ত্রিশ শতাংশ
১
সাইকেলটার নাম বন্ধু।
রহিমা নিজেই নাম রেখেছে। কাউকে বলেনি। বললে হাসবে। মানুষ সাইকেলের নাম রাখে? রাখে। রহিমা রাখে। করিম ভাতের সাথে কথা বলে, রহিমা সাইকেলের সাথে কথা বলে। পৃথিবীতে একা মানুষ কিছু না কিছুর সাথে কথা বলে। না বললে পাগল হয়ে যায়।
বন্ধু পুরনো সাইকেল। কালো রঙ। জায়গায় জায়গায় মরচে ধরেছে। চেইনটা একটু ঢিলা। প্যাডেল মারলে কটকট শব্দ হয়। পেছনে একটা ঝুড়ি, রহিমা নিজে তার দিয়ে বেঁধেছে। ঝুড়িটা বাজার থেকে কেনা, মাছের ঝুড়ি আসলে, কিন্তু এখন এতে খাবারের প্যাকেট যায়। ঝুড়ির তলায় রহিমা একটা পলিথিন বিছিয়ে দিয়েছে, বৃষ্টিতে যেন খাবার ভেজে না।
"চল বন্ধু," রহিমা বলল। সকাল এগারোটা। প্রথম অর্ডার এসেছে ফোনে। গাজীপুর চৌরাস্তার কাছে একটা রেস্তোরাঁ থেকে পিক আপ। ডেলিভারি দুই কিলোমিটার দূরে। আনুমানিক সময় পনেরো মিনিট। অ্যাপ বলছে পনেরো মিনিট। রাস্তায় ট্রাফিক থাকলে বিশ লাগবে। তখন অ্যাপ রাগ করবে। অ্যাপ ট্রাফিক বোঝে না।
রহিমা প্যাডেল মারল। বন্ধু কটকট করতে করতে চলল।
২
অ্যাপটার নাম ফুডফ্লাই।
রহিমা নামটা পছন্দ করে না। খাবার কি মাছি? উড়বে কেন? কিন্তু নাম নিয়ে কে ভাবে। কাজ দেয়, এটাই যথেষ্ট।
অ্যাপে সাইন আপ করতে মিতু সাহায্য করেছিল। ফোনে অ্যাপ নামিয়ে, ছবি তুলে, এনআইডি দিয়ে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দিয়ে। মিতু বলেছিল, "আম্মা, এরা ত্রিশ পার্সেন্ট কমিশন নেয়।" রহিমা বলেছিল, "ত্রিশ পার্সেন্ট মানে কত?" মিতু বলেছিল, "মানে তুমি একশো টাকা আনলে সত্তর টাকা তোমার। ত্রিশ টাকা ওদের।" রহিমা বলেছিল, "ওরা কী করে ত্রিশ টাকার?" মিতু বলেছিল, "অ্যাপ চালায়।"
অ্যাপ চালায়। একটা অ্যাপ। ফোনের ভেতরে। চোখে দেখা যায় না, হাতে ধরা যায় না, কিন্তু ত্রিশ টাকা নিয়ে নেয় প্রতি একশো থেকে। রহিমা ভাবল, ফ্যাক্টরিতে সুপারভাইজার ছিল, ম্যানেজার ছিল, ফ্লোর ইনচার্জ ছিল। তাদের দেখা যেত। তাদের কাছে গিয়ে বলা যেত, "ভাই, আমার ওভারটাইমের টাকা দেননি।" তারা হয়তো দিত, হয়তো দিত না, কিন্তু বলা যেত। এই অ্যাপকে কী বলবে? কোথায় বলবে? কাকে বলবে?
