করিম শহরে

পর্ব ৫২ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

ঘরটা আট বাই দশ। করিম জানে কারণ সে মেপেছে। হাত দিয়ে মাপা, ফিতা দিয়ে না। একদিক থেকে অন্যদিকে চার পা। আরেকদিকে পাঁচ পা। করিমের পা বড়, তাই হয়তো আসলে আরেকটু বড় হবে ঘরটা। কিন্তু বড় হলেও কত বড়। একটা খাট, একটা চুলা রাখার জায়গা, আর দরজা। ব্যাস।

জানালা নেই।

এই কথাটা করিম প্রতিদিন মনে মনে বলে। জানালা নেই। রংপুরের ঘরে জানালা ছিল। ছোট জানালা, কাঠের পাল্লা, একটা পাল্লা ঠিকমতো বন্ধ হতো না। কিন্তু জানালা ছিল। সেই জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যেত। ভোরের আকাশ, দুপুরের আকাশ, সন্ধ্যার আকাশ। করিম আকাশ দেখে বুঝত বৃষ্টি হবে কি না। মেঘের রঙ দেখে বুঝত ধান কেমন হবে। সেটা অন্য জীবন। সেই জীবন আর নেই।

বেলাল এই ঘরটা জোগাড় করেছে। মিরপুরে, একটা গলির ভেতরে, চারতলা বিল্ডিংয়ের তিনতলায়। বেলাল বলেছিল, "আব্বা, ঢাকায় এইটাই পাওয়া যায় এই দামে।" করিম কিছু বলেনি। কী বলবে। ছেলে যা জোগাড় করতে পেরেছে, সেটাই ভালো।

হালিমা ঘরটাকে গোছানোর চেষ্টা করেছে। খাটের ওপর একটা চাদর বিছিয়েছে, যেটা রংপুর থেকে এনেছে। চুলার পাশে তিনটা বাসন সাজিয়ে রেখেছে। দেয়ালে একটা পেরেক মেরে একটা ব্যাগ ঝুলিয়েছে যেখানে কাপড়চোপড় রাখা। ঘরটা দেখতে এখনো ছোট, কিন্তু হালিমার হাতের ছোঁয়ায় একটু কম বিদঘুটে লাগে।

করিম রাতে ঘুমাতে পারে না। ঘরে বাতাস চলে না। পাশের ঘর থেকে টিভির আওয়াজ আসে। নিচের তলায় কেউ রাত দুইটায় রান্না করে, তেলের গন্ধ উঠে আসে। করিম চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। রংপুরে এই সময়ে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকত। এখানে ঝিঁঝিঁ পোকা নেই। মশা আছে। মশারি টাঙিয়ে শুয়ে থাকে করিম, ঘেমে যায়, ফ্যান ঘুরে কিন্তু বাতাস পায় না।

বেলাল একটা কাজ জোগাড় করে দিয়েছে। রাতের প্রহরী। মিরপুরেই, একটু দূরে, একটা নতুন কনস্ট্রাকশন সাইটে। বড় বিল্ডিং হচ্ছে, বিশতলা। রাত আটটা থেকে সকাল ছয়টা। বেতন বেশি না, কিন্তু নিয়মিত।

প্রথম রাতে করিম গেল কনস্ট্রাকশন সাইটে। গেটে একজন তাকে একটা চেয়ার আর একটা টর্চলাইট দিল। বলল, "রাতে কেউ ঢুকলে বাঁশি বাজাবেন। ওই যে বাঁশি।" একটা প্লাস্টিকের বাঁশি দিল। করিম বাঁশিটা হাতে নিয়ে দেখল। হালকা, খেলনার মতো।

সাইটের ভেতরে ঢুকল। বিশাল জায়গা। মাটি খোঁড়া হয়েছে, ফাউন্ডেশনের কাজ চলছে। আর মেশিন। বড় বড় মেশিন। দুইটা ক্রেন, একটা এক্সকাভেটর, একটা কংক্রিট মিক্সার। রাতের অন্ধকারে এগুলো দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। দিনের বেলা এরা কাজ করে, রাতে ঘুমায়। করিমের মতো। না, করিমের উল্টো। করিম এখন রাতে জাগে, দিনে ঘুমায়।

