মাঝরাতের বিতর্ক
১
চায়ের দোকানের টিভিতে সংসদ।
রহিমা বসে আছে বেঞ্চের এক কোণায়। পাশে একটা ব্যাগ, ভেতরে দুটো ডেলিভারি বাকি আছে। একটা গুলশানে, একটা বনানীতে। কিন্তু এখন বিরতি। পনেরো মিনিটের বিরতি। অ্যাপে "ব্রেক" চাপলে পনেরো মিনিট সময় দেয়। তারপর আবার অর্ডার আসবে। পনেরো মিনিটে চা খাওয়া যায়। বসা যায়। শরীরটা একটু বিশ্রাম পায়।
টিভিতে সংসদ সদস্যরা কথা বলছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আইন। রহিমা শব্দটা চেনে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটাই তার চাকরি খেয়েছে। এটাই তাকে ফ্যাক্টরি থেকে রাস্তায় নামিয়েছে। এখন সে ডেলিভারি দেয়। মোটরসাইকেল নেই, তাই সাইকেলে। সাইকেলে কম অর্ডার পায়। কম টাকা। কিন্তু কিছু তো কিছু।
টিভির রিসেপশন খারাপ। ছবি আসছে, কিন্তু ঝিরঝির করছে। সংসদ সদস্যদের মুখ ঝাপসা। গলা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু মাঝে মাঝে ভেঙে যাচ্ছে। একজন বলছেন, "... প্রযুক্তির উন্নয়ন... দক্ষতা... বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা..." আরেকজন বলছেন, "... নিয়ন্ত্রণ... কাঠামো... নৈতিকতা..."
রহিমা চা খাচ্ছে। চা গরম। ভালো চা। এই দোকানের চা ভালো হয়। আদা দেয়। রহিমা আদা-চা পছন্দ করে।
টিভিতে একজন এমপি দাঁড়ালেন। পাতলা মানুষ। চশমা পরা। কাগজ হাতে। কাগজ থেকে পড়ছেন। "এই বিলটি বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য একটি মাইলফলক। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করব। প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পুনর্বাসন তহবিল গঠন করা হবে।"
রহিমা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।
ক্ষতিগ্রস্ত। সে কি ক্ষতিগ্রস্ত? হ্যাঁ, সে ক্ষতিগ্রস্ত। পুনর্বাসন তহবিল। তাকে কি কেউ জিজ্ঞেস করেছে সে কী চায়? কেউ জিজ্ঞেস করেনি। কেউ আসেনি। কেউ তার নাম জানে না।
চায়ের দোকানে আরো তিনজন বসে আছে। একজন রিকশাওয়ালা, একজন দোকানের কর্মচারী, আর একজন বুড়ো মানুষ, সারাদিন এখানে বসে থাকেন, কেউ জানে না তিনি কী করেন। তিনজনই টিভি দেখছেন। কেউ কিছু বলছেন না।
টিভিতে আরেকজন এমপি উঠলেন। মোটা মানুষ। জোরে কথা বলেন। "বিরোধী দল বলছে এই বিলে শ্রমিকদের কথা নেই। আমি বলছি, শ্রমিকদের কথা আছে। ধারা বারো দেখুন। ধারা পনেরো দেখুন।"
ঝিরঝির। ছবি ভেঙে গেল। আবার এলো। এমপিরা স্ট্যাটিকের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছেন। ভূতের মতো। অস্পষ্ট। ঝাপসা। রহিমা ভাবল, ওরা কি জানে আমরা কে? ওরা কি জানে যাদের জন্য আইন বানাচ্ছে, তারা এই মুহূর্তে কোথায়? কী করছে?
