রহিমার নতুন কাজ

পর্ব ৫১ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

গাজীপুরের রাস্তায় বিকেলের আলো যখন কমলা হয়ে আসে, তখন রহিমা তার সাইকেলটা একটু থামায়। পেছনের ক্যারিয়ারে বাঁধা ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে এক চুমুক খায়। ফোনটা দেখে। তিনটা নতুন অর্ডার। একটা মিরপুর থেকে, দুইটা টঙ্গী সাইড। মিরপুরেরটা আগে নেবে, কারণ ওই রেস্তোরাঁর মালিক খাবার তাড়াতাড়ি দেয়। টঙ্গীর দুইটা একসাথে পিক করবে, কারণ দুই দোকান পাশাপাশি।

এই হিসাবটা কেউ রহিমাকে শেখায়নি। নিজে শিখেছে। চার বছর ধরে এই কাজ করছে।

রহিমার বয়স চুয়াল্লিশ। গার্মেন্টসে আঠারো বছর কাটিয়েছে। তারপর মেশিন এসেছে, চাকরি গেছে, গিগ অ্যাপে নাম লিখিয়েছে। প্রথম ছয় মাস কিছুই বুঝত না। অ্যাপের ম্যাপ দেখে রাস্তা চিনত না। রেটিং পড়ে যেত। কাস্টমার কমপ্লেইন করত। একদিন এক কাস্টমার বলেছিল, খাবারের বক্স উল্টে গেছে। রহিমা জানত বক্স উল্টায়নি, কিন্তু কী বলবে? অ্যাপে কমপ্লেইন করার জায়গা আছে, কিন্তু সেটা ইংরেজিতে। রহিমা ইংরেজি পড়তে পারে না।

সেই রাতে রহিমা কেঁদেছিল। তারপর কান্না মুছে অ্যাপটা খুলে বসেছিল। প্রতিটা বাটন টিপে দেখেছিল কোনটা কী করে। মনে মনে চিহ্ন দিয়ে রেখেছিল। সবুজ বাটন মানে অ্যাকসেপ্ট। লাল মানে ক্যান্সেল। তারা মানে রেটিং। ক্যামেরার ছবি মানে প্রমাণ আপলোড।

এখন চার বছর পর, রহিমা অ্যাপটা এমনভাবে চালায় যেন সেটা তার শরীরের একটা অংশ। কোন সময় কোন এলাকায় অর্ডার বেশি আসে, সেটা সে অ্যাপ দেখার আগেই জানে। শুক্রবার দুপুরে ধানমন্ডি। রবিবার সন্ধ্যায় গুলশান। বৃষ্টির দিনে সব জায়গায়।

একদিন রহিমা একটা ছেলেকে দেখল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফোন ঘুরাচ্ছে। নতুন রাইডার, বোঝা যাচ্ছে। মুখে ভয়, চোখে বিভ্রান্তি। রহিমা সাইকেল থামাল।

"কী হইছে?"

ছেলেটা বলল, "আপা, অর্ডার অ্যাকসেপ্ট করছি কিন্তু ম্যাপে রেস্তোরাঁ খুঁজে পাচ্ছি না।"

রহিমা তার ফোনটা নিল। দুই সেকেন্ডে দেখল সমস্যাটা কী। ছেলেটা ম্যাপের নীল বিন্দু ফলো করছে, কিন্তু নীল বিন্দু তার নিজের লোকেশন, রেস্তোরাঁর লোকেশন না। রহিমা লাল পিনটা দেখিয়ে দিল। ছেলেটা বলল, "আপা, আপনি তো সব জানেন।"

রহিমা হাসল। "জানি না। শিখছি।"

সেই ছেলেটা পরের দিন আরেকটা ছেলেকে নিয়ে এলো। তার পরের দিন আরো দুইজন। তারা সবাই রহিমাকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল। কীভাবে রেটিং বাড়ানো যায়। কীভাবে বৃষ্টির দিনে টাকা বেশি কামানো যায়। কোন রেস্তোরাঁয় গেলে অপেক্ষা কম করতে হয়।

রহিমা উত্তর দিত। কখনো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, কখনো চায়ের দোকানে বসে। একদিন একজন বলল, "আপা, একটা গ্রুপ করেন না, সবাই মিলে কথা বলতে পারব।"

রহিমা বলল, "গ্রুপ মানে?"

