রহিমার মিছিল

পর্ব ৪৭ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

রহিমা পনেরোটা প্ল্যাকার্ড বানিয়েছে।

সাদা কাগজ, কালো মার্কার। মার্কারটা মিতুর। মিতু অফিস থেকে নিয়ে এসেছিল একদিন, রহিমা জিজ্ঞেস করেনি কেন। মিতু কিছু বলেনি। মার্কারটা ড্রয়ারে পড়ে ছিল তিন মাস। আজ কাজে লাগল।

প্ল্যাকার্ডগুলো মেঝেতে সারি করে রাখা। কালি শুকাচ্ছে। রহিমা একটা একটা করে পড়ল। "আমরা মানুষ, মেশিন না।" "ত্রিশ শতাংশ কমিশন অন্যায়।" "কাজের ন্যায্য মূল্য চাই।" লেখাগুলো সোজাসাপটা। রহিমার হাতের লেখা সুন্দর না, কিন্তু স্পষ্ট। প্রতিটা অক্ষর আলাদা করে চেনা যায়। রহিমা সবকিছু স্পষ্ট করে। এটা তার স্বভাব।

বাইরে ভোরের আলো। ঘড়িতে পাঁচটা বাজে। আলম ঘুমাচ্ছে। রাজু ঘুমাচ্ছে। মিতু নিজের ফ্ল্যাটে, বানানীতে। রহিমা একা জেগে আছে।

গত দুই সপ্তাহ ধরে সে এই কাজটার পরিকল্পনা করছে। পরিকল্পনা বড় শব্দ, আসলে কিছু ফোন করেছে, কিছু কথা বলেছে। ফ্যাক্টরি থেকে ছাঁটাই হওয়ার পর যারা গিগ ওয়ার্কার হয়েছে, তাদের সাথে। সাইকেলে ডেলিভারি দেয় যারা, তাদের সাথে। অ্যাপে কাজ করে যারা, তাদের সাথে। বেশিরভাগ মেয়ে। কিছু ছেলে।

"আপা, লাভ হবে?" সালেহা জিজ্ঞেস করেছিল ফোনে।

"জানি না। কিন্তু চুপ করে বসে থাকলে কিছুই হবে না।"

"ভয় লাগে।"

"আমারও লাগে। তবু যাব।"

সালেহা একটু চুপ ছিল। তারপর বলল, "ঠিক আছে, যাব।"

রহিমা প্ল্যাকার্ডগুলো ভাঁজ করে একটা ব্যাগে রাখল। কাঁধে ব্যাগ। পায়ে স্যান্ডেল। শাড়িটা সাদা, কালো পাড়। কোনো বিশেষ শাড়ি না। প্রতিদিন যেটা পরে।

দরজার কাছে গিয়ে একবার পেছনে তাকাল। টবে মরিচগাছ। আজও ফল ধরেনি। রহিমা পানি দিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু সময় নেই। পরে দেবে।

বাইরে বের হলো।

উত্তরার অফিসটা আটতলা। কাচের বিল্ডিং। সামনে একটা ছোট পার্কিং, পার্কিংয়ে চারটা গাড়ি। বিল্ডিংয়ের গায়ে কোম্পানির নাম লেখা, সবুজ আর সাদা রঙে। রহিমা এই নাম প্রতিদিন ফোনে দেখে। অ্যাপের নাম। অ্যাপটা তাকে বলে কোথায় যেতে হবে, কত সময়ের মধ্যে, কত টাকা পাবে। অ্যাপটা তার থেকে ত্রিশ শতাংশ কেটে নেয়।

ত্রিশ শতাংশ। রহিমা হিসেব জানে। একশো টাকার অর্ডারে সে পায় সত্তর। বাকি ত্রিশ যায় কোম্পানিতে। এই আটতলা বিল্ডিংয়ে। যেখানে এসি চলে, যেখানে লিফট আছে, যেখানে মানুষ কফি খেতে খেতে স্ক্রিনে তাকায়।

সকাল নয়টায় রহিমা পৌঁছাল। বিল্ডিংয়ের সামনে ফুটপাত। ফুটপাতটা চওড়া, গাছ আছে দুপাশে। রহিমা একটা গাছের নিচে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে প্ল্যাকার্ড বের করল।

তখনো কেউ আসেনি।

পনেরো মিনিট পর সালেহা এলো। সাইকেল নিয়ে। পেছনে ডেলিভারি ব্যাগ। সালেহা সাইকেল তালা দিয়ে রেখে রহিমার কাছে এলো।

"কয়জন আসবে?"

