রিট্রেনিং সেন্টারে একদিন
১
সেন্টারটা একটা পুরনো স্কুলবিল্ডিংয়ে। গাজীপুরের শিল্পনগরী এলাকায়। দোতলা। নিচতলায় আগে ক্লাসরুম ছিল, এখন "ডিজিটাল লার্নিং সেন্টার।" দোতলায় এখনো স্কুল চলে, বাচ্চাদের হট্টগোল ওপর থেকে আসছে, মাঝে মাঝে একটা বেল বাজছে।
রহিমা সকাল নয়টায় পৌঁছাল। সেন্টারের সামনে একটা ব্যানার: "বাংলাদেশ সরকার, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিস্থাপিত গার্মেন্টস কর্মী পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি।" ব্যানারটা লম্বা, পুরো দরজা জুড়ে। ব্যানারের নিচে একটা প্রেরণামূলক পোস্টার: "আপনি পারবেন!" পোস্টারটা পুরনো, রোদে রং ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। "আপনি"র 'আ' টা খোলসা উঠে অর্ধেক ঝুলে আছে, এখন পড়লে মনে হয় "পনি পারবেন।" কেউ ঠিক করেনি। কতদিন ধরে এরকম আছে কেউ জানে না।
ভেতরে ঢুকল। একটা রুম। চারটা টেবিল, প্রতি টেবিলে দুটো করে কম্পিউটার। আটটা কম্পিউটার। স্ক্রিন পুরনো, বড়, ভারী, যেগুলো এখন আর কেউ বানায় না। কিবোর্ডে কিছু কিছু অক্ষর মুছে গেছে। মাউস আছে, তারওয়ালা, ডানপাশের স্ক্রলটা ময়লায় আটকে আছে।
পনেরোজন মহিলা বসে আছে। সবাই গার্মেন্টস কর্মী। ছিল। এখন কেউ কাজ করছে না। ফ্যাক্টরি বন্ধ, নয়তো ছাঁটাই। বয়স বিশ থেকে পঞ্চাশ। কেউ শাড়ি পরে এসেছে, কেউ সালোয়ার কামিজে। সবার মুখে একটা সাধারণ ভাব: অপেক্ষা। কিসের অপেক্ষা কেউ ঠিক জানে না।
রহিমা পেছনের সারিতে বসল। পাশে একজন। বয়স পঞ্চাশের কাছে। ছোটখাটো, রোগা, হাতে রুক্ষতার দাগ, তিরিশ বছর সেলাইয়ের হাত। চোখে চশমা, পুরু কাচ। তিনি রহিমার দিকে তাকালেন।
"আগে আইছেন?" রহিমা জিজ্ঞেস করল।
"না। আজ প্রথম।"
"আমারও।"
২
ইন্সট্রাক্টর এলো। ছেলে। তরুণ। চব্বিশ পঁচিশ বছর। পরনে জিন্স আর টি-শার্ট, গলায় আইডি কার্ড ঝুলছে। চুল ঝুঁটি বাঁধা। হাতে একটা ল্যাপটপ।
"আসসালামু আলাইকুম। আমি তুষার। আমি আপনাদের ডিজিটাল লিটারেসি কোর্সের ইন্সট্রাক্টর।"
তুষার ল্যাপটপটা টেবিলে রাখল। সামনে দাঁড়াল। পনেরোজনের দিকে তাকাল। পনেরোজন তার দিকে তাকাল।
"আজকে আমরা শিখব কীভাবে একটা ইমেইল অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। জিমেইল।"
রহিমা ভাবল, সে আঠারো বছর সেলাই করেছে। ওভারলক, ফ্ল্যাটলক, বার্টন হোল, চেইন স্টিচ, সব পারে। একটা শার্ট কত মিনিটে হয় সে বলতে পারে চোখ বন্ধ করে। প্রতি মিনিটে কতটা সেলাই, প্রতি ঘণ্টায় কতটা পিস, প্রতিদিন কতটা ডজন। এই হিসাব তার শরীরে আছে, মাথায় না, শরীরে। আঙুল জানে, পিঠ জানে, চোখ জানে।
