যে রাতে সবাই জেগে ছিল
১
রহিমা হিসেব করছে।
চোখ বন্ধ। পাশে আলম ঘুমাচ্ছে। আলমের নাক ডাকে। আঠারো বছর ধরে ডাকে। প্রথম প্রথম ঘুম হতো না। এখন নাক ডাকার শব্দ ছাড়া ঘুম হয় না। শব্দটা একটা ছন্দ। ওঠে, নামে, ওঠে, নামে। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। রহিমা সমুদ্র দেখেনি কোনোদিন।
হিসেব।
ব্যাংকে আছে সাতচল্লিশ হাজার টাকা। আলমের পকেটে হয়তো তিন-চার হাজার। বাড়িতে টিনের কৌটায় আট হাজার। সব মিলিয়ে আটান্ন-ষাট হাজার। ভাড়া সাত হাজার। খাওয়া পনেরো-ষোলো হাজার, কম করলেও বারো হাজারের নিচে নামানো যায় না, চালের দাম যা। রাজুর টিউশন তিন হাজার। মিতুর ফোনের বিল পাঁচশো। বিদ্যুৎ বিল দেড় হাজার। আলমের রিকশার মালিকের ভাড়া দুই হাজার। গ্যাস, পানি, ওষুধ, যাতায়াত, বাকি তিন-চার হাজার। মাসে মোট খরচ তিরিশ হাজারের কাছাকাছি।
আলমের রিকশায় আসে আট-দশ হাজার। বাকি বিশ হাজার রহিমা দিত। রহিমা এখন দেয় না। রহিমার চাকরি নেই।
ষাট হাজারকে বিশ দিয়ে ভাগ করলে তিন। তিন মাস। যদি রাজুর টিউশন বন্ধ করে, আর মিতুর ফোনের বিল কমায়, তাহলে চার মাস। যদি খাওয়া আরো কমায়, মাছ বাদ, ডিম বাদ, শুধু ডাল আর সবজি, তাহলে পাঁচ মাস হতে পারে। হয়তো।
পাঁচ মাস।
রহিমা চোখ খুলল। ছাদের দিকে তাকাল। ছাদে একটা গিরগিটি আছে। রাতে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু রহিমা জানে ওটা আছে। প্রতিদিন একই জায়গায় থাকে। গিরগিটিটার কোনো ভাড়া নেই, কোনো বিল নেই, কোনো সন্তানের টিউশন নেই। একটা মশা খেলেই হলো।
রাজুর টিউশন বন্ধ করলে রাজু কী বলবে? কিছু বলবে না। রাজু কিছু বলে না। চুপচাপ ছেলে। কিন্তু চোখে একটা কিছু হবে। একটা নিভে যাওয়া। রহিমা সেটা সহ্য করতে পারবে না।
বাইরে একটা কুকুর ডাকল। তারপর আরেকটা। তারপর আরেকটা। দূর থেকে আরেকটা। কুকুরগুলো একটার পর একটা ডাকছে, যেন চেইন। একটা শুরু করে, পাশেরটা ধরে, তার পাশেরটা ধরে। পুরো মহল্লা জুড়ে কুকুরের ডাক। কারোরই ঘুম নেই। কুকুরদেরও না।
রহিমা আবার চোখ বন্ধ করল। আবার হিসেব শুরু করল। একই হিসেব। আবার। একই উত্তর আসবে জানে। তবু করল। হিসেব করলে মনে হয় কিছু একটা করছে। হিসেব না করলে শুধু ভয়। হিসেব করলে ভয়ের একটা সংখ্যা থাকে। সংখ্যা যতই ছোট হোক, ভয়ের চেয়ে ভালো।
চার মাস। হয়তো পাঁচ।
২
করিমের ঘরের ছাদে কোনো ফাটল নেই।
এটা সমস্যা। রংপুরের পুরনো ঘরে ছাদে ফাটল ছিল। ফাটলটা প্রতি বর্ষায় একটু বড় হতো। করিম শুয়ে শুয়ে দেখত ফাটলটা বাড়ছে। এটা একটা কাজ ছিল। কিছু একটা দেখা। কিছু একটা বদলানো লক্ষ করা।
এই ভাড়া ঘরের ছাদ সিমেন্টের। মসৃণ। ধূসর। একঘেয়ে। কোনো ফাটল নেই। কোনো দাগ নেই। কিছু নেই। করিম ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু দেখার কিছু নেই।
