জাহিদের ছেলে মালয়েশিয়ায়
১
ইমরান বলল, "বাবা, আমি মালয়েশিয়া যাব।"
জাহিদ চায়ের কাপ হাতে ধরে ছিল। কাপটা টেবিলে রাখল। আস্তে, যেন কাপটা ভাঙার ভয় আছে। কাপটা ভাঙার কোনো ভয় নেই, মোটা কাচের কাপ, চরে পড়লেও ভাঙবে না। কিন্তু জাহিদ আস্তে রাখল।
"কী বললি?"
"মালয়েশিয়া। কাজের ভিসা। মোবারক ভাই ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।"
জাহিদ ইমরানের দিকে তাকাল। বাইশ বছরের ছেলে। লম্বা, জাহিদের চেয়ে দুই ইঞ্চি বেশি। চোয়াল শক্ত, ভ্রু ঘন, চোখে সেই একই একগুঁয়েমি যেটা জাহিদের চোখে আছে। রশিদা বলে, "তোর ছেলে তোর মতো। একবার কিছু ঠিক করলে পাথরও নড়ে, ও নড়ে না।"
জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "তুই কেন যাবি?"
ইমরান বলল, "বাবা, এখানে কাজ নেই।"
জাহিদ চুপ করে গেল।
চোদ্দ বছর আগে। ২০১৬ সাল। জাহিদ দাঁড়িয়েছিল এই ঘরে, এই ঘর না, তখন পুরনো ঘর ছিল, মাটির দেয়াল, টিনের চাল। রশিদা দুই মাসের ইমরানকে কোলে নিয়ে বসে ছিল। জাহিদের মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কাতার যাবি কেন?" জাহিদ বলেছিল, "আম্মা, এখানে কাজ নেই।"
একই শব্দ। হুবহু।
"বাবা, এখানে কাজ নেই।"
"আম্মা, এখানে কাজ নেই।"
জাহিদ চোদ্দ বছর পর নিজের কথা নিজের ছেলের মুখে শুনল। কথাগুলো পুরনো হয়নি। কথাগুলো একটুও বদলায়নি। দেশ বদলেছে, সরকার বদলেছে, প্রযুক্তি এসেছে, রাস্তা হয়েছে, সেতু হয়েছে। কিন্তু এই একটা বাক্য একই আছে। এখানে কাজ নেই।
জাহিদ কিছু বলতে চাইল। "যাবি না" বলতে চাইল। কিন্তু মুখ খুলতে পারল না। কারণ সে গিয়েছিল। সে গিয়ে বারো বছর কাটিয়ে এসেছে। সেই টাকায় এই ঘর হয়েছে, ইটের দেয়াল হয়েছে, ছেলেমেয়ে পড়েছে। যদি সে না যেত, ইমরান হয়তো স্কুলেও যেতে পারত না।
তাহলে ইমরানকে কী বলবে?
"যাবি না" বললে ইমরান জিজ্ঞেস করবে, "তুমি তো গিয়েছিলে।"
তখন জাহিদ কী উত্তর দেবে?
২
রশিদা রান্নাঘরে।
সে শুনেছে। পাতলা দেয়াল, সবকিছু শোনা যায়। ইমরানের কথা শুনেছে, জাহিদের চুপ থাকাও শুনেছে। চুপ থাকার শব্দ অনেক জোরে হয়, কখনো কখনো কথার চেয়ে জোরে।
রশিদা ডাল নাড়ছে। ডালের ভেতর আদা দিয়েছে, পেঁয়াজ দিয়েছে, হলুদ দিয়েছে। জাহিদের পছন্দমতো। বারো বছর দূরে ছিল, তারপর দুই বছর হলো ফিরেছে, কিন্তু রান্নায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। রশিদা একই রকম রান্না করে। এটা অভ্যাস না, প্রতিরোধ। কিছু জিনিস বদলাবে না, রশিদা ঠিক করে রেখেছে।
ইমরান রান্নাঘরে ঢুকল।
"আম্মা।"
রশিদা ঘুরে তাকাল না। ডাল নাড়তে থাকল।
"আম্মা, বাবা কিছু বলছে না।"
"কী বলবে?"
