তানিয়া ছোট হলো

পর্ব ৫৩ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

অফিসটা আগে বড় ছিল। বনানীর সেই অফিস, যেখানে বারোজন বসত। ওপেন ফ্লোর, কাচের পার্টিশন, একটা কনফারেন্স রুম যেটার নাম ছিল "মঙ্গল গ্রহ", কারণ তানিয়া মনে করত স্টার্টআপ মানে বড় স্বপ্ন, বড় নাম, বড় সব কিছু।

এখন অফিস একটা ফ্ল্যাটের একটা রুম। মিরপুরে। শিহাবের মামার ফ্ল্যাট, ভাড়া কম। চারটা ডেস্ক, চারটা চেয়ার, একটা হোয়াইটবোর্ড। কনফারেন্স রুম নেই। কনফারেন্স করতে হলে সবাই চেয়ার ঘুরিয়ে মুখোমুখি বসে।

তানিয়া, শিহাব, মিতু, আর রাকিব। চারজন। রাকিব নতুন, ছয় মাস হলো জয়েন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়েছে, কম্পিউটার সায়েন্স পড়া ছেলে, বেতন কম নিচ্ছে কারণ সে বিশ্বাস করে তানিয়ার প্রোডাক্টে।

প্রোডাক্ট। এই শব্দটা তানিয়া এখন সাবধানে ব্যবহার করে। আগে বলত "প্ল্যাটফর্ম"। বড় শব্দ। এখন বলে "টুল"। ছোট শব্দ। কিন্তু সৎ শব্দ।

টুলটা হলো একটা বাংলা টেক্সট-টু-স্পিচ সফটওয়্যার। বাংলায় লেখা টেক্সট দিলে সেটা পড়ে শোনায়। এটুকুই। কোনো জটিলতা নেই। কোনো এআই ড্যাশবোর্ড নেই, কোনো অ্যানালিটিক্স নেই, কোনো মাল্টিল্যাঙ্গুয়েজ সাপোর্ট নেই। শুধু বাংলা। শুধু পড়া।

দুই বছর আগে তানিয়ার কোম্পানি অন্যরকম ছিল। বড় বিনিয়োগকারী ছিল। সিঙ্গাপুর থেকে একটা ফান্ড, ঢাকার দুইটা এঞ্জেল ইনভেস্টর। তারা চাইত তানিয়া হিন্দি আর উর্দুতে এক্সপ্যান্ড করুক। "সাউথ এশিয়ান মার্কেট" ধরতে হবে। তানিয়া চেষ্টা করেছিল। হিন্দি মডেল বানাতে গিয়ে বুঝল, সে হিন্দি জানে না। উর্দু জানে না। বাইরে থেকে লোক আনতে হবে, সেই লোকদের বেতন দিতে হবে, সেই বেতনের জন্য আরো ফান্ডিং লাগবে। চক্রটা ঘুরতে থাকল। তানিয়া ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেল।

সিঙ্গাপুরের ফান্ড চলে গেল। তারা বলল, "গ্রোথ দেখাতে পারছ না।" এঞ্জেল ইনভেস্টররা চলে গেল। তারা বলল, "মার্কেট ফিট নেই।" অফিসের লোক কমতে শুরু করল। বারো থেকে আট, আট থেকে পাঁচ, পাঁচ থেকে তিন। শিহাব আর মিতু রয়ে গেল। তারা বেতন কম নিয়েও রয়ে গেল। তানিয়া জিজ্ঞেস করেছিল, "কেন থাকছ?" শিহাব বলেছিল, "কারণ কাজটা ভালো।" মিতু কিছু বলেনি, শুধু হেসেছিল।

তানিয়া তখন একটা সিদ্ধান্ত নিল। হিন্দি বাদ। উর্দু বাদ। সাউথ এশিয়ান মার্কেট বাদ। শুধু বাংলা। শুধু বাংলাদেশ। আর শুধু একটা কাজ, টেক্সট-টু-স্পিচ, কিন্তু সেটা ভালোভাবে।

