বেলাল ফিরলো রংপুরে

যে মাটি আর নিজের নয়

পর্ব ৩৮ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

বাসটা রংপুরে ঢুকল সন্ধ্যা সাতটায়।

বেলাল জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু চিনতে পারছিল না। রাস্তা চেনা, কিন্তু রাস্তার দুইপাশ বদলে গেছে। যেখানে শ্যামল সাহেবের চায়ের দোকান ছিল সেখানে একটা ফার্মেসি হয়েছে। যেখানে পুরনো বটগাছটা ছিল সেটা কাটা পড়েছে, জায়গায় একটা মোবাইল টাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে। বেলাল দুই বছর ঢাকায় ছিল। দুই বছর কম সময় না।

বাস থেকে নামল। কাঁধে একটা ব্যাগ। ব্যাগে দুইটা প্যান্ট, তিনটা শার্ট, একটা লুঙ্গি, একটা গামছা। এই নিয়ে গিয়েছিল, এই নিয়ে ফিরল। ব্যাগটা ভারী হয়নি।

ফারুক বলেছিল, "ফিরে যাইস না। ঢাকায় থাক, অন্য কাজ খুঁজ।" বেলাল বলেছিল, "কী কাজ? ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একটা একটা করে। যেগুলো খোলা আছে সেগুলোতে মানুষ কমাচ্ছে।" ফারুক চুপ করেছিল। ফারুকও জানে। ফারুকের নিজের লাইনেও গত মাসে তিনজনকে ছাঁটাই করেছে।

রংপুর শহর থেকে গঙ্গাচড়ার বাস ধরতে হবে। বেলাল বাসস্ট্যান্ডে গেল। বাস আধ ঘণ্টা পর। সে একটা চায়ের দোকানে বসল। চা অর্ডার করল। চা এলো, আদা দেওয়া, লাল। এক চুমুকে অর্ধেক শেষ করল। ঢাকায় এই চা পাওয়া যায় না। ঢাকার চায়ে দুধ বেশি, চিনি বেশি, চা কম।

চা খেতে খেতে বেলাল ফোন বের করল। ওয়ালপেপারটা দেখল। ধানক্ষেত। সবুজ ধানক্ষেত, ওপরে নীল আকাশ, দিগন্তরেখা একটু বাঁকা। এটা দুই বছর আগে তোলা। গঙ্গাচড়া থেকে ঢাকায় রওনা হওয়ার আগের দিন। বাবার জমি। তখন ধান ছিল।

বাবার বাসা আর আগের জায়গায় নেই।

বেলাল যখন বাসা বলত, তখন একটা টিনের ঘর বোঝাত, তিনটা ঘর, সামনে উঠান, উঠানে একটা পেয়ারাগাছ, পেছনে পুকুর। সেই বাসা বাবার জমির পাশে ছিল। জমির সাথে বাসা ছিল, বাসার সাথে জমি ছিল। আলাদা করা যেত না।

এখন বাবা ভাড়া বাসায়।

গঙ্গাচড়া বাজারের কাছে একটা পাকা বাড়ির নিচতলায় একটা ঘর। একটা। একটাই। আগে তিনটা ঘর ছিল, এখন একটা। ঘরে একটা খাট, খাটে বাবার বিছানা। মেঝেতে একটা পাটি, সেটা বেলালের হবে। একটা আলমারি, কাঠের, পুরনো, দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় না। দেয়ালে একটা পেরেক, তাতে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে, গত বছরের।

ঘরটায় ঢুকতেই একটা গন্ধ নাকে এলো। ভেজা কংক্রিটের গন্ধ। সিমেন্ট আর পানির মিশ্রণ। দেয়ালের নিচের দিকে স্যাঁতসেঁতে দাগ, বর্ষায় পানি ওঠে মনে হয়। মেঝেও স্যাঁতসেঁতে। ঘরে জানালা একটা, ছোট, বাতাস ঢোকে কম। বেলাল ব্যাগটা মেঝেতে নামাল। শ্বাস নিল। কংক্রিটের গন্ধ। ধানক্ষেতের গন্ধ না। মাটির গন্ধ না। সেই গন্ধ যেটা বেলাল চোখ বন্ধ করেও চিনতে পারত, সেটা এখানে নেই।