গাজীপুর শহরে তিন মাস হলো। সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি। রাত আটটা থেকে সকাল আটটা। একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির গেটে দাঁড়িয়ে থাকা। কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে, লিখে রাখা। করিম লিখতে পারে। এটাই তার যোগ্যতা। আর দাঁড়াতে পারে। বারো ঘণ্টা।
আজ ছুটির দিন। করিম শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না।
ঘরটা ছোট। একটা খাট, একটা আলমারি, একটা চেয়ার। জানালা একটা, রাস্তার দিকে। রাস্তা থেকে শব্দ আসছে। ট্রাক যাচ্ছে। মোটরসাইকেল যাচ্ছে। গাজীপুরে রাতেও যানবাহন চলে। ফ্যাক্টরির শিফট বদল হয়। রাত বারোটায় ট্রাক আসে, কাপড় নিয়ে। ভোর চারটায় আরেকটা ট্রাক। শব্দ থামে না।
রংপুরে রাতে নিস্তব্ধ ছিল। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকত। মাঝে মাঝে শেয়াল। আর কিছু না। করিমের শরীর সেই নিস্তব্ধতায় অভ্যস্ত। এই শব্দে ঘুম হয় না।
হালিমা আর বাচ্চারা রংপুরে। শ্বশুরবাড়িতে। করিম একা। প্রতি মাসে ছয় হাজার টাকা পাঠায়। বেতন নয় হাজার। ভাড়া তিন হাজার। বাকি থাকে শূন্য। খাওয়া? ফ্যাক্টরি রাতে একবেলা দেয়। বাকি একবেলা করিম নিজে রান্না করে। ভাত আর ডাল। মাঝে মাঝে ডিম।
করিম পাশ ফিরল। দেয়ালের দিকে তাকাল। দেয়ালে একটা পেরেক আছে। পেরেকে কিছু ঝুলছে না। আগের ভাড়াটে হয়তো কিছু ঝুলিয়েছিল। ছবি, ক্যালেন্ডার, কিছু একটা। করিম কিছু ঝোলায়নি। ঝোলানোর কিছু নেই।
ধানের মৌসুমে করিম ফিরে যেতে চায়। কিন্তু ধান কে কিনবে? ধানের দাম নেই। চালকলে যন্ত্র বসেছে, কম লোক লাগে। মাঠে ড্রোন যায়, কম লোক লাগে। সব জায়গায় কম লোক লাগে। করিম বেশি লোকের দলে।
ছাদের দিকে তাকাল। মসৃণ। ধূসর। একটা ফাটলও নেই।
৩
তানিয়ার ল্যাপটপে বারোটা ট্যাব খোলা।
সব চাকরির বিজ্ঞাপন। বিডিজবস, লিংকডইন, ফেসবুক গ্রুপ। তানিয়া খুঁজছে না নিজের জন্য। নিজের কোম্পানি চলছে, কোনোমতে। সে খুঁজছে শিহাবের জন্য। তাসনিমের জন্য। রাকিবের জন্য। তিনজনকে ছাঁটাই করেছে গত মাসে। ক্লায়েন্ট কমেছে। রাজস্ব কমেছে। তিনজনের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই।
ছাঁটাইয়ের দিন তাসনিম কেঁদেছিল। শিহাব কিছু বলেনি। রাকিব বলেছিল, "কোনো সমস্যা নেই, আপা। আমি বুঝি।" রাকিব বোঝে। সবাই বোঝে। বোঝা সহজ। চাকরি পাওয়া কঠিন।
তানিয়া স্ক্রল করছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ঢাকা, অভিজ্ঞতা পাঁচ বছর। শিহাবের সাত বছর আছে। ক্লিক করল। বেতন লেখা নেই। "আকর্ষণীয় বেতন।" আকর্ষণীয় মানে কত? কেউ জানে না। আকর্ষণীয় মানে যা দেবে তাই নেবে, কারণ বিকল্প নেই।
