সিগন্যাল আসে, কখনো আসে না। দিনে একটা নৌকা যায়, সকালে। আরেকটা ফেরে, বিকেলে। মিস করলে পরের দিন।
সেলিনা বাড়িতে ফিরে মাকে বলল।
মা বললেন, "চরে? কোন চরে?"
"কুশিয়ারা।"
মা চুপ করে গেলেন। কুশিয়ারা চর চেনেন। চেনেন মানে নাম শুনেছেন। সেখানে কেউ যায় না বলে চেনার সুযোগ হয় না।
সোহেল স্কুল থেকে ফিরেছে। উঠোনে বসে কিছু একটা করছে। সেলিনা দেখল সোহেল পকেট থেকে কয়েকটা পাথর বের করছে। নদীর পাথর। ছোট ছোট, মসৃণ, পানিতে ঘষে ঘষে গোল হয়ে গেছে। সোহেল ইদানীং পাথর জমায়। স্কুলে যাওয়ার পথে নদীর ধার থেকে কুড়িয়ে আনে। পকেটে সবসময় অন্তত তিনটা থাকে। কেন জমায় কেউ জানে না। সোহেলও জানে না। কিছু কিছু অভ্যাসের কারণ থাকে না।
"সোহেল।"
সোহেল তাকাল।
"আমাদের নতুন জায়গায় যেতে হবে।"
"কোথায়?"
"একটা চরে। নৌকায় যেতে হবে।"
সোহেলের চোখ উজ্জ্বল হলো। "আম্মু, আবার নৌকায় যাবো?"
"হ্যাঁ।"
সোহেল হাসল। দাঁত বের করে। সোহেল নৌকা ভালোবাসে। হাওরের ছেলে, নৌকা তার রক্তে। যখনই সেলিনা ভিজিটে নৌকায় যেত, সোহেল যেতে চাইত। "আম্মু আমিও যাবো, আম্মু আমিও যাবো।"
সেলিনার বুকে কিছু একটা চেপে বসল। সোহেলের হাসি দেখে আরো চাপল। ছেলে ভাবছে এটা একটা অ্যাডভেঞ্চার। নৌকায় যাওয়া, নতুন জায়গা, মজা। সেলিনার মনে হলো বলে দেয়, এই নৌকা এমন একটা জায়গায় যায় যেখানে কেউ যেতে চায় না, যেখানে রাতে অন্ধকার ছাড়া কিছু নেই, যেখানে ফোনে কাউকে ডাকা যায় না।
বলল না। ছেলেকে এখন এসব বলে কী হবে? চরে গেলে বুঝবে।
৩
পরের সপ্তাহে সেলিনা গোছগাছ করল।
বেশি কিছু নেই। কাপড়, কিছু বাসনপত্র, ওষুধের বাক্স, ট্যাবলেট, চার্জার। আর দুটো খাতা। একটা সরকারি, যেটায় ছক আছে, কলাম আছে, তারিখ লেখার জায়গা আছে, রোগীর নাম লেখার জায়গা আছে। আরেকটা নিজের। যেটায় কিছু নেই, শুধু সত্য।
দুটো খাতাই ব্যাগে রাখল। পাশাপাশি।
মা কাঁদলেন। মায়েরা কাঁদেন। সেলিনা মাকে জড়িয়ে ধরল। "আসবো। নৌকা তো আছে।"
"কতদিন পরপর আসবি?"