করিম চেয়ারে বসে ছিল। প্লাস্টিকের চেয়ার। একটাই আছে। বেলালকে দেখে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু দ্রুত না, ধীরে। শরীরটা ভেঙে গেছে। দুই বছর আগেও করিমের পিঠ সোজা ছিল, কাঁধ চওড়া ছিল, হাতে শক্তি ছিল। এখন পিঠ বাঁকা, কাঁধ ঝুলে পড়েছে। চোখের নিচে কালো দাগ।

"এলি?" করিম বলল।

"এলাম।"

বেলাল বাবার দিকে তাকাল। করিম বেলালের দিকে তাকাল। দুজনে কিছু বলল না। কিছু বলার মতো কিছু নেই। দুজনেই জানে কী হয়েছে। জমি বিক্রি হয়ে গেছে। কোল্ড স্টোরেজ কোম্পানি কিনেছে। সাত লক্ষ টাকা দিয়েছে, দুই বিঘার জন্য। সাত লক্ষ। করিমের দাদা যখন এই জমি পরিষ্কার করেছিল, তখন জমির কোনো দাম ছিল না। জঙ্গল কেটে, শিকড় তুলে, মাটি সমান করে, ধানের জন্য তৈরি করেছিল। তিন প্রজন্মের মাটি। সাত লক্ষ টাকা।

দেয়ালের কোণে দাও-টা দেখল বেলাল।

বাবার দাও। যেটা দিয়ে বাঁশ কাটত, ডাল ছাঁটত, মাঝে মাঝে মাছ কাটত। দাও-এর বাঁট ভাঙা। তিন মাস আগে ভেঙেছে। বেলাল ঢাকায় থাকতে বাবা একদিন ফোনে বলেছিল, "দাও-টার বাঁট ভেঙে গেছে।" বেলাল বলেছিল, "ঠিক করিয়ে নাও।" করিম বলেছিল, "পরে করব।"

পরে করেনি। দাও-টা আগের বাসার দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা ছিল। এখন এই ভাড়া ঘরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা। একই দাও, ভিন্ন দেয়াল। এখনো ভাঙা।

পরদিন সকালে বেলাল জমিতে গেল।

যে জমি আর তার নয়।

হেঁটে যেতে বিশ মিনিট। আগে পাঁচ মিনিট লাগত, কারণ বাসা ছিল জমির পাশে। এখন ভাড়া বাসা বাজারের কাছে, জমি গ্রামের শেষে। রাস্তাটা চেনা। মাটির রাস্তা, দুইপাশে আল, আলের ধারে ঘাস। কিন্তু রাস্তাও বদলেছে। একটা জায়গায় নতুন ইটের রাস্তা হয়েছে, গাড়ি চলার জন্য। কোল্ড স্টোরেজের ট্রাক ঢুকবে, তাই রাস্তা চওড়া করেছে।

জমিতে পৌঁছে বেলাল দাঁড়াল।

ধান নেই। ধানক্ষেত নেই। মাটি আছে, কিন্তু মাটি খোঁড়া হয়েছে। একটা বড় গর্ত, লম্বায় হাত পঞ্চাশেক, চওড়ায় ত্রিশেক। ফাউন্ডেশন। কোল্ড স্টোরেজের ফাউন্ডেশন। গর্তের পাশে বালির স্তূপ, ইটের স্তূপ, সিমেন্টের বস্তা। একটা কংক্রিট মিক্সার মেশিন দাঁড়িয়ে আছে, হলুদ রঙের, নোংরা।

