মিতুর প্রথম চাকরি
যখন আনন্দ আর দুঃখ একসাথে আসে
১
তানিয়া বলল, "তোমাকে অফার দিচ্ছি।"
মিতু বুঝল না প্রথমে। শব্দগুলো কানে ঢুকল, কিন্তু মাথায় পৌঁছাতে দেরি হলো। যেমন গাজীপুরের বাসে দাঁড়িয়ে থাকলে হঠাৎ সিট খালি হয়, কিন্তু বসতে ভুলে যায় মানুষ। অভ্যাস। দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস।
"জুনিয়র ডেভেলপার। ফুলটাইম। মাসে পঁচিশ হাজার টাকা।"
তানিয়ার অফিসে এসি চলছে। দেয়ালে একটা হোয়াইটবোর্ড, তাতে কিছু বাংলা শব্দ লেখা, কালো মার্কারে। মিতু শব্দগুলো পড়তে পারে, কিন্তু এখন পড়ছে না। সে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। তানিয়া চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে, হাতে একটা কফির মগ, মগে স্টিম উঠছে।
"ইন্টার্নশিপের তিন মাসে তোমার কাজ দেখেছি। তুমি যেভাবে বাগ ধরো, সেটা শেখানো যায় না। সেটা চোখ। তোমার চোখ আছে।"
মিতুর চোখ আম্মার মতো। আম্মা সোয়েটারে ত্রুটি দেখত, মিতু কোডে বাগ দেখে। একই চোখ। ভিন্ন জিনিসের দিকে তাকায়।
"হ্যাঁ," মিতু বলল।
"হ্যাঁ মানে?"
"হ্যাঁ, আমি রাজি।"
তানিয়া হাসল। "এত তাড়াতাড়ি? ভাবতে চাও না?"
"কী ভাবব?"
তানিয়া মগটা টেবিলে রাখল। "ঠিক আছে। সোমবার থেকে শুরু। এইচআরের সাথে কথা বলো, ডকুমেন্ট জমা দাও।"
মিতু উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে গেল। দরজার কাছে গিয়ে থামল।
"তানিয়া আপা।"
"হুম?"
"ধন্যবাদ।"
তানিয়া কিছু বলল না। মাথা নাড়ল। মিতু বের হয়ে গেল।
২
বাইরে করিডোরে এসে মিতু দেয়ালে হেলান দিল।
পঁচিশ হাজার টাকা।
সংখ্যাটা মাথায় ঘুরছে। পঁচিশ হাজার। আম্মার বেতন ছিল বারো হাজার। ওভারটাইম মিলিয়ে চৌদ্দ-পনেরো। বাবার রিকশায় আসত আট-দশ। দুইজনে মিলে বাইশ-পঁচিশ হাজার। মিতু একা সেই সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলবে। একটা চাকরিতে। একটা টেবিলে বসে। স্ক্রিনের সামনে।
মিতু নিজের ডেস্কে ফিরে এলো। ডেস্কটা ছোট, পাশে আরো তিনজনের ডেস্ক। ইন্টার্নদের বসার জায়গা। কিন্তু এখন থেকে সে ইন্টার্ন না। জুনিয়র ডেভেলপার। পদবিটা মুখে আনল, শব্দ করে না, ঠোঁট নড়ল শুধু। জুনিয়র ডেভেলপার।
ডেস্কের নিচে তার পায়ের দিকে তাকাল।
কাল নতুন জুতো কিনেছে। কালো। বন্ধ জুতো। জীবনে প্রথমবার স্যান্ডেল ছাড়া জুতো। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে পায়ে একটু অন্যরকম লাগছিল, শক্ত, পা ঢাকা, গোড়ালি পর্যন্ত। স্যান্ডেলে পা খোলা থাকে, বাতাস লাগে। জুতোয় পা বন্ধ, নিজের। দোকানদার বলেছিল, "সাইজ কত?" মিতু বলেছিল, "জানি না।" দোকানদার পা মেপে দিয়েছিল। ছত্রিশ।
জুতোটা চকচকে না। সাদামাটা। আটশো টাকা। ইন্টার্নশিপের স্টাইপেন্ড থেকে কিনেছে। এটাই প্রথম জিনিস যেটা নিজের রোজগারে কেনা।
মিতু আবার ডেস্কের নিচে তাকাল। জুতো দুটো সমান্তরালে রাখা, পা ভেতরে। দেখতে ভালো লাগছে। কেন ভালো লাগছে বুঝতে পারছে না। শুধু ভালো লাগছে।
সে আম্মাকে ফোন করবে।
ফোন বের করল। আম্মার নম্বরে চাপ দিল। তিন রিং। চার রিং। পাঁচ রিং। তারপর আম্মার গলা।
"কী রে?"
"আম্মা, আমার চাকরি হয়ে গেছে।"
একটু চুপ। তারপর আম্মার গলা, একটু ভিন্ন। "চাকরি?"