কেন টেক্সট-টু-স্পিচ? কারণ বাংলাদেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা কম না। তাদের জন্য বাংলায় ভালো টেক্সট-টু-স্পিচ নেই। যেগুলো আছে সেগুলোর উচ্চারণ রোবটের মতো, যুক্তবর্ণ ভুল পড়ে, বিরামচিহ্ন ধরতে পারে না। তানিয়ার টুল এগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছে। পুরোপুরি ঠিক হয়নি, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক ভালো।

নতুন বিনিয়োগকারী একজন। মতিঝিলের একজন ব্যবসায়ী। নাম মনজুর সাহেব। ছোট বিনিয়োগ, বড় বিনিয়োগকারীদের তুলনায় খুবই ছোট। কিন্তু মনজুর সাহেব হিন্দি এক্সপ্যানশন চান না। তিনি চান বাংলাদেশের মানুষের কাজে লাগুক। তিনি নিজে একটা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংগঠনের সাথে যুক্ত, তাই এই প্রোডাক্টে আগ্রহী।

প্রথম মিটিংয়ে মনজুর সাহেব জিজ্ঞেস করেছিলেন, "এটা দিয়ে কত টাকা কামাবেন?"

তানিয়া সৎ উত্তর দিয়েছিল। "এখনই বেশি না। তবে সরকারি স্কুলে যদি ঢোকাতে পারি, তাহলে একটা মডেল দাঁড়াবে।"

মনজুর সাহেব বলেছিলেন, "ঠিক আছে। আমি অল্প দেব। তবে দেব।"

অল্পটুকু দিয়ে চলছে। রাকিবের বেতন, সার্ভার খরচ, আর অফিসের বিদ্যুৎ বিল। তানিয়া আর শিহাব নিজেদের বেতন কমিয়ে রেখেছে। মিতু ফ্রিল্যান্স কাজ করে পাশাপাশি, সেখান থেকে তার চলে যায়।

আজকে মঙ্গলবার। বিকেল চারটা। তানিয়া ডেস্কে বসে আছে। সামনে ল্যাপটপ। মিতু পাশের ডেস্কে কোড লিখছে। শিহাব হোয়াইটবোর্ডে কিছু আঁকছে, নতুন একটা ফিচারের ডিজাইন। রাকিব হেডফোন পরে টেস্টিং করছে, বাংলা টেক্সট দিচ্ছে আর শুনছে উচ্চারণ ঠিক হচ্ছে কি না।

অফিস শান্ত। এই শান্তটা নতুন। আগের অফিসে সবসময় কোলাহল ছিল। কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ মিটিং করছে, কেউ তর্ক করছে কোন ফিচার আগে বানাবে। এখন চারজন, চুপচাপ কাজ করে। দরকার হলে কথা বলে, না হলে বলে না।

তানিয়ার চেয়ারের চাকাটা আগে একটু শব্দ করত। খিচ খিচ আওয়াজ। চেয়ার সরালেই হতো। বিরক্তিকর ছিল, কিন্তু অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। গত মাসে শিহাব ঠিক করে দিল। একটু তেল দিল, ব্যাস। এখন চেয়ার সরালে কোনো আওয়াজ হয় না। অফিস একদম চুপ। তানিয়া মাঝে মাঝে অবাক হয়, এত চুপ কেন। তারপর মনে পড়ে, চাকাটা ঠিক হয়ে গেছে। অদ্ভুত, একটা খিচখিচে শব্দ না থাকলেও কিছু একটা মিস করে তানিয়া।

তানিয়ার ইনবক্সে একটা ভয়েস নোট এসেছে। কাল রাতে এসেছে, আজকে দেখল। পাঠিয়েছেন রাজশাহীর একজন স্কুলশিক্ষক। নাম আনোয়ার হোসেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ান। তানিয়াদের টুলটা ব্যবহার করছেন তিন মাস ধরে।