প্রথম অর্ডার। রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখল খাবার তৈরি হয়নি। সাত মিনিট অপেক্ষা করল। অ্যাপের টাইমার চলছে। খাবার পেল। ঝুড়িতে রাখল। বের হলো।
ডেলিভারি দিল। কাস্টমার দরজা খুলে প্যাকেট নিল। কিছু বলল না। দরজা বন্ধ করল। ফোনে দেখল, চল্লিশ টাকা জমা হয়েছে। চল্লিশ টাকা। সাত মিনিট অপেক্ষা, পনেরো মিনিট রাস্তা, আর চল্লিশ টাকা।
৩
দুপুরে ব্যস্ত সময়। একটার পর একটা অর্ডার। রহিমা প্যাডেল মারছে। গাজীপুরের রাস্তা। ট্রাক, সিএনজি, রিকশা, মোটরসাইকেল, সব মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি। রহিমা ফাঁক খুঁজে সাইকেল চালাচ্ছে। ঘাম হচ্ছে। পিঠে রোদ পড়ছে।
"চল বন্ধু, আরেকটু," রহিমা বলল সাইকেলকে।
দ্বিতীয় অর্ডার। পঞ্চাশ টাকা। তৃতীয় অর্ডার। পঁয়তাল্লিশ টাকা। চতুর্থ অর্ডার। পঁয়ত্রিশ টাকা। পঁয়ত্রিশ? কম কেন? ছোট অর্ডার। এক প্যাকেট পরোটা আর ডাল। অল্প দামের অর্ডারে কমিশনের পর কিছু থাকে না।
রহিমা হিসেব করছে প্যাডেল মারতে মারতে। হিসেব তার অভ্যাস। আজ এখন পর্যন্ত একশো সত্তর টাকা। দিনে আটটা-দশটা ডেলিভারি দিতে পারলে তিনশো থেকে চারশো টাকা হয়। মাসে ছাব্বিশ দিন কাজ করলে আট-দশ হাজার। ভালো দিন গেলে বারো হাজার।
ফ্যাক্টরিতে রহিমা পেত পনেরো হাজার। ওভারটাইম মিলিয়ে। সাথে ছিল ঈদ বোনাস, অসুস্থ হলে ছুটি, একটা বেতন ঠিক তারিখে আসত। এখন কিছু নেই। অসুস্থ হলে কাজ নেই। কাজ না করলে টাকা নেই। ঈদ বোনাস? কোন ঈদ বোনাস? অ্যাপ ঈদ চেনে না।
পঞ্চম অর্ডার এলো। রহিমা ফোনে দেখল। পিক আপ পয়েন্ট, তার পুরনো ফ্যাক্টরির রাস্তায়। সে থামল। একটু ভাবল। তারপর অ্যাপে "গ্রহণ করুন" চাপল।
৪
ফ্যাক্টরির সামনে দিয়ে গেল রহিমা। সাইকেলে।
ফ্যাক্টরি চলছে। গেট খোলা। গার্ড দাঁড়িয়ে। ভেতরে আলো জ্বলছে। কিন্তু আগের চেয়ে কম জানালায় আলো। রহিমা গুনল। অভ্যাস। তিন তলায় ডান দিকের জানালাগুলো অন্ধকার। ওই ফ্লোরে কি কাজ বন্ধ? নাকি কম লোক?
রহিমা জানে। কম লোক। মেশিন বেশি।
সে থামল না। পাশের রেস্তোরাঁ থেকে খাবার নিল। বিরিয়ানি। ভারী প্যাকেট। ঝুড়িতে রাখল। বেরিয়ে আসতে গিয়ে আরেকবার ফ্যাক্টরির দিকে তাকাল। গেটে একটা নতুন সাইনবোর্ড। "অটোমেটেড কোয়ালিটি অ্যাশিওরেন্স সিস্টেম।" ইংরেজি। রহিমা পড়তে পারল না। কিন্তু সে জানে ওটা কী। ওটা সেই ক্যামেরা। যেটা তিন সেকেন্ডে দেখে। যেটা রহিমার চেয়ে ভালো দেখে।
"চল বন্ধু," রহিমা বলল। সাইকেল কটকট করল।
৫
বিকেলে বৃষ্টি এলো।
হঠাৎ। আকাশ ভালো ছিল, তারপর কালো হলো, তারপর বৃষ্টি। গাজীপুরে বৃষ্টি মানে রাস্তায় পানি। পানি মানে কাদা। কাদা মানে সাইকেল চালানো কঠিন। চাকা পিছলায়। ব্রেক কাজ করে না ঠিকমতো।
রহিমা একটা দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়াল। ঝুড়িতে খাবার আছে। ষষ্ঠ অর্ডার। ডেলিভারির সময় আরো আট মিনিট বাকি। বৃষ্টি থামছে না।
ফোনে নোটিফিকেশন এলো। "আপনার ডেলিভারি বিলম্বিত হচ্ছে। দয়া করে দ্রুত পৌঁছান।"
অ্যাপ বলছে দ্রুত পৌঁছাতে। অ্যাপ বৃষ্টি দেখতে পায় না। অ্যাপ কাদা দেখতে পায় না। অ্যাপ দেখে শুধু সময়। সময় আর দূরত্ব। মানচিত্রে দুটো বিন্দু, এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দু কত মিনিট, ব্যস। মাঝখানে বৃষ্টি আছে, রাস্তায় পানি উঠেছে, একটা ট্রাক আটকে আছে, এসব অ্যাপ জানে না। অ্যাপ জানে পনেরো মিনিটে পৌঁছানোর কথা ছিল, আঠারো মিনিট হয়ে গেছে, রহিমা দেরি করছে।
রহিমা বৃষ্টিতে বের হলো। পলিথিন দিয়ে ঝুড়ি ঢেকে দিল। ভিজতে ভিজতে প্যাডেল মারল। পিঠে বৃষ্টির পানি। চোখে পানি। রাস্তায় পানি। সব পানি।
ডেলিভারি দিল। তিন মিনিট দেরি।
কাস্টমার দরজা খুলল। প্যাকেট নিল। রহিমার দিকে তাকাল। "ভিজে গেছে তো প্যাকেট।"
"না ভাই, ভেতরে শুকনা। পলিথিন দিয়ে ঢেকেছিলাম।"
কাস্টমার খুলে দেখল। শুকনা। কিছু বলল না। দরজা বন্ধ করল।
রাতে ফোনে দেখল, কাস্টমার রিভিউ দিয়েছে। তিন তারা। মন্তব্য: "দেরি হয়েছে।"
৬
রহিমার রেটিং চার দশমিক দুই।
মিতু বুঝিয়ে দিয়েছে রেটিং কী। "পাঁচ তারা সবচেয়ে ভালো। চার তারার ওপরে থাকলে ভালো। তিন দশমিক আটের নিচে গেলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে।"
"বন্ধ মানে?"