"জানি না। পনেরো-বিশজনকে বলেছি।"

সালেহা প্ল্যাকার্ড নিল একটা। পড়ল। "ত্রিশ শতাংশ কমিশন অন্যায়।" মাথা নাড়ল।

একে একে আরো মানুষ আসতে লাগল। জয়নাল এলো, রিকশাচালক ছিল আগে, এখন অ্যাপে ডেলিভারি দেয়। ফেরদৌস এলো, বিশ বছরের ছেলে, ইউনিভার্সিটি ড্রপআউট, সকাল থেকে রাত অ্যাপে থাকে। শাহিনা এলো, চল্লিশের ওপর, রহিমার আগের ফ্যাক্টরির মেয়ে।

এগারোজন হলো। তারপর বারো। তেরো।

চৌদ্দ নম্বর একজন লোক, নাম আবদুল কাদের, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সাথে তার মেয়ে। মেয়ের বয়স চার হবে। মেয়ের হাতে একটা আইসক্রিম। কাঠির আইসক্রিম। গোলাপি রঙের। মেয়েটা বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আইসক্রিম চাটছে। চারপাশে কী হচ্ছে তার কোনো ধারণা নেই। তার পৃথিবীতে শুধু আইসক্রিম আছে, আর বাবার হাত।

পনেরো নম্বর একজন মেয়ে, নাম জুলি, রহিমাকে চেনে না, ফেসবুকে দেখেছে পোস্ট। কেউ একজন শেয়ার করেছিল।

"ফেসবুকে পোস্ট?" রহিমা জিজ্ঞেস করল।

"হ্যাঁ, কেউ দিয়েছে। স্ক্রিনশট।"

রহিমা কোনো পোস্ট দেয়নি। কেউ দিয়েছে। কে দিয়েছে সে জানে না।

পনেরোজন। এটুকুই। আর কেউ এলো না।

রহিমা প্ল্যাকার্ড তুলে ধরল। অন্যরাও। পনেরোজন মানুষ, পনেরোটা প্ল্যাকার্ড, একটা ফুটপাত।

কোনো চিৎকার নেই। কোনো স্লোগান নেই। রহিমা স্লোগান দিতে চায়নি। স্লোগান দিলে পুলিশ আসে। পুলিশ আসলে সমস্যা হয়। রহিমা সমস্যা চায় না। সে শুধু চায় ভেতরের লোকেরা দেখুক। জানুক। বাইরে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

দশ মিনিট কেটে গেল। বিল্ডিংয়ের কাচের দরজার ভেতর থেকে দুইজন সিকিউরিটি গার্ড দেখছে। একজন ফোন করছে কাউকে। আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে, হাত পেছনে, মুখ শক্ত।

রাস্তায় কিছু মানুষ থামল। দেখল। কেউ ফোন তুলে ছবি তুলল। কেউ হেঁটে চলে গেল। একজন রিকশাচালক রিকশা থামিয়ে পড়ল লেখাগুলো। তারপর ঘণ্টি বাজিয়ে চলে গেল।

আবদুল কাদেরের মেয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে। কাঠি ধরে চাটছে। আইসক্রিম গলে হাতে পড়ছে। বাবা মাঝে মাঝে নিচু হয়ে মেয়ের হাত মুছিয়ে দিচ্ছে, তারপর আবার প্ল্যাকার্ড তুলে ধরছে। মেয়েটা একবার প্ল্যাকার্ডের দিকে তাকাল, কিন্তু লেখা পড়তে পারে না, আবার আইসক্রিমে মন দিল।

বিশ মিনিট পর বিল্ডিংয়ের দরজা খুলল।

একজন বের হলো। যুবক। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর। পরনে নীল শার্ট, কালো প্যান্ট। চুল পরিপাটি। হাতে একটা ফোন। সে সরাসরি রহিমার কাছে এলো। সিকিউরিটি গার্ডরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, কিছু করছে না।

"আসসালামু আলাইকুম। আমি নাবিল, অপারেশন্স টিমের।" একটু থামল। "আপনাদের সমস্যা কী?"

