সংসদে AI বিল

পর্ব ৪৬ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

সংসদ ভবনের এসি নষ্ট।

কারো দোষ না। যন্ত্র নষ্ট হয়, এটা যন্ত্রের ধর্ম। কিন্তু আজই নষ্ট হতে হবে, যেদিন "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০৩০" নিয়ে আলোচনা, সেদিন? কেউ পরিকল্পনা করেনি, কেউ করে না, জিনিসগুলো এমনিতেই ঘটে।

তিনশো আসনের চেম্বার। আজ উপস্থিত একশো সাতাশ জন। বাকিরা কোথায় কেউ জানে না, কেউ জিজ্ঞেসও করে না। যারা আছে তাদের অনেকের হাতে কাগজ, কিন্তু কাগজ পড়ছে কম, পাখা করছে বেশি। গরম। মার্চের শেষ, ঢাকায় গরম তখন পাকা আমের মতো, পুরোপুরি পেকে গেছে।

স্পিকার মহোদয় বললেন, "আজকের আলোচ্যসূচিতে দ্বিতীয় নম্বরে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ বিল। প্রস্তাবক মাননীয় সদস্য, চট্টগ্রাম-৮।"

একজন তরুণ এমপি উঠে দাঁড়ালেন। তানভীর হোসেন। বয়স তেত্রিশ। স্যুট পরা, টাই বাঁধা, ঘাম মুছছেন। হাতে একটা কাগজ। কাগজটা কে লিখে দিয়েছে বোঝা যায়, কারণ তানভীর পড়ছেন এমনভাবে যেভাবে মানুষ অচেনা রাস্তায় ম্যাপ দেখে হাঁটে, প্রতি পদে থেমে, দিক ঠিক করে, আবার হাঁটে।

"মাননীয় স্পিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সর্বত্র পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশকেও এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তবে একই সাথে, এর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এই বিলটি..."

তানভীর কাগজ উলটালেন। পরের পাতা খুঁজলেন। পেলেন না। কাগজটা আবার উলটালেন। পেলেন। পড়তে লাগলেন।

"এই বিলটি তিনটি মূল অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশ, AI ব্যবহারের ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিতকরণ। দ্বিতীয় অংশ, AI-ঘটিত ক্ষতির দায়দায়িত্ব নির্ধারণ। তৃতীয় অংশ, AI নিবন্ধন ও তদারকি কমিটি গঠন।"

গ্যালারিতে কিছু মানুষ বসে আছে। সাংবাদিক। দুই-একজন বিদেশি। একজন মহিলা ল্যাপটপে কিছু টাইপ করছে।

তানভীরের বক্তব্য শেষ হলো। পনেরো মিনিট। পনেরো মিনিটে তিনি "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা" শব্দটা বাইশবার বললেন। "নিয়ন্ত্রণ" শব্দটা সতেরোবার। "প্রয়োজন" শব্দটা চোদ্দবার। কিন্তু একবারও বললেন না ঠিক কী নিয়ন্ত্রণ করা হবে, কীভাবে করা হবে, কে করবে।

স্পিকার বললেন, "আলোচনায় অংশ নিতে চান কেউ?"

একজন বয়স্ক এমপি দাঁড়ালেন। আব্দুল হক সাহেব। রংপুর-৩। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরা, সংসদে লুঙ্গি পরা মানুষ কম, কিন্তু আব্দুল হক সাহেব পরেন। বলেন, "আমি জনগণের প্রতিনিধি, জনগণ লুঙ্গি পরে।"

আব্দুল হক সাহেব মাইকের কাছে গেলেন। গলা খাকারি দিলেন।

"মাননীয় স্পিকার, আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই। খুব সহজ প্রশ্ন।"

একটু থামলেন।

"AI কি একটা কোম্পানি?"

গ্যালারিতে হাসির শব্দ। দুই-একজন এমপিও হাসলেন। তানভীর হাসলেন না।

আব্দুল হক সাহেব হাসি শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করলেন। তারপর বললেন, "আপনারা হাসছেন। ঠিক আছে, হাসেন। কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করি, এই চেম্বারে কেউ কি আমাকে বলতে পারবে, AI কী? এমনভাবে বলতে পারবে যে আমার ভোটার, যে চরে ধান চাষ করে, সেও বুঝবে?"

চুপচাপ।

"কেউ? আমার এলাকায় বিশ লাখ মানুষ থাকে। তাদের বেশিরভাগ কৃষক, জেলে, দিনমজুর। তাদের কাছে AI মানে কী? তারা জানে না। আমিও জানি না। তাহলে আমরা কিসের বিল পাশ করছি?"

তানভীর দাঁড়ালেন। "মাননীয় সদস্য, AI মানে হলো..."

"আমি জানি AI মানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটা আমিও পড়তে পারি। আমার প্রশ্ন হলো, এটা কী করে? আমার এলাকার চাষির ধানের দাম কমে যাচ্ছে, সেটা কি AI-এর জন্য? আমার এলাকার তাঁতি কাজ হারাচ্ছে, সেটা কি AI-এর জন্য? নাকি সেটা অন্য কিছু? আমরা যদি না-ই জানি সমস্যা কোথায়, তাহলে আইন বানিয়ে কী হবে?"