"মানে... রাজি আছে না নেই।"
রশিদা ডাল নাড়ার হাত থামাল। একটু ভাবল। তারপর বলল, "তোর বাবা রাজি আছে। বলতে পারছে না। বলতে পারা আর রাজি থাকা আলাদা জিনিস।"
ইমরান চলে গেল।
রশিদা ডালের হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। ডাল ফুটছে। বুদবুদ উঠছে, ফাটছে, আবার উঠছে। রশিদার চোখ ভিজে গেল। সে জানে কেন। এই ছেলেকে সে দুই মাস বয়সে কোলে নিয়ে বসে ছিল যখন জাহিদ কাতার গিয়েছিল। এই ছেলে বাবা ছাড়া বড় হয়েছে। ফোনে বাবাকে দেখেছে, কিন্তু ফোনের বাবা আর ঘরের বাবা আলাদা। ফোনের বাবা সমান, ঘরের বাবা উঁচু-নিচু। ইমরান ঘরের বাবাকে চেনে মাত্র দুই বছর।
আর এখন সেই ছেলে বলছে সে যাবে। মালয়েশিয়া। কাতার না, মালয়েশিয়া। দেশ আলাদা, কিন্তু গল্প একই। একটা ছেলে যাবে, একটা মা থাকবে, একটা ফোন থাকবে, ফোনে "কেমন আছো" "আছি" হবে। বছরের পর বছর।
রশিদা ডালের হাঁড়ি থেকে চামচ তুলে নিল। চামচে একটু ডাল নিয়ে মুখে দিল। নুন কম। নুন দিল।
৩
সন্ধ্যায় ইমরান বাইরে গেল। বন্ধুদের সাথে। ফারিন বই পড়ছে। রুমা ঘুমিয়ে গেছে।
জাহিদ বারান্দায় বসে আছে। উঠোনে আমগাছ। যেটা চারা ছিল, এখন বাড়ির চেয়ে উঁচু। রাতে গাছটা একটা ছায়ার মতো দেখায়, বিশাল, স্থির। বাতাস লাগলে পাতা নড়ে, তখন মনে হয় গাছটা শ্বাস নিচ্ছে।
রশিদা এসে পাশে বসল।
কেউ কিছু বলল না। অনেকক্ষণ।
তারপর জাহিদ বলল, "সেই সুটকেসটা আছে?"
"কোনটা?"
"যেটা নিয়ে আমি গিয়েছিলাম।"
রশিদা একটু ভাবল। "আছে। ওপরে তাকে। তুমি যেটা নিয়ে ফিরলে সেটাও আছে।"
"আমি যেটা নিয়ে গিয়েছিলাম সেটা দে।"
রশিদা ভেতরে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো একটা সুটকেস নিয়ে। পুরনো। কালো রঙ, কিন্তু কালো উঠে ধূসর হয়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। চামড়া নকল, ফেটে গেছে এক কোণায়। হাতলটা শক্ত, ভাঙেনি। চাকা দুটোর একটা আটকে যায়।
জাহিদ সুটকেসটা হাতে নিল। উলটে দেখল। ডানদিকের জিপারটা ভাঙা ছিল। জাহিদ নিজে ঠিক করেছিল, তার দিয়ে, ২০১৪ সালে, কাতার যাওয়ার আগে। তারটা এখনো আছে। ষোলো বছর হয়ে গেছে, তার এখনো ধরে আছে। জিপারের দাঁতগুলো মরচে পড়েছে, কিন্তু তারটা ঠিক আছে।
জাহিদ তারটায় আঙুল বোলাল। শক্ত তার। নিজের হাতে বেঁকিয়ে লাগিয়েছিল। তখন ভেবেছিল, কাতার গিয়ে নতুন সুটকেস কিনবে, এটা ফেলে দেবে। কেনেনি। ফেলেনি। বারো বছর এই সুটকেসেই কাপড় রেখেছে। তারটা ধরে রেখেছে বারো বছর। জাহিদও ধরে রেখেছে বারো বছর। কে কাকে ধরে রেখেছিল বোঝা মুশকিল।
"এটা দে ইমরানকে।"
রশিদা কিছু বলল না।
জাহিদ বলল, "নতুন কেনার দরকার নেই। এটা ভালো আছে।"
ভালো আছে মানে ভালো আছে না। ভালো আছে মানে চলে। এটুকুই। নেত্রকোনায় বেশিরভাগ জিনিস "ভালো আছে" এই অর্থে ভালো আছে।
৪
পরদিন রশিদা সুটকেসটা খুলল।
