মিতু এখন বস
অফিসটা মিরপুরে। দোতলা বাড়ির একতলায়। তিনটা ঘর, একটা বারান্দা। বারান্দায় একটা ফ্রিজ, ভেতরে পানির বোতল আর দই। তানিয়া আপা বলে, "ডেভেলপাররা দই না খেলে কোড লেখে না।" কথাটা মজা করে বলে, কিন্তু ফ্রিজে দই থাকেই।
মিতু সকাল নয়টায় আসে। সে আগে আসতো, কিন্তু এখন তার দায়িত্ব বেশি। ঘুম দরকার। তানিয়া আপা বলেছে, "তুমি ঘুমাও। ক্লান্ত মাথায় কোড লিখলে বাগ বেশি হয়।"
মিতু এখন লিড ডেভেলপার। তিনজনের টিম। দুজন ইন্টার্ন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে, একজন জাহাঙ্গীরনগর থেকে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির দুজন: সাবরিনা আর তাসনিম। জাহাঙ্গীরনগরের ছেলেটার নাম রাকিব।
সাবরিনা ভালো কোড লেখে, কিন্তু ভয় পায়। প্রতিটা লাইনের পরে জিজ্ঞেস করে, "আপু, এটা ঠিক আছে?" মিতু বলে, "রান করো। দেখো কী হয়।" সাবরিনা রান করে। কাজ করলে হাসে। না করলে ভয় পায়। মিতু ভয়টা কমানোর চেষ্টা করে।
তাসনিম উল্টো। ভয় পায় না, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে। কোড কাজ করলেই পুশ করে দেয়। মিতু বলে, "আগে পড়ো। নিজের কোড নিজে পড়ো। তারপর পুশ।" তাসনিম শোনে, কিন্তু ভুলে যায়। আবার তাড়াহুড়ো করে। মিতু আবার বলে।
রাকিব চুপচাপ। কম কথা বলে, কম জিজ্ঞেস করে। কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করে, প্রশ্নটা ভালো হয়। মিতু রাকিবকে পছন্দ করে। চুপচাপ মানুষদের সে চেনে। সে নিজেও তাই।
প্রতি সকালে মিতু দশ মিনিট সময় নেয়। তিনজনকে বসায়। জিজ্ঞেস করে, "গতকাল কোথায় আটকেছিলে?" কেউ বললে সাহায্য করে। কেউ না বললে জোর করে না। কিন্তু পরে আলাদাভাবে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, "রাকিব, ঐ পার্সিং লজিকটা হলো?" রাকিব বলে, "হচ্ছে।" মিতু বলে, "দেখাও।" রাকিব দেখায়। মিতু দেখে বলে, "এই অংশটা আর সহজ করা যায়।" রাকিব মাথা নাড়ে।
এই দশ মিনিট কেউ বলেনি রাখতে। কোনো বইয়ে পড়েনি। মিতু নিজে বুঝেছে, সকালে দশ মিনিট কথা বললে বাকি দিনটা সহজ হয়। সমস্যা জমে না।
---
মিতু তাদের একটা জিনিস শেখায় যেটা কেউ শেখায় না।
"কোড কমেন্ট বাংলায় লেখো।"
প্রথমদিন তিনজনই অবাক হয়েছিলো।
সাবরিনা বলেছিলো, "আপু, কমেন্ট তো ইংরেজিতে লেখে সবাই।"
"ইংরেজি কমেন্ট কেউ পড়ে না। বাংলায় লেখো, মানুষ বুঝবে।"
তাসনিম বলেছিলো, "কিন্তু আপু, গিটহাবে তো..."