রহিমা প্ল্যাকার্ড নামাল। ছেলেটার দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে ভয় আছে, একটু। কিন্তু চেপে রাখছে। ট্রেনিং পেয়েছে হয়তো, কীভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে হয়।

"সমস্যা হলো, আমরা কাজ করি, আপনারা কাটেন।"

কথাটা জোরে বলল না। চিৎকার করল না। যেভাবে চালের দাম বলে, সেভাবে বলল। সমতল স্বরে।

নাবিল একটু ভ্রু কুঁচকাল। "মানে?"

"মানে ত্রিশ শতাংশ। আমি একশো টাকার অর্ডার ডেলিভারি দিই, সত্তর টাকা পাই। ত্রিশ টাকা আপনাদের। আমি সাইকেল চালাই, রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি। আপনারা এসিতে বসেন।"

নাবিল ফোনটা পকেটে রাখল। "দেখুন, আমাদেরও তো খরচ আছে। সার্ভার, ডেভেলপমেন্ট, মার্কেটিং..."

"আমার খরচ নেই?" রহিমা বলল। "আমার সাইকেলের চেইন বদলাতে লাগে। টায়ার বদলাতে লাগে। ফোনের বিল দিতে হয়। ইন্টারনেট কিনতে হয়। খেতে হয়। বাড়ি ভাড়া দিতে হয়।"

সালেহা পাশ থেকে বলল, "আমরা তো কমিশন কমাতে বলছি না। বলছি ত্রিশ বেশি। বিশ করেন।"

নাবিল একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, "আমি বুঝতে পারছি। আমি এটা ম্যানেজমেন্টের কাছে ফরওয়ার্ড করব।"

"ফরওয়ার্ড?" রহিমা বলল।

"হ্যাঁ। আমি তো সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। ওপরে জানাব।"

রহিমা মাথা নাড়ল। সে জানে "ফরওয়ার্ড" মানে কী। ফ্যাক্টরিতে আঠারো বছর কাজ করেছে। "ফরওয়ার্ড" মানে একটা ফাইলে ঢুকবে। ফাইলটা একটা ড্রয়ারে যাবে। ড্রয়ারটা বন্ধ হবে। কেউ আর খুলবে না।

"ফরওয়ার্ড করেন," রহিমা বলল।

নাবিল আরেকটু দাঁড়াল। কিছু বলতে চাইছিল হয়তো, বলল না। ঘুরে ভেতরে চলে গেল। কাচের দরজা বন্ধ হলো। এসির ঠান্ডা বাতাস একমুহূর্তের জন্য বাইরে এলো, তারপর হারিয়ে গেল।

আরো পনেরো মিনিট দাঁড়াল রহিমা। তারপর বলল, "চলেন।"

সবাই প্ল্যাকার্ড নামাল। কেউ কথা বলছে না। জয়নাল সিগারেট ধরাল। ফেরদৌস ফোনে কিছু দেখছে। শাহিনা রহিমার কাছে এলো।

"কিছু হবে আপা?"

রহিমা বলল, "না।"

শাহিনা একটু চমকে গেল। এত সোজা উত্তর আশা করেনি।

রহিমা বলল, "কিছু হবে না। কিন্তু আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। বলেছিলাম। এটুকু যথেষ্ট আপাতত।"

আবদুল কাদের মেয়েকে কোলে তুলে নিল। মেয়ের আইসক্রিম শেষ। কাঠিটা হাতে ধরে আছে। কাঠি ফেলতে চাইছে না। বাবা বলল, "ফেল।" মেয়ে বলল, "না।" বাবা আর কিছু বলল না। কাঠিসহ মেয়েকে নিয়ে হাঁটতে লাগল।

রহিমা প্ল্যাকার্ডগুলো ভাঁজ করে ব্যাগে রাখল। কোনোটা ফেলে দিল না। কাগজ ভালো আছে, আবার ব্যবহার করা যাবে। রহিমা কিছু ফেলে দেয় না। এটা অভ্যাস। পুরনো অভ্যাস।

বাসস্ট্যান্ডে হেঁটে গেল। উত্তরা থেকে গাজীপুরের বাস ধরতে হবে। বাস আসতে বিশ মিনিট লাগল। রহিমা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল। পাশে আরো মানুষ। কেউ জানে না সে এইমাত্র একটা মিছিল করে এসেছে। কেউ জানার কথাও না। পনেরোজন মানুষের মিছিল খবরের কাগজে আসে না।