ভেতরে কিছুই নেই। জাহিদ ফেরার সময় খালি করে এনেছিল, কাতারের সব ফেলে এসেছিল। শুধু খাতাটা আনেনি, সেটা আলমারিতে রেখেছে। সুটকেসে একটু ন্যাপথলিনের গন্ধ, একটু পুরনো কাপড়ের গন্ধ, আর একটু ধুলো।
রশিদা সুটকেস মুছল। ভেতরে, বাইরে। তারপর ইমরানের জামাকাপড় গোছাতে শুরু করল।
দুটো প্যান্ট। তিনটা শার্ট। দুটো লুঙ্গি। গেঞ্জি চারটা। আন্ডারওয়্যার। মোজা তিন জোড়া। একটা তোয়ালে। সাবান, শ্যাম্পু, টুথব্রাশ, পেস্ট। একটা ছোট আয়না। একটা চিরুনি।
রশিদা ভাঁজ করে রাখছে। প্রতিটা জামা আলাদা আলাদা ভাঁজ, যেভাবে দোকানে রাখে, সমান, কোণা মেলানো। জাহিদের জন্যও এভাবেই গুছিয়ে দিয়েছিল। চোদ্দ বছর আগে। একই সুটকেস। একই ভাঁজ। একই হাত।
তখন ইমরান দুই মাসের ছিল। কোলে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল। রশিদা এক হাতে ইমরানকে ধরে, এক হাতে জাহিদের কাপড় ভাঁজ করেছিল। জাহিদ বলেছিল, "আমি করি।" রশিদা বলেছিল, "তুমি ঠিকমতো ভাঁজ করতে পারো না।" জাহিদ আর কিছু বলেনি।
আজ রশিদা দুই হাতে ইমরানের কাপড় ভাঁজ করছে। কোলে কোনো বাচ্চা নেই। দুই হাত খালি, তাই ভাঁজ আরো পরিপাটি। কিন্তু ভেতরে কিছু একটা আছে যেটা পরিপাটি না। সেটা কী, রশিদা জানে। বলবে না।
ইমরান ঘরে ঢুকল। দেখল মা সুটকেস গোছাচ্ছে।
"আম্মা, এত তাড়াতাড়ি কেন? আমার যেতে এখনো দুই সপ্তাহ।"
রশিদা বলল, "তাড়াতাড়ি না। আগে থেকে গোছালে কিছু বাদ পড়ে না।"
ইমরান চলে গেল। রশিদা সুটকেস গোছাতে থাকল।
৫
রাতে জাহিদ আলমারি খুলল।
নীল মলাটের খাতাটা আছে। সেই খাতা। কাতারের খাতা। বারো বছরের হিসেব। পাতার পর পাতায় সংখ্যা, তারিখ, টাকার অঙ্ক। আর সেই শেষ পাতায়, সেই একটা বাক্য: "ক্রেন এখন নিজেই চলে।"
জাহিদ খাতাটা বের করল।
দেশে ফেরার পর সে এই খাতায় আর লেখেনি। দুই বছর। খাতাটা আলমারিতে পড়ে ছিল, রশিদার শাড়ির পাশে, চুপচাপ। জাহিদ মাঝে মাঝে আলমারি খুলে দেখত, খাতাটা আছে, তারপর আলমারি বন্ধ করত। খোলা আর বন্ধ, এটুকুই।
আজ সে খাতা খুলল। শেষ পাতার পর পরের পাতা। খালি। পেন্সিল নিল। সেই পেন্সিল, কাতার থেকে আনা, এখনো ধার আছে।
লিখল:
"ইমরান মালয়েশিয়া। ইতিহাস।"
দুটো শব্দ। তারপর একটু থামল। তারপর আরেকটা শব্দ।
"ইতিহাস।"
তিন শব্দ। এর বেশি লেখার কিছু নেই। জাহিদ সংখ্যার মানুষ, শব্দের না। কিন্তু আজ সংখ্যা আসছে না। কত টাকায় যাবে ইমরান? কত টাকা পাঠাবে? কত বছর থাকবে? এসব হিসেব জাহিদ করতে পারে, কিন্তু আজ করতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
আজ শুধু তিনটা শব্দ।
ইমরান। মালয়েশিয়া। ইতিহাস।
জাহিদ খাতা বন্ধ করল। আলমারিতে রাখল। রশিদার শাড়ির পাশে। খাতাটা আবার শুয়ে পড়ল, যেভাবে ক্লান্ত মানুষ বিছানায় পড়ে।
৬
রাতে ইমরান ঘরে ফিরল।
জাহিদ বারান্দায় বসে আছে। ইমরান জুতো খুলে বারান্দায় উঠল। বাবার পাশ দিয়ে যেতে যেতে থামল।
"বাবা।"
"হুম।"
"তুমি রাগ করেছো?"
