সেলিনার দুই খাতা
১
চরে বিদ্যুৎ নেই।
সেলিনা দুই বছর ধরে এই কথাটা বলছে, কিন্তু এখন আর বলে না। কাকে বলবে? চরের মানুষ জানে। সুপারভাইজর নাজমুল সাহেব জানেন, কিন্তু তিনি সুনামগঞ্জে, ফোনে ধরেন না। ঢাকায় যারা বসে আছে, তারা জানে কিনা জানা নেই। সম্ভবত জানে। জেনেও কিছু করার নেই, তাই না-জানার ভান করা সহজ।
দুই বছর।
সেলিনা হিসেব করে। ২০২৮ সালের শেষে বদলি হয়ে এসেছিল। নাজমুল সাহেব বলেছিলেন, "দূরের চরে একজন দরকার। আপনি ভালো কাজ করেন, আপনাকেই পাঠাচ্ছি।" কথাটায় প্রশংসা ছিল, না শাস্তি ছিল, সেলিনা বুঝতে পারেনি। এখনো পারেনি। হয়তো দুটোই ছিল। হয়তো কোনোটাই ছিল না। হয়তো শুধু দরকার ছিল।
চরটার নাম ভাসানচর। না, সেই ভাসানচর না। বাংলাদেশে ভাসানচর অনেক আছে, যেভাবে আশা অনেক আছে, কিন্তু বেশিরভাগই ভেঙে যায়। এই ভাসানচরে তিনশো পরিবার থাকে। মৌসুমে কমে, মৌসুম শেষে বাড়ে। পানি এলে মানুষ চলে যায়, পানি নামলে ফিরে আসে। চরের মানুষ পানির সাথে একটা চুক্তি করে রেখেছে: তোমার সময় তোমার, আমার সময় আমার।
সেলিনার ট্যাবলেটটা ব্যাগের তলায় পড়ে আছে। বন্ধ। চার্জ শেষ হয়েছে কবে সেটা সেলিনা মনে করতে পারে না। ছয় মাস আগে? আট মাস? প্রথম দিকে সে চেষ্টা করেছিল। পাশের চরে গিয়ে একটা দোকানে চার্জ দিত, পাঁচ টাকা নিত দোকানদার। কিন্তু চার্জ দিয়ে কী হবে? নেটওয়ার্ক নেই। ডেটা সিঙ্ক হয় না। অ্যাপ খুলে রোগীর লক্ষণ লেখা যায়, কিন্তু বিশ্লেষণ করতে গেলে স্ক্রিনে ঘুরতে থাকে নীল বৃত্ত, ঘুরতেই থাকে, কখনো থামে না।
তাই সেলিনা থামিয়ে দিয়েছে।
ট্যাবলেট ছাড়াই চরে কাজ চলে। চরে কাজ চলত ট্যাবলেটের আগেও, চলবে ট্যাবলেটের পরেও। সেলিনার দুটো হাত আছে, দুটো চোখ আছে, সাত বছরের অভিজ্ঞতা আছে। এগুলোর চার্জ শেষ হয় না।
২
সেলিনার দুটো খাতা।
প্রথম খাতাটা সরকারি। হালকা নীল রঙের মলাট, ওপরে "স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়" লেখা। ভেতরে ছক আছে, কলাম আছে। "তারিখ", "রোগীর নাম", "বয়স", "লিঙ্গ", "রোগ নির্ণয়", "ব্যবস্থাপনা", "রেফারেল"। প্রতি মাসে এই খাতা জমা দিতে হয়। সুপারভাইজরের কাছে।
সেলিনা এই খাতাটা খুলল।
খালি।
দুই বছরে একটা পাতাও পূরণ হয়নি। কারণ খাতা পূরণ করতে হলে ট্যাবলেটের ডেটা লাগে। ট্যাবলেটের ডেটা নেই। তাই খাতা খালি। সিস্টেম বলছে সেলিনা দুই বছরে একটা রোগীও দেখেনি। সিস্টেম বলছে এই চরে কেউ অসুস্থ হয়নি, কেউ জন্মায়নি, কেউ মরেনি। সিস্টেম বলছে এই চরের অস্তিত্ব নেই।
দ্বিতীয় খাতাটা সেলিনার নিজের। সাদা, মলাট নেই, বাজার থেকে কেনা, পনেরো টাকা। এই খাতায় কোনো ছক নেই। কলাম নেই। শুধু সেলিনার হাতের লেখা, ছোট ছোট অক্ষর, ঘন ঘন, পাতার একটুও নষ্ট হয়নি।
