তানিয়া টিভিতে

পর্ব ৪৩ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

গ্রিন রুমের ঘড়িতে সাতটা বেজে সাতচল্লিশ। আসলে সাতটা চল্লিশ। ঘড়িটা সাত মিনিট এগিয়ে। এখানে সবাই জানে। কেউ ঠিক করে না। এটা এই চ্যানেলের একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে, ঘড়ি সাত মিনিট এগিয়ে থাকবে।

তানিয়া আয়নার সামনে বসে আছে। একটা মেয়ে তার মুখে পাউডার লাগাচ্ছে। তানিয়া সাধারণত মেকআপ করে না। আজ করতে হচ্ছে, ক্যামেরার জন্য। ক্যামেরা সব দেখায়, কিন্তু যা দেখায় তা সত্য না। ক্যামেরায় তাকে যতটা ভালো দেখাবে, ভেতরে সে ততটা ভালো নেই।

আজ রাতে একটা টকশো। বিষয়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ। তানিয়াকে ডাকা হয়েছে প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধি হিসেবে। সে একটা স্টার্টআপ চালায়। চালাত বলা ভালো। কোম্পানি আগের মতো নেই। লোক ছাঁটাই হয়েছে। ফান্ডিং কমেছে। কিন্তু টিভিতে এসব বলার জায়গা নেই। টিভিতে সফল হতে হয়। আত্মবিশ্বাসী। ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী।

অন্য প্যানেলিস্ট হলেন ফজলুল করিম। শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা। বয়স পঞ্চাশের কাছে। তানিয়া তাঁর নাম শুনেছে। গাজীপুরের আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। টিভিতে তাঁকে আগেও দেখেছে। তিনি জোরে কথা বলেন। আবেগ দিয়ে। তাঁর কথায় ওজন আছে কারণ তাঁর পেছনে লাখো শ্রমিক আছে।

তানিয়ার পেছনে কে আছে? একটা পাতলা টিম। একটা অফিস যেটার ভাড়া দিতে কষ্ট হচ্ছে। দুইজন ইনভেস্টর যারা এই মুহূর্তে তাকে দেখছে। হয়তো। হয়তো না। কিন্তু দেখতে পারে, তাই সাবধানে কথা বলতে হবে।

শো শুরু হলো।

স্টুডিও ঠান্ডা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। তানিয়ার হাত ঠান্ডা, কিন্তু সেটা শীতাতপের জন্য না, নার্ভাসনেসের জন্য। সে নার্ভাস হয় না সাধারণত। প্রেজেন্টেশন দিয়েছে, পিচ করেছে, ইনভেস্টরদের সামনে কথা বলেছে। কিন্তু এটা আলাদা। এখানে প্রশ্নগুলো আলাদা। এখানে উত্তর শুধু তথ্য না, অবস্থান।

উপস্থাপক পরিচয় দিলেন। তানিয়া, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। ফজলুল করিম, শ্রমিক নেতা। দুই পাশে দুজন। মাঝখানে একটা টেবিল। টেবিলে পানির গ্লাস। তানিয়ার গ্লাসে পানি কম। সে একটু পান করল।

ফজলুল করিম প্রথমে বললেন। তাঁর গলা ভারী। শব্দগুলো যেন ওজন নিয়ে আসে।

"আমি গাজীপুর থেকে আসছি। আগুনের পরে। আপনারা টিভিতে দেখেছেন ধোঁয়া। আমি দেখেছি মানুষ। তিনশো পরিবার রাস্তায়। চাকরি নেই। ভাত নেই। মেশিন এসেছে, মানুষ গেছে। এটা প্রগতি না, এটা নিষ্ঠুরতা।"

উপস্থাপক তানিয়ার দিকে ফিরলেন। "তানিয়া, আপনার কী বক্তব্য?"

তানিয়ার মাথায় দুটো উত্তর আছে। একটা সত্য, একটা নিরাপদ।

সত্য উত্তরটা হলো: ফজলুল করিম ঠিক বলেছেন। মেশিন মানুষকে সরিয়ে দিচ্ছে। তানিয়া নিজেও এটা দেখেছে। তার কোম্পানিতেও হয়েছে। মিতু, তার জুনিয়র ডেভেলপার, সে আজকে যে কাজ করে সেটা দুই বছর আগে তিনজনে করত। প্রযুক্তি চাকরি বাড়ায় না, প্রযুক্তি চাকরি বদলায়। কখনো বাড়ায়, কখনো কমায়। এই মুহূর্তে কমাচ্ছে বেশি।

