গাজীপুরে আগুন
রাহিমা রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল। পিঠে ব্যাগ। ব্যাগে দুটো বক্স। একটাতে বিরিয়ানি, আরেকটাতে কোল্ড ড্রিংকস। অর্ডারটা কাছেই, তিন কিলোমিটার। কিন্তু রাস্তা বন্ধ।
ফ্যাক্টরির সামনে মানুষ। শত শত। হাজার হতে পারে। রাহিমার গোনার ধৈর্য নেই। সে শুধু দেখছে। ভিড়ের ভেতর থেকে গলা ভেসে আসছে, কিন্তু কথা আলাদা করা যাচ্ছে না। একটা গর্জনের মতো। সমুদ্রের ঢেউ যেমন একটার পর একটা আসে, তেমন।
রাহিমা এই এলাকা চেনে। দশ বছর আগে সে এই রাস্তায় হাঁটত। সকাল সাতটায়। অন্য মেয়েদের সাথে। সারিবদ্ধভাবে। ফ্যাক্টরির গেটে ঢুকত। সন্ধ্যা সাতটায় বের হতো। কখনো রাত আটটা। কখনো নটা। ওভারটাইমের টাকাটা দরকার ছিল।
সেই ফ্যাক্টরি এখন জ্বলছে।
আগুন লেগেছে কীভাবে, কেউ ঠিক বলতে পারবে না। কেউ বলবে কারো হাতে ছিল মশাল, কেউ বলবে পুলিশের টিয়ার গ্যাসের ক্যানিস্টার থেকে। আসল কথা হলো, আগুন লাগার আগে থেকেই সবকিছু জ্বলছিল। ভেতরে ভেতরে।
গত ছয় মাসে এই ফ্যাক্টরি তিনশো শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। মেশিন এসেছে। বড় বড় মেশিন। যেগুলো কাপড় কাটে, সেলাই করে, ভাঁজ করে, প্যাক করে। একটা মেশিন বিশ জনের কাজ করে। মেশিন অসুস্থ হয় না, ছুটি চায় না, ইউনিয়ন করে না। মেশিনের বাচ্চার স্কুলের বেতন নেই।
রাহিমা এসব জানে। সে নিজেও ছাঁটাইয়ের শিকার। তবে সেটা আগের কথা, অন্য ফ্যাক্টরি, অন্য বছর। এখন সে ডেলিভারি করে। মোটরসাইকেল নেই, সাইকেল আছে। সাইকেলে করে খাবার পৌঁছায়। অ্যাপ বলে কোথায় যেতে হবে, কত সময়ের মধ্যে, কত টাকা পাবে। অ্যাপ একটু বেশিই জানে। অ্যাপ জানে রাহিমা কখন থামে, কখন দ্রুত চলে, কখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ধোঁয়া উঠছে। কালো ধোঁয়া। পলিয়েস্টার পুড়লে এরকম হয়। একটা তীব্র গন্ধ। প্লাস্টিক আর কাপড়ের মাঝামাঝি কিছু। রাহিমার নাকে এই গন্ধ চেনা। বছরের পর বছর এই গন্ধের মধ্যে কাজ করেছে সে। তখন অভ্যস্ত ছিল। এখন চোখ জ্বলছে।
পুলিশের গাড়ি এসেছে। তিনটা। পেছনে আরো আসছে। একটা মাইকে কিছু বলা হচ্ছে, কিন্তু শব্দ এত বিকৃত যে মনে হচ্ছে কেউ পানির নিচে থেকে চিৎকার করছে। টিয়ার গ্যাস ছোড়া হলো। সাদা ধোঁয়া কালো ধোঁয়ায় মিশে গেল। শ্রমিকরা ছড়িয়ে পড়ল। গলিতে, মাঠে, রাস্তার দুপাশে।
একটা মেয়ে দৌড়াচ্ছে। বয়স বিশ হবে, হয়তো আঠারো। চোখ লাল। ওড়না নেই। হারিয়ে গেছে ভিড়ে। সে রাহিমার পাশ দিয়ে গেল। রাহিমা কিছু বলল না। মেয়েটাও তাকাল না।
রাহিমা ভাবল, এই মেয়ে হয়তো সে নিজেই। দশ বছর আগের সে। যখন হাতে সুই ছিল, মেশিন ছিল, লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ করত। তখন রাগ ছিল, কিন্তু রাগ প্রকাশের উপায় ছিল না। এখন এই মেয়েরা রাস্তায় নেমেছে। তাদের রাগটা বাইরে এসেছে।
আগুন বাড়ছে। ফায়ার সার্ভিস আসেনি এখনো। গাজীপুরে ফায়ার সার্ভিসের একটাই স্টেশন, সেটা এখান থেকে অনেক দূরে। রাস্তায় জ্যাম। সবসময় জ্যাম।
ফ্যাক্টরির ছাদ থেকে একটা জুতা পড়ল। বাম পায়ের। সাদা রঙের ছিল হয়তো, এখন ছাই রঙ। কেউ জানে না জুতাটা কার। কেউ দাবি করতে আসেনি। জুতাটা রাস্তার পাশে পড়ে রইল, উলটো হয়ে। পিঁপড়া উঠতে শুরু করেছে তার ভেতরে।