সেলিনা এই খাতাটাও খুলল।
ভরা।
একশো বিশ পাতার খাতা। দুটো শেষ হয়েছে, এটা তৃতীয়। প্রতিটা পাতায় তারিখ, রোগীর নাম, লক্ষণ, কী করেছে সেলিনা। কিন্তু শুধু এটুকু না। এই খাতায় আরো অনেক কিছু আছে।
জন্মের হিসেব আছে। দুই বছরে এই চরে উনিশটা বাচ্চা জন্মেছে। সতেরোটা ঘরে, দুইটা পাশের চরের ক্লিনিকে। সেলিনা প্রতিটা জন্মে ছিল, সতেরোটায় নিজে ধরেছে। একটা বাচ্চা আড়াআড়ি ছিল, সেলিনা ঘুরিয়ে আনতে পেরেছিল, কীভাবে পেরেছিল সেটা সে নিজেও জানে না, জোহরা আপা শিখিয়েছিলেন একবার, হাওরের ঘরে, মোমবাতির আলোয়।
মৃত্যুর হিসেব আছে। সাতজন মারা গেছে দুই বছরে। তিনজন বয়স্ক, স্বাভাবিক। একজন সাপের কামড়ে, ওঝার কাছে নিয়ে গিয়েছিল, সেলিনা পৌঁছানোর আগেই শেষ। একটা বাচ্চা, তিন মাস বয়স, নিউমোনিয়া, রেফার করার আগেই। দুজন ডায়রিয়ায়, বন্যার পরে। সেলিনা প্রতিটা মৃত্যু লিখে রেখেছে। নাম, তারিখ, কারণ। শেষে একটা লাইন, নিজের জন্য: "আরো আগে পেলে বাঁচানো যেত" অথবা "কিছু করার ছিল না।"
রোগের ধরন লেখা আছে। বর্ষায় ডায়রিয়া বাড়ে, শীতে নিউমোনিয়া, সারা বছর চর্মরোগ। চরের পানি খারাপ, টিউবওয়েলে আর্সেনিক, সবাই জানে, কেউ কিছু করে না। সেলিনা লিখে রেখেছে কোন টিউবওয়েলে আর্সেনিক বেশি, কোনটায় কম। নিজে পরীক্ষা করেনি, পরীক্ষার কিট নেই। মানুষের শরীর দেখে বুঝেছে। যাদের হাতে-পায়ে কালো দাগ, তাদের টিউবওয়েল আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত অংশটা হলো ওষুধের তালিকা। সরকারি ওষুধ না। চরের ওষুধ।
থানকুনি পাতার রস পেটের অসুখে কাজ করে। সেলিনা নিজে দেখেছে, বারবার দেখেছে। নিম পাতা চর্মরোগে। তুলসী পাতা কাশিতে। হলুদ আর মধু গলা ব্যথায়। এগুলো সবাই জানে। কিন্তু সেলিনা আরো কিছু লিখে রেখেছে। চরের বুড়ো হাকিম, রহিম চাচা, একটা গাছের ছাল জ্বালিয়ে পানি খাওয়ান জ্বরে। সেলিনা গাছটার নাম জানে না, চরের মানুষ বলে "তেঁতো গাছ।" কিন্তু কাজ করে। তিনবার দেখেছে, তিনবারই জ্বর কমেছে।
সেলিনা এসব লিখে রেখেছে। কোনো বৈজ্ঞানিক ভাষায় না, নিজের ভাষায়। "ছেলেটার জ্বর ছিল তিন দিন। ওষুধ নেই। রহিম চাচার তেঁতো গাছের পানি দিলাম। পরদিন জ্বর কমে গেল। তিন দিন পর সম্পূর্ণ সুস্থ।"
এটা প্রমাণ না। সেলিনা জানে। কিন্তু এটা পর্যবেক্ষণ। আর পর্যবেক্ষণ দিয়েই শুরু হয় সবকিছু।
৩
সোহেল নদীর ঘাটে বসে আছে।
বারো বছর হয়ে গেছে ছেলেটার। লম্বা হয়েছে, রোগা, গায়ের রং মায়ের মতো শ্যামলা। চরের স্কুলে পড়ে, স্কুল বলতে একটা টিনের ঘর, একজন মাস্টার, ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ একসাথে। সোহেল ক্লাস সিক্সে উঠেছে, তাই এখন পাশের চরে যেতে হয়, নৌকায়। প্রতিদিন।