অ্যাপে নোটিফিকেশন এলো। নতুন অর্ডার। গুলশান। রহিমা চায়ের কাপ শেষ করল। উঠল। ব্যাগ কাঁধে তুলল। সাইকেলের কাছে গেল।
টিভিতে সংসদ চলছে। রহিমা চলে গেল। টিভি তার জন্য অপেক্ষা করবে না। সংসদও না।
২
রেডিওতে সংসদ।
করিম শুনছে। ঘরে বসে। গাজীপুরের ছোট ভাড়া ঘর। রাতের শিফটের আগে কয়েক ঘণ্টা সময়। করিম রেডিও শোনে। টিভি নেই। ফোন আছে, কিন্তু ফোনে ডাটা কেনার সামর্থ্য নেই। মাসে একশো টাকার প্যাকেজ নেয়, সেটা হালিমার সাথে কথা বলার জন্য। বাকি সময় ফোন চুপ। রেডিও ব্যাটারিতে চলে। পুরনো রেডিও। রংপুর থেকে আনা। এটা করিমের বাবার ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর করিম রেখে দিয়েছে। রেডিওর একটা কোণা ভাঙা, সেখানে সেলোটেপ লাগানো।
সংসদে কেউ একজন বলছেন, "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রযুক্তিকে ভয় পাব না। প্রযুক্তিকে কাজে লাগাব।"
করিম শুনল। "আইন। আরেকটা আইন।"
ঘরে আর কেউ নেই। করিম নিজের সাথে কথা বলে মাঝে মাঝে। অভ্যাস হয়ে গেছে। একা থাকলে মানুষ নিজের সাথে কথা বলে। এতে লজ্জার কিছু নেই।
রেডিওতে আরেকজন বলছেন, "আমাদের কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াতে হবে। ফসলের উৎপাদন বাড়বে। কৃষক লাভবান হবে।"
করিম রেডিও বন্ধ করল।
কৃষক লাভবান হবে। কোন কৃষক? করিম কৃষক ছিল। করিম লাভবান হয়নি। করিমের জমি গেছে। কোল্ড স্টোরেজ হচ্ছে। ড্রোন এসেছে। অ্যাপ এসেছে। ফোনে কেউ একজন ধানের দাম বলে, করিমের ধানের দাম কমে যায়। এটা কৃষকের লাভ?
করিম চেয়ার থেকে উঠল। জানালা খুলল। বাইরে সন্ধ্যা নামছে। গাজীপুরের আকাশ কমলা আর ধূসর। কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া। দূরে আজানের শব্দ।
আইন। আরেকটা আইন। করিম আইন বোঝে না। আইন কাগজে থাকে। কাগজ আলমারিতে থাকে। আলমারি অফিসে থাকে। অফিস ঢাকায়। ঢাকা অনেক দূরে। ঢাকা আর রংপুরের মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা রাস্তার দূরত্ব না। সেটা অন্য দূরত্ব। সেটা কম হয় না, বাড়ে।
করিম জানালা বন্ধ করল। রাতের শিফটের জন্য তৈরি হতে হবে।
৩
তানিয়ার ফোনে সংসদ।
বনানীর ফ্ল্যাটে বসে দেখছে। ল্যাপটপ খোলা, পাশে ফোন, ফোনে লাইভ স্ট্রিম। তানিয়া একসাথে দুটো কাজ করছে। ল্যাপটপে ক্লায়েন্টের ইমেইলের উত্তর লিখছে, ফোনে সংসদ দেখছে। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। দুটোই তার জীবনের সাথে সম্পর্কিত।
একজন এমপি বলছেন, "এই বিলে ডেটা সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ডেটা সুরক্ষা কী, সেটা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। ধারা আটে বলা হয়েছে 'যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।' যথাযথ মানে কী? কে নির্ধারণ করবে কোনটা যথাযথ?"
