মিতুর দ্বিধা

পর্ব ৪৮ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

বোতামটা ছোট। সাদা প্লাস্টিকের। চারটা ফুটো। কিনারায় একটু হলুদ হয়ে গেছে, পুরনো হয়ে। মিতুর পেন্সিল হোল্ডারে দাঁড়িয়ে আছে, কলমগুলোর মাঝে, যেন ওটাও একটা কলম।

বোতামটা কবে এখানে এসেছে মিতু জানে না। একদিন দেখল আছে। সরায়নি। সরানোর কথাও মনে হয়নি। পেন্সিল হোল্ডারটা ডেস্কের ডান কোণে, মনিটরের পাশে। মিতু প্রতিদিন এটা দেখে। দেখে, কিন্তু খেয়াল করে না। জিনিসটা সেখানে আছে, এটুকুই।

আজ সকালে মিতু অফিসে এসে ল্যাপটপ খুলল। কফি আনল। কফির কাপটা রাখল ডেস্কে। ঠোঁটে এক চুমুক নিল। তিতা। চিনি দেয়নি। মিতু চিনি দেয় না, তানিয়ার প্রভাব। তানিয়া বলত, "কফিতে চিনি দিলে কফি পাওয়া যায় না।" মিতু একমত না, কিন্তু অভ্যাস হয়ে গেছে।

স্ক্রিনে একটা ডকুমেন্ট খোলা। প্রোডাক্ট স্পেক। নতুন ফিচারের। বাংলায় কাস্টমার সার্ভিস অটোমেশন। মিতু পড়ছে। পড়ে পড়ে কফি খাচ্ছে।

ফিচারটা এরকম: কাস্টমারের প্রশ্ন আসবে বাংলায়, চ্যাটে বা ফোনে। মেশিন বুঝবে। মেশিন উত্তর দেবে। বাংলায়। মানুষের মতো। কাস্টমার বুঝতে পারবে না সে মেশিনের সাথে কথা বলছে। এতটাই ভালো হতে হবে।

মিতু লিড ডেভেলপার। এই ফিচারটা সে বানাবে। তার টিমে আরো দুইজন। তিনজনে মিলে তিন মাসে শেষ করতে হবে।

স্পেকটা পড়তে পড়তে মিতু একটা লাইনে থামল। "ফেজ ২ এ বিদ্যমান কল সেন্টার কর্মীদের ধীরে ধীরে হ্রাস করা হবে।"

হ্রাস। শব্দটা নরম। হ্রাস মানে কমানো। কমানো মানে কাউকে বলা "আপনাকে আর দরকার নেই।" মিতু শব্দটা চেনে। আম্মার ফ্যাক্টরিতে "হ্রাস" হয়েছিল। মেশিন এসেছিল। মানুষ হ্রাস হয়েছিল।

মিতু স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল। পেন্সিল হোল্ডারের দিকে তাকাল। বোতামটা আছে। সাদা। চারটা ফুটো। আম্মার ফ্যাক্টরির ইউনিফর্মের বোতাম ছিল এরকম। সাদা, প্লাস্টিকের, চারটা ফুটো। একই রকম। হয়তো একই বোতাম।

মিতু ভাবল, এটা কি আম্মার ইউনিফর্মের? কবে এখানে এলো? কীভাবে? সে মনে করতে পারল না। হয়তো আম্মা একদিন এসেছিল অফিসে, পকেট থেকে পড়ে গেছে। হয়তো মিতু নিজেই নিয়ে এসেছিল, জানে না কেন। হয়তো কোনো কারণ নেই। জিনিস কখনো কখনো এমনি এমনি জায়গা বদলায়।

দুপুরের পর মিতু তানিয়ার কাছে গেল।

তানিয়ার ঘরটা অফিসের শেষ মাথায়। ছোট ঘর। একটা ডেস্ক, দুটো চেয়ার, দেয়ালে একটা হোয়াইটবোর্ড। হোয়াইটবোর্ডে কিছু বাক্স আঁকা, তীরচিহ্ন দিয়ে জোড়া। প্রোডাক্ট রোডম্যাপ। মিতু বোঝে, কিন্তু আজ পড়ছে না।

তানিয়া চেয়ারে বসে ল্যাপটপে কিছু লিখছিল। মিতুকে দেখে থামল।

"বস।"

"বস বলিস না।"

"আপু।"

তানিয়া হাসল। "বল।"

মিতু চেয়ারে বসল। একটু চুপ। তারপর বলল, "আপু, এই ফিচারটা বানালে কি ঠিক হবে?"

তানিয়া ল্যাপটপের ঢাকনা অর্ধেক বন্ধ করল। মিতুর দিকে তাকাল।

"কোন ফিচার? কাস্টমার সার্ভিস?"

"হ্যাঁ।"

"কী সমস্যা?"

