জাহিদের চায়ের দোকান

পর্ব ৫৫ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

দোকানটা ছোট। নেত্রকোনা বাজারের পূর্ব কোণে, পুরোনো টিন আর বাঁশের কাঠামো। সামনে একটা কাঠের বেঞ্চ, পেছনে চুলা আর চায়ের সরঞ্জাম। জাহিদ নিজে বানিয়েছে। নিজের হাতে। সৌদি থেকে ফেরার পর জমানো টাকায়।

সকাল ছয়টায় চুলা ধরায়। প্রথম চা নিজে খায়। এটা অভ্যাস। সৌদিতে শিখেছে, দিন শুরু করো নিজের চায়ে। তারপর খদ্দেরের চা।

দোকানের নাম নেই। সাইনবোর্ড লাগায়নি। লোকে বলে "জাহিদের দোকান।" এইটুকু নামই যথেষ্ট।

রাশিদা সকালে নাস্তা বানিয়ে পাঠায়। পিঁয়াজু, বেগুনি, কখনো শিঙাড়া। জাহিদ বিক্রি করে। রাশিদার হাতটা ভালো। বাজারের লোক বলে, "জাহিদ ভাইয়ের চায়ের সাথে ভাবির পিঁয়াজু, জুড়ি নাই।"

প্রথম কয়েক মাস ভালো চললো। বাজারের দিন ভিড় হতো। রিকশাওয়ালারা আসতো, দোকানদাররা আসতো, কৃষক বাজারে এসে চা খেতো। জাহিদ চা বানায় ধীরে, যত্ন করে। পানি ফোটে, চা পাতা পড়ে, দুধ পড়ে, আদা পড়ে। তাড়াহুড়ো নেই। সৌদিতে বারো বছর পরিশ্রম করেছে, এখন তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।

---

পরিবর্তনটা আস্তে এলো। এতো আস্তে যে জাহিদ প্রথমে বুঝতেই পারলো না।

রিকশাওয়ালারা কমে গেলো। আগে বাজারের সামনে পাঁচটা ছয়টা রিকশা দাঁড়িয়ে থাকতো। এখন দুটো, কখনো একটা। মানুষ ফোনে গাড়ি ডাকে। অটো আসে, সিএনজি আসে। ফোনে বুকিং, ফোনে পেমেন্ট। রিকশার দরকার পড়ে না।

রিকশাওয়ালারা ছিলো জাহিদের নিয়মিত খদ্দের। সকালে এক কাপ, বিকেলে এক কাপ। কখনো দুই কাপ। তারা চলে গেছে। রিকশা ছেড়ে দিয়েছে, না হয় অন্য বাজারে গেছে যেখানে এখনো মানুষ রিকশায় চড়ে।

তারপর বাজারে মানুষ কমলো। আগে শনিবার-মঙ্গলবার বাজারের দিন গিজগিজ করতো। এখন ভিড় কম। একটা অ্যাপ এসেছে, ফোনে বাজার করা যায়। মুদি দোকানের জিনিস, মাছ, সবজি, সব বাড়িতে পৌঁছে দেয়। ডেলিভারি ছেলে মোটরসাইকেলে আসে, ব্যাগ দিয়ে যায়। মানুষের বাজারে আসার দরকার কমেছে।

যারা আসে না বাজারে, তারা জাহিদের দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটে না। জাহিদের চা খায় না।

ব্যাপারটা জাহিদের চায়ের দোষে না। চা ভালোই আছে। আদা-চা, দুধ-চা, লাল চা, সব আগের মতোই। রাশিদার পিঁয়াজুও আগের মতো। কিন্তু মানুষের পথ বদলে গেছে। আগে মানুষ হেঁটে বাজারে আসতো, জাহিদের দোকানের সামনে দিয়ে যেতো, চায়ের গন্ধ পেতো, থামতো। এখন মানুষ আসে না। ফোনে সব হয়ে যায়।

জাহিদ এটা কাউকে বলে না। বলবে কী। কে শুনবে। কার কাছে অভিযোগ করবে। সে কি বলবে, "ফোন বন্ধ করো, হেঁটে বাজারে আসো"? সে কি বলবে, "ডেলিভারি অ্যাপ বন্ধ করো"? কাকে বলবে? কেন বলবে?