সেলিনা জানে না। চর থেকে আসা সহজ না। সকালের নৌকায় গেলে বিকেলের নৌকায় ফিরতে হবে, মাঝখানে কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু মাকে বলল, "শুক্রবারে আসবো।"
মা কিছু বললেন না। দুজনেই জানে প্রতি শুক্রবার সম্ভব না।
সোহেল তৈরি। পকেটে পাথর। পিঠে ছোট ব্যাগ। ব্যাগে বই, খাতা, রঙ পেন্সিল।
৪
ছাতকের ঘাটে নৌকা।
কাঠের নৌকা। ইঞ্জিন লাগানো। ছোট। দশজন বসতে পারে, কিন্তু আজ যাত্রী চারজন। সেলিনা, সোহেল, একজন বৃদ্ধ লোক যিনি চরে থাকেন, আর একজন মাঝি।
নৌকা ছাড়ল।
ইঞ্জিনের শব্দ। পানি কাটছে। দুইপাশে নদী। নদী চওড়া। এপার থেকে ওপার দেখা যায়, কিন্তু ওপারের মানুষ চেনা যায় না। দূরত্ব এটুকুই, দেখা যায় কিন্তু চেনা যায় না।
সোহেল নৌকার কিনারায় বসে পানিতে হাত ডুবিয়ে দিল। পানি ঠান্ডা। স্রোত হাত টানছে। সোহেল হাসছে।
সেলিনা ব্যাগ কোলে নিয়ে বসে আছে। নৌকা দুলছে। আকাশে মেঘ নেই। রোদ সোজা মাথায় পড়ছে। বৃদ্ধ লোকটি একটা গামছা মাথায় দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন।
সেলিনা ব্যাগ থেকে ট্যাবলেট বের করল। অভ্যাসবশত। স্ক্রিন ছুঁলো। স্ক্রিনের ওপরে যেখানে সিগন্যাল বার থাকে, সেখানে কিছু নেই। এক বার নেই। শূন্য। ঘাট থেকে বের হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে সিগন্যাল চলে গেছে।
ট্যাবলেটের ওপরের কোণায় ছোট সবুজ আলোটা নিভে আছে। প্রথমবার। যতদিন সেলিনা এই ট্যাবলেট ব্যবহার করছে, ততদিন আলোটা জ্বলছিল। ঘরে, বাইরে, হাওরে, উপজেলায়, সব জায়গায়। রাতে চার্জ দিলে, সকালে খুললে, সবসময়। সবুজ আলো মানে কেউ দেখছে। সবুজ আলো মানে সংযুক্ত। সবুজ আলো মানে সেলিনা একা না।
আজ আলো নিভে আছে।
সেলিনা ট্যাবলেটের দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিন কালো নয়, অন তো আছে, কিন্তু সিগন্যাল নেই। ট্যাবলেট চলছে, কিন্তু কারো সাথে কথা বলছে না। কাউকে ডেটা পাঠাচ্ছে না। কারো কাছ থেকে নির্দেশ পাচ্ছে না। ট্যাবলেট এখন শুধু একটা যন্ত্র। প্লাস্টিক আর কাচ। ভারী না, কিন্তু অকেজো।
সেলিনা ট্যাবলেট ব্যাগে রাখল। পাশের খাতাটা বের করল। নিজের খাতা। কলম বের করল।
নৌকায় বসে, দোলায়, রোদে, লিখল:
"আজ ট্যাবলেট আমাকে দেখতে পারছে না। আমি মুক্ত। আমি একা।"
দুটো বাক্য। দুটোই সত্য। দুটো একসাথে সত্য হওয়া কঠিন, কিন্তু হচ্ছে।
৫
কুশিয়ারা চর দেখা গেল।
নদীর মাঝখানে একটুকরো সবুজ। গাছ আছে কিছু, বাঁশঝাড় আছে, টিনের ছাদ দেখা যাচ্ছে দুয়েকটা। ছোট। পুরো চরটা হেঁটে পার হতে বিশ মিনিট লাগবে হয়তো।
নৌকা ঘাটে লাগল। ঘাট বলতে দুটো বাঁশ মাটিতে পুঁতে তার ওপর একটা তক্তা রাখা। সেলিনা নামল। সোহেল লাফ দিয়ে নামল। পায়ে কাদা লাগল। সোহেল কাদার দিকে তাকাল, তারপর হাসল। বাচ্চাদের কাছে কাদা খেলনা।
চরে মানুষ কম। কুড়িটা পরিবার আছে, বৃদ্ধ লোকটি বললেন। বর্ষায় কিছু পরিবার চলে যায়, শীতে ফেরে। যারা থাকে তারা মাছ ধরে, কিছু ফসল করে।
সেলিনার জন্য একটা ঘর ঠিক করা হয়েছে। টিনের ছাদ, মাটির দেয়াল। একটা ঘর, একটা রান্নাঘর। বিদ্যুৎ নেই। সোলার প্যানেল আছে একটা, ছাদে, পুরনো, কতটুকু কাজ করে বোঝা যাচ্ছে না। পাশের ঘরে একটা পরিবার থাকে, তাদের সোলার থেকে ফোন চার্জ করা যায়, বৃদ্ধ লোকটি বললেন।
সেলিনা ঘরে ঢুকল। চারপাই আছে। একটা টেবিল, ভাঙা পায়া, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালে একটা পেরেক, কাপড় ঝোলানোর জন্য।
সোহেল ঘুরে ঘুরে দেখছে। "আম্মু, এখানে টিভি নাই?"