পরেরটা। ডাটা অ্যানালিস্ট। অভিজ্ঞতা তিন বছর। তাসনিমের জন্য হতে পারে। কিন্তু লেখা আছে, "এআই টুলসে দক্ষতা আবশ্যক।" প্রতিটা বিজ্ঞাপনে এখন এই লাইন। এআই টুলসে দক্ষতা। মানে কী? মানে কম লোক দিয়ে বেশি কাজ। মানে আগে যেখানে পাঁচজন লাগত এখন দুইজন। বাকি তিনজন তানিয়ার শিহাব, তাসনিম, রাকিব।
রাত দুইটা বাজে। তানিয়ার চোখ জ্বলছে। স্ক্রিনের নীল আলো। সে জানে এই আলো ঘুম নষ্ট করে। মেলাটোনিন কমায়। সে এসব জানে। জেনে লাভ নেই। ঘুম আসবে না।
আরেকটা ট্যাব খুলল। রাকিবের জন্য। জুনিয়র ডেভেলপার। পোস্ট হয়েছে তিন দিন আগে। আবেদন করেছে দুইশো তেষট্টি জন। দুইশো তেষট্টি।
তানিয়া ল্যাপটপ বন্ধ করল। অন্ধকার। বনানীর ফ্ল্যাট। জানালা দিয়ে রাস্তার বাতি দেখা যাচ্ছে। কমলা আলো। তানিয়া ভাবল, সে তো ওদের ছাঁটাই করতে চায়নি। সে নিজেও ছাঁটাই হয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে, টুকরো টুকরো, ক্লায়েন্ট একটা একটা করে চলে যাচ্ছে, কিন্তু তার কেউ নেই যে তাকে ডেকে বলবে "দুঃখিত।"
ল্যাপটপ আবার খুলল।
৪
সেলিনার চর পোস্টিংয়ে বিদ্যুৎ নেই আজ।
কাল ছিল। তার আগের দিন ছিল না। তার আগের দিন ছিল। এভাবে চলে। থাকে, থাকে না, থাকে, থাকে না। সেলিনা অভ্যস্ত।
সে বারান্দায় বসে আছে। পা ঝুলিয়ে। নদীর শব্দ আসছে। নদী বারো মাস কথা বলে। একই কথা। জল যাচ্ছে। জল যাচ্ছে। জল যাচ্ছে। সেলিনা শুনছে।
আকাশে তারা আছে। চাঁদ নেই। চাঁদ না থাকলে তারা বেশি দেখা যায়। সেলিনা তারা গুনছে না। তারা গোনার বয়স পেরিয়ে গেছে।
ট্যাবলেটটা ভেতরে টেবিলে আছে। চার্জ নেই। কালকে বিদ্যুৎ আসলে চার্জ দেবে। ট্যাবলেট ছাড়া সেলিনা কাজ করতে পারে। আগেও করত। কিন্তু ট্যাবলেট ছাড়া সে রিপোর্ট পাঠাতে পারে না। রিপোর্ট না পাঠালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কেউ জানে না সে কী করছে। জানে না মানে সে নেই। অদৃশ্য।
নদীর শব্দ। জল যাচ্ছে।
আজ বিকেলে একটা বাচ্চা এসেছিল। জ্বর। মা নিয়ে এসেছিল। সেলিনা হাত দিয়ে কপাল ছুঁয়ে দেখল। গরম। পুরনো থার্মোমিটার দিয়ে মাপল। একশো দুই। প্যারাসিটামল দিল। বলল, "দুইদিন পর না কমলে আবার আসবেন।" মা বলল, "আচ্ছা।" চলে গেল।
সেলিনা এটুকুই করতে পারে। এটুকুই সবসময় করত। ট্যাবলেট আসার পর আরো কিছু করত, লক্ষণ দিত, ট্যাবলেট বলত কী হতে পারে, কোথায় পাঠাতে হবে। এখন ট্যাবলেট বন্ধ। সেলিনা নিজে। শুধু নিজে। যথেষ্ট? জানে না।
নদীর ধারে একটা নৌকা বাঁধা আছে। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু সেলিনা জানে ওটা আছে। মাঝির নৌকা। মাঝি এই পারে ঘুমায়, ভোরে ওই পারে যায়। সরল জীবন। নৌকা, নদী, দুই পাড়। কোনো অ্যাপ নেই, কোনো রেটিং নেই, কোনো রিপোর্ট নেই।