তানিয়া মাথা নাড়ল। এই এমপি ঠিক বলছেন। বিলের ভাষা অস্পষ্ট। তানিয়া বিলটা পড়েছে। অনলাইনে পাওয়া যায়। তেইশ পৃষ্ঠা। তানিয়া প্রতিটা পৃষ্ঠা পড়েছে। কিছু ভালো আছে। কিছু অর্থহীন। কিছু বিপজ্জনক। ধারা চৌদ্দতে বলা হয়েছে "সরকার প্রয়োজনে যেকোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সিস্টেম নিষিদ্ধ করিতে পারিবে।" যেকোনো। সরকার চাইলে তানিয়ার এনএলপি মডেলটাও নিষিদ্ধ করতে পারে। কোনো কারণ দেখাতে হবে না। "প্রয়োজনে।"
তানিয়া এই বিল নিয়ে একটা বিশ্লেষণ লিখতে পারে। একটা ভালো, বিস্তারিত, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ। কোথায় দুর্বলতা, কোথায় শক্তি, কী বাদ পড়েছে, কী যোগ করা উচিত। তানিয়া এটা পারে। তানিয়ার দক্ষতা আছে, জ্ঞান আছে, অভিজ্ঞতা আছে।
কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করবে না।
সংসদে যারা কথা বলছেন, তারা কি জানেন বাংলাদেশে কয়টা এআই স্টার্টআপ আছে? তারা কি জানেন একটা এনএলপি মডেল ট্রেন করতে কত সময় লাগে? তারা কি জানেন ডেটা লেবেলিং কী? তারা কি জানেন বায়াস কী? তারা কি জানেন একটা অ্যালগরিদম কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়?
তারা জানেন না। তারা "যথাযথ ব্যবস্থা" লেখেন।
তানিয়া ল্যাপটপের দিকে ফিরল। ক্লায়েন্টের ইমেইল। "তোমাদের চ্যাটবটটা মাঝে মাঝে ভুল উত্তর দেয়। ঠিক করো।" তানিয়া উত্তর লিখল। ভদ্র, পেশাদার, ধৈর্যশীল উত্তর। ভেতরে একটা ক্লান্তি আছে, সেটা উত্তরে নেই।
ফোনে সংসদ চলছে। তানিয়া মাঝে মাঝে দেখছে। একজন এমপি এখন ঘুমাচ্ছেন। ক্যামেরা তার ওপর পড়েনি, কিন্তু তানিয়া দেখতে পাচ্ছে পেছনের সারিতে একজনের মাথা ঝুঁকে আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। একজন ঘুমাচ্ছেন।
তানিয়া ফোন বন্ধ করল। ল্যাপটপে মনোযোগ দিল। কাজ আছে। কাজ সবসময় আছে। বিল পাস হবে। তানিয়াকে জিজ্ঞেস করা হবে না। তানিয়া কাজ করবে। এভাবেই চলবে।
৪
টিভিতে সংসদ। জাহিদ আর রশিদা দেখছে।
নেত্রকোনার ঘরে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেছে। রাত নয়টা। জাহিদ আর রশিদা পাশাপাশি বসে আছে। টিভি ছোট। চৌদ্দ ইঞ্চি। পুরনো মডেল। জাহিদ দোহা থেকে ফেরার সময় কিনেছিল, বিমানবন্দরে ডিউটি ফ্রি থেকে না, ফেরার পরে মিরপুরের একটা দোকান থেকে, সেকেন্ড হ্যান্ড।
সংসদে এখন বিতর্ক চলছে। সরকারি দল বলছে বিলটা ভালো। বিরোধী দল বলছে বিলটায় ফাঁক আছে। দুই পক্ষই জোরে কথা বলছেন। স্পিকার বলছেন, "শান্তি বজায় রাখুন।" কেউ শুনছে না।
জাহিদ চুপচাপ দেখছে। রশিদাও চুপচাপ। সংসদের পুরো সময়টায় কেউ কিছু বলল না। দুজনেই দেখল। শুনল। চুপ করে থাকল।
সংসদ শেষ হলো না, কিন্তু সংবাদ সম্মেলন শুরু হলো আরেক চ্যানেলে। জাহিদ চ্যানেল বদলাল না। সংসদের শেষ দেখতে চায়।
একজন এমপি বলছেন, "আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এই বিলে বিশেষ ধারা রাখা হয়েছে। প্রবাসে যেসব কাজ অটোমেশনের কারণে কমে যাচ্ছে, সেসব ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বিকল্প প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।"
জাহিদ নড়ল। একটু সোজা হয়ে বসল। বিকল্প প্রশিক্ষণ। জাহিদকে কি কেউ প্রশিক্ষণ দিয়েছিল? দোহায় যখন কোম্পানি বলেছিল কন্ট্রাক্ট রিনিউ হবে না, তখন কি কেউ বলেছিল "আপনাকে নতুন কিছু শেখাব"? কেউ বলেনি। একটা ইমেইল এসেছিল। একটা লাইন। "কন্ট্রাক্ট রিনিউ হবে না।" তারপর বিমানের টিকিট। তারপর বাংলাদেশ। তারপর নেত্রকোনা। তারপর এই ঘর। তারপর রাত তিনটায় ঘুম না আসা।
সংসদ শেষ হলো। জাহিদ টিভি বন্ধ করল।
রশিদা বলল, "ওরা কি জানে বাইরে কী হচ্ছে?"