সোহেল এখন চোদ্দ ধরনের নদীর মাছ চিনতে পারে শব্দ শুনে। ইলিশ পানিতে যখন ওঠে, একটা থপ করে শব্দ হয়, ভারী, যেন কেউ পাথর ফেলল। বোয়াল ঘাপটি মেরে থাকে, শব্দ হয় না, কিন্তু যখন শিকার ধরে তখন পানি ফাটে, চেরা শব্দ। রুই লাফায়, সুষম শব্দ, পর পর তিনবার, যেন গুনে গুনে করে। কাতলা ভারী, তার শব্দ গভীর। পুঁটি ঝাঁক ধরে ওঠে, তখন পানির ওপরটা ফুটতে থাকে, টিপটিপ, যেন বৃষ্টি পড়ছে।
এসব সোহেল শিখেছে জেলেদের কাছ থেকে। আসলাম চাচা, যিনি সারারাত নদীতে থাকেন, বলেন, "মাছের কান আছে, তুইও কান দিয়ে মাছ ধর।" সোহেল ধরে না। শুধু শোনে। আর গুনে। চোদ্দটা মাছ, চোদ্দটা শব্দ। সে একদিন আম্মাকে বলেছিল, "আম্মা, আমি চোখ বন্ধ করেও বলতে পারি কোন মাছ উঠল।" সেলিনা বলেছিল, "ঠিক আছে, এবার বই খুল।"
সোহেল বই খোলে, কিন্তু কান নদীর দিকেই থাকে।
৪
নৌকাটা এলো বিকেল চারটায়।
এই চরে নৌকা আসে প্রতিদিন। মাছ নিয়ে যায়, চাল নিয়ে আসে। কিন্তু এই নৌকাটা আলাদা। একটা ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ওপরে ছাউনি, পেছনে একটা ব্যাগ। নৌকা থেকে একজন নামল। শহরের মানুষ, বোঝা যায়। জুতো পরা, চরে কেউ জুতো পরে না। গলায় ক্যামেরা। হাতে একটা ছোট খাতা, কলম গোঁজা কানের পেছনে।
লোকটা ঘাটে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর কাছে দাঁড়ানো একজনকে জিজ্ঞেস করল, "স্বাস্থ্য কর্মী কোথায় পাব?"
সেলিনাকে ডেকে আনা হলো।
লোকটা হাত বাড়াল। "আমি তৌফিক। সাংবাদিক। ঢাকা থেকে এসেছি। একটা ফিচার করছি, 'AI স্বাস্থ্যসেবা বিপ্লব' নিয়ে। সরকার বলছে চর-হাওরেও AI পৌঁছে গেছে। সত্যি কিনা দেখতে এসেছি।"
সেলিনা লোকটার দিকে তাকাল। একটু তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, "চা খাবেন? বসেন।"
তৌফিক বসল। সেলিনার ঘরের বারান্দায়। ঘরটা ছোট, বাঁশের বেড়া, টিনের চাল। বারান্দায় একটা কাঠের বেঞ্চ। সেলিনা চা বানিয়ে আনল। দুধ ছাড়া, দুধ পাওয়া যায় না চরে। চিনি বেশি দিয়েছে, অতিথি বলে।
তৌফিক রেকর্ডার বের করল। "শুরু করি?"
"করেন।"
"আপনাকে যে ট্যাবলেট দেওয়া হয়েছিল, সেটা কি এখনো ব্যবহার করেন?"
সেলিনা হাসল। হাসিটা টক, যেভাবে কাঁচা আম কামড়ালে চোয়াল কুঁচকে যায়।
"ট্যাবলেট? চার্জ কোথায় দেবো?"
তৌফিক একটু থমকে গেল। খাতায় কিছু লিখল।
"মানে, ট্যাবলেট চলে না?"
"বিদ্যুৎ নেই। চার্জ নেই। নেটওয়ার্ক নেই। ট্যাবলেট একটা ইট, ব্যাগের তলায় পড়ে আছে। দুই বছর।"
তৌফিক আবার লিখল। তারপর জিজ্ঞেস করল, "তাহলে আপনি কী করেন? রোগী দেখেন না?"