"নাই।"
"ফ্যান?"
"নাই।"
সোহেল একটু ভাবল। তারপর বলল, "তাহলে কী আছে?"
সেলিনা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। নদী দেখা যাচ্ছে। নদীতে রোদ পড়ে চকচক করছে। দূরে একটা নৌকা যাচ্ছে, ছোট, একটা বিন্দুর মতো।
"নদী আছে।"
সোহেল জানালায় এসে দাঁড়াল। নদী দেখল। তারপর পকেট থেকে একটা পাথর বের করল। ঘষামাজা, মসৃণ, ধূসর রঙের। হাতে ধরে আছে, যেভাবে কেউ তাবিজ ধরে।
৬
প্রথম রাত।
সোলার প্যানেল থেকে একটা ছোট বাল্ব জ্বলছে। হলুদ আলো। কম। ঘরের অর্ধেকটা আলোয়, বাকি অর্ধেক অন্ধকারে। সেলিনা চারপাইয়ে বসে আছে। সোহেল পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে গেছে। সারাদিন ঘুরেছে, ক্লান্ত।
বাইরে নদীর শব্দ। পানি বইছে। রাতে নদীর শব্দ অন্যরকম, দিনের চেয়ে জোরে, কারণ বাকি সব শব্দ থেমে যায়। কোনো গাড়ি নেই, কোনো মোটর নেই, কোনো টিভির আওয়াজ নেই। শুধু নদী। আর মাঝে মাঝে একটা পাখি ডাকছে। কোন পাখি সেলিনা জানে না। রাতের পাখি।
সেলিনা টেবিলে ট্যাবলেট রাখল। অভ্যাসবশত। চার্জ দেওয়ার উপায় নেই আজ, সোলার প্যানেলের আউটপুট কম, বাল্ব জ্বালাতেই শেষ। ট্যাবলেটের ব্যাটারি বিশ পার্সেন্ট।
স্ক্রিন অন করল। সিগন্যাল নেই। সবুজ আলো নিভে আছে। নোটিফিকেশন নেই। কোনো মেসেজ আসেনি, কারণ আসার উপায় নেই।
সেলিনা ট্যাবলেটটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তিন বছর ধরে এই ট্যাবলেট তাকে দেখেছে। তার পথ ট্র্যাক করেছে। তার সময় গুনেছে। কোথায় গেছে, কতক্ষণ ছিল, কোন রুটে গেছে, সব রেকর্ড করেছে। সেলিনা তাকে ভয় পেত। ঘৃণা করত মাঝে মাঝে। আবার নির্ভরও করত, রোগীর লক্ষণ দিলে ট্যাবলেট বলে দিত কী করতে হবে। ভালোবাসা আর ভয় একসাথে, যেভাবে কেউ কেউ ঝড়কে একসাথে ভয় পায় আর দেখতে চায়।
এখন ট্যাবলেট অন্ধ। বধির। নিঃশব্দ। সিগন্যাল ছাড়া ট্যাবলেট একটা আয়না যেটায় প্রতিবিম্ব পড়ে না।
সেলিনা ট্যাবলেট বন্ধ করল। ব্যাটারি বাঁচাতে। টেবিলে রাখল। মুখ ওপরে। সবুজ আলো নিভে আছে। কালো। মৃত।
সেলিনা চারপাইয়ে শুয়ে পড়ল। সোহেলের পাশে। ছেলের চুলে হাত বোলাল।
বাইরে নদী বইছে। চর ঘুমাচ্ছে। কুড়িটা পরিবার, কুড়িটা ঘর, কুড়িটা অন্ধকার। কোনো সবুজ আলো নেই কোথাও। কোনো স্ক্রিন জ্বলছে না। কোনো ডেটা কোথাও যাচ্ছে না।
সেলিনা চোখ বন্ধ করল। নদীর শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল। অনেকদিন পর এত তাড়াতাড়ি ঘুম এলো।