তানিয়া ভয়েস নোটটা প্লে করল।

আনোয়ার হোসেনের গলা। ভারী, ধীর, একটু কাঁপা।

"তানিয়া বেটি, আমি আনোয়ার বলছি, রাজশাহী থেকে। আপনার এই জিনিসটা দিয়ে আমি আবার বই পড়তে পারছি। আমার চোখ গেছে পাঁচ বছর হলো। তার আগে আমি খুব বই পড়তাম। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ। চোখ যাওয়ার পরে মনে হতো জীবনের একটা বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে। অডিওবুক শুনতাম, কিন্তু বাংলা অডিওবুক খুব কম। আর যেগুলো আছে সেগুলো সব উপন্যাস, আমি কবিতা পড়তে চাই। আপনার এই টুলে আমি কবিতার টেক্সট দিই, আর সে পড়ে শোনায়। উচ্চারণটা একটু যান্ত্রিক, মানুষের মতো না, কিন্তু শব্দগুলো তো ঠিক আছে। জীবনানন্দের 'বনলতা সেন' শুনলাম গতকাল। 'সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে'... এই লাইনটা শুনে আমার চোখে পানি এসে গেল। আপনাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক।"

ভয়েস নোট শেষ।

তানিয়া আবার প্লে করল। আবার শুনল। তারপর আরেকবার।

শিহাব জিজ্ঞেস করল, "কী শুনছ?"

তানিয়া ফোনটা শিহাবের দিকে এগিয়ে দিল। শিহাব শুনল। কিছু বলল না। ফোনটা ফেরত দিল। মিতু জিজ্ঞেস করল, "কী?" শিহাব বলল, "রাজশাহীর একজন শিক্ষক। আমাদের টুল ব্যবহার করছেন।" মিতু বলল, "ভালো।" তারপর আবার কোড লিখতে বসল।

তানিয়া ভাবল, দুই বছর আগে সিঙ্গাপুরের ফান্ড থাকতে একবার একটা আর্টিকেল বেরিয়েছিল একটা টেক ব্লগে। "বাংলাদেশি স্টার্টআপ দক্ষিণ এশিয়ার এআই মার্কেটে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।" তানিয়া সেই আর্টিকেলটা দশবার পড়েছিল। সবাইকে পাঠিয়েছিল। বাবাকে পাঠিয়েছিল। বাবা বুঝতে পারেননি কী লেখা, কিন্তু খুশি হয়েছিলেন।

এখন কোনো আর্টিকেল নেই। কোনো টেক ব্লগে তানিয়ার কোম্পানির নাম আসে না। কোনো কনফারেন্সে ডাক আসে না। কেউ জানে না তানিয়ারা কী করছে। চারজন মানুষ, মিরপুরের একটা ফ্ল্যাটে, একটা বাংলা টেক্সট-টু-স্পিচ টুল বানাচ্ছে।

কিন্তু রাজশাহীর আনোয়ার হোসেন জানেন। তিনি জীবনানন্দ পড়ছেন তানিয়ার টুল দিয়ে।

বিকেল পাঁচটায় তানিয়া কফি বানাতে গেল। কিচেনে দাঁড়িয়ে কেটলিতে পানি বসিয়েছে। তারপর ভাবল, কফি লাগবে না। বিকেলে কফি খেলে রাতে ঘুম আসে না, এটা তানিয়া জানে। কিন্তু সে এতদিন বিকেলে কফি খেত কারণ রাতেও কাজ করত। ডেডলাইন, পিচ ডেক, ইনভেস্টর মিটিংয়ের প্রিপারেশন। রাতে জেগে থাকতে হতো।

আজকে রাতে কাজ নেই। কোনো ইনভেস্টর মিটিং নেই। কোনো পিচ ডেক বানাতে হবে না। আজকের কাজ হলো উচ্চারণ মডেলের একটা বাগ ফিক্স করা, যেটা রাকিব করছে। তানিয়ার কাজ হলো আনোয়ার হোসেনকে একটা ধন্যবাদ মেসেজ পাঠানো আর পরের মাসের বাজেট দেখা। দুইটাই আধা ঘণ্টার কাজ।