এখন তাকে শেখানো হচ্ছে কীভাবে জিমেইল খুলতে হয়।
তুষার হোয়াইটবোর্ডে লিখল: gmail.com
"প্রথমে ব্রাউজার ওপেন করুন। ব্রাউজার মানে ইন্টারনেট। নীল রঙের আইকন দেখবেন। সেটাতে ক্লিক করুন।"
রহিমা কম্পিউটারের সামনে বসল। মাউসটা ধরল। পাশের আন্টি মাউসটা ধরতে পারছেন না। মাউস ধরার একটা ভঙ্গি আছে, সেটা শেখা হয়নি। তিনি মাউসটা উলটো ধরলেন, তারওয়ালা দিকটা সামনে। তুষার এসে দেখিয়ে দিল। "এইভাবে ধরুন।" আন্টি ধরলেন। হাত কাঁপছে। কার্সর স্ক্রিনে এদিক ওদিক যাচ্ছে।
রহিমা দেখল। মানুষটা পঞ্চাশ বছর সুই ধরেছেন। সুইয়ের চোখে সুতা পরাতে পারেন অন্ধকারেও। কিন্তু মাউস ধরতে পারছেন না। কারণ মাউস সুই না। মাউসের নিয়ম আলাদা।
৩
তুষার বলল, "এখন সবাই gmail.com টাইপ করুন। ঠিকানা বারে। ওপরে যে লম্বা বক্সটা দেখছেন, সেখানে।"
রহিমা টাইপ করল। আঙুল দিয়ে একটা একটা করে। g-m-a-i-l. তারপর ডট। ডট কোথায়? কিবোর্ডে খুঁজল। পেল। তারপর c-o-m.
পাশের আন্টি টাইপ করতে পারছেন না। কিবোর্ডের অক্ষরগুলো ছোট, চশমার কাচ পুরু, তবু দেখতে পাচ্ছেন না ঠিকমতো। তুষার এসে আঙুল ধরে দেখিয়ে দিল।
স্ক্রিনে গুগলের পেজ এলো। নীল, লাল, হলুদ, সবুজ। রঙিন অক্ষরে Google.
তুষার বলল, "এখন Create account এ ক্লিক করুন।"
রহিমা ক্লিক করল। একটা ফর্ম এলো। First name, Last name, Email address, Password.
"আপনাদের নাম লিখুন। ইংরেজিতে।"
রহিমা লিখল। R-a-h-i-m-a. তারপর K-h-a-t-u-n. ধীরে ধীরে। প্রতিটা অক্ষর খুঁজে খুঁজে।
পাশের আন্টি বললেন, "আমার নাম ইংরেজিতে কীভাবে লিখব?"
তুষার বলল, "আপনার নাম কী?"
"জরিনা।"
"J-o-r-i-n-a।"
জরিনা আন্টি একটা একটা করে টাইপ করলেন। J পেলেন না। তুষার দেখিয়ে দিল। J পেলেন। o পেলেন না। তুষার দেখিয়ে দিল।
রহিমা দেখল, এভাবে পনেরোজনকে একটা একটা করে অক্ষর দেখিয়ে দিতে তুষারের সারাদিন লাগবে। তুষারও জানে। কিন্তু এটাই কোর্সের প্রথম দিন।
৪
বিরতি। এগারোটায়।
তুষার বলল, "দশ মিনিট ব্রেক।"
রহিমা উঠল। বারান্দায় গেল। বারান্দায় একটা পানির ফিল্টার, প্লাস্টিকের, ময়লা। পানি খেল। গরম পানি।
পাশে জরিনা আন্টি এসে দাঁড়ালেন।
"কত বছর কাজ করছিলেন?" রহিমা জিজ্ঞেস করল।
"তিরিশ বছর। সিংগার গার্মেন্টসে শুরু, শেষে নিউ এশিয়াতে। তারপর বন্ধ।"
"তারপর?"