জাহিদ তাকাল। "কী বললে?"
"ওরা, সংসদের ভেতরে যারা, ওরা কি জানে বাইরে কী হচ্ছে? মানুষ কীভাবে আছে? কী হয়ে গেছে?"
জাহিদ কিছু বলল না।
রশিদা উঠে গেল। রান্নাঘরে। পানি আনতে। জাহিদ বসে রইল। টিভির স্ক্রিন কালো। স্ক্রিনে জাহিদের মুখ ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। প্রতিবিম্ব।
জাহিদ ভাবল, রশিদা ঠিক বলেছে। ওরা জানে না। জানার কথাও না। ওরা সংসদে বসে আইন বানায়। আইনে "প্রবাসী শ্রমিক" লেখে। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিক মানে কে? মানে জাহিদ? জাহিদের নাম লেখা নেই। জাহিদের গল্প লেখা নেই। লেখা আছে "ধারা", "উপধারা", "তফসিল।"
রশিদা পানি নিয়ে ফিরল। একটা গ্লাস জাহিদের হাতে দিল। জাহিদ পানি খেল। ঠান্ডা পানি। টিউবওয়েলের পানি। দোহায় পানি কিনতে হতো। বোতলের পানি। এখানে টিউবওয়েলে পাম্প করলেই পানি। এটা ভালো। এটুকু ভালো।
জাহিদ উঠল। বিছানায় যেতে হবে। ঘুম আসবে না, কিন্তু শুতে হবে। শরীরকে বিশ্রাম দিতে হবে। রাত তিনটায় শরীর আবার জেগে উঠবে। সেটা জানা আছে। কিন্তু ততক্ষণ শুয়ে থাকা যায়।
৫
সেলিনা দেখেনি।
সংসদ সেলিনা দেখেনি। টিভি নেই। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। চরে বিদ্যুৎ আছে আজ, কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই। নেটওয়ার্ক আসে, যায়, আসে, যায়। কখন আসবে কেউ জানে না। টাওয়ার দূরে। নদীর ওপারে। নদী পেরিয়ে সিগন্যাল আসতে আসতে দুর্বল হয়ে যায়।
সেলিনা জানল দুইদিন পর।
একজন মাঝি, নাম আজিজ, ওপার থেকে এসেছিল। সেলিনার কাছে এসেছিল পায়ের ক্ষত দেখাতে। ক্ষতটা পুরনো, সারছে না। সেলিনা ড্রেসিং করতে করতে জিজ্ঞেস করল, "ওপারে কী খবর?"
আজিজ বলল, "সংসদে নাকি নতুন আইন পাস হইছে। কম্পিউটারের আইন। টিভিতে দেখাইছে।"
"কী আইন?"