মিতু একটু সময় নিল। কীভাবে বলবে ভাবছে। তারপর সোজা বলল।

"এটা বানালে কল সেন্টারের মেয়েদের চাকরি যাবে। স্পেকে লেখা আছে, ফেজ ২ এ কর্মী হ্রাস।"

তানিয়া চুপ করে রইল। তানিয়া চুপ থাকলে মানে ভাবছে। মিতু তিন বছর ধরে তানিয়ার সাথে কাজ করে, চেনে।

"কল সেন্টারে কতজন আছে?" তানিয়া জিজ্ঞেস করল।

"ক্লায়েন্টের? জানি না ঠিক। বত্রিশজন হবে। বেশিরভাগ মেয়ে।"

তানিয়া মাথা নাড়ল। চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাছে গেল। বাইরে তাকাল। বাইরে বানানীর রাস্তা, গাড়ি যাচ্ছে।

"তুই যদি না বানাস, অন্য কেউ বানাবে," তানিয়া বলল। জানালার দিকে তাকিয়ে।

"জানি।"

"তাহলে?"

"তাহলেও।" মিতু বলল। "অন্য কেউ বানালে আমার কিছু করার নেই। আমি বানালে, আমার হাতে হবে।"

তানিয়া ঘুরে তাকাল। মিতুর চোখের দিকে। মিতুর চোখ রহিমার মতো। একই একগুঁয়ে চোখ। তানিয়া এটা আগেও দেখেছে।

তানিয়া চেয়ারে ফিরে এসে বসল। হাত টেবিলে রাখল।

"তোর আম্মু কী বলবে?"

মিতু একটু থামল। মাথায় আম্মুর মুখ ভেসে উঠল। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে হাতা, ভাতের হাঁড়িতে নাড়ছে। মিতু জিজ্ঞেস করছে, "আম্মু, এটা বানালে কি ঠিক হবে?" আম্মু হাতা নামাবে না। হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারপর বলবে, "টাকা আসলে বানাও।"

আম্মু এটাই বলবে। কারণ আম্মু জানে টাকা না আসলে কী হয়। আম্মু জানে চাকরি না থাকলে কেমন লাগে। আম্মু জানে রাতে ছাদের দিকে তাকিয়ে হিসেব করা কেমন, কত মাস চলবে, কত মাস।

"আম্মু বলবে বানাও," মিতু বলল।

তানিয়া কিছু বলল না।

"কিন্তু আম্মু বলবে নিজের জন্য। নিজের সংসারের জন্য।" মিতু থামল। "কল সেন্টারের মেয়েটার সংসারের কথা আম্মু ভাববে না। ভাবার সময় নেই আম্মুর।"

তানিয়া হাত জড়ো করল। "তুই ভাবছিস।"

"হ্যাঁ।"

"তারপর?"

"জানি না।"

মিতু ডেস্কে ফিরে এলো।

স্ক্রিনে কোড এডিটর খোলা। ফাঁকা ফাইল। মিতু লিখতে শুরু করল। প্রথম লাইন, দ্বিতীয় লাইন। ফাংশন ডিফাইন করল। ভেরিয়েবল রাখল। লুপ লিখল। মিতু কোড লেখে যেভাবে আম্মু বোতাম গোনে। একটার পর একটা। নিখুঁত। ভুল হলে ধরে ফেলে। চোখ আছে।

তিনদিন কাজ করল।

ফিচারের মূল অংশটা দাঁড়িয়ে গেল। বাংলায় প্রশ্ন ঢোকে, বাংলায় উত্তর বের হয়। ঢাকাইয়া বাংলাও বোঝে। চট্টগ্রামের টানও কিছুটা ধরে। ভালো কাজ করছে। টেস্টে পাস করছে।

চতুর্থ দিনে মিতু একটা জিনিস যোগ করল।

কেউ বলেনি করতে। স্পেকে নেই। রোডম্যাপে নেই। মিতু নিজে থেকে করল।

একটা বোতাম। চ্যাটের নিচে। ছোট। "মানুষের সাথে কথা বলুন।" কাস্টমার চাইলে এই বোতাম টিপবে, মেশিন চলে যাবে, মানুষ আসবে। কল সেন্টারের কেউ।

কোডটা সহজ। কয়েক লাইন। একটা কন্ডিশন চেক, একটা রাউটিং ফাংশন। বড় কিছু না। কিন্তু এই কয়েক লাইন থাকলে মেশিন পুরোপুরি মানুষকে সরাতে পারবে না। কেউ চাইলে মানুষের কাছে যেতে পারবে। মানুষ থাকবে। কম থাকবে, কিন্তু থাকবে।

পরের দিন কোড রিভিউতে রাকিব দেখল।

"এই ফাংশনটা কী? human_handoff()? স্পেকে তো নেই।"

"রেখে দে," মিতু বলল।

"কেন?"

মিতু স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কোডের দিকে। তারপর বলল, "ভালো লাগলো।"

রাকিব একটু অবাক হলো। "ভালো লাগলো?" কোড রিভিউতে এমন উত্তর দেয় না কেউ। রিজন থাকে, জাস্টিফিকেশন থাকে, পারফরম্যান্স ইমপ্যাক্ট বলে, ইউজার এক্সপেরিয়েন্স বলে। "ভালো লাগলো" বলে না।

রাকিব আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। অ্যাপ্রুভ করল।

পিএম দেখল আরো দুই দিন পরে। শুক্রবার। ডেমোর আগে।

"মিতু, এই human_handoff ফাংশনটা কেন?"