"হ্যাঁ। ফুলটাইম। সোমবার থেকে।"
"কত দেবে?"
"পঁচিশ হাজার।"
ফোনের ওপারে কোনো শব্দ নেই। তিন সেকেন্ড। পাঁচ সেকেন্ড। মিতু ভাবল কল কেটে গেছে। তারপর আম্মার গলা শোনা গেল। ভেজা গলা। কিন্তু কান্না না। কান্নার কাছাকাছি কিছু, কিন্তু রহিমা কান্না ধরে রাখতে জানে। আঠারো বছর ফ্যাক্টরিতে শিখেছে।
"তোর বাবাকে বলিস। খুশি হবে।"
"বলব।"
"ভালো করে কাজ কর। কেউ যেন বলতে না পারে।"
"হুম।"
ফোন রেখে মিতু চেয়ারে বসে রইল। মনে হলো আম্মার মুখটা দেখতে পাচ্ছে। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে, ফোন কানে, হাতের পিঠে চোখ মুছছে। কেউ দেখেনি। কেউ দেখবে না। রহিমা একা কাঁদে।
৩
দুপুরের পর মিতু আবার ফোন বের করল।
আম্মাকে তো জানিয়েছে। এখন আর কাকে বলবে? বাবা? বাবাকে রাতে বলবে, বাবা দিনে ঘুমায়। রাজু? রাজু এখন খেলছে, ফোন ধরবে না।
মিতু কন্ট্যাক্ট লিস্ট স্ক্রোল করল। নামগুলো উপর থেকে নিচে যাচ্ছে। বেশিরভাগ নাম অচেনা, পুরনো, কোনোদিন ফোন করে না। তারপর একটা নামে থামল।
রহিমা আপা।
না, এটা আম্মা না। এটা অন্য রহিমা। ফ্যাক্টরির রহিমা আপা। আম্মার লাইনের রহিমা। যে সবসময় আম্মার পাশের মেশিনে বসত। যে মিতুকে ছোটবেলায় কোলে নিত, বলত, "তোর মেয়েটা দেখতে তোর মতো, কিন্তু চোখে বুদ্ধি বেশি।"
রহিমা আপাকেও তো জানাতে পারে।
মিতু জানে রহিমা আপার চাকরি গেছে। আম্মা বলেছিল, দুই সপ্তাহ আগে। আম্মার গলায় তখন একটা অদ্ভুত শব্দ ছিল, রাগ না, দুঃখ না, কিছু একটা যেটার জন্য বাংলায় শব্দ নেই। আম্মা শুধু বলেছিল, "রহিমা আপার কাজ শেষ।" তারপর আর কিছু বলেনি।
মিতু ফোনের স্ক্রিনে রহিমা আপার নামটার দিকে তাকিয়ে রইল। আঙুল হোভার করছে। চাপবে? চাপবে না?
চাপল।
রিং হচ্ছে। এক। দুই। তিন। চার। পাঁচ। মিতু ভাবল ধরবে না। তারপর ধরল।
"হ্যালো?"
গলাটা চেনা। কিন্তু অন্যরকম। সমতল। ক্লান্ত না ঠিক, ক্লান্তিরও নিচে কিছু আছে, সেটা। যেন গলাটা খালি হয়ে গেছে, ভেতরে কিছু নেই।
"রহিমা আপা, আমি মিতু। রহিমার মেয়ে।"
"হ্যাঁ, চিনি। বল।"
মিতু বলতে যাচ্ছিল। বলতে যাচ্ছিল "আমার চাকরি হয়ে গেছে," বলতে যাচ্ছিল "পঁচিশ হাজার টাকা," বলতে যাচ্ছিল উত্তেজিত হয়ে, দ্রুত, যেভাবে ভালো খবর বলা হয়।
কিন্তু গলাটা শোনার পর থেমে গেল।
গলাটার ভেতরে কিছু নেই। আনন্দ নেই, রাগ নেই, অভিযোগ নেই। শুধু একটা শব্দ, "বল," যেন কথা বলা একটা শ্রম, আর রহিমা আপা সেই শ্রমটুকুও বাঁচাতে চাইছে।
"আপা, আমি, একটা চাকরি পেয়েছি। জুনিয়র ডেভেলপার।"
মিতু "পঁচিশ হাজার" বলতে যাচ্ছিল জোরে। কিন্তু গলা থেকে বেরোল ফিসফিস করে। যেন সংখ্যাটা বড় হয়ে গেছে, যেন এই মুহূর্তে এই সংখ্যাটা বলা ঠিক হবে না।
"পঁচিশ হাজার।"
ফোনের ওপারে নিশ্চুপ।
তারপর রহিমা আপা বলল, "ভালো।"
একটা শব্দ। "ভালো।" রহিমা আপা সবসময় এটা বলে। মিতু যখন স্কুলে ফার্স্ট হয়েছিল, রহিমা আপা বলেছিল "ভালো।" মিতু যখন কোডিং শেখা শুরু করেছিল, আম্মা রহিমা আপাকে বলেছিল, রহিমা আপা বলেছিল "ভালো।" একই শব্দ।
কিন্তু আজ শব্দটা অন্যরকম শোনাল।
আগে "ভালো" এর ভেতরে একটা উষ্ণতা ছিল। একটা হাসি ছিল। আজ "ভালো" শুধু একটা শব্দ। দুই অক্ষর। বাতাসে ভেসে এলো, তারপর হারিয়ে গেল।
মিতু আর কিছু বলতে পারল না। বলল, "আপা, আপনি কেমন আছেন?"