"ঠিক বুঝি নাই। কম্পিউটার যে নিজে নিজে চিন্তা করে, সেটার আইন। ভালো কইরা ব্যবহার করতে হবে, এইরকম কিছু একটা।"
সেলিনা ড্রেসিং শেষ করল। আজিজকে বলল দুইদিন পর আবার আসতে। আজিজ নৌকায় উঠে চলে গেল। নৌকার বৈঠার শব্দ। পানি কেটে যাওয়ার শব্দ। ধীরে ধীরে শব্দ কমে গেল।
সেলিনা বারান্দায় বসল। সামনে নদী। নদী আজ শান্ত। ঢেউ নেই। পানি ধূসর। আকাশও ধূসর। কোথায় পানি শেষ, কোথায় আকাশ শুরু, বোঝা যাচ্ছে না।
সেলিনা নোটবুক বের করল। ছোট নোটবুক। নীল মলাট। এটায় সে লেখে। রোগীর নোট লেখে। মাঝে মাঝে নিজের কথাও লেখে। কেউ পড়ে না। পড়ার কেউ নেই। চরে সেলিনা একা স্বাস্থ্যকর্মী।
সেলিনা লিখল:
"দেশ একটা আইন বানিয়েছে। আমরা এখনো নৌকায়।"
কলমটা নামিয়ে রাখল। নোটবুক বন্ধ করল।
সেলিনা ভাবল, আইনটা কী বলেছে সে জানে না। পড়েনি। পড়ার সুযোগ হয়নি। যখন সুযোগ হবে, তখন হয়তো আরেকটা আইন আসবে। আগেরটা পুরনো হয়ে যাবে। এভাবেই চলে। আইন আসে, আইন যায়, চরে কিছু বদলায় না।
ট্যাবলেটটা ভেতরে টেবিলে আছে। আজ চার্জ আছে। কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই। ট্যাবলেট ছাড়াও সেলিনা কাজ করে। হাত দিয়ে কপাল ছোঁয়, থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপে, ব্যান্ডেজ বাঁধে, ওষুধ দেয়। এগুলো যন্ত্র ছাড়াও হয়। কিন্তু রিপোর্ট? রিপোর্ট হয় না। রিপোর্ট না গেলে উপজেলা জানে না। উপজেলা না জানলে জেলা জানে না। জেলা না জানলে ঢাকা জানে না। ঢাকা না জানলে সেলিনা নেই। চর নেই। রোগী নেই। কেউ নেই।
আইন বানাচ্ছে যারা, তারা কি জানে এই চরের কথা? তারা কি জানে এখানে নেটওয়ার্ক আসে দুইদিনে একদিন? তারা কি জানে এখানে একজন মেয়ে একা বসে আছে, নোটবুকে লিখছে, কেউ পড়বে না জেনেও লিখছে?
জানে না। জানার কথাও না।
সন্ধ্যা নামছে। নদীর ওপর একটা বক উড়ে গেল। সাদা বক। ধূসর আকাশে সাদা দেখা যাচ্ছে। একটু। তারপর অন্ধকার গিলে নিল।
সেলিনা উঠল। ভেতরে গেল। হারিকেনটা জ্বালাল। বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু সেলিনা হারিকেন জ্বালায়। অভ্যাস। বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে যেকোনো সময়। হারিকেন যায় না। হারিকেনে তেল দিলেই হলো।
হারিকেনের আলো দুলছে। দেয়ালে ছায়া নড়ছে। সেলিনা বসল। নোটবুকটা আবার খুলল। আগের লেখাটা পড়ল।
"দেশ একটা আইন বানিয়েছে। আমরা এখনো নৌকায়।"
নিচে আরেকটা লাইন লিখল:
"যারা আইন বানায়, তারা কোনোদিন নৌকায় ওঠেনি।"
নোটবুক বন্ধ করল। হারিকেনের কাচে একটা পোকা এসে বসল। পোকাটা আলোর দিকে তাকাচ্ছে। আলো ছাড়া আর কিছু দেখছে না। পোকার জন্য পুরো পৃথিবী ওই আলো।
সেলিনা হারিকেনটা একটু সরিয়ে রাখল। পোকাটা উড়ে গেল।
বাইরে নদী বইছে। চর ভাঙছে না আজ। কাল হয়তো ভাঙবে। পরশু হয়তো ভাঙবে না। চর ভাঙে, চর জাগে, এটা নদীর নিয়ম। আইন দিয়ে নদী চলে না। নদী নিজের নিয়মে চলে।
সেলিনার ঘরে হারিকেনের আলো জ্বলছে। নদীর ওপারে টাওয়ারে একটা লাল বাতি জ্বলছে। দুটো আলোর মাঝখানে অনেক অন্ধকার। অনেক পানি। অনেক দূরত্ব।