নিরাপদ উত্তরটা হলো: প্রযুক্তি একটা হাতিয়ার। ভালো-মন্দ নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর। আমাদের দরকার প্রশিক্ষণ, নীতি, পরিকল্পনা। এগুলো সত্য কথা, কিন্তু ফাঁকা কথা। এই ধরনের কথা বলে যেকোনো প্রশ্ন এড়ানো যায়।

তানিয়া নিরাপদ উত্তরটা বেছে নিল।

"প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ না। আমাদের দেখতে হবে কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে। শ্রমিকদের কথা ভাবতে হবে। একই সাথে নতুন দক্ষতা তৈরি করতে হবে। সরকার, শিল্প মালিক, প্রযুক্তি খাত, সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।"

সে বলতে বলতে নিজেই শুনছিল। শব্দগুলো সাজানো। বাক্যগুলো মাপা। কোনো ধার নেই, কোনো ক্ষত নেই। একটা পলিশ করা উত্তর। সেমিনারের উত্তর। পাওয়ারপয়েন্টের উত্তর।

ফজলুল করিম তাকালেন। তাঁর চোখে রাগ না, একটু করুণা। তিনি বললেন, "আপনারা যন্ত্র বানাচ্ছেন, আমরা মানুষ হারাচ্ছি।"

একটা বাক্য। সোজা। পরিষ্কার। কোনো জটিলতা নেই। যন্ত্র বনাম মানুষ। এটা ফ্রেমিং ঠিক না, তানিয়া জানে। বাস্তব এর চেয়ে জটিল। কিন্তু টিভিতে জটিলতা চলে না। টিভিতে একটা বাক্য চলে। একটা লাইন। এবং ফজলুল করিমের লাইনটা জিতে গেল।

তানিয়া আরো কিছু বলল। কিন্তু সেগুলো কেউ মনে রাখবে না। মানুষ মনে রাখবে "আপনারা যন্ত্র বানাচ্ছেন, আমরা মানুষ হারাচ্ছি।" এটাই ক্লিপ হবে। এটাই শেয়ার হবে।

শো শেষ হলো। ক্যামেরার লাল বাতি নিভল। উপস্থাপক উঠে দাঁড়ালেন, হাত মেলালেন, "ধন্যবাদ, ভালো আলোচনা হলো" বললেন। এটা তিনি সবাইকে বলেন। ভালো হোক আর না হোক।

তানিয়া গ্রিন রুমে ফিরল। ব্যাগ নেবে, বের হবে। কিন্তু ফজলুল করিমও গ্রিন রুমে।

তিনি একটা চায়ের কাপ হাতে। গ্রিন রুমে একটা ছোট টেবিলে চায়ের ব্যবস্থা আছে। থার্মোসে চা, পাশে কাপ, চিনি, দুধ। ফজলুল করিম নিজে চা ঢেলেছেন।

তানিয়াকে দেখে তিনি বললেন, "চা খাবেন?"

তানিয়া একটু ইতস্তত করল। তারপর বলল, "খাই।"

ফজলুল করিম আরেকটা কাপে চা ঢাললেন। চিনি দিলেন। দুধ দিলেন। তানিয়ার হাতে দিলেন।

তানিয়া একটু চুমুক দিল। চা খুব মিষ্টি। তানিয়া চিনি কম খায়। কিন্তু সে কিছু বলল না। চা যেমন দেওয়া হয়েছে, তেমনই খাবে।

ফজলুল করিম বললেন, "ভালো বলেছেন।"

তানিয়া তাকাল।

তিনি বললেন, "কিন্তু সত্য বলেননি।"

কথাটা আস্তে বললেন। রাগ নেই গলায়। অভিযোগও নেই। একটা পর্যবেক্ষণ। যেভাবে কেউ বলে "আজকে বৃষ্টি হবে" বা "চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।"

তানিয়া কিছু বলল না। কারণ বলার কিছু নেই। তিনি ঠিকই বলেছেন। তানিয়া সত্য বলেনি। সে সত্য জানে, কিন্তু বলেনি। সত্য বলা আর সত্য জানা এক জিনিস না।

সে চা খেতে লাগল। মিষ্টি চা। গলা দিয়ে নামছে। পেটে গরম লাগছে। চা মিষ্টি হলে কেমন একটা সান্ত্বনা আছে। ছোটবেলায় চা এরকমই ছিল। নানির বাড়িতে। নানি চায়ে এত চিনি দিত যে চামচ দাঁড়িয়ে থাকত।

ফজলুল করিম বললেন, "আমি জানি আপনার অবস্থান কঠিন। আপনি ব্যবসা করেন, ইনভেস্টর আছে, কাস্টমার আছে। আপনি ইচ্ছে করলেই সব বলতে পারেন না। আমি পারি। আমার হারানোর কিছু নেই।"