"আছি।"
"কিছু দরকার হলে বলবেন।"
"হুম।"
ফোন রাখল। মিতু ফোনটা টেবিলে রেখে দিল। স্ক্রিনটা কালো হয়ে গেল।
ডেস্কের নিচে কালো জুতো দুটো। একটু আগেও চকচকে লাগছিল। এখন শুধু জুতো।
৪
বিকেলে অফিস থেকে বের হয়ে মিতু বাসে উঠল।
বাসে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। গাড়ি যাচ্ছে, মানুষ হাঁটছে, দোকানের সাইনবোর্ডে আলো জ্বলছে। মিতু কিছু দেখছে না। সে রহিমা আপার গলাটা শুনছে। "ভালো।" বারবার।
মিতু ফোন বের করল। বিকাশ খুলল।
রহিমা আপার নম্বর টাইপ করল। অ্যামাউন্ট: দশ হাজার টাকা। রেফারেন্স লিখবে? মিতু রেফারেন্সের ঘরটা খালি রাখল। কোনো মেসেজ নেই। কোনো কথা নেই। শুধু টাকা।
পাঠাও চাপ দিল। পিন দিল। সেন্ট।
দশ হাজার টাকা। মিতুর ইন্টার্নশিপের স্টাইপেন্ড থেকে জমানো। প্রথম বেতন আসতে আরো এক মাস। কিন্তু এখন পাঠানো দরকার। কেন দরকার মিতু ঠিক জানে না। শুধু জানে, "ভালো" শব্দটা যেভাবে শোনালো, তারপর কিছু না করে বসে থাকা সম্ভব না।
বাস চলছে। মিতু ফোনটা ব্যাগে রাখল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। সন্ধ্যা হচ্ছে। আকাশের রঙ বদলাচ্ছে, কমলা থেকে বেগুনি।
৫
রহিমা আপার ফোনে নোটিফিকেশন এলো।
বিকাশ। দশ হাজার টাকা। প্রেরক: মিতু আক্তার। রেফারেন্স: খালি।
রহিমা আপা ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে তাকাল। দশ হাজার টাকা। মিতুর কাছ থেকে।
রহিমা আপা রান্নাঘরে বসে ছিল। ভাড়া বাসার রান্নাঘর। ছোট। চুলার পাশে একটা তাক, তাতে দুইটা থালা, তিনটা গ্লাস, একটা হাঁড়ি। আগে তার নিজের রান্নাঘরে অনেক বাসন ছিল। এখন এটুকু।
সে নম্বরটা চিনল। মিতুর নম্বর। রহিমার মেয়ে। যে মেয়েটাকে সে কোলে নিয়েছিল যখন রহিমা ফ্যাক্টরিতে ওভারটাইম করত। যে মেয়েটার চোখে আম্মার একগুঁয়েমি আর অন্যকিছু মিশে আছে, যেটার নাম রহিমা আপা জানে না।
রহিমা আপা ফোন করল না। কল ব্যাক করল না।
সে সংখ্যাটা দেখল। দশ হাজার। একবার গুনল। দশ, হ্যাঁ, দশ হাজার। আবার দেখল। আবার গুনল। দশ হাজার। ঠিকই আছে। কম না, বেশি না। দশ হাজার।
দুইবার গুনল। অভ্যাস। জিনিস গুনলে নিশ্চিত হওয়া যায়। রহিমা থেকে শিখেছে। কিংবা রহিমাদের লাইনে সবাই এমন, সবকিছু গোনে, বোতাম গোনে, সুতা গোনে, দিন গোনে। এখন রহিমা আপাও গুনছে। টাকা।
ফোনটা রেখে দিল। চুলার দিকে তাকাল। চুলা বন্ধ। রান্না করার কিছু নেই এখন। সন্ধ্যায় করবে। ছেলে স্কুল থেকে ফিরবে, ক্ষুধার্ত।
রহিমা আপা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। জানালার বাইরে একটা সরু গলি, গলির শেষে একটা মুদি দোকান, দোকানে একটা বাল্ব জ্বলছে। আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছে।
রহিমা আপা ফোনটা আবার হাতে নিল। স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। দশ হাজার টাকা। মিতু আক্তার।
সে ফোনটা টেবিলে রাখল। ওপরে বসিয়ে রাখল, সামনে। যেন একটু পরে আবার দেখবে।
বাইরে গলিতে একটা রিকশার ঘণ্টি বাজল। তারপর চুপ।