রাহিমার ফোন বাজল।
স্ক্রিনে নোটিফিকেশন: "নতুন অর্ডার। পিক আপ: ক্যাফে মিলন, টঙ্গী। ড্রপ: বাসাবো। আনুমানিক আয়: ৮৫ টাকা।"
রাহিমা ফোনের দিকে তাকাল। তারপর জ্বলন্ত ফ্যাক্টরির দিকে। তারপর আবার ফোনে।
পঁচাশি টাকা। টঙ্গী থেকে বাসাবো। সাইকেলে ঘণ্টা দেড়েক। রোদে। ঘামে। পিঠে ব্যাগ নিয়ে।
সে ক্যালকুলেশন করল না। করার কিছু নেই। পঁচাশি টাকা পঁচাশি টাকাই। এটা দিয়ে কী হয়? চালের দাম উঠেছে। ছেলের স্কুলে নতুন বই লাগবে। বাড়িভাড়া পরশু দিতে হবে।
ফ্যাক্টরির আগুন তাকে কিছু দেবে না। আগুন কাউকে কিছু দেয় না। আগুন শুধু নেয়।
রাহিমা অর্ডার গ্রহণ করল।
সে সাইকেলে উঠল। প্যাডেল মারল। পেছনে ধোঁয়া। সামনে রাস্তা। অ্যাপ বলছে বাঁয়ে যেতে। রাহিমা বাঁয়ে গেল।
সে দুবার পেছনে তাকাল। প্রথমবার ধোঁয়া দেখল। দ্বিতীয়বার কিছুই দেখল না, রাস্তা বাঁক নিয়েছে।
গাজীপুরের রাস্তায় ট্রাকগুলো চলছে। কন্টেইনার বোঝাই। রপ্তানির মাল। যেসব কাপড় মেশিনে তৈরি হয়েছে, সেগুলো বন্দরে যাচ্ছে। জাহাজে উঠবে। ইউরোপে যাবে। দোকানে ঝুলবে। কেউ কিনবে। কেউ জানবে না এই কাপড়ের পেছনে কী আছে। জানার দরকারও নেই হয়তো।
রাহিমা টঙ্গীতে পৌঁছাল। ক্যাফে মিলন। ছোট দোকান। চায়ের দোকানের মতো, কিন্তু নাম দিয়েছে ক্যাফে। ভেতরে দুটো টেবিল। দেয়ালে একটা পুরোনো ক্যালেন্ডার। অর্ডার তৈরি হতে পাঁচ মিনিট লাগবে। রাহিমা বাইরে দাঁড়াল।
পাশের দোকানে টিভি চলছে। খবরে গাজীপুরের আগুন দেখাচ্ছে। হেলিকপ্টার থেকে তোলা ছবি। ওপর থেকে দেখলে ফ্যাক্টরিটাকে ছোট দেখায়। ধোঁয়াটাকেও ছোট। মানুষগুলোকে দেখাই যায় না। পিঁপড়ার মতো। পিঁপড়ার চেয়েও ছোট।
একজন বলছে, "আবার আগুন।" আরেকজন বলল, "এইবার শ্রমিকরাই দিছে।" তৃতীয়জন চুপ। সে চা খাচ্ছে।
রাহিমা কিছু বলল না।
অর্ডার তৈরি হলো। সে ব্যাগে রাখল। সাইকেলে উঠল। বাসাবোর দিকে রওনা দিল।
রাস্তায় একটা জায়গায় সিগন্যালে দাঁড়াতে হলো। পাশে একটা বাস। বাসের গায়ে একটা বিজ্ঞাপন। কোনো কোম্পানির। "ভবিষ্যৎ এখন শুরু হয়েছে" লেখা। রাহিমা পড়ল। কিছু মনে হলো না। সিগন্যাল সবুজ হলো। সে চলে গেল।
বাসাবোতে কাস্টমার একটা বিল্ডিংয়ের তিন তলায়। লিফট নেই। রাহিমা সিঁড়ি দিয়ে উঠল। দরজায় কড়া নাড়ল। একটা ছেলে দরজা খুলল। বিশ-বাইশ বছর। ল্যাপটপ খোলা পেছনে। সে খাবার নিল। ফোনে পেমেন্ট করল। দরজা বন্ধ করল। ধন্যবাদ বলল না। বলার দরকার নেই, অ্যাপেই রেটিং দিয়ে দেবে।
রাহিমা সিঁড়ি দিয়ে নামল।
বাইরে সন্ধ্যা হচ্ছে। আকাশে একটু লাল। গাজীপুরের দিকে এখনো ধোঁয়া আছে কি না, এখান থেকে বোঝা যায় না। দূরত্ব বেশি। শহর আড়াল করে দিয়েছে সব।
ফোন আবার বাজল। নতুন অর্ডার।
রাহিমা দেখল। এবার মিরপুর। দূর। কিন্তু আয় একটু বেশি।
সে অর্ডার নিল।
সাইকেলের চেইন একটু ঢিলে হয়ে গেছে। কালকে ঠিক করাতে হবে। আজকে আর না। আজকে শুধু চালাতে হবে।
রাহিমা প্যাডেল মারল। সাইকেল এগিয়ে গেল। পেছনে সন্ধ্যার ছায়া লম্বা হলো।
গাজীপুরে আগুন নিভেছে কি না, সে জানে না। জানার সময় নেই। অ্যাপ বলছে বাঁয়ে যেতে।
রাহিমা বাঁয়ে গেল।