সেলিনা থেকে গেলো
চিঠিটা এলো বিকেলবেলা। ডাকপিয়ন আসেনি, আসবে কী করে। চরে ডাকপিয়ন আসে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কেউ একজন নৌকায় করে এনেছে। লোকটা সেলিনার টিনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, "আপা, ঢাকা থেকে চিঠি।"
সেলিনা তখন রহিমার ছেলের কানে তেল দিচ্ছিলো। ছেলেটার কান পাকা। ট্যাবলেটে দেখেছে কী ওষুধ দিতে হবে, কিন্তু ওষুধ নেই। তাই সরিষার তেলে রসুন গরম করে দিচ্ছে। এটা ট্যাবলেটে নেই। এটা চরের।
চিঠি হাতে নিয়ে পড়লো। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের লেটারহেড। সরকারি সিল। ভেতরে লেখা, তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হচ্ছে। পদোন্নতিসহ। সিনিয়র স্টাফ নার্স।
সেলিনা চিঠিটা ভাঁজ করে রাখলো।
সোহেল স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখলো মা চুলায় ভাত চড়াচ্ছে। চিঠিটা টেবিলে। সোহেল এখন চৌদ্দ বছরের ছেলে। লম্বা হয়েছে, চওড়া হয়নি। নদীর বাতাসে বড় হওয়া ছেলেদের এরকমই হয়, সরু আর শক্ত।
"মা, এটা কী?"
"পড়ে দেখ।"
সোহেল পড়লো। চোখ বড় হলো। "মা, ময়মনসিংহ! মেডিকেল কলেজ!"
সেলিনা ভাতে পানি দিলো। "হুম।"
"আমরা যাবো?"
"না।"
সোহেল চুপ করে গেলো। সে মাকে চেনে। মা যখন এক শব্দে উত্তর দেয়, তখন আর কথা বলার দরকার নেই। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।
কিন্তু সোহেল চৌদ্দ বছরের ছেলে। চুপ থাকতে পারলো না।
"কেন, মা?"
সেলিনা চুলা থেকে মুখ তুললো। তার মুখে ঘামের একটা স্তর। চরের রান্নাঘরে পাখা নেই।
"এখানে আমাকে দরকার। ওখানে আমাকে দেখতো।"
সোহেল কথাটা বুঝলো। ময়মনসিংহে মা হতো একজন নার্স, শত নার্সের একজন। এখানে মা হলো সেলিনা আপা। চরের মানুষের কাছে শব্দ দুটো আলাদা জিনিস।
ভাত হলো। দুজনে খেলো। সোহেল পড়তে বসলো। সেলিনা বারান্দায় বসে চিঠিটা আবার পড়লো। "পদোন্নতিসহ" শব্দটা চোখে লাগলো। পদোন্নতি। মানে বেতন বাড়বে। মানে সোহেলকে প্রাইভেট পড়াতে পারবে। মানে ঈদে নতুন জামা একটা না, দুটো।
সেলিনা চিঠি রেখে দিলো। উঠোনে আকাশ দেখলো। চরের আকাশে মেঘ জমছে। বর্ষা আসছে। বর্ষায় চর ডুবে যায়। নৌকা ছাড়া চলাচল বন্ধ। গত বর্ষায় হালিমের বউয়ের জ্বর হয়েছিলো। সেলিনা কোমর পানি ভেঙে গিয়েছিলো ওষুধ নিয়ে। ট্যাবলেটটা মাথার ওপর ধরে রেখেছিলো, যেন ভিজে না যায়।
ময়মনসিংহে বর্ষায় কোমর পানি ভাঙতে হয় না।
---
সন্ধ্যায় করিম চাচা এলো। করিম চাচা জেলে। তার নৌকা সবচেয়ে বড়, তার জাল সবচেয়ে পুরোনো। চরে কেউ অসুস্থ হলে করিম চাচার নৌকাই অ্যাম্বুলেন্স।
এটা সেলিনা তৈরি করেছে। কেউ বলেনি করো। কোনো সরকারি আদেশ নেই। কোনো প্রকল্প নেই। সেলিনা একদিন করিমকে বলেছিলো, "চাচা, কেউ জরুরি অসুস্থ হলে আপনার নৌকা লাগবে।" করিম বলেছিলো, "আপা, নৌকা তো আছেই।" ব্যস।
এখন চরের তিনটা নৌকা সেলিনার "অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক"। করিমের নৌকা, হালিমের নৌকা, আর ফজলুর নৌকা। তিনটা নৌকা তিন দিকে। যেকোনো সময় কেউ না কেউ নদীতে আছে। কেউ অসুস্থ হলে সেই নৌকায় করে উপজেলায় নেওয়া হয়।
করিম চাচা বসলো। সোহেল চা বানালো। করিম বললো, "শুনলাম ময়মনসিংহ?"