সেলিনা চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। উঠে ভেতরে গেল। ফিরে এলো দুটো খাতা নিয়ে।
"এটা সরকারি খাতা।" নীল মলাটের খাতাটা খুলে দেখাল। খালি। "সরকারের হিসেবে আমি দুই বছরে কিছু করিনি।"
"আর এটা?" তৌফিক সাদা খাতাটার দিকে তাকাল।
সেলিনা সাদা খাতাটা খুলল।
তৌফিক পড়তে শুরু করল। প্রথম পাতা। দ্বিতীয় পাতা। তৃতীয় পাতা। পড়তে পড়তে চুপ হয়ে গেল। চা ঠান্ডা হয়ে গেল। রেকর্ডার চলছে, কিন্তু তৌফিক কিছু বলছে না। শুধু পড়ছে।
জন্ম। মৃত্যু। রোগ। চিকিৎসা। টিউবওয়েলের আর্সেনিক। তেঁতো গাছের ছাল। সাপের কামড়ে মারা যাওয়া ছেলেটার নাম। নিউমোনিয়ায় মরে যাওয়া তিন মাসের বাচ্চাটার নাম। উনিশটা নবজাতকের নাম।
তৌফিক পড়া শেষ করে মুখ তুলল। চোখে কিছু একটা ছিল, সেলিনা চিনতে পারল না, লজ্জা হতে পারে, রাগ হতে পারে, অবাক হতে পারে। শহরের মানুষের চোখে অনেক কিছু থাকে যেগুলোর নাম চরে নেই।
"এটার ছবি তুলতে পারি?"
"পারেন।"
তৌফিক ক্যামেরা তুলল। প্রতিটা পাতার ছবি তুলল। একশো বিশ পাতা। তার আগের খাতারটাও আনল সেলিনা, সেটারও ছবি তুলল। তারপর প্রথম খাতার, সেটারও। তিন খাতা। প্রায় তিনশো পাতা। তৌফিকের ক্যামেরায় তিনশো পাতার ছবি।
তৌফিক বলল, "আপনি জানেন, এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?"
সেলিনা কিছু বলল না। চায়ে চুমুক দিল। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
৫
তৌফিক থাকল একটা রাত।
চরে হোটেল নেই। সেলিনার ঘরের বারান্দায় একটা মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়ল। সকালে নৌকায় চলে গেল। যাওয়ার আগে সেলিনার হাত ধরে বলল, "আপা, এই খাতাগুলো রাখবেন। নষ্ট হতে দেবেন না।"
সেলিনা বলল, "পানি আসলে সব নষ্ট হয়। পানি কারো কথা শোনে না।"
তৌফিক চলে গেল।
দুই সপ্তাহ পর খবরটা বেরোলো। অনলাইনে। সেলিনা দেখেনি, নেটওয়ার্ক নেই। কিন্তু পাশের চরের দোকানদার, যার ফোনে মাঝে মাঝে ইন্টারনেট ধরে, সে দেখেছে।
শিরোনাম: "যেখানে AI পৌঁছায়নি।"
সেলিনার খাতার পাতার ছবি, পাশে সেলিনার ছবি, পেছনে চরের দৃশ্য। তৌফিক লিখেছে পুরো গল্প। ট্যাবলেট যেখানে ইটের মতো পড়ে আছে, সেখানে একজন মহিলা তিন খাতা ভরে রোগীর হিসেব রেখেছে। জন্ম থেকে মৃত্যু। সরকারি হিসেবে এই চরে কেউ নেই। সেলিনার হিসেবে তিনশো পরিবার।
রিপোর্টটা শেয়ার হলো। অনেক শেয়ার হলো। সেলিনা জানে না কত। সেলিনা জানে না "ভাইরাল" শব্দটার মানে কী। চরে ভাইরাল বলতে বোঝায় ডায়রিয়া।
তিন দিন পর ফোন এলো।
সেলিনা পাশের চরে গিয়েছিল ওষুধ আনতে। দোকানদার বলল, "আপা, ফোন আইছে আপনার। ওই নম্বরটা থেকে। সুনামগঞ্জ থেকে।"
সেলিনা ফোন ধরল।
নাজমুল সাহেব।
দুই বছরে প্রথম ফোন। আগে সেলিনা ফোন করত, ধরতেন না। রিপোর্ট পাঠাতে বলতেন, কিন্তু কী রিপোর্ট পাঠাবে? ট্যাবলেটের ডেটা নেই, সরকারি খাতা খালি। নাজমুল সাহেব ভুলে গিয়েছিলেন সেলিনাকে, যেভাবে মানুষ পুরনো ফাইল ভুলে যায়।
আজ মনে পড়েছে।
"সেলিনা আপা, কেমন আছেন?" গলায় উষ্ণতা। বানানো উষ্ণতা, চেনা যায়।
"আছি।"
"ওই যে একটা সাংবাদিক গিয়েছিল, আপনি নাকি কিছু বলেছেন..."
"বলেছি। যা সত্য তাই বলেছি।"
একটু চুপচাপ। নাজমুল সাহেবের শ্বাসের শব্দ। ফোনের ওপাশে কেউ কিছু বলছে, চাপা গলায়।
"আপা, ওপর থেকে জিজ্ঞেস করছে। ওই খাতার কথা। রিপোর্টের কথা। আপনি একটু..."