আরেকজন এমপি দাঁড়ালেন। ঢাকা-১২। মধ্যবয়স্ক। বললেন, "আমি প্রস্তাবকের পক্ষে। আমাদের AI নিয়ন্ত্রণ দরকার। ভারত করছে, ইউরোপ করছে, আমরাও করব।"

আব্দুল হক সাহেব বললেন, "ভারত করছে মানে আমাদেরও করতে হবে, এটা কোন যুক্তি? ভারত গরু পূজা করে, আমরাও করব?"

হাসি।

স্পিকার বললেন, "শৃঙ্খলা বজায় রাখুন।"

আলোচনা চলল। দুই ঘণ্টা। পঁয়ত্রিশজন বক্তব্য দিলেন। কেউ AI-এর পক্ষে, কেউ বিপক্ষে, কেউ নিরপেক্ষ। বেশিরভাগ নিজের এলাকার সমস্যা বললেন, AI-এর সাথে যেগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। একজন বললেন সেতু, একজন বললেন হাসপাতাল, একজন বললেন সড়ক। AI বিলের আলোচনায় সেতু কীভাবে এলো কেউ জিজ্ঞেস করল না।

এমপিরা ঘামছিলেন। পাঞ্জাবি ভিজে যাচ্ছিল। কাগজ পাখা হচ্ছিল। এসি নষ্ট।

ভোট হলো।

বিল পাশ হলো। সংশোধনী সহ। সংশোধনীগুলো কী ছিল:

এক: "AI ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানকে সরকারের নিকট নিবন্ধন করিতে হইবে।" কোন সরকারি দফতরে নিবন্ধন করতে হবে, সেটা পরে ঠিক হবে।

দুই: "AI-ঘটিত ক্ষতির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দায়ী থাকিবে।" কীভাবে ক্ষতি নির্ধারণ করা হবে, সেটা পরে ঠিক হবে।

তিন: "AI তদারকি কমিটি গঠন করা হইবে।" কমিটিতে কারা থাকবে, সেটা পরে ঠিক হবে।

সব পরে।

বিল পাশ হলো। এমপিরা উঠলেন। করিডোরে বেরিয়ে গেলেন। চা খেতে। এসি আছে করিডোরে, সেটা চলছে।

সাংবাদিকরা লিখল: "ঐতিহাসিক AI বিল পাশ।"

রংপুরে।

করিম রেডিও শুনছে। বাংলাদেশ বেতার। সন্ধ্যা সাতটার খবর। খবরে বলছে, সংসদে AI বিল পাশ হয়েছে।

করিম বুঝল না। করিম ধানের দাম বোঝে, সারের দাম বোঝে, বীজের দাম বোঝে, পানির অভাব বোঝে। AI বোঝে না।

পাশে বসে আছে প্রতিবেশী মোস্তফা। মোস্তফার ছেলে ঢাকায় থাকে, মাঝে মাঝে ফোনে এটা-ওটা বলে, নতুন নতুন শব্দ ব্যবহার করে।

মোস্তফা বলল, "শুনলা? আইন হইছে।"

করিম বলল, "আইন দিয়ে কি ধান ফিরবে?"

মোস্তফা কিছু বলল না। উত্তর নেই কারণ প্রশ্নটা উত্তরের জন্য করা হয়নি। প্রশ্নটা একটা বিবৃতি। করিমের অনেক কথাই এরকম, প্রশ্নের ছদ্মবেশে বিবৃতি।

করিমের ধানের কথা সে ভালো জানে। তিন বছর আগে ধানের দাম পড়ে গিয়েছিল। কেউ বলেছিল AI-এর কারণে, কেউ বলেছিল সরকারের কারণে, কেউ বলেছিল আবহাওয়ার কারণে। করিম জানে না কার কারণে। সে শুধু জানে ধান বিক্রি করে সারের দাম ওঠে না। এটুকু জানলেই চলে।

রেডিওতে আরো খবর আসছে। করিম শুনছে, কিন্তু শুনছে না। রেডিওর শব্দ বাড়ির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে, দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে, তারপর হারিয়ে যাচ্ছে। যেভাবে আইন পাশ হয়, ঘোষণা হয়, তারপর হারিয়ে যায়।

করিম উঠল। বাইরে গেল। উঠোনে। আকাশে তারা উঠেছে। রংপুরের আকাশ এখনো পরিষ্কার, ঢাকার মতো ধোঁয়া নেই। করিম তারা গুনতে পারে, যদিও গোনে না। তারা গুনে কী হবে? তারা দিয়ে ধান হয় না।

গাজীপুর।

রহিমা ফ্যাক্টরি থেকে ফিরেছে। রাত আটটা। আজ ওভারটাইম। শরীর ভাঙছে, তবু চলছে। চলতে হয়।

ফোনে একটা নোটিফিকেশন এসেছে। ডেলিভারি অ্যাপের। রহিমা মাঝে মাঝে এই অ্যাপ দিয়ে জিনিসপত্র আনায়, যখন বাজারে যাওয়ার সময় থাকে না। মিতু শিখিয়ে দিয়েছে। মিতু এখন ঢাকায়, কলেজে, হোস্টেলে থাকে। মিতু না থাকলে ঘর খালি লাগে, কিন্তু রহিমা এই খালিটা স্বীকার করে নিয়েছে।

নোটিফিকেশনে লেখা: "নতুন ফিচার! AI-চালিত রুট অপটিমাইজেশন! আপনার অর্ডার এখন আরো দ্রুত পৌঁছাবে!"