চরে খবর দ্রুত যায়। নদীর চেয়ে দ্রুত।
"যাচ্ছি না, চাচা।"
করিম চা-তে ফুঁ দিলো। "ভালো করবেন, আপা। আপনি গেলে আমরা শেষ।"
সেলিনা কিছু বললো না। করিমের কথায় বাড়াবাড়ি আছে। চরের মানুষ আগেও বেঁচে ছিলো, পরেও বাঁচবে। কিন্তু কথাটা পুরোপুরি মিথ্যাও না।
---
সেলিনার ঘরে তিনটা খাতা আছে। মোটা, শক্ত মলাটের। প্রথম খাতায় চরের প্রতিটি পরিবারের নাম। কে কবে অসুস্থ হয়েছিলো, কী ওষুধ দেওয়া হয়েছিলো, কী হয়েছিলো ফলাফল। দ্বিতীয় খাতায় গর্ভবতী মায়েদের তালিকা। কার কবে ডেলিভারি, আগে কোনো সমস্যা হয়েছিলো কি না, রক্তের গ্রুপ কী। তৃতীয় খাতায় ভেষজ চিকিৎসার নোট। কোন গাছের কোন অংশ কোন রোগে কাজ করে, চরের বয়স্ক মহিলারা কী বলেন, ট্যাবলেটে কী বলে।
এই তিনটা খাতা কোনো সরকারি ফর্মে নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই খাতার কথা জানে না। কিন্তু এই খাতা চরের মেডিকেল রেকর্ড।
ট্যাবলেটটা সেলিনা সপ্তাহে একদিন চার্জ করে। বাজারের দিন। চরে বিদ্যুৎ নেই, কিন্তু বাজারে একটা সোলার চার্জিং পয়েন্ট আছে। সেলিনা বাজারে যায়, ট্যাবলেট চার্জ দেয়, বাজার করে, ফেরে।
ট্যাবলেটে একটা স্বাস্থ্যসেবা অ্যাপ আছে। লক্ষণ লিখলে সম্ভাব্য রোগ বলে। ওষুধের নাম বলে। কিন্তু সেলিনা জানে ওষুধের নাম জেনে লাভ নেই, যদি ওষুধ না থাকে। তাই সে একটা নিজের পদ্ধতি তৈরি করেছে। ট্যাবলেট বলে রোগটা কী। তারপর সেলিনা দেখে, ওষুধ আছে কি না। থাকলে ওষুধ। না থাকলে খাতা খোলে, ভেষজ কী দেওয়া যায়। দুটোই না হলে, নৌকায় উপজেলা।
এই ব্যবস্থাটা কেউ ডিজাইন করেনি। কোনো এনজিও, কোনো মন্ত্রণালয়, কোনো বিদেশি প্রকল্প এটা বানায়নি। সেলিনা বানিয়েছে। আস্তে আস্তে, দিনে দিনে, ভুল করে করে।
ভুলও হয়েছে। একবার এক বুড়ির পেটে ব্যথা, সেলিনা ভেবেছিলো গ্যাস। তুলসি পাতার রস দিয়েছিলো। পরে দেখা গেলো অ্যাপেন্ডিক্স। নৌকায় করে উপজেলায় নিয়ে যেতে যেতে অনেক কষ্ট হয়েছিলো বুড়ির। তখন থেকে সেলিনা পেটে ব্যথা হলে আগে ট্যাবলেটে দেখে, তারপর চাপ দিয়ে দেখে কোন জায়গায় ব্যথা, তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। এই শিক্ষাটা কোনো বইয়ে নেই। এটা ভুলের শিক্ষা।
খাতায় লিখে রেখেছে: "পেটে ব্যথা, গ্যাস ভাবা ঠিক না। ডান দিকে নিচে চাপ দিলে যদি ব্যথা বাড়ে, নৌকায় পাঠাও।" এই লাইনটা একটা বুড়ির কষ্টের ফল।
---
সোহেল এখন মায়ের সাথে কাজ করে। স্কুলের পরে। সোহেল ট্যাবলেট পড়তে পারে। চরের বেশিরভাগ মানুষ পারে না। বয়স্ক মহিলারা তো পারেই না। তাই সোহেল মাঝখানে দাঁড়ায়। ট্যাবলেটে যা লেখা, সেটা মানুষকে বুঝিয়ে বলে।