পাশের দোকানদার সেলিম মিয়া মুদি দোকান চালায়। তার বিক্রিও কমেছে। কিন্তু সেলিম মিয়া নিজে অ্যাপে উঠে গেছে। ডেলিভারি অ্যাপে তার দোকানের জিনিস পাওয়া যায়। মানুষ অর্ডার করে, সেলিম মিয়া প্যাক করে, ডেলিভারি ছেলে নিয়ে যায়। সেলিম মিয়ার বিক্রি আবার বেড়েছে।

জাহিদ ভাবে, চায়ের দোকান কি অ্যাপে যায়? চা কি ডেলিভারি দেওয়া যায়? হয়তো যায়। কিন্তু গরম চা মোটরসাইকেলে যেতে যেতে ঠান্ডা হয়ে যাবে। আর চায়ের দোকানের আসল জিনিস তো চা না। আসল জিনিস হলো বসা। বেঞ্চে বসে চা খাওয়া, পাশের লোকের সাথে কথা বলা, বাজারের খবর শোনা। সেটা কি অ্যাপে যায়?

---

বিকেলটা খারাপ। সকালে কিছু খদ্দের আসে, দুপুরের পর দোকান ফাঁকা। জাহিদ বসে থাকে। চুলায় চা গরম, পিঁয়াজু ঠান্ডা হচ্ছে। মাছি বসছে।

পেছনের তাকে একটা খাতা আছে। সেই খাতা। সৌদিতে যে খাতায় লিখতো। শেষ লেখাটা ছিলো একটা শব্দ: "ফেরত।" তারপর আর কিছু লেখেনি। খাতাটা ধুলো জমেছে।

জাহিদ মাঝে মাঝে খাতার দিকে তাকায়। কিন্তু হাত বাড়ায় না। কী লিখবে। "বসে আছি।" "খদ্দের নেই।" "চা ঠান্ডা হচ্ছে।" এসব লেখার কী আছে।

দোকানের দেয়ালে একটা ছোট ছবি ঝোলানো। রিয়াদের স্কাইলাইন। রাতের ছবি, আলো জ্বলছে। জাহিদ সৌদি থাকতে ক্যালেন্ডার থেকে কেটে রেখেছিলো। দেশে আনার সময় ব্যাগে ছিলো। দোকান খুলে দেয়ালে লাগিয়েছে।

খদ্দেররা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, "জাহিদ ভাই, সৌদি গেছিলেন?"

"বারো বছর," জাহিদ বলে।

"কেমন ছিলো?"

জাহিদ বিষয় পাল্টায়। চা ঢালে। অন্য কথা শুরু করে। সৌদির গল্প করে না। কারণ সৌদির গল্পে ভালো কিছু নেই যে বলবে, আবার এতো খারাপও ছিলো না যে অভিযোগ করবে। বারো বছর ছিলো, কাজ করেছে, টাকা পাঠিয়েছে, ফিরে এসেছে। ব্যস।

---

একদিন বিকেলে এক তরুণ এলো। কুড়ি-বাইশ বছর। হাতে ফোন, কানে ইয়ারফোন। ল্যাপটপ ব্যাগ কাঁধে।

"ভাই, ওয়াইফাই আছে?"

জাহিদ তাকালো। ছেলেটা দোকানের দিকে তাকাচ্ছে, চায়ের দিকে না, দেয়ালের দিকে, যেন ওয়াইফাইয়ের স্টিকার খুঁজছে।

"চা আছে।"

ছেলেটা একটু থামলো। তারপর বললো, "ওকে ভাই।" চলে গেলো।

জাহিদ দেখলো ছেলেটা পাশের দোকানে ঢুকলো। সেই দোকানে ওয়াইফাই আছে। দোকানদার ছয় মাস আগে রাউটার বসিয়েছে। ফ্রি ওয়াইফাই দেয়, খদ্দের আসে, বসে, অর্ডার করে।

জাহিদ ভাবলো, ওয়াইফাই লাগাবে কি না। রাউটার কিনতে কতো টাকা লাগে জানে না। ইন্টারনেটের বিল কতো জানে না। সে তো ফোনই ব্যবহার করে কম। রাশিদাকে কল করে, রাশিদা কল করে, এইটুকু।

কিন্তু ওয়াইফাই লাগালেই কি খদ্দের আসবে? জাহিদ নিশ্চিত না। হয়তো আসবে। হয়তো আসবে না। হয়তো এসে শুধু ওয়াইফাই ব্যবহার করবে, চা খাবে না।