"তারপর এইখানে।"
দুজন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বারান্দা থেকে রাস্তা দেখা যায়। রাস্তায় রিকশা যাচ্ছে, সিএনজি যাচ্ছে। একটা ফ্যাক্টরির সামনে "কর্মী নিয়োগ" লেখা ব্যানার, কিন্তু সেটা কবে থেকে ঝুলছে কেউ জানে না। হয়তো ভর্তি হয়ে গেছে। হয়তো ব্যানার নামাতে ভুলে গেছে।
৫
ব্রেকের পর তুষার একটা কথা বলল।
"আপনারা জানেন, এখন AI যুগ। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। মেশিন এখন অনেক কাজ করতে পারে। গার্মেন্টসেও মেশিন আসছে। তাই আপনাদের নতুন দক্ষতা শিখতে হবে। AI যুগে সবাইকে ডিজিটাল হতে হবে।"
তুষার বলল কথাটা যেভাবে মানুষ মুখস্থ বলে। কোনো একটা ট্রেনিং ম্যানুয়ালে এই কথা লেখা আছে, তুষার সেখান থেকে শিখেছে, এখন বলছে। তুষার নিজে কোনোদিন ফ্যাক্টরিতে কাজ করেনি। তুষার বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স পড়েছে, তারপর এই চাকরি পেয়েছে। কন্ট্র্যাক্ট বেসিসে। ছয় মাসের।
রহিমা হাত তুলল।
তুষার থামল। "হ্যাঁ?"
"ডিজিটাল হলে চাকরি পাবো?"
ক্লাসরুমে একটা নীরবতা নামল। পনেরোজন তুষারের দিকে তাকাল। তুষার দাঁড়িয়ে আছে। হোয়াইটবোর্ডের সামনে। হাতে মার্কার।
"সেটা নির্ভর করে..."
"কিসের ওপর?"
তুষার কিছু বলল না। মার্কারের ক্যাপটা খুলল, আবার লাগাল। একটা অভ্যাস, যখন উত্তর জানা নেই তখন হাতে কিছু একটা নাড়াচাড়া করা।
রহিমা তাকিয়ে রইল। তুষারও তাকাল। দুজনের মাঝে একটা টেবিল, একটা পুরনো কম্পিউটার, একটা ময়লা মাউস। আর একটা প্রশ্ন যেটার উত্তর কারো কাছে নেই।
তুষার বলল, "চলুন, পাসওয়ার্ড সেট করা শিখি।"
৬
বাকি দিন কাটল।
পাসওয়ার্ড শেখা হলো। পাসওয়ার্ডে বড় হাতের অক্ষর লাগে, ছোট হাতের অক্ষর লাগে, সংখ্যা লাগে, একটা বিশেষ চিহ্ন লাগে। জরিনা আন্টি বড় হাতের অক্ষর কীভাবে টাইপ করতে হয় জানেন না। Shift চেপে ধরতে হয়, একই সাথে আরেকটা কী চাপতে হয়। দুটো আঙুল একসাথে, দুটো কী একসাথে। জরিনা আন্টি পারলেন না। তুষার দেখিয়ে দিল। আবার পারলেন না। আবার দেখাল। তৃতীয়বারে পারলেন।
জরিনা আন্টি হাসলেন। পেরেছেন। একটা বড় হাতের J টাইপ করেছেন। আঠারো বছরের মেয়ের মতো হাসলেন।
রহিমা দেখল। হাসিটা দেখে কিছু একটা টনটন করল। এই মানুষটা তিরিশ বছর কাজ করেছেন। এখন একটা বড় হাতের অক্ষর টাইপ করে খুশি হচ্ছেন। কারণ এটুকুই তাকে শেখানো হচ্ছে। এটুকুই তার পাওনা।