শ্রমিকরা কাজ করছে। সাত-আটজন। কংক্রিট ঢালছে মাটির ওপর। বেলালের দাদা যে মাটি পরিষ্কার করেছিল, যে মাটিতে বেলালের বাবা সারাজীবন ধান ফলিয়েছে, সেই মাটির ওপর ধূসর কংক্রিট পড়ছে। সরসর শব্দে। মিক্সার ঘুরছে। কংক্রিট গড়িয়ে আসছে। মাটি ঢাকা পড়ছে।

বেলাল দাঁড়িয়ে দেখল।

একটা শ্রমিক বেলভেল দিয়ে কংক্রিট সমান করছে। আরেকজন বালতিতে করে কংক্রিট আনছে মিক্সার থেকে। কেউ বেলালের দিকে তাকায়নি। সে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে, গর্তের পাশে, হাত দুইটা পাশে ঝুলছে।

মাটিটা কালো ছিল। পলিমাটি। বর্ষায় নরম হতো, শুকনো মৌসুমে শক্ত। ধান লাগানোর আগে হাল দিলে মাটি থেকে একটা গন্ধ উঠত, ভেজা, মিষ্টি, জীবন্ত। সেই মাটি এখন কংক্রিটের নিচে। চিরকালের জন্য।

একজন লোক এগিয়ে এলো। হেলমেট পরা। হাতে একটা ক্লিপবোর্ড। কনস্ট্রাকশন সুপারভাইজার মনে হয়। লোকটা বেলালের দিকে তাকাল।

"এখানে দাঁড়ানো যাবে না।"

বেলাল লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা তাকে চেনে না। বেলালও তাকে চেনে না। বাইরের লোক, শহর থেকে এসেছে, কোম্পানির লোক।

"এটা আমার জমি ছিল।"

লোকটা একটু থামল। বেলালের দিকে তাকাল। তারপর বলল, "ছিল।"

একটা শব্দ। অতীতকাল। "ছিল" মানে আর নেই। "ছিল" মানে শেষ। বাংলা ভাষায় এর চেয়ে নির্মম শব্দ আর নেই। "আছে" তে আশা আছে, "থাকবে" তে ভবিষ্যৎ আছে, কিন্তু "ছিল" এ কিছু নেই। শুধু একটা দরজা, বন্ধ, তালা দেওয়া, চাবি ফেলে দেওয়া।

লোকটা চলে গেল। বেলাল দাঁড়িয়ে রইল।

মিক্সার ঘুরছে। কংক্রিট পড়ছে। শ্রমিকরা কাজ করছে। কেউ বেলালের দিকে তাকাচ্ছে না। সে এখানে অদৃশ্য। এই জমিতে সে জন্মেছে, এই জমিতে দৌড়েছে, এই জমিতে বাবার সাথে ধান কেটেছে, কিন্তু এখন সে এখানে কেউ না। একটা লোক, রাস্তার ধারে দাঁড়ানো, যাকে সরে যেতে বলা হয়েছে।

বেলাল ফিরে এলো।

ভাড়া ঘরে। ভেজা কংক্রিটের গন্ধওয়ালা ঘরে। করিম খাটে শুয়ে ছিল, ঘুমাচ্ছিল না, শুধু শুয়ে ছিল। ছাদের দিকে তাকিয়ে। বেলাল ঢুকতে চোখ ঘোরাল, কিন্তু কিছু বলল না। বেলালও কিছু বলল না।

বেলাল মেঝেতে পাটিতে বসল। পিঠ দেয়ালে ঠেকাল। দেয়াল শীতল। স্যাঁতসেঁতে।

সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। জানালাটা ছোট, একটু উঁচুতে। বাইরে একটা গলি দেখা যায়, গলির ওপারে আরেকটা বাড়ি, বাড়ির ছাদে কাপড় শুকাচ্ছে কেউ। আকাশ দেখা যায় না এই জানালা থেকে। আগের বাসায় দরজা খুললেই আকাশ, ধানক্ষেত, দিগন্ত। এখানে দরজা খুললে গলি।