জাহিদ কিছু করলো না। বসে রইলো।

বিকেলে একজন বুড়ো এলো। আব্দুল চাচা। চরের চাষী। প্রতি মঙ্গলবার বাজারে আসে, জাহিদের দোকানে একটু বসে, এক কাপ চা খায়। আব্দুল চাচা ফোন চালায় না। তার ফোনে শুধু কল হয়। অ্যাপ নেই, ইন্টারনেট নেই। তিনি পায়ে হেঁটে বাজারে আসেন, হাতে ধরে সবজি কেনেন, নাক দিয়ে মাছ শোকেন। তারপর জাহিদের দোকানে বসেন।

"এক কাপ দাও, বাবা।"

জাহিদ চা বানালো। আব্দুল চাচা চা খেলো। দুজনে কিছুক্ষণ বসলো। আব্দুল চাচা বাজারের গল্প করলো, ধানের দাম কেমন, পেঁয়াজ মানাই না। জাহিদ শুনলো। চা ঢাললো। আব্দুল চাচা চলে গেলো।

জাহিদ ভাবলো, আব্দুল চাচারা কতোদিন থাকবে। যারা হেঁটে বাজারে আসে, হাতে ধরে জিনিস কেনে, চায়ের দোকানে বসে, তারা কতোদিন আসবে। তাদের ছেলেরা তো ফোনে বাজার করে। তাদের নাতিরা তো ডেলিভারি ছেলে হয়ে মোটরসাইকেল চালায়। আব্দুল চাচা একদিন আসবে না। তখন?

---

সন্ধ্যায় দোকান গোছালো। চুলা নেভালো। বাকি পিঁয়াজু প্যাকেটে ভরলো, বাড়ি নিয়ে যাবে। ছেলেমেয়ে খাবে। বিক্রি না হওয়া পিঁয়াজু বাড়ির নাস্তা।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখলো বাজারের গলিতে একটা ডেলিভারি মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে আছে। বড় একটা বাক্স পেছনে, ভেতরে বাজারের জিনিস। ছেলেটা ফোন দেখছে, পরের ডেলিভারি কোথায়।

জাহিদ ছেলেটার দিকে তাকালো। ছেলেটা তাকালো না। ফোনে ম্যাপ দেখছে।

বাড়ি ফিরে রাশিদা জিজ্ঞেস করলো, "কেমন গেলো?"

"ভালো।"

"কতো বিক্রি?"

জাহিদ একটা সংখ্যা বললো। সংখ্যাটা আগের মাসের চেয়ে কম। তার আগের মাসের চেয়েও কম।

রাশিদা কিছু বললো না। রাশিদা হিসাব করতে জানে। সে বুঝতে পারছে, কিন্তু বলছে না। জাহিদও বলছে না। দুজনের মাঝখানে একটা নীরবতা, যেটা ভারী, কিন্তু কেউ ভাঙে না।

---

পরদিন সকালে জাহিদ আবার চুলা ধরালো। প্রথম চা নিজে খেলো। তারপর অপেক্ষা। সাতটায় হালিম এলো, এক কাপ দুধ-চা। সাড়ে সাতটায় রফিক, লাল চা। আটটায় কেউ না।

জাহিদ বসে আছে। রোদ উঠছে। বাজারের পথে মানুষ হাঁটছে, কিন্তু কম। আগে এই সময়ে পথ ভরা থাকতো।

একটা সিএনজি থামলো। ফোনে বুকিং। মানুষ উঠলো, চলে গেলো। সিএনজি আগে ভাড়ায় ঘুরতো, এখন অ্যাপে চলে। চালকও ফোন দেখে, যাত্রীও ফোন দেখে। দুজনে চায়ের দোকানে থামে না।

জাহিদ চা বানালো। কারো জন্য না। এমনি। গরম চা পাত্রে রেখে দিলো।

দুপুরের পর দোকান একদম ফাঁকা। জাহিদ তাকের দিকে তাকালো। খাতা। ধুলো। "ফেরত।"

জাহিদ খাতা নামালো না। চায়ের কাপ ধুলো। পিঁয়াজুর প্লেট গোছালো। চুলায় পানি চড়ালো।

পানি ফুটছে। কেউ আসেনি। পানি ফুটতে থাকলো।

---

বিকেলে রাশিদা নিজে এলো দোকানে। হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। ভাত আর ডাল।