"গিটহাব তোমার ক্লায়েন্ট না। তোমার ক্লায়েন্ট বাংলাদেশের মানুষ। তারা বাংলা পড়ে।"
রাকিব কিছু বলেনি। পরদিন থেকে বাংলায় কমেন্ট লিখতে শুরু করেছে।
এখন তাদের কোডবেসে কমেন্ট বাংলায়। "এই ফাংশন ব্যবহারকারীর ইনপুট যাচাই করে।" "এখানে ডেটাবেস থেকে তথ্য আনা হচ্ছে।" "এই শর্তটা পূরণ না হলে ত্রুটি বার্তা দেখাবে।"
তানিয়া আপা দেখে বলেছে, "এটা ভালো।" তানিয়া আপা নিজে ইংরেজিতে কমেন্ট লেখে। কিন্তু মিতুর যুক্তি শুনে কিছু বলেনি। তানিয়া আপা এরকম, ভালো আইডিয়া হলে গ্রহণ করে, কার কাছ থেকে এসেছে দেখে না।
---
মিতু এখন টেক্সট-টু-স্পিচ টুল বানাচ্ছে। বাংলা টেক্সট ইনপুট দিলে কথা বলবে। এটা তানিয়া আপার প্রকল্পের অংশ। বাংলা ভাষায় প্রযুক্তি ব্যবহারযোগ্য করা, এটাই লক্ষ্য।
মিতুর কোড পরিষ্কার। ভেরিয়েবলের নাম অর্থবহ। ফাংশন ছোট। লজিক সোজা। এটা সে নিজে শিখেছে। কেউ শেখায়নি। ইউটিউব ভিডিও দেখে দেখে শিখেছে কোডিং, তারপর নিজের ভুল থেকে শিখেছে পরিষ্কার কোড। মিতু জানে, খারাপ কোড কাজ করে, কিন্তু ছয় মাস পরে বুঝা যায় না কী লেখা। ভালো কোড ছয় মাস পরেও পড়া যায়।
সে তিনজনকেও এটা শেখায়। "ভেরিয়েবলের নাম যেন বলে দেয় কী আছে ভেতরে। ফাংশনের নাম যেন বলে দেয় কী করে। তাহলে কমেন্টও কম লাগে।"
তাসনিম একদিন বললো, "আপু, আপনার কোড দেখলে মনে হয় কেউ গুছিয়ে কথা বলছে।"
মিতু বললো, "কোড তো কথাই। মেশিনের সাথে কথা।"
---
তানিয়া আপা মিতুকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে। টিমের কাজ, ডেডলাইন, কোড রিভিউ, সব মিতুর হাতে। তানিয়া আপা ফান্ডিং নিয়ে ব্যস্ত, পার্টনারশিপ নিয়ে ব্যস্ত। কোডের দিকটা মিতু সামলায়।
এটা আস্তে আস্তে হয়েছে। প্রথমে ছোট কাজ, তারপর বড় কাজ, তারপর পুরো দায়িত্ব। তানিয়া আপা একদিন বললো, "তুমি লিড। তোমার টিম, তোমার সিদ্ধান্ত।"
মিতু মাথা নাড়লো। বেশি কিছু বললো না। সে বেশি কিছু বলে না কখনো।
কিন্তু সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে আম্মুকে বললো। আম্মু বললো, "ভালো।" আম্মুও বেশি কিছু বলে না। মা-মেয়ে এরকম।
---
একদিন সন্ধ্যায় সবাই কাজ করছে। বারান্দায় ফ্যান চলছে। মিরপুরের সন্ধ্যা গরম। সাবরিনা আর তাসনিম পাশাপাশি বসে, রাকিব একটু দূরে। মিতু নিজের স্ক্রিনে।
সাবরিনা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, "আপু, আপনি কোথা থেকে কোডিং শিখেছেন?"