"হোয়াটসঅ্যাপে।"

রহিমা হোয়াটসঅ্যাপ চালাতে পারে। সেটাও শিখেছে, নিজে নিজে। গ্রুপ বানাল। নাম দিল "রাইডার ভাইবোন"। প্রথম সপ্তাহে সাতজন। দ্বিতীয় সপ্তাহে পনেরো। এক মাসের মধ্যে সাতচল্লিশ জন।

গ্রুপে রহিমা প্রতিদিন সকালে একটা মেসেজ দেয়। আজকে কোন এলাকায় ট্রাফিক বেশি, কোন রাস্তা বন্ধ, কোন রেস্তোরাঁ দেরি করছে। এগুলো সে নিজে ঘুরে ঘুরে জানে। কেউ কেউ তাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে, "আপা, আজকে কোনদিকে যাব?" রহিমা বলে, "উত্তরায় যাও, আজকে ওদিকে অর্ডার ভালো।"

সে ভুলও করে। একদিন বলেছিল বনানীতে অর্ডার ভালো হবে, কিন্তু হয়নি। গ্রুপে একজন লিখল, "আপা, বনানীতে বসে আছি এক ঘণ্টা, কিছু নাই।" রহিমা লিখল, "ভুল হইছে, সরি। মিরপুরে চলে যাও।" এটুকুই। কেউ রাগ করেনি।

একটা জিনিস রহিমা লক্ষ্য করল। রাইডাররা শুধু অ্যাপ নিয়ে জিজ্ঞেস করে না। তারা অন্য জিনিসও জিজ্ঞেস করে। সাইকেলের টায়ার কোথায় সস্তায় পাওয়া যায়। বৃষ্টির দিনে কোথায় আশ্রয় নেওয়া যায়। অসুস্থ হলে কোন ডাক্তারের কাছে যেতে হয় যে বেশি টাকা নেয় না।

রহিমা এসব জানে। আঠারো বছর গার্মেন্টসে কাজ করেছে, তার আগে গ্রামে ছিল, তারপর শহরে এসেছে। জীবনটা তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে যেগুলো কোনো অ্যাপে নেই।

একদিন গ্রুপের একজন মেসেজ দিল, "আপা, ফুডপয়েন্ট চেইনে গেলে বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। খাবার রেডি থাকে না। ততক্ষণে রেটিং কমে যায়।" আরো পাঁচজন একই কথা বলল।

রহিমা ভাবল। তারপর একদিন ফুডপয়েন্টের মিরপুর শাখায় গেল। ম্যানেজারের সাথে কথা বলল।

"আমরা আপনাদের থেকে প্রতিদিন চল্লিশ-পঞ্চাশটা অর্ডার পিক করি। কিন্তু খাবার রেডি থাকে না। আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমরা দাঁড়িয়ে থাকলে অন্য অর্ডার মিস করি। আমরা অর্ডার মিস করলে আপনাদেরও লস।"

ম্যানেজার একটু অবাক হলো। একজন ডেলিভারি রাইডার এভাবে কথা বলছে। কিন্তু রহিমার কথায় যুক্তি আছে।

"কী চান?" ম্যানেজার জিজ্ঞেস করল।

"অর্ডার আসার পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্যাকিং শুরু করবেন। আমরা আসার আগেই খাবার রেডি থাকবে। আমরা তাড়াতাড়ি ডেলিভারি দিতে পারলে কাস্টমার খুশি, আপনারাও খুশি।"

ম্যানেজার বলল, "দেখি কী করা যায়।"

দুই সপ্তাহ পরে ফুডপয়েন্ট মিরপুর শাখায় অপেক্ষার সময় কমল। অনেক কমল না, পাঁচ-সাত মিনিট কমল। কিন্তু কমল। গ্রুপে রহিমা লিখল, "ফুডপয়েন্ট মিরপুরে এখন একটু ভালো হইছে।" কেউ একজন রিপ্লাই দিল, "আপা জিন্দাবাদ।" রহিমা হাসল।