"খেয়ে নাও।"

জাহিদ খেলো। রাশিদা পাশে বসলো। দুজনে চুপচাপ। রাশিদা বাজার দেখলো। কম মানুষ। ফাঁকা রাস্তা। পাশের দোকানে কয়েকজন বসে আছে, ফোনে কিছু দেখছে, ওয়াইফাই ব্যবহার করছে।

রাশিদা বললো, "তুমিও ওয়াইফাই লাগাও।"

জাহিদ বললো, "চায়ের দোকান, ওয়াইফাইয়ের দোকান না।"

রাশিদা আর কিছু বললো না।

জাহিদও কিছু বললো না।

টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে রাশিদা চলে গেলো।

---

সন্ধ্যায় জাহিদ দোকান বন্ধ করলো। তালা লাগালো। রাস্তায় নামলো।

বাজারের মোড়ে একটা নতুন বিলবোর্ড। একটা ডেলিভারি অ্যাপের বিজ্ঞাপন। হাসিমুখে একটা মেয়ে ফোনে অর্ডার দিচ্ছে, দরজায় একটা ছেলে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে। নিচে লেখা: "বাজার এখন আপনার হাতে।"

জাহিদ বিলবোর্ডের দিকে তাকালো। তারপর হাঁটতে শুরু করলো। বাড়ির দিকে। পকেটে আজকের বিক্রির টাকা। বেশি না। কম না বলা যায় না। কম।

বাড়ি পৌঁছে দেখলো ছেলেমেয়ে উঠোনে খেলছে। রাশিদা রান্নাঘরে। সব স্বাভাবিক। সব ঠিক আছে। শুধু ঠিক নেই।

জাহিদ চেয়ারে বসলো। দেয়ালে রিয়াদের ছবিটা ঘরেও আছে, আরেকটা কপি। একই ক্যালেন্ডার থেকে কাটা। রাতের রিয়াদ, আলোয় ভরা।

বারো বছর আগে এই শহরে সে ইট বহন করতো। তাপমাত্রা পঞ্চাশ ডিগ্রি। ঘাম শুকিয়ে লবণ হতো গায়ে। সেই টাকায় এই দোকান। এই দোকান এখন ফাঁকা বসে থাকে বিকেলে।

জাহিদ চোখ বন্ধ করলো। ক্লান্তি না। হতাশাও ঠিক না। একটা অন্যরকম অনুভূতি, নাম নেই, শব্দ নেই। যখন সব ঠিকমতো করো, তবু কাজ হয় না, তখন যেটা হয়, সেটা।

রাতে বিছানায় শুয়ে রাশিদা বললো, "অন্য কিছু করবে?"

"চা বানাতে পারি। চা-ই বানাবো।"

রাশিদা বললো, "আমি বলছি না বন্ধ করো। আমি বলছি, আরো কিছু রাখো। বিস্কুট রাখো, সিগারেট রাখো, ফোনের ফ্লেক্সি রাখো।"

জাহিদ ভাবলো। কথাটায় বুদ্ধি আছে। রাশিদা বুদ্ধিমান মহিলা। কিন্তু জাহিদ চায়ের দোকান খুলেছে চায়ের দোকান চালাতে। মুদি দোকান চালাতে না। সে চা বানায়, চা বানাতে পারে, চা বানাবে।

"দেখি।"

"দেখো," রাশিদা বললো। ঘুমিয়ে পড়লো।

জাহিদ জেগে রইলো। ছাদের দিকে তাকিয়ে। সৌদিতেও এরকম জেগে থাকতো রাতে। তখন ভাবতো দেশে ফিরে কী করবে। এখন দেশে আছে। এখন ভাবে, কী করছে।

পরদিন সকালে জাহিদ আবার চুলা ধরালো। পানি ফুটলো। চা পাতা পড়লো। দুধ পড়লো। আদা পড়লো।

দোকানের সামনের রাস্তায় একটা ডেলিভারি মোটরসাইকেল গেলো। তার পেছনে ধুলো উড়লো। ধুলো থিতিয়ে পড়লো। রাস্তা আবার ফাঁকা।

জাহিদ চা ঢাললো কাপে। ধোঁয়া উঠলো। ধোঁয়া মিলিয়ে গেলো বাতাসে।