দুপুরে তুষার বলল, "আজকের ক্লাস শেষ। কাল আমরা শিখব কীভাবে ইমেইল পাঠাতে হয়।"
সবাই উঠল। কেউ কেউ কম্পিউটার বন্ধ করল, কেউ করল না, তুষার গিয়ে গিয়ে বন্ধ করল। স্ক্রিনগুলো কালো হলো।
৭
বের হওয়ার আগে হাজিরা খাতা।
টেবিলে একটা রেজিস্টার। প্রতিদিন সই করতে হবে। সই করলে পাঁচশো টাকা ট্রান্সপোর্ট ভাতা। রহিমা সই করল। পাশে তারিখ লিখল। জরিনা আন্টি সই করলেন। বাকি সবাই করল।
পাঁচশো টাকা। ক্যাশে দেওয়া হলো। একটা খাম থেকে। রহিমা খামটা নিল। ভেতরে একটা পাঁচশো টাকার নোট। নোটটা নতুন, মুচমুচে।
রহিমা নোটটা ব্যাগে রাখল। এটাই আজকের সবচেয়ে কাজের জিনিস। জিমেইল অ্যাকাউন্ট না, পাসওয়ার্ড না, ব্রাউজার না। পাঁচশো টাকা। এটা দিয়ে চাল কেনা যায়। ডাল কেনা যায়। সোহেলের দুধ কেনা যায়।
রহিমা বের হলো। বারান্দায় পোস্টারটা দেখল। "পনি পারবেন!" 'আ' এখনো ঝুলে আছে। কেউ ঠিক করবে না। কেউ খেয়ালও করবে না। পোস্টার তার কাজ করে যাচ্ছে, অসম্পূর্ণ অক্ষরে।
রাস্তায় নামল। সিএনজি ধরবে। পাঁচশো টাকা থেকে ভাড়া যাবে, বাকিটা থাকবে। কাল আবার আসবে। আবার জিমেইল। আবার পাসওয়ার্ড। আবার তুষার। আবার পাঁচশো টাকা।
রহিমা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছে। পেছনে সেন্টারটা দাঁড়িয়ে আছে। দোতলায় স্কুলের বাচ্চারা বের হচ্ছে, হট্টগোল করে, ব্যাগ পিঠে, দৌড়াচ্ছে। নিচতলায় পনেরোজন মহিলা বের হচ্ছে, চুপচাপ, ধীরে ধীরে, কোথাও দৌড়ানোর নেই।
একটা সিএনজি থামল। রহিমা উঠল।
সিএনজি চলল। জানালা দিয়ে বাতাস আসছে। গরম বাতাস। গাজীপুরের বাতাসে সবসময় একটা গন্ধ থাকে, কাপড়ের রঙের গন্ধ, ডাইংয়ের গন্ধ, যেটা ফ্যাক্টরি থেকে আসে। রহিমা এই গন্ধ আঠারো বছর ধরে শুঁকেছে। এখন ফ্যাক্টরিতে যায় না, কিন্তু গন্ধ আসে। গন্ধ জানে না রহিমা আর কাজ করে না।
ব্যাগে পাঁচশো টাকা। পকেটে কিছু নেই। মাথায় একটা প্রশ্ন, যেটার উত্তর তুষার দিতে পারেনি: ডিজিটাল হলে চাকরি পাবো?
সিএনজি চলছে। রাস্তার দুইপাশে ফ্যাক্টরি। কিছু চলছে, কিছু বন্ধ। বন্ধগুলোর জানালায় অন্ধকার। ভেতরে মেশিন আছে হয়তো, নেই হয়তো। বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
রহিমা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। একটা বন্ধ ফ্যাক্টরির গেটে তালা ঝুলছে। তালাটা মরচে ধরা।