"মানে আর ডেলিভারি দিতে পারবে না।"
চার দশমিক দুই। মানে আরো কয়েকটা খারাপ রিভিউ পেলেই তিন দশমিক আটের নিচে। বৃষ্টির দিনের তিন তারা সেটাকে নামিয়ে দিয়েছে চার দশমিক শূন্যে। মিতু দেখিয়ে দিল।
"আম্মা, এই কাস্টমার কমপ্লেইন করেছে। তিন মিনিট দেরি।"
তিন মিনিট। বৃষ্টিতে। সাইকেলে। রাস্তায় পানি ছিল। ট্রাক আটকে ছিল। কিন্তু কাস্টমার এসব জানে না। কাস্টমার জানে খাবার দেরিতে এসেছে।
রহিমা বলল, "ফ্যাক্টরিতে দেরি হলে সুপারভাইজারকে বলতাম, ভাই, ট্রাফিক ছিল, বাচ্চা অসুস্থ ছিল, যা ছিল বলতাম। সে শুনত। মানুষ তো। মাঝে মাঝে বকত, মাঝে মাঝে বলত ঠিক আছে, পরেরবার সময়মতো আসবে। চা দিত। এই অ্যাপকে কী বলব? চা দেবে?"
মিতু কিছু বলল না।
রহিমা ফোনের দিকে তাকাল। স্ক্রিনে তার ছবি। ছবির নিচে নাম: রহিমা বেগম। তার নিচে রেটিং: চার দশমিক শূন্য। তার নিচে মোট ডেলিভারি: সাতচল্লিশ। তার নিচে এই সপ্তাহের আয়: দুই হাজার একশো পঁচিশ টাকা।
রহিমা ফোন রেখে দিল। রাতের খাবার বানাতে হবে।
৭
রাত।
রহিমা উঠোনে বসে আছে। বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালে ঠেস দিয়ে। ঝুড়িটা এখনো পেছনে বাঁধা। কাল আবার লাগবে।
আলম চা নিয়ে এলো। দুটো কাপ। একটা রহিমার, একটা তার।
"কেমন হলো আজ?"
"তিনশো বিশ।"
আলম চুপ করে চা খেল। তিনশো বিশ। ত্রিশ দিনে নয় হাজার ছয়শো। যদি প্রতিদিন তিনশো বিশ হয়। হয় না। কোনো দিন দুইশো, কোনো দিন চারশো। বৃষ্টির দিন দেড়শো। গড়ে তিনশো ধরলে মাসে নয় হাজার।
ফ্যাক্টরিতে পনেরো হাজার ছিল।
রহিমা চা খেতে খেতে বন্ধুর দিকে তাকাল। সাইকেলটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লান্ত দেখাচ্ছে। সাইকেল কি ক্লান্ত হয়? হয় না। কিন্তু রহিমা ক্লান্ত, তাই বন্ধুকেও ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
আলম বলল, "রেটিং কত?"
"চার।"
"চারে কি ভালো?"
"মন্দ না। তিন আটের নিচে গেলে বন্ধ।"
"কারা বন্ধ করে?"
"অ্যাপ।"
"অ্যাপ মানে?"
রহিমা ভাবল। কী বলবে? অ্যাপ মানে কী? অ্যাপ মানে একটা জিনিস যেটা ফোনের ভেতরে থাকে, যেটা তাকে বলে কোথায় যেতে হবে, কত সময়ে পৌঁছাতে হবে, কত টাকা পাবে। যেটা তাকে তারা দিয়ে মাপে। যেটার কাছে যাওয়া যায় না, কথা বলা যায় না, চা দেওয়া যায় না।
"অ্যাপ মানে বস," রহিমা বলল। "যাকে দেখা যায় না।"
আলম চা শেষ করল। ভেতরে গেল। রহিমা বসে রইল।
উঠোনে বন্ধু দাঁড়িয়ে। ঝুড়ি বাঁধা। তার দিয়ে বাঁধা। তারটা একটু ঢিলে হয়ে গেছে। কাল শক্ত করে বাঁধতে হবে।
রহিমা উঠল। বন্ধুর কাছে গেল। হ্যান্ডেলে হাত রাখল। ঠান্ডা লোহা।
"ক্লান্ত হয়েছিস?" রহিমা জিজ্ঞেস করল।
সাইকেল কিছু বলল না। সাইকেল কথা বলে না। এটাই তার সুবিধা। এটাই তার অসুবিধা।
রহিমা ভেতরে গেল। বাতি নেভাল। শুয়ে পড়ল। পাশের ঘরে মিতু ফোনে কিছু দেখছে। ফোনের আলো দরজার ফাঁক দিয়ে আসছে। রাজু ঘুমিয়ে গেছে। আলম ঘুমিয়ে গেছে।
বাইরে বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে। অন্ধকারে।