তানিয়া ভাবল, হারানোর কিছু নেই। এই কথাটা কতটা শক্তিশালী। যার হারানোর কিছু নেই, সে সত্য বলতে পারে। যার আছে, সে মেপে কথা বলে। তানিয়ার আছে, একটা কোম্পানি যেটা টিকে থাকার চেষ্টা করছে। একটা টিম যাদের বেতন দিতে হয়। একটা সুনাম যেটা ভাঙলে আর জোড়া লাগবে না।

"আপনি ঠিক বলেছেন," তানিয়া বলল। "আমি সব বলতে পারি না।"

ফজলুল করিম মাথা নাড়লেন। "জানি।"

দুজন চুপ করে চা খেল। গ্রিন রুমে আর কেউ নেই। মেকআপ আর্টিস্ট চলে গেছে। একটা পর্দা সরানো আছে, পেছনে তার-টার জট। টিভি স্টুডিওর পেছনটা সামনের মতো না। সামনে ঝকঝকে, পেছনে অগোছালো। জীবনের মতো।

তানিয়া চায়ের কাপ শেষ করল। কাপটা রাখল টেবিলে।

"আমি কি সত্যিই কিছু বদলাতে পারি?" সে জিজ্ঞেস করল। নিজেকে। কিন্তু জোরে বলে ফেলল।

ফজলুল করিম বললেন, "একা না। কেউ একা পারে না।"

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে একটা কার্ড বের করলেন। সাদা কার্ড, তাতে নাম আর ফোন নম্বর। দিলেন তানিয়ার হাতে। "কখনো কথা বলতে চাইলে ফোন করবেন। ক্যামেরা ছাড়া।"

তানিয়া কার্ড নিল। পড়ল। পকেটে রাখল।

ফজলুল করিম চলে গেলেন। দরজা বন্ধ হলো। গ্রিন রুমে তানিয়া একা।

সে ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত নটা বাজে। মানে আটটা তিপান্ন। ঘড়ি সাত মিনিট এগিয়ে।

তানিয়া ব্যাগ নিল। বের হলো। করিডোরে একজন ক্লিনার মেঝে মুছছে। তানিয়া তাকে পাশ কাটিয়ে গেল। লিফটে উঠল। নিচে নামল। বিল্ডিংয়ের বাইরে।

ঢাকার রাত। গাড়ির হর্ন। আলো। মানুষ। গরম বাতাস। স্টুডিওর ভেতরের ঠান্ডা থেকে বাইরের গরমে আসতে একটু সময় লাগে।

তানিয়া রাইড ডাকল। অ্যাপে। গাড়ি আসতে আট মিনিট। সে দাঁড়িয়ে রইল।

ফোন বাজল। মিতু। তানিয়া ধরল।

"আপা, শো দেখলাম।"

"কেমন হলো?"

মিতু একটু চুপ করল। তারপর বলল, "ভালো ছিল। কিন্তু..."

"কিন্তু কী?"

"ঐ ইউনিয়ন নেতা যা বললেন, সেটা সত্য না?"

তানিয়া চুপ করে রইল। মিতু বিশ বছরের মেয়ে। জুনিয়র ডেভেলপার। সে কোড লেখে, বাগ ফিক্স করে, মিটিংয়ে চুপচাপ বসে থাকে। সে প্রশ্ন করে না সাধারণত। আজ করল।

"হ্যাঁ," তানিয়া বলল। "সত্য।"

"তাহলে টিভিতে বললেন না কেন?"

তানিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "বললে বুঝবি একদিন।"

কথা শেষ। ফোন রাখল।

গাড়ি এলো। তানিয়া উঠল। ড্রাইভার কিছু বলল না। রেডিওতে গান চলছে। পুরোনো গান। কার গান চেনা যাচ্ছে না, ভলিউম কম।

তানিয়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ঢাকা চলছে। ঢাকা সবসময় চলে। রাত বারোটায়ও চলে, ভোর চারটায়ও। এই শহর থামে না। এই শহর কারো জন্য অপেক্ষা করে না।

পকেটে ফজলুল করিমের কার্ড। তানিয়া হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। কার্ডটা আছে। কাগজের একটা ছোট টুকরো। তাতে একটা নাম, একটা নম্বর।

সে ফোন করবে কি না জানে না। হয়তো করবে। হয়তো না। কিন্তু কার্ডটা ফেলবে না। এটুকু সে জানে।

গাড়ি এগিয়ে চলল। ঢাকার রাতের আলো জানালার কাচে ছায়া ফেলল। তানিয়ার মুখে আলো আর অন্ধকার পালা করে খেলল।

মুখে এখনো চায়ের স্বাদ। মিষ্টি। একটু বেশি মিষ্টি।

সে অভিযোগ করেনি।