এই জিনিসটা রহিমাকে অবাক করল। সে কখনো ভাবেনি যে সে নেতৃত্ব দিতে পারে। গার্মেন্টসে সে ছিল একজন সুপারভাইজার, হ্যাঁ, কিন্তু সেটা ছিল ম্যানেজমেন্টের দেওয়া পদ। এটা কেউ দেয়নি। এটা নিজে থেকে হয়েছে। মানুষ তার কাছে আসে কারণ সে কাজের কথা বলে, ফালতু কথা বলে না।

"আমি আঠারো বছর মেশিনের সাথে কাজ করেছি," রহিমা একদিন গ্রুপে ভয়েস মেসেজে বলল। "এই অ্যাপও একটা মেশিন। মেশিনের ভাষা বুঝতে হয়। সে কী চায়, কখন চায়, কেন চায়। বুঝলে মেশিন তোমার বন্ধু। না বুঝলে শত্রু।"

কেউ একজন লিখল, "আপা, আপনি তো ফিলোসফার।"

রহিমা জানে না ফিলোসফার কী। জানার দরকারও মনে করে না।

রহিমার ঘরে একটা বিড়ালের বাচ্চা আছে। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছে মাস তিনেক আগে। ধূসর রঙ, একটা কান একটু ছেঁড়া। পাড়ার লোকে বলে এই বিড়ালটা পাশের বাড়ির যে বিড়ালটা ছিল তার বংশের। রহিমা বিড়ালটাকে ভাত খাওয়ায়, মাঝে মাঝে একটু মাছের কাঁটা দেয়। নাম রেখেছে "জিডিপি"। মিতু একদিন ফোনে এই শব্দটা বলেছিল। রহিমা জিজ্ঞেস করেছিল, "এইটা কী?" মিতু বুঝিয়েছিল, কিন্তু রহিমা তেমন কিছু বোঝেনি। শব্দটা মজা লেগেছিল। জিডিপি। মুখে বলতে ভালো লাগে। তাই বিড়ালের নাম রেখে দিল জিডিপি। জিডিপি সারাদিন ঘুমায়, সন্ধ্যায় জেগে ওঠে। রহিমার সাথে এই ব্যাপারে মিল আছে, রহিমাও সন্ধ্যার দিকে বেশি কাজ পায়।

সন্ধ্যা নামছে। গাজীপুরের আকাশে একটা কমলা রেখা। রহিমা সাইকেলের ওপর বসে আছে, একটা চায়ের দোকানের সামনে। শেষ ডেলিভারিটা দিয়ে এসেছে। ফোনটা হাতে। স্ক্রিনে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা। মেসেজ আসছে। একটার পর একটা।

"আপা, কাল গুলশানে কেমন হবে?"

"আপা, নতুন একজন আসতে চায় গ্রুপে, দেব?"

"আপা, আজকে পাঁচটা অর্ডার দিলাম, সব ফাইভ স্টার।"

ফোন ভাইব্রেট করছে। মেসেজ আসছে। রহিমা গোনে না কয়টা এলো। আগে সে সবকিছু গুনত। কয়টা অর্ডার, কত টাকা, কয়টা রেটিং। গার্মেন্টসে গুনত কয়টা পিস হলো, কত মিনিট বাকি, কত ওভারটাইম। সারাজীবন গুনে গুনে কাটিয়েছে।

আজকে গুনছে না। ফোনটা পকেটে রাখল। আকাশের দিকে তাকাল। কমলা রেখাটা আস্তে আস্তে বেগুনি হয়ে যাচ্ছে। চায়ের দোকানের রেডিওতে কে যেন একটা পুরোনো গান গাইছে। রহিমা গানটা চেনে না, কিন্তু সুরটা ভালো লাগছে।

সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে রহিমা বসে আছে। পকেটে ফোন ভাইব্রেট করছে। সে ধরছে না। তাড়া নেই। মেসেজ পরে দেখবে। এখন আকাশটা দেখুক।

চুয়াল্লিশ বছর বয়সে রহিমা প্রথমবার কিছু গুনছে না।