"চাচি, ট্যাবলেট বলতেছে আপনার প্রেশার বেশি। লবণ কম খাবেন।"
"চাচা, এই ওষুধ সকালে একটা, রাতে একটা। ভাত খাওয়ার পরে।"
সোহেলের গলা মিহি, কিন্তু কথা পরিষ্কার। মানুষ তার কথা শোনে। একটা চৌদ্দ বছরের ছেলে বলছে, মানুষ শুনছে। কারণ সোহেল সেলিনা আপার ছেলে।
মা আর ছেলে মিলে একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ভবন নেই, সাইনবোর্ড নেই। কিন্তু চরের মানুষ জানে, শরীর খারাপ হলে সেলিনা আপার ঘরে যেতে হবে।
সোহেল আরেকটা কাজ করে। ট্যাবলেটের ব্যাটারি যখন থাকে, তখন সে রোগীদের তথ্য ট্যাবলেটেও লিখে রাখে। মায়ের খাতার জিনিস ট্যাবলেটে। ট্যাবলেটের জিনিস মায়ের খাতায়। দুটো একসাথে চলে। কোনো দিন ট্যাবলেট নষ্ট হলে খাতা আছে। কোনো দিন খাতা হারালে ট্যাবলেট আছে।
এই কাজটা সোহেল নিজে শুরু করেছে। মা বলেনি। সোহেল দেখেছে ট্যাবলেটে তথ্য রাখলে খুঁজে পাওয়া সহজ। কিন্তু ট্যাবলেটের ব্যাটারি শেষ হলে কিছুই দেখা যায় না। তাই দুটোই দরকার।
---
একদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এলেন। নতুন কর্মকর্তা, তরুণ, ঢাকা মেডিকেল থেকে পাশ করা। তিনি এসে সেলিনার "ক্লিনিক" দেখলেন। টিনের ঘর। একটা খাটিয়া। তিনটা খাতা। একটা ট্যাবলেট। কিছু ভেষজ উপকরণ কাচের বয়ামে।
"এটা তো কোনো স্বীকৃত স্বাস্থ্যকেন্দ্র না," তিনি বললেন।
"না," সেলিনা বললো।
"আপনি কি জানেন, বিনা অনুমোদনে চিকিৎসাসেবা দেওয়া..."
সেলিনা তাকালো। শুধু তাকালো। কিছু বললো না।
কর্মকর্তা থামলেন। তিনি চারপাশে তাকালেন। ঘরের বাইরে তিনজন মহিলা বসে আছে। একজনের কোলে বাচ্চা। তারা অপেক্ষা করছে সেলিনা আপার জন্য।
কর্মকর্তা চলে গেলেন। কিছু করলেন না। কিছু বললেন না। চিঠিও লিখলেন না। হয়তো বুঝলেন, এটা বন্ধ করলে এই মানুষগুলো কোথায় যাবে। হয়তো বুঝলেন না। হয়তো শুধু ঝামেলা এড়ালেন।
---
রাতে সোহেল পড়াশোনা করে। হারিকেনের আলোতে। চরে বিদ্যুৎ এখনো আসেনি। আসবে আসবে বলে পাঁচ বছর হলো।
সোহেলের টেবিলে একটা কাচের বয়াম আছে। বয়ামে নদীর নুড়িপাথর। সাদা, ধূসর, হালকা গোলাপি, কালচে সবুজ। সোহেল রঙ অনুযায়ী সাজিয়ে রেখেছে। কেন সাজিয়েছে কেউ জানে না। সোহেলও জানে না। নদীতে গেলে সুন্দর পাথর কুড়ায়, এনে বয়ামে রাখে। বয়াম প্রায় ভরে গেছে। আরেকটা বয়াম লাগবে।
সেলিনা একবার জিজ্ঞেস করেছিলো, "এতো পাথর কী করবি?"
সোহেল বলেছিলো, "রাখবো।"
"কেন?"
