করিম রাস্তায় নামলো
করিম জীবনে কোনোদিন মিছিলে যায়নি।
ষাট বছর বাঁচলে মানুষ অনেক কিছু করে। করিম ধান কেটেছে, জমি চাষ করেছে, বন্যায় ঘর হারিয়েছে, আবার ঘর বানিয়েছে, ছেলেকে কবর দিয়েছে, জমি হারিয়েছে, রংপুর শহরে ভাড়া ঘরে এসেছে। কিন্তু মিছিল? না। মিছিল অন্যদের কাজ। যাদের জোর আছে, গলা আছে, সাহস আছে।
করিমের কোনোটাই নেই। সে একটা চুপচাপ মানুষ। কথা কম বলে। যা বলে, জরুরি বলে।
আজ সকালে বেলাল এসেছিল। বেলাল পাশের ঘরে থাকে। ছাব্বিশ বছরের ছেলে। চাকরি নেই। সারাদিন ফোন দেখে। কিন্তু ছেলেটা খারাপ না। করিমকে দেখলে সালাম দেয়। মাঝে মাঝে চা খাওয়ায়।
বেলাল বলল, "করিম চাচা, আইজ রংপুর শহরে মিছিল। কৃষকদের মিছিল। চলেন।"
করিম বলল, "আমি কৃষক না। জমি নাই।"
বেলাল বলল, "জমি নাই বইলাই তো যাইতে হবে।"
কথাটা করিমের মাথায় ঢুকল। আস্তে আস্তে। জমি নেই বলেই যেতে হবে। এটা একটা কথা।
করিম গেল।
রংপুর শহরের কেন্দ্রীয় মোড়। মানুষ জমা হচ্ছে। বেশিরভাগ করিমের মতো। বয়স্ক। রোদে পোড়া মুখ। হাতে শিরা দেখা যায়। চোখে একটা ক্লান্তি, যেটা ঘুমালেও যায় না। এরা কৃষক ছিল। কেউ এখনো আছে, কেউ হারিয়েছে। জমি কেউ বিক্রি করেছে, কারো কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কারো জমিতে এখন কোম্পানির সাইনবোর্ড।
একটা ব্যানার আছে বড়। লাল কাপড়ে সাদা অক্ষরে কিছু লেখা। করিম পড়তে পারল: "আমাদের জমি, আমাদের অধিকার।" বাকি কিছু লেখা আছে, ছোট ছোট, সেগুলো পড়া গেল না। চশমা নেই। দরকারও পড়েনি কোনোদিন, ধান চেনার জন্য চশমা লাগে না।
কেউ একটা প্ল্যাকার্ড দিল করিমের হাতে। পাতলা কাঠের হাতলে একটা বোর্ড। বোর্ডে লেখা। করিম পড়ার চেষ্টা করল। কিছু শব্দ চেনা, কিছু না। "কর্পোরেট" শব্দটা সে চেনে না। "অ্যাগ্রিটেক" শব্দটাও না। কিন্তু "জমি" আর "কৃষক" চেনে। এটুকু যথেষ্ট।
সে প্ল্যাকার্ড ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
প্ল্যাকার্ডটা ভারী না। কিন্তু দশ মিনিট ধরে রাখলে হাত ব্যথা করে। করিমের হাত সেরকম শক্ত নেই আর। আগে ছিল। যখন লাঙল ধরত, ধান কাটত, বাঁশ বহন করত। এখন সে ভাড়া ঘরে বসে থাকে। মাঝে মাঝে রিকশা চালায়। শরীর সায় দিলে।
মিছিল শুরু হলো। মানুষ হাঁটতে লাগল। স্লোগান দিচ্ছে। করিম স্লোগান দিতে পারছে না। গলা বের হচ্ছে না। সে শুধু হাঁটছে। প্ল্যাকার্ড ধরে। ভিড়ের মধ্যে।
বেলাল পাশেই আছে। সে স্লোগান দিচ্ছে। জোরে। তরুণদের গলা অন্যরকম। তাদের রাগ তাজা, পুরোনো হয়নি। করিমের রাগ পুরোনো। এত পুরোনো যে সেটা এখন রাগ না, দুঃখ। রাগ আর দুঃখের মধ্যে একটা সীমারেখা আছে। বছরের পর বছর রাগ জমলে সেটা দুঃখ হয়ে যায়।
একটা টিভি ক্যামেরা এলো। একটা মেয়ে, হাতে মাইক্রোফোন। পেছনে একটা ছেলে, কাঁধে ক্যামেরা। তারা মানুষের কাছে যাচ্ছে, কথা বলছে। একজন দুইজন তিনজন। তারপর তারা করিমের কাছে এলো।
মেয়েটা মাইক্রোফোন বাড়াল। বলল, "চাচা, আপনি কেন এখানে?"