করিম চেয়ারটা ক্রেনের কাছে রাখল। বসল। চারদিকে নিস্তব্ধ। ঢাকা শহর কখনো একদম চুপ থাকে না, দূরে গাড়ির হর্ন শোনা যায়, কোথাও কুকুর ডাকছে। কিন্তু সাইটের ভেতরে একটা আলাদা নীরবতা আছে। মেশিনগুলোর নীরবতা।

করিম ক্রেনের দিকে তাকাল। বিশাল লম্বা গলা, আকাশের দিকে উঠে গেছে। রংপুরে করিম ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখত। এখানে ক্রেনের গলা ভেদ করে আকাশ দেখে।

"তোমরা কি ক্লান্ত হও?" করিম জিজ্ঞেস করল।

ক্রেনগুলো উত্তর দিল না। করিম অবাক হলো না। সে ধানগাছের সাথেও কথা বলত। রোপনের সময় বলত, "ভালো করে বেড়ে ওঠো।" ফসল কাটার আগে বলত, "এবার ভালো দানা দিয়ো।" ধান উত্তর দিত না। কিন্তু ধান জীবিত ছিল। ধানের গায়ে হাত রাখলে একটা অনুভূতি হতো। সবুজ, ভেজা, উষ্ণ। ক্রেনের গায়ে হাত রাখলে শুধু ঠান্ডা লোহা।

করিম ভাবল, এই মেশিনগুলো দিনের বেলা মাটি খোঁড়ে। আগে মানুষ খুঁড়ত। জাহিদের মতো মানুষ। কোদাল হাতে, রোদে পুড়ে, ঘেমে। এখন মেশিন করে। মেশিন ক্লান্ত হয় না, অসুস্থ হয় না, বেতন চায় না। মেশিন শুধু কাজ করে। আর করিম এখন সেই মেশিনের পাহারাদার। যে মেশিনগুলো জাহিদের মতো মানুষের কাজ কেড়ে নিয়েছে, সেই মেশিনগুলোর রক্ষক এখন করিম।

করিম এই কথা ভাবল কিন্তু বেশিক্ষণ ভাবল না। ভাবনার অভ্যাস করিমের কম। সে কাজের মানুষ। কাজ না থাকলে চুপচাপ বসে থাকে।

রাত গভীর হলো। করিম সাইটের চারদিকে একবার হেঁটে এলো। টর্চলাইট জ্বালিয়ে দেখল কোথাও কেউ নেই। ফিরে এসে চেয়ারে বসল। আকাশের দিকে তাকাল। ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না, আলোক দূষণের কারণে। রংপুরে তারা দেখা যেত। শীতকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে এত তারা দেখা যেত যে মনে হতো কেউ ছাদে চাল ছড়িয়ে রেখেছে।

এখানে আকাশটা ধূসর কমলা। শহরের আলোয় ধোয়া। করিম তারা খোঁজে, পায় না।

একটা জিনিস করিম লক্ষ্য করল। কনস্ট্রাকশন সাইটে একটা গন্ধ আছে। মাটির গন্ধ। গভীর মাটি খোঁড়া হয়েছে বলে একটা ভেজা মাটির গন্ধ উঠছে। এই গন্ধটা করিম চেনে। এটা রংপুরের গন্ধ না, কিন্তু মাটির গন্ধ তো মাটির গন্ধই। করিম নাক দিয়ে টেনে নিল বাতাসটা। একটু ভালো লাগল।

রাত তিনটায় একটা কুকুর ঢুকে এলো সাইটে। বেওয়ারিশ কুকুর, রোগা, এক পা একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে। করিম তাড়াল না। কুকুরটা একটা কোণে শুয়ে পড়ল। করিম ভাবল, সেও তো বেওয়ারিশ। রংপুরে জমি ছিল, ঘর ছিল, পরিচয় ছিল। এখানে সে একটা আট বাই দশ ঘরে থাকা লোক। কারো চেনা না, কেউ চেনে না।

ভোর হলো। আকাশের ধূসর কমলা আস্তে আস্তে ফ্যাকাশে হলুদ হয়ে এলো। করিম চেয়ার গুছিয়ে রাখল। টর্চলাইট আর বাঁশি জমা দিল গেটে। হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরল। পনেরো মিনিটের রাস্তা।