রাতে বেলাল মেঝেতে শুয়ে পড়ল। পাটি পাতলা, মেঝে শক্ত। পিঠে লাগছে। ঢাকাতেও মেঝেতে শুত, ফারুকের ঘরে। কিন্তু সেটা অন্য মেঝে ছিল, সাময়িক ছিল, একদিন এখান থেকে উঠে যাব জানত। এই মেঝে স্থায়ী। এই মেঝে বাড়ি। বাড়ি বলতে এখন এটাই।

করিম খাটে শুয়ে আছে। নাক ডাকছে না, শ্বাস টানছে ধীরে ধীরে। বেলাল বাবার শ্বাসের শব্দ শুনল। আগে বাবার শ্বাসের সাথে রাতের পোকামাকড়ের শব্দ মিশে থাকত, ব্যাঙের ডাক মিশত, দূর থেকে শেয়ালের ডাক আসত। এখন শুধু বাবার শ্বাস, আর বাইরের রাস্তায় মাঝে মাঝে একটা মোটরসাইকেলের শব্দ।

বেলাল ফোন বের করল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ওয়ালপেপার। ধানক্ষেত। সবুজ। নীল আকাশ।

সে ওয়ালপেপারটার দিকে তাকাল। এটা বদলানো উচিত। এই ক্ষেত আর নেই। এই সবুজ এখন ধূসর কংক্রিটের নিচে। এই ছবি রাখা মানে এমন কিছু দেখা যেটা আর বাস্তবে নেই।

বেলাল সেটিংসে গেল। ওয়ালপেপার। চেঞ্জ ওয়ালপেপার।

থামল।

আঙুল স্ক্রিনের ওপর। চাপ দিলেই বদলে যাবে। অন্য কোনো ছবি আসবে। ফোনে যে ছবিগুলো আছে, সেগুলোর কোনোটা। ফারুকের সাথে সেলফি। ফ্যাক্টরির গেটের সামনে। শিরিনের সাথে লাঞ্চের ছবি। এগুলোর কোনো একটা দিতে পারে।

বেলাল ব্যাক বাটন চাপল।

ওয়ালপেপার বদলাল না। ধানক্ষেত রইল।

সে ফোনটা বুকের ওপর রাখল। স্ক্রিন নিভে গেল। ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। দেয়ালের কোণে দাও-টা দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে দেখা যায় না, কিন্তু বেলাল জানে কোথায় আছে। ভাঙা বাঁট, মরচে পড়া ফলা। আগের দেয়ালে ছিল, এই দেয়ালে আছে। কেউ ঠিক করেনি। কেউ ঠিক করবে না। ঠিক করে কী হবে। যে জঙ্গল কাটার জন্য দাও, সে জঙ্গল নেই। যে বাঁশ ছাঁটার জন্য দাও, সে বাঁশঝাড় নেই। দাও-টা এখন শুধু একটা জিনিস। পুরনো, ভাঙা, কাজহীন।

বাইরে একটা কুকুর ডাকল। তারপর চুপ হয়ে গেল।

বেলাল চোখ বন্ধ করল। ঘুম এলো না। মেঝে শক্ত। বালিশ পাতলা। ঘরে ভেজা কংক্রিটের গন্ধ।

বেলাল ধানক্ষেতের গন্ধ ভাবার চেষ্টা করল। সেই গন্ধ, ভেজা মাটির, সবুজ ধানের, সকালের শিশিরের। ভাবতে পারল না। গন্ধটা মনে আসছে না। কংক্রিটের গন্ধ সব ঢেকে দিয়েছে।

বুকের ওপর ফোনটা রাখা। স্ক্রিন নিভে আছে। ভেতরে ধানক্ষেত। বাইরে অন্ধকার।