"একটু কী?"
নাজমুল সাহেব বলতে পারলেন না। কী বলবেন? চুপ থাকতে বলবেন? খাতা লুকাতে বলবেন? সত্য ভুলে যেতে বলবেন?
সেলিনা বলল, "নাজমুল সাহেব, আমি দুই বছর ধরে একা এই চরে আছি। বিদ্যুৎ নেই, ট্যাবলেট চলে না, ওষুধ আসে না। আমি যা করেছি খাতায় লিখেছি। আর কিছু করিনি।"
ফোন কেটে গেল। নেটওয়ার্ক চলে গেল। চরে নেটওয়ার্ক এরকমই, মাঝে মাঝে আসে, কথা শেষ হওয়ার আগেই চলে যায়।
সেলিনা ফোনটা দোকানদারকে ফেরত দিল।
৬
সন্ধ্যায় সেলিনা ঘরে ফিরে দেখল সোহেল বারান্দায় বসে আছে। চোখ বন্ধ। কান খাড়া।
"কী শুনছিস?"
"চিতল। এইমাত্র একটা চিতল উঠল।"
সেলিনা কান পাতল। কিছু শুনতে পেল না। শুধু পানির শব্দ, বাতাসের শব্দ, দূরে কোথাও একটা পাখি ডাকছে।
"আমি তো কিছু শুনলাম না।"
"তুমি শুনবে না, আম্মা। তোমার কান শহরের কান।"
সেলিনা কিছু বলল না। ছেলেটা ঠিক বলেছে। সেলিনার কান সুনামগঞ্জের, চরের না। দুই বছরেও চরের কান হয়নি।
সেলিনা ভেতরে গেল। সাদা খাতাটা বের করল। আজকের তারিখ লিখল। তারপর লিখল:
"সাংবাদিক এসেছিল। খাতার ছবি তুলেছে। খবর হয়েছে। সুপারভাইজরের ফোন এসেছে। চিন্তিত মনে হলো। কেন চিন্তিত বুঝতে পারিনি। হয়তো আমার জন্য, হয়তো নিজের জন্য।"
কলম রাখল। ভাবল।
তারপর আরেকটা লাইন যোগ করল:
"চরে বিদ্যুৎ এখনো নেই।"
খাতা বন্ধ করল। বালিশের নিচে রাখল। বালিশটা পাতলা, ভেতরে তুলা কম, খাতা রাখলে একটু উঁচু হয়ে যায়। সেলিনা প্রতিরাতে এই উঁচুতে মাথা রেখে ঘুমায়।
বাইরে অন্ধকার। চরে বিদ্যুৎ নেই বলে অন্ধকারটা সম্পূর্ণ। শহরের অন্ধকার অসম্পূর্ণ, কোথাও না কোথাও একটা আলো থাকে। চরের অন্ধকার খাঁটি।
নদী বয়ে যাচ্ছে। পানির ওপর কোনো আলো নেই, কোনো ছায়া নেই। শুধু শব্দ। পানি কোথাও ভাঙছে, কোথাও গড়ছে। চর ভাঙছে, চর গড়ছে। এটাই চরের নিয়ম।
সোহেল ঘুমিয়ে গেছে। তার পাশে একটা খোলা খাতা, স্কুলের খাতা, যেখানে সে দিনে যা শিখেছে লিখে রাখে। আজকের পাতায় লেখা: "চিতল মাছ রাতে বেশি শব্দ করে। কারণ রাতে পানি ঠান্ডা।"
এটা সত্য কিনা সেলিনা জানে না। কিন্তু সোহেল বিশ্বাস করে। চরের বাচ্চারা এরকম, তারা পানি থেকে শেখে, বই থেকে কম।
নদীর ওপর দিয়ে একটা বাতাস এলো। ঘরের টিনের চালে লাগল। একটা শব্দ হলো, যেটা বৃষ্টি না, বাতাস না, শুধু চাল আর বাতাসের কথোপকথন।
সেলিনার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। ঘুম আসছে। বালিশের নিচে খাতা। খাতায় তিনশো পরিবার। তিনশো পরিবার যাদের অস্তিত্ব কোনো সিস্টেমে নেই, কোনো ডেটাবেসে নেই, কোনো ড্যাশবোর্ডে নেই। শুধু সেলিনার হাতের লেখায় আছে, পনেরো টাকার খাতায়।
দূরে নদীতে একটা মাছ উঠল। সোহেল ঘুমের ভেতরেও শুনল হয়তো।