জাহিদ একটু ভাবল। রাগ? না, রাগ করেনি। রাগ করার কোনো কারণ নেই। ছেলে কাজ খুঁজছে, দেশে কাজ নেই, বিদেশে যাবে। এটা স্বাভাবিক। নেত্রকোনার প্রতি ঘরে একজন বিদেশে, বাকিরা অপেক্ষা করছে। স্বাভাবিক।
"না।"
"তাহলে কিছু বলছো না কেন?"
জাহিদ ইমরানের দিকে তাকাল। ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে, দরজার সামনে, বাতির আলোতে। মুখটা অর্ধেক আলো, অর্ধেক ছায়া।
"কী বলবো? আমিও তো গিয়েছিলাম।"
ইমরান কিছু বলল না। একটু দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ভেতরে গেল।
জাহিদ বসে রইল। উঠোনে আমগাছ। গাছে এখন আম ধরেছে, কাঁচা, সবুজ। আরো দুই মাস লাগবে পাকতে। ইমরান পাকা আম খেয়ে যেতে পারবে না। ইমরানের ফ্লাইট তার আগে।
রশিদা ভেতর থেকে বলল, "শোও এখন।"
জাহিদ উঠল না।
সে ভাবছে। চোদ্দ বছর আগে সে কাতার গিয়েছিল কারণ এখানে কাজ নেই। তারপর সে ফিরে এসেছে, কারণ সেখানেও কাজ নেই, ক্রেন নিজেই চলে। এখন ইমরান যাচ্ছে মালয়েশিয়া, কারণ এখানে কাজ নেই। ইমরানও একদিন ফিরবে। তারপর ইমরানের ছেলে কোথাও যাবে। কারণ এখানে কাজ নেই।
একটা বৃত্ত।
জাহিদ বৃত্ত বোঝে। ক্রেনের বুম একটা বৃত্তে ঘোরে। সে বারো বছর দেখেছে। কিন্তু ক্রেনের বৃত্তের মানে আছে, কিছু একটা তোলে, কোথাও রাখে। এই বৃত্তের মানে কী? কী তোলে? কোথায় রাখে?
জাহিদ জানে না।
৭
পরদিন সকালে ইমরান দেখল বারান্দায় সুটকেস রাখা। পুরনো সুটকেস। কালো, ধূসর হয়ে যাওয়া, এক কোণায় ফাটা।
"এটা কার?"
জাহিদ চা খাচ্ছিল। বলল, "তোর। নিয়ে যা।"
ইমরান সুটকেসটা দেখল। হাতল ধরল। একটু ভারী, কিন্তু শক্ত। চাকা ঘুরিয়ে দেখল, একটা আটকায়।
"এটা তো তোমার। তুমি যেটা নিয়ে গিয়েছিলে।"
"হুম।"
ইমরান সুটকেসটা উলটে দেখল। ডানদিকের জিপার। তারের কাজ।
"এটা কী? তার?"
"জিপার ভাঙা ছিল। তার দিয়ে ঠিক করেছিলাম। ২০১৪ সালে।"
ইমরান তারটায় আঙুল বোলাল। একই ভঙ্গিতে। জাহিদ গতকাল রাতে যেভাবে বোলিয়েছিল, ঠিক সেভাবে। বাবা-ছেলে, একই হাত, একই আঙুল, একই ভঙ্গি।
"নতুন একটা কিনে দিতাম," জাহিদ বলল। "কিন্তু..."
কিন্তু কী? কিন্তু টাকা নেই? না, সেটা পুরো সত্য না। কিন্তু এই সুটকেসটা দিতে চায়? হয়তো। কেন? জাহিদ নিজেও জানে না। হয়তো কোনো কারণ নেই। হয়তো শুধু মনে হয়েছে, বাবা যেটা নিয়ে গিয়েছিল ছেলেও সেটা নিয়ে যাক। জিনিস একটাই, শুধু হাত বদলায়।
ইমরান সুটকেস নিয়ে ভেতরে গেল।
জাহিদ চায়ে চুমুক দিল। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
উঠোনে আমগাছের একটা পাতা ঝরে পড়ল। সবুজ পাতা, শুকায়নি, তবু ঝরল। গাছ কেন সবুজ পাতা ফেলে সেটা জাহিদ জানে না। রশিদা হয়তো জানে, রশিদা গাছের কথা বোঝে।
পাতাটা উঠোনে পড়ে রইল। কেউ তুলল না।