তানিয়া কেটলি বন্ধ করে দিল। কফি বানাল না। ডেস্কে ফিরে এলো। এক গ্লাস পানি নিয়ে।

সে জেগে আছে। কফি ছাড়াই জেগে আছে। কারণ ঘুমের দরকার নেই, ক্লান্তি নেই। আগে ক্লান্তি ছিল, সবসময়। বারোজনের কোম্পানি চালানো, ইনভেস্টর সামলানো, হিন্দি টিম ম্যানেজ করা, পিচ ডেক বানানো, গ্রোথ দেখানো। সবসময় একটা চাপ ছিল, বুকের ওপর একটা ভারী জিনিস বসে থাকত।

এখন সেই ভারী জিনিসটা নেই। কোম্পানি ছোট হয়ে গেছে, হ্যাঁ। টাকা কম, হ্যাঁ। নাম নেই, হ্যাঁ। কিন্তু বুকের ওপর থেকে ভারটা উঠে গেছে।

সন্ধ্যা ছয়টায় সবাই উঠল। রাকিব বলল, "আপু, যুক্তবর্ণের ওই বাগটা ফিক্স হয়ে গেছে। 'সন্ধ্যা' এখন ঠিকমতো পড়ছে।" তানিয়া বলল, "ভালো।" মিতু ব্যাগ গোছাচ্ছে। শিহাব হোয়াইটবোর্ড মুছছে।

তানিয়া ডেস্কে বসে আনোয়ার হোসেনকে একটা ভয়েস নোট পাঠাল। "আনোয়ার ভাই, আপনার মেসেজ পেয়েছি। আপনার কথা শুনে আমাদের খুব ভালো লাগল। আমরা উচ্চারণটা আরো ভালো করার চেষ্টা করছি। আপনি ব্যবহার করতে থাকুন, কোনো সমস্যা হলে জানাবেন।"

পাঠিয়ে দিল। তারপর ফোন রেখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। মিরপুরের রাস্তায় সন্ধ্যার আলো। রিকশার ঘণ্টা, বাচ্চাদের চিৎকার, কোথাও আজানের সুর।

তানিয়া ভাবল, সিঙ্গাপুরের ফান্ড থাকতে সে একবার একটা কনফারেন্সে গিয়েছিল। ব্যাংককে। স্টেজে দাঁড়িয়ে পিচ করেছিল। ইংরেজিতে। স্লাইডে বড় বড় নম্বর ছিল। মার্কেট সাইজ, প্রজেক্টেড গ্রোথ, ইউজার অ্যাকুইজিশন কস্ট। তালি পেয়েছিল। ভালো লেগেছিল।

আর আজকে রাজশাহীর একজন অন্ধ শিক্ষক একটা ভয়েস নোট পাঠিয়েছেন। কোনো তালি নেই। কোনো স্টেজ নেই। শুধু একজন মানুষের কাঁপা গলা বলছে, আমি আবার বই পড়তে পারছি।

তানিয়া জানে কোনটা বেশি ভারী। কোনটা বেশি সত্যি।

সবাই চলে গেল। তানিয়া একা অফিসে। লাইট নিভিয়ে দিল। ল্যাপটপ বন্ধ করল। চেয়ার থেকে উঠল। চেয়ারটা সরল, কোনো শব্দ হলো না। তানিয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার ঘরটার দিকে তাকাল। চারটা ডেস্ক, চারটা চেয়ার, একটা হোয়াইটবোর্ড। এটুকুই তার কোম্পানি। এটুকুই যথেষ্ট।

দরজা বন্ধ করে সিঁড়ি দিয়ে নামল। রাস্তায় বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল। পকেটে ফোন। ফোনে আনোয়ার হোসেনের ভয়েস নোট সেভ আছে। তানিয়া জানে, খারাপ দিনে এটা শুনবে। আজকে খারাপ দিন না। আজকে ভালো দিন।

মিরপুরের রাস্তায় সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে। দোকানে দোকানে বাতি জ্বলছে। তানিয়া হাঁটছে। কফি খায়নি, তবু জেগে আছে।