রহিমা পড়ল। বুঝল না। "রুট অপটিমাইজেশন" মানে কী? ডেলিভারি ছেলেটা আগেও ঠিক সময়ে আনত, এখন কী বদলাবে? রহিমা জানে না।

রহিমা জানে না আজ সংসদে একটা বিল পাশ হয়েছে। জানলেও কিছু বদলাত না। রহিমার জীবন বিলে বদলায় না, অ্যাপে বদলায়। বিল কাগজে থাকে, ফাইলে থাকে, গেজেটে থাকে। অ্যাপ ফোনে থাকে, হাতে থাকে, জীবনে ঢুকে যায়।

রহিমা অ্যাপ খুলল। একটু দেখল। ইন্টারফেস বদলেছে। আগে সবুজ ছিল, এখন নীল। নতুন একটা বাটন, "AI সাজেশন।" রহিমা চাপল।

স্ক্রিনে এলো: "আপনার আগের অর্ডারের ভিত্তিতে আমাদের সাজেশন: আলু ২ কেজি, পেঁয়াজ ১ কেজি, রসুন ২৫০ গ্রাম, মরিচ ১০০ গ্রাম।"

রহিমা দেখল। ঠিক আছে। এগুলোই সে কেনে প্রতি সপ্তাহে। অ্যাপ জানে। অ্যাপ মনে রাখে। রহিমাকে মনে রাখতে হয় না।

রহিমা "অর্ডার করুন" চাপল।

একটা অ্যানিমেশন এলো স্ক্রিনে। একটা ছোট গাড়ি, নীল রঙের, রাস্তা বরাবর চলছে। "আনুমানিক সময়: ২৮ মিনিট।" আগে ত্রিশ মিনিট লাগত। এখন আঠাশ। দুই মিনিট কম। এটাই রুট অপটিমাইজেশন। দুই মিনিট।

রহিমা ফোন রাখল। ভাত বসাতে হবে। আলম এখনো ফেরেনি। রাজু পড়ছে, সপ্তম শ্রেণি।

ঢাকায়, সংসদ ভবনে, একজন টেকনিশিয়ান এসি ঠিক করছে। রাত নয়টা। সবাই চলে গেছে। চেম্বার খালি। তিনশো আসন, সব খালি। টেকনিশিয়ান একটা ড্রিল চালাচ্ছে, কম্প্রেসারের কভার খুলছে।

সে জানে না আজ কী বিল পাশ হয়েছে। জানার দরকারও নেই। তার কাজ এসি ঠিক করা। এসি ঠিক হলে কাল চেম্বার ঠান্ডা থাকবে। কাল অন্য কোনো বিলের আলোচনা হবে। এমপিরা ঘামবে না। এটুকুই।

রংপুরে করিম ঘুমিয়ে গেছে। রেডিও বন্ধ। তারা এখনো আকাশে আছে, করিম দেখছে না।

গাজীপুরে রহিমার দরজায় কড়া নাড়ল ডেলিভারি ছেলেটা। পলিথিনের ব্যাগে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ। রহিমা টাকা দিল। ছেলেটা চলে গেল। আঠাশ মিনিট না, বত্রিশ মিনিট লেগেছে। রুট অপটিমাইজেশন গাজীপুরের ট্রাফিক হিসেব করতে পারেনি।

রহিমা আলু ধুতে বসল।

সংসদের বিল একটা কাগজ। অ্যাপের আপডেট একটা বাটন। কাগজ ফাইলে যায়। বাটন আঙুলের নিচে থাকে। বাংলাদেশে আইন দিয়ে কিছু বদলায় কিনা সেটা বিতর্কের বিষয়। কিন্তু অ্যাপ দিয়ে বদলায়, এটা বিতর্কের বিষয় না। এটা সত্য। ছোট সত্য, দুই মিনিটের সত্য, কিন্তু সত্য।

করিম জানে না তার ধানের দাম কেন কমে। রহিমা জানে না রুট অপটিমাইজেশন কী। সংসদের এমপিরা জানেন না AI ঠিক কী করে। কেউ জানে না। কিন্তু সবকিছু চলছে।

এমপিদের ঘামে ভেজা কাগজগুলো টেবিলে পড়ে আছে। চেম্বার খালি। এসি ঠিক হচ্ছে। কাল থেকে ঠান্ডা বাতাস আসবে।

রহিমার রান্নাঘরে পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ। ধোঁয়া উঠছে। ধোঁয়া জানালা দিয়ে বেরিয়ে গাজীপুরের রাতের বাতাসে মিশে যাচ্ছে।

করিমের উঠোনে একটা তারা খসে পড়ল। কেউ দেখল না।