প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটাও সহজ।
"ইউটিউব। আম্মুর ভাঙা ফোনে।"
সাবরিনা চুপ করে গেলো। তাসনিমও। রাকিব স্ক্রিন থেকে মুখ তুললো, তাকালো, আবার স্ক্রিনে ফিরে গেলো।
মিতু স্ক্রিনে ফিরে গেলো। সে এটা নিয়ে গল্প করে না। এটা কোনো গল্প না। এটা যা হয়েছিলো তাই।
আম্মু গার্মেন্টসে কাজ করতো। ফোনটা পুরোনো, স্ক্রিনে চিড় ছিলো, ব্যাটারি দুই ঘণ্টা টিকতো। মিতু সেই ফোনে ইউটিউব দেখতো রাতে, যখন আম্মু ঘুমাতো। ওয়াইফাই পাশের বাড়ির। পাসওয়ার্ড জানতো, কারণ পাশের বাড়ির ছেলে একবার বলে ফেলেছিলো।
প্রথম ভিডিও ছিলো এইচটিএমএল। তারপর সিএসএস। তারপর জাভাস্ক্রিপ্ট। তারপর পাইথন। দুই বছর ধরে, প্রতি রাতে, ভাঙা ফোনে।
কিন্তু মিতু এসব বলে না। বলার কিছু নেই। সবাই কোনো না কোনোভাবে শেখে। তার পথটা এরকম ছিলো। অন্যদের অন্যরকম।
সাবরিনা সেদিন বাড়ি ফিরে তার রুমমেটকে বলেছিলো। রুমমেট বলেছিলো, "মিতু আপু কি গরিব ছিলেন?" সাবরিনা বলেছিলো, "জানি না।" আসলে গরিব শব্দটা ঠিক না। মিতুর কোনো কিছুতে গরিবের চিহ্ন নেই। তার পোশাক পরিষ্কার, তার কথা স্পষ্ট, তার কোড ঝকঝকে। কিন্তু ভাঙা ফোনে ইউটিউবে কোডিং শেখা, এটা কোনো সচ্ছল পরিবারের গল্প না।
মিতু জানে না সাবরিনা এটা নিয়ে ভেবেছে। জানলেও কিছু বলতো না। মিতু এসব নিয়ে ভাবে না। সে যা করতে পারে তাই করে। যা পারে না তা নিয়ে ভাবার সময় নেই।
---
মিতুর পেন্সিল হোল্ডারে একটা বোতাম আছে। প্লাস্টিকের, গোল, ধূসর রঙ। গার্মেন্টসের বোতাম। আম্মু একদিন ফ্যাক্টরি থেকে এনেছিলো, জামার সাথে লাগানো ছিলো না, আলগা ছিলো, মিতুকে দিয়েছিলো খেলতে। মিতু তখন ছোট। বোতামটা রেখে দিয়েছিলো। এখনো আছে।
পেন্সিল হোল্ডারে কলমের সাথে দাঁড়িয়ে আছে বোতামটা। আসলে দাঁড়িয়ে নেই, কলমের ফাঁকে গড়িয়ে পড়ে আছে। ইন্টার্নরা দেখে। তাসনিম একদিন বললো, "আপু, এই বোতামটা সুন্দর। মিনিমালিস্ট ডিজাইন।"
মিতু বললো, "হুম।"
ইন্টার্নরা ভাবে এটা ডিজাইন এলিমেন্ট। মিতু ভাবে না কিছু। বোতাম। আম্মুর ফ্যাক্টরির।
---
কাজ চলছে। টেক্সট-টু-স্পিচ টুলটা প্রায় শেষ। বাংলা টেক্সট ইনপুট দিলে একটা কৃত্রিম কণ্ঠ পড়ে শোনায়। কণ্ঠটা এখনো রোবটিক, কিন্তু বোঝা যায়। মিতু চাচ্ছে আরো স্বাভাবিক করতে। উচ্চারণের ধরন, বিরতি, ছন্দ, এগুলো ঠিক করতে হবে।
সাবরিনা উচ্চারণের মডেলে কাজ করছে। তাসনিম ইন্টারফেসে। রাকিব ডেটা পাইপলাইনে।