করিম তাকাল। মেয়েটার দিকে। ক্যামেরার দিকে। ক্যামেরার লাল আলোটা জ্বলছে।
করিম বলল, "আমার ধান ছিল।"
তিনটা শব্দ। মেয়েটা অপেক্ষা করল, আরো কিছু বলবে কি না। করিম আর কিছু বলল না। তার বলার ছিল এটুকুই। ধান ছিল। এখন নেই। এটাই পুরো গল্প।
মেয়েটা চলে গেল। অন্য কারো কাছে। করিম আবার হাঁটতে লাগল।
প্ল্যাকার্ডের পেছনে একটা লেখা আছে। সার কোম্পানির নাম। বোর্ড বানানো হয়েছে সারের বস্তা কেটে। সামনে স্লোগান, পেছনে "ইউরিয়া সুপার, ফলন দুপুর।" করিম এই ব্র্যান্ডের সার ব্যবহার করত। জমি থাকতে।
মিছিল শেষ হলো বেলা দুইটায়। মানুষ ছড়িয়ে গেল। করিম প্ল্যাকার্ড রেখে দিল রাস্তার পাশে। অন্যরাও রাখছে। একটা স্তূপ হয়ে গেল।
বাড়ি ফিরল। ভাড়া ঘর। একটা ঘর, একটা রান্নাঘর। রান্নাঘরে চুলা জ্বালাল। ভাত বসাল। তরকারি নেই আজকে। পেঁয়াজ আর লবণ দিয়ে খাবে। এটা অভ্যাস, দারিদ্র্য না। দারিদ্র্য যখন অভ্যাস হয়ে যায়, তখন আলাদা করে টের পাওয়া যায় না।
সন্ধ্যায় বেলাল এলো।
"করিম চাচা, আপনের ভিডিও ভাইরাল।"
করিম বলল, "ভাইরাল কী?"
বেলাল বোঝাতে চেষ্টা করল। "মানে অনেক মানুষ দেখতাছে। ফোনে। ফেসবুকে।"
করিম বুঝল না পুরোটা। কিন্তু এটুকু বুঝল যে তাকে অনেকে দেখেছে। সে চুপ করে রইল। অনেকে দেখলে কী হয়? তার ধান কি ফিরে আসবে?
বেলাল ফোনটা দেখাল। ছোট স্ক্রিনে করিম নিজেকে দেখল। প্ল্যাকার্ড ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মাইক্রোফোন মুখের কাছে। তারপর সে বলছে: "আমার ধান ছিল।"
করিম নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনের মানুষটা তাকে চেনা লাগল, কিন্তু পুরোপুরি না। সে জিজ্ঞেস করল, "এটা আমি?"
বেলাল হাসল। "হ্যাঁ চাচা, আপনিই।"
করিম ফোনটা ফেরত দিল। সে আর দেখতে চাইল না। নিজেকে দেখতে অদ্ভুত লাগছে। আয়নায় দেখা আর জিনিস, স্ক্রিনে দেখা আর জিনিস। আয়নায় সে নিজে আছে, স্ক্রিনে অন্য কেউ।
রাতে ফোন বাজল। করিমের ফোন। পুরোনো একটা ফোন, বোতামওয়ালা। অচেনা নম্বর। সে ধরল। অপর প্রান্তে একজন বলল, "আপনি কি করিম সাহেব? যিনি আজ টিভিতে ছিলেন?"