মিতু বলল, "ইউজার চাইলে মানুষের কাছে যেতে পারবে।"

"কিন্তু পুরো পয়েন্টটাই তো হলো মানুষ না লাগানো।"

"পুরো পয়েন্ট হলো কাস্টমারের সমস্যা সমাধান। কিছু সমস্যা মেশিন বুঝবে না। কিছু কাস্টমার মেশিনের সাথে কথা বলতে চাইবে না।"

পিএম ভাবল। মিতু দেখল পিএম ভাবছে। পিএমের নাম ফারুক। ফারুক ভালো মানুষ, কিন্তু ফারুকের ওপরেও মানুষ আছে। ফারুকের ওপরের মানুষটা চায় কম খরচ, বেশি মুনাফা। সবার ওপরের মানুষটা একই জিনিস চায়।

"রাখো আপাতত," ফারুক বলল। "ডেমোতে দেখাব। ক্লায়েন্ট কী বলে।"

"ঠিক আছে।"

ফারুক চলে গেল। মিতু জানে ক্লায়েন্ট কী বলবে। ক্লায়েন্ট বলবে "এটা কেন? আমরা তো চাই পুরোটা অটোমেটেড হোক।" তারপর ফারুক ফিরে আসবে, বলবে "সরাও।" মিতু সরাবে? হয়তো। হয়তো না। সেটা সেদিনের কথা।

আজ কোডটা আছে। আজ একটা বোতাম আছে চ্যাটের নিচে। "মানুষের সাথে কথা বলুন।" ছোট বোতাম। কেউ টিপলে একজন মানুষ আসবে, হেডসেট পরা, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মানুষ।

মিতু ল্যাপটপ বন্ধ করল। ব্যাগ গোছাল।

পেন্সিল হোল্ডারের দিকে তাকাল। বোতামটা আছে। সাদা। চারটা ফুটো। কলমগুলোর মাঝে। মিতু এটা এখানে রাখেনি। মনে নেই কে রেখেছে, কবে রেখেছে। কিন্তু বোতামটা আছে। থাকবে।

বাসায় ফিরে মিতু জানালার ধারে বসল।

ছোট ফ্ল্যাট। একটা ঘর, একটা রান্নাঘর, একটা বাথরুম। বানানীতে। ভাড়া বেশি, কিন্তু অফিসের কাছে। মিতু একা থাকে। প্রতি শুক্রবার গাজীপুরে যায়, আম্মু-বাবার কাছে।

আজ শুক্রবার না। আজ মঙ্গলবার। মিতু যাবে না আজ।

ফোন তুলল। আম্মুকে কল করবে? না। আম্মুকে কী বলবে? "আম্মু, আমি এমন একটা জিনিস বানাচ্ছি যেটা অন্য কারো আম্মুর চাকরি খাবে"? না। এটা বলা যায় না। এভাবে বলা যায় না।

ফোন রেখে দিল।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। সন্ধ্যা হচ্ছে। বানানীর রাস্তায় আলো জ্বলছে। একটা চায়ের দোকানে দুইজন বসে আছে। একজন ফোনে কথা বলছে, হাত নাড়ছে।

মিতু ভাবল, কল সেন্টারের মেয়েগুলো কেমন হবে। বয়স কত? বিশ? বাইশ? মিতুর বয়সী? তাদের আম্মুও কি ফ্যাক্টরিতে কাজ করত? তাদের আম্মুও কি বলত "টাকা আসলে বানাও"?

হয়তো। হয়তো না। মিতু জানে না। জানার উপায় নেই। কল সেন্টারের মেয়েদের মুখ সে দেখেনি। তারা একটা সংখ্যা। বত্রিশ। স্পেকে একটা শব্দ। "হ্রাস।"

মিতু উঠে রান্নাঘরে গেল। ভাত বসাবে। চাল বের করল। একটু থেকে মুঠো মুঠো মাপল। এক মুঠো। দুই মুঠো। একজনের দুই মুঠো। আম্মু পাঁচজনের চার মুঠো দিত, আর এক মুঠো বাড়তি বাবার জন্য। মিতু একজনের দুই মুঠো দেয়। সংখ্যাগুলো ছোট হয়ে গেছে।

চাল ধুতে ধুতে মিতু ভাবল human_handoff ফাংশনটার কথা। ক্লায়েন্ট সরাতে বললে সে কী করবে? রাখবে? নাকি সরাবে?

এই মুহূর্তে জানে না। সেদিন জানবে।

পানি ফেলে দিল। নতুন পানি দিল। চুলায় বসাল।

জানালা দিয়ে একটুকরো আকাশ দেখা যায়। আকাশে একটা তারা। একটাই। বাকিগুলো ঢাকার আলোয় হারিয়ে গেছে। একটা রয়ে গেছে। জেদি। নিভবে না।