ঘরে ঢুকে দেখল হালিমা চুলায় পানি বসিয়েছে। চা বানাচ্ছে। ঘরে কেরোসিনের গন্ধ আর চায়ের গন্ধ মেশানো। হালিমা একটা কাপে চা ঢেলে করিমের হাতে দিল। করিম চুমুক দিল।

পানির স্বাদ আলাদা। রংপুরের পানি নরম, একটু মিষ্টি। নলকূপের পানি, মাটির নিচ থেকে আসা। ঢাকার পানি কঠিন, একটা ধাতব স্বাদ। চায়ে দুধ চিনি দিলেও সেই স্বাদটা থেকে যায়। করিম বুঝতে পারে। হালিমাও বুঝতে পারে, কিন্তু কেউ বলে না।

করিম চা খেল। কিছু বলল না। হালিমাও কিছু বলল না। দুজনে চুপচাপ বসে আছে আট বাই দশ ঘরে। খাটের ওপর করিম, চুলার পাশে হালিমা। দুজনের মধ্যে দুই হাত দূরত্ব, এর বেশি দূরত্ব এই ঘরে সম্ভব না।

করিম চায়ের কাপটা মেঝেতে রাখল। খাটে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল। ঘুম আসবে না জানে, তবু চোখ বন্ধ করল। হালিমা কাপ তুলে ধুয়ে রাখল। তারপর সেও খাটের এক পাশে বসল। পা ঝুলিয়ে। করিমের পায়ের কাছে।

ঘরের এক কোণে, দরজার পাশে, একটা দা রাখা আছে। হাতলটা ভাঙা, সেই আগেই ভাঙা ছিল। রংপুর থেকে আনা। কেন এনেছে করিম নিজেও জানে না। দা দিয়ে এখানে কী করবে? বাঁশ কাটবে? গাছের ডাল ছাঁটবে? মিরপুরে বাঁশ নেই, গাছও নেই। কিন্তু দাটা ফেলতে পারেনি। রংপুরের ঘর ছেড়ে আসার সময় জামাকাপড়ের বোঁচকার পাশে দাটা রেখেছিল। হালিমা বলেছিল, "এইটা নিয়া কী করবা?" করিম বলেছিল, "রাখো।" হালিমা আর কিছু বলেনি।

দাটা এখন ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙা হাতল, মরচে পড়া ধার। আরেকটা জীবনের চিহ্ন, যেই জীবন আর ফিরে আসবে না। কিন্তু চিহ্নটা রয়ে গেছে। আট বাই দশ ঘরে।

করিম অভিযোগ করে না। আগেও করত না, এখনো করে না। হালিমা মাঝে মাঝে বলে, "কেমন লাগে?" করিম বলে, "ঠিক আছে।" এর বেশি বলে না। ঠিক আছে মানে ভালো আছে না। ঠিক আছে মানে বেঁচে আছে। খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, কাজে যাচ্ছে। এটুকুই।

করিম শিখছে। অভিযোগ না করতে শিখছে না, সেটা সে আগে থেকেই পারে। সে শিখছে এই শহরটাকে সহ্য করতে। গলির আওয়াজ, গাড়ির ধোঁয়া, মানুষের ভিড়, জানালাহীন ঘর, ধাতব স্বাদের পানি। সব সহ্য করছে। প্রতিদিন একটু একটু করে।

রাতের শিফটে যাওয়ার আগে করিম জুতো পরে। দরজা খোলে। গলিতে পা রাখে। পেছনে হালিমা বলে, "খেয়াল রাইখো।" করিম মাথা নাড়ে। হাঁটতে শুরু করে। মিরপুরের গলি, ভাঙা রাস্তা, দুপাশে বিল্ডিং, উপরে সরু আকাশ।

করিম হাঁটে। কনস্ট্রাকশন সাইটের দিকে। যেখানে ক্রেনগুলো অপেক্ষা করছে। চুপচাপ, নিথর, লোহার তৈরি। করিম ওদের পাহারা দেবে। সারারাত। একা।