মিতু তিনজনের কাজ দেখে, রিভিউ করে, ফিডব্যাক দেয়। যেভাবে কেউ তাকে দেয়নি। তানিয়া আপা দিয়েছে, কিন্তু তানিয়া আপা ব্যস্ত থাকে। মিতু যখন শুরু করেছিলো, বেশিরভাগ সময় নিজে বুঝে নিয়েছে। ভুল করেছে, ঠিক করেছে, আবার ভুল করেছে।
সে চায় না তার ইন্টার্নরা সেই পথে যাক। ভুল থেকে শেখা ভালো, কিন্তু কেউ পাশে থাকলে ভুলের পরিমাণ কমে। সময় বাঁচে। হতাশা কমে।
তাই সে সময় দেয়। কোড রিভিউতে বসে, লাইন ধরে ধরে বোঝায়। "এখানে যদি ইনপুট না আসে, তাহলে কী হবে?" "এই ভেরিয়েবলটা কি সত্যিই দরকার?" "এটা সহজে লেখা যায়, দেখো।"
ইন্টার্নরা শেখে। আস্তে আস্তে। সাবরিনা এখন কম ভয় পায়। তাসনিম এখন একটু কম তাড়াহুড়ো করে। রাকিব আগের মতোই চুপচাপ, কিন্তু তার কোড আরো ভালো হচ্ছে।
---
একদিন তানিয়া আপা বললো, "মিতু, একটা মিটিংয়ে আসো। ক্লায়েন্ট প্রেজেন্টেশন।"
মিতু গেলো। ক্লায়েন্ট একটা এনজিও, গ্রামের স্কুলে বাংলা ভাষায় শিক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। তারা চাচ্ছে টেক্সট-টু-স্পিচ টুলটা তাদের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার করতে।
মিটিংয়ে তানিয়া আপা বললো, "টেকনিক্যাল প্রশ্নের উত্তর মিতু দেবে।"
মিতু দিলো। পরিষ্কার, সংক্ষেপে, প্রয়োজনীয় কথা। বেশি বললো না, কম বললো না।
এনজিওর লোকজন খুশি হলো। মিটিং শেষে একজন বললো, "আপনার টিম ভালো কাজ করছে।"
মিতু বললো, "ধন্যবাদ।"
তানিয়া আপা হাসলো। সে জানে মিতু এর বেশি বলবে না।
ফেরার পথে তানিয়া আপা বললো, "মিতু, তুমি চাইলে পরের মিটিংটা একা সামলাতে পারবে।"
মিতু বললো, "পারবো।"
তানিয়া আপা তাকালো। "তুমি কখনো 'পারবো না' বলো?"
মিতু একটু ভাবলো। "বলি। কিন্তু মনে মনে। তারপর শিখি। তারপর পারি।"
তানিয়া আপা কিছু বললো না। শুধু হাসলো। সে মিতুকে চেনে। এই মেয়ে "পারি না" বললেও পরদিন পারবে। কারণ রাতে শিখবে।
---
দুপুরে সবাই একসাথে খায়। বারান্দায়। রাশিদা আন্টি রান্না করে পাঠায়, তানিয়া আপার পরিচিত। ভাত, ডাল, সবজি, মাঝে মাঝে মাছ। এটাও তানিয়া আপার ব্যবস্থা। সে বলে, "অফিসে ভালো খাবার না থাকলে ভালো কোড হয় না।"
খাওয়ার সময় কাজের কথা হয় না। তাসনিম গল্প করে, সিনেমার কথা বলে, ইনস্টাগ্রামের কথা বলে। সাবরিনা হাসে। রাকিব খায়। মিতু শোনে।
মিতু এই সময়টা পছন্দ করে। কাজের বাইরের সময়। মানুষ যখন কাজ করে না, তখন তাদের আসল চেহারা দেখা যায়। তাসনিম হাসিখুশি, সাবরিনা লাজুক, রাকিব ভাবুক। এটা জানা দরকার। কারণ কোড লেখে মানুষ, মেশিন না।
---
রাতে বাড়ি ফিরে মিতু আম্মুর সাথে ভাত খেলো