সেলিনা উঠল না। বসে রইল। নদী কথা বলছে। সেলিনা শুনছে।
৫
জাহিদের শরীর জানে রাত তিনটায় কী করতে হয়।
উঠতে হয়। জুতো পরতে হয়। হেলমেট নিতে হয়। বের হতে হয়। কনস্ট্রাকশন সাইটে যেতে হয়। সিমেন্ট মেশাতে হয়। ইট তুলতে হয়। রোদ ওঠার আগে যতটা পারো কাজ শেষ করতে হয়।
জাহিদ শুয়ে আছে। নেত্রকোনায়। নিজের ঘরে। পাশে রশিদা ঘুমাচ্ছে। বাচ্চারা পাশের ঘরে। জাহিদ দুই মাস হলো ফিরেছে। কিন্তু তার শরীর ফেরেনি। তার শরীর এখনো দোহায় আছে। উপসাগরীয় সময়ে চলছে। রাত তিনটায় তার পেশি টান ধরে, হাতের আঙুল নড়ে, পা নামাতে চায় খাটের নিচে।
জাহিদ উঠে বসল। ঘরে অন্ধকার। রশিদা নড়ল একটু, আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
জাহিদ উঠোনে গেল। আকাশ পরিষ্কার। ঠান্ডা হাওয়া। শীত চলে গেছে, কিন্তু রাতে একটু ঠান্ডা লাগে। জাহিদ লুঙ্গির ওপর একটা গেঞ্জি পরেছে। দোহায় এই সময়ে সে পুরো কাপড় পরত। বুট জুতো, হেলমেট, ভেস্ট।
দোহায় রাত তিনটায় সাইট জ্বলজ্বল করত। ফ্লাডলাইট। দিনের মতো উজ্জ্বল। এখানে রাত তিনটায় অন্ধকার। শুধু তারা। দোহায় তারা দেখা যেত না। আলো খেয়ে ফেলত। এখানে তারা আছে। কিন্তু জাহিদ তারা দেখছে না। সে উঠোনের মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। মাটি ঠান্ডা। পায়ের নিচে ভেজা।
দুই বছর দোহায় ছিল। রোবটিক আর্ম চালাত কনস্ট্রাকশনে। কোম্পানি বলেছিল, রোবটিক আর্ম শিখলে বেশিদিন কাজ থাকবে। শিখেছিল। তারপর আরো ভালো রোবট এলো। যেটা অপারেটর ছাড়াই চলে। জাহিদের আর দরকার নেই। "কন্ট্রাক্ট রিনিউ হবে না।" এক লাইন। ইমেইলে।
জাহিদ উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীর বলছে, কাজে যাও। তার মাথা বলছে, কোনো কাজ নেই। শরীর শোনে না। শরীর দুই বছর ধরে শিখেছে, রাত তিনটা মানে কাজ। শরীরকে ভোলানো যায় না। শরীর মনে রাখে।
রশিদা দরজায় এসে দাঁড়াল। "আবার উঠেছ?"
"ঘুম আসে না।"
"আসো ভেতরে। ঠান্ডা লাগবে।"
জাহিদ ভেতরে গেল। শুয়ে পড়ল। ছাদের দিকে তাকাল। চোখ বন্ধ করল। পেশি টান ধরছে। হাত কাজ চাইছে। পা হাঁটতে চাইছে।
রাত তিনটা বেজে চৌদ্দ মিনিট।
দোহায় এতক্ষণে প্রথম ট্রাক আসত। সিমেন্টের গন্ধ পেত নাকে। এখানে ভেজা মাটির গন্ধ। রশিদার চুলের তেলের গন্ধ। বাচ্চাদের ঘরে মশার কয়েল জ্বলছে, তার গন্ধ।
জাহিদ চোখ খুলে তাকিয়ে রইল। ছাদের দিকে। ঘুম আসবে না। সে জানে। ভোর পাঁচটার দিকে হয়তো আসবে। যখন দোহায় শিফট শেষ হতো। শরীর তখন ছাড়বে। তার আগে না।
জানালা দিয়ে আকাশ একটু ফিকে হচ্ছে। না, হচ্ছে না। এখনো রাত। অনেক রাত বাকি।