বাস এলো। রহিমা উঠল। একটা সিট পেল, জানালার ধারে। বসল। ব্যাগটা কোলে রাখল। ব্যাগের ভেতরে ভাঁজ করা প্ল্যাকার্ড।

বাস ছাড়ল। রহিমা সোজা হয়ে বসে আছে। পিঠ সিটের সাথে লাগানো না, সোজা। যেভাবে ফ্যাক্টরিতে বসত। সেলাই মেশিনের সামনে পিঠ বাঁকালে ব্যথা হতো, তাই সোজা থাকতে শিখেছিল। অভ্যাস রয়ে গেছে।

জানালা দিয়ে রাস্তা দেখছে। গাড়ি যাচ্ছে। রিকশা যাচ্ছে। মানুষ হাঁটছে। উত্তরার রাস্তা চওড়া, গাজীপুরের দিকে সরু হবে, তারপর আরো সরু।

ফোন বাজল।

স্ক্রিনে মিতুর নাম।

"আম্মু।"

"হুম।"

"আম্মু, দেখেছি ফেসবুকে।"

রহিমা একটু ভ্রু কুঁচকাল। "কী দেখেছিস?"

"তোমার ছবি। প্ল্যাকার্ড ধরে দাঁড়িয়ে আছ। কেউ তুলে দিয়েছে।"

রহিমা ভাবল কে তুলেছে। রাস্তার লোক? সিকিউরিটি গার্ড? জুলি? জানা নেই।

"আম্মু, অনেকে শেয়ার করছে।"

"আমি ফেসবুক চালাই না।"

মিতু একটু চুপ। তারপর বলল, "তুমি বলোনি যে যাচ্ছ।"

"বলার কী আছে? গেছিলাম। বলেছিলাম। এসে গেছি।"

"কী বলেছ?"

"যা বলার ছিল।"

মিতু আবার চুপ। মিতু জানে আম্মার সাথে কথা টেনে লাভ নেই। আম্মা যতটুকু বলতে চায় ততটুকু বলে, তার বেশি না।

"আম্মু।"

"হুম।"

"তোমাকে নিয়ে গর্ব হচ্ছে।"

রহিমা কিছু বলল না। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। একটা চায়ের দোকান যাচ্ছে। দোকানে দুইজন বসে চা খাচ্ছে। একজনের হাতে খবরের কাগজ।

"ঠিক আছে, রাখি," রহিমা বলল।

"রাখো, আম্মু।"

ফোন রাখল।

রহিমা ফোনটা ব্যাগে রাখল। ব্যাগটা বন্ধ করল। বাসের ভেতরে গরম। জানালা খোলা, কিন্তু বাতাস গরম। মার্চের শেষ।

রহিমা হাসল।

হাসিটা বড় না। ঠোঁটের কোণে। কেউ দেখলে বুঝত না হাসছে কিনা। কিন্তু রহিমা জানে সে হাসছে। কত মাস হলো হাসেনি? গুনতে পারবে না। গুনতে চায় না। শুধু জানে, অনেকদিন পর মুখের পেশিগুলো একটু অন্যরকম হলো। একটু হালকা।

কিছু বদলাবে না। ত্রিশ শতাংশ ত্রিশ শতাংশই থাকবে। অ্যাপ চলবে। সাইকেল চলবে। রোদ জ্বলবে। রহিমা জানে।

কিন্তু আজ সে দাঁড়িয়েছিল। সে বলেছিল। "সমস্যা হলো, আমরা কাজ করি, আপনারা কাটেন।" কথাটা বাতাসে মিশে গেছে। কিন্তু কথা বলার আগে সে ছিল চুপ। এখন সে চুপ না। পার্থক্যটা এটুকুই।

বাস গাজীপুরে ঢুকল। রাস্তা সরু হলো। দুপাশে দোকান, ফ্যাক্টরির গেট, মানুষের ভিড়। রহিমা সোজা হয়ে বসে আছে। পিঠ সোজা। চোখ সামনে।

বাসের সামনের সিটে একজন মহিলা বসে আছে, কোলে একটা বাচ্চা ঘুমাচ্ছে। বাচ্চার মুখে একটু হাসি আছে, ঘুমের মধ্যে। কী স্বপ্ন দেখছে কে জানে। হয়তো আইসক্রিম।