করিম বলল, "হ্যাঁ।"
"আমি ঢাকা থেকে বলছি। আমি একটা সংগঠনের..."
করিম ফোন রেখে দিল। সে সংগঠন চেনে না। ঢাকাও চেনে না। সে চেনে রংপুর, তিস্তার ধার, ধানের মৌসুম।
আবার বাজল। আরেকটা নম্বর। সে ধরল না। আবার। আবার। চারবার পর সে ফোন বন্ধ করে দিল।
ঘরে নীরবতা নেমে এলো। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। করিম শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল।
সে ভাবল, আজকে অনেক মানুষের সামনে কথা বলেছে। তিনটা শব্দ। তার সারা জীবনে এত কম কথায় এত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়নি কিছু। অথচ সে যা বলতে চেয়েছিল, তার কিছুই বলেনি। ধানের কথা বলেছে, কিন্তু ধানের গন্ধের কথা বলেনি। সকালে শিশির ভেজা ক্ষেতে পা রাখলে যে ঠান্ডাটা লাগত, সেটা বলেনি। ফসল কাটার পর মাটির যে রঙ হয়, সোনালি আর বাদামির মাঝামাঝি, সেটা বলেনি। বলা যায় না এসব। তিনটা শব্দে তো না-ই।
করিম ধানের সাথে কথা বলত। সত্যিই বলত। ক্ষেতে একা দাঁড়িয়ে। ধান শোনে না, এটা সে জানত। কিন্তু ধানের কাছে কথা বলতে ভালো লাগত। ধান কোনো প্রশ্ন করে না। "কেন এখানে" জিজ্ঞেস করে না। ধান শুধু বাড়ে। সময় হলে ফলে। সময় হলে কাটা হয়।
মানুষের সাথে কথা বলা কঠিন। মানুষ প্রশ্ন করে। উত্তর চায়। উত্তর না পেলে নিজেরাই উত্তর বানিয়ে নেয়।
পরদিন সকালে করিম ফোন চালু করল। সাতটা মিসড কল। দুইটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ। সে মেসেজ পড়ল না। পড়ার চেষ্টাও করল না।
বেলাল এলো চা নিয়ে। বলল, "চাচা, আপনার ভিডিও তিন লাখ মানুষ দেখছে।"
তিন লাখ। করিম সংখ্যাটা বুঝল। তিন লাখ মানুষ। এটা একটা শহরের সমান। একটা পুরো শহর তাকে দেখেছে, তার তিনটা শব্দ শুনেছে।
"তারপর?" করিম বলল।
বেলাল কিছু বলতে পারল না। তারপর কী? তিন লাখ মানুষ দেখলে কী হয়? করিমের ঘরে তো এখনো একটাই চুলা। একটাই পাতিল। আজকেও পেঁয়াজ আর লবণ দিয়ে ভাত।
করিম চা খেল। চা ভালো ছিল। বেলাল ভালো চা বানায়। এটুকু সত্য।
বাইরে রোদ উঠছে। আজকে মিছিল নেই। সাধারণ দিন। রংপুর শহরে রিকশার ঘণ্টি বাজছে। কোথাও থেকে আজানের শেষ সুর ভেসে আসছে। একটা কাক ডাকল। করিম জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
আকাশ পরিষ্কার। বৃষ্টি হবে না আজ।
করিম ভাবল, আজকে একটু বাইরে যাবে। রিকশা চালাবে কি না ভাবেনি। হয়তো চালাবে। হয়তো শুধু হাঁটবে। তিস্তার দিকে। নদীর ধারে বসলে ভালো লাগে। নদী কোনো প্রশ্ন করে না। ধানের মতো।
সে জুতা পরল। বাঁ পায়েরটা একটু ছেঁড়া। আঙুল দেখা যায়। কিন্তু চলে। চলতে তো হবেই।
করিম বাইরে বের হলো। রংপুরের সকালের আলো তার মুখে পড়ল। সে চোখ কুঁচকাল।
তিন লাখ মানুষ তাকে দেখেছে। সে দেখছে একটা রাস্তা, একটা সকাল, একটা আকাশ।
এটুকুই আছে। এটুকুই থাকবে।