"এমনি।"
সেলিনা আর জিজ্ঞেস করেনি।
---
সেলিনা মাঝে মাঝে ভাবে, সে কী করছে এখানে। সে একটা সরকারি নার্স। তার পদবি আছে, বেতন আছে, পরিচয়পত্র আছে। কিন্তু সে যা করছে সেটা তার পদবির কাজ না। তার কাজ ছিলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বসে থাকা, ডাক্তারের সহকারী হওয়া, সুচ ফোটানো, ব্যান্ডেজ বাঁধা।
সে চরে এসেছে কারণ তাকে পাঠানো হয়েছিলো। শাস্তি হিসেবে। কোনো এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে ভুল বোঝাবুঝি। চর মানে নির্বাসন। কেউ চরে যেতে চায় না।
কিন্তু সেলিনা এসে দেখলো, চরে মানুষ আছে। মানুষ অসুস্থ হয়। বাচ্চা হয়। মারা যায়। সব হয়, শুধু কেউ দেখতে আসে না। তখন সে ভাবলো, যা আছে তাই নিয়ে কাজ করবে। ট্যাবলেট দিয়েছে সরকার, ব্যবহার করবে। খাতা দোকানে পাওয়া যায়, কিনবে। গাছগাছড়ার জ্ঞান বুড়িদের কাছে আছে, শিখবে। নৌকা জেলেদের আছে, ব্যবহার করবে।
এই ভাবনাটা কোনো মহান পরিকল্পনা ছিলো না। সেলিনা মহান কিছু ভাবেনি। সে শুধু ভেবেছে, মানুষ অসুস্থ, কিছু করা দরকার।
---
পরদিন সেলিনা চিঠির উত্তর লিখলো। সাদা কাগজে, কলম দিয়ে।
"মাননীয় কর্তৃপক্ষ, আমি বদলি গ্রহণে অপারগ। আমার বর্তমান কর্মস্থলে আমার উপস্থিতি প্রয়োজন। বিনীত, সেলিনা বেগম।"
চিঠি ভাঁজ করে খামে ভরলো। বাজারের দিন পোস্ট করবে।
সোহেল বললো, "মা, তুমি ময়মনসিংহ গেলে আমি ভালো স্কুলে পড়তে পারতাম।"
সেলিনা ছেলের দিকে তাকালো। কথাটা সত্যি। ময়মনসিংহে স্কুল ভালো, কোচিং আছে, বই আছে। এখানে স্কুল আছে, কিন্তু শিক্ষক আসে সপ্তাহে তিনদিন।
"তুই কি যেতে চাস?"
সোহেল একটু ভাবলো। "না।"
"কেন?"
"এমনি।"
সেলিনা হাসলো। ছেলে তার মতো।
---
বিকেলে রহিমা এলো। তার ছেলের কানে তেল দেওয়ার পরের দিন। বললো, "আপা, কান ভালো। ব্যথা নাই।"
সেলিনা বললো, "আরো দুইদিন দিবা। তারপর বন্ধ।"
রহিমা গেলো। তার জায়গায় আরেকজন এলো। আসমার শ্বাশুড়ি, হাঁটু ব্যথা। সেলিনা হাঁটু দেখলো, ট্যাবলেট দেখলো, খাতা দেখলো। তুলসি পাতার রস আর গরম সেঁক দিতে বললো।
এভাবে বিকেল গেলো।
সন্ধ্যায় সোহেল নদীর ধারে গেলো। ফিরে এলো হাতে দুটো নুড়িপাথর নিয়ে। একটা সাদা, একটা ধূসর। বয়ামে রাখলো।
সেলিনা উঠোনে বসে আছে। আকাশে তারা উঠেছে। চরের আকাশে তারা বেশি দেখা যায়। শহরে আলো বেশি বলে তারা কম। এখানে আলো নেই বলে তারা অনেক।
সেলিনা ভাবলো, ময়মনসিংহে এখন বিদ্যুৎ আছে। পাখা আছে। ফ্রিজ আছে। টিভি আছে। সিনিয়র স্টাফ নার্সের কোয়ার্টার হয়তো পাবে। সোহেল ভালো স্কুলে পড়বে।
তারপর ভাবলো, আসমার শ্বাশুড়ি কে দেখবে। রহিমার ছেলের কান কে দেখবে। মরিয়মের ডেলিভারি আগামী মাসে, কে থাকবে।
চিঠিটা পাঠাবে বাজারের দিন।
রাতে ঘরে ঢুকে দেখলো সোহেল ঘুমিয়ে গেছে। হারিকেন জ্বলছে। পাশে ট্যাবলেট, ব্যাটারি প্রায় শেষ। পাশে খোলা খাতা, সোহেলের হাতের লেখায় একটা রোগীর নোট। বয়ামে নুড়িপাথরে হারিকেনের আলো পড়ে ছোট ছোট ছায়া তৈরি হয়েছে দেয়ালে।
সেলিনা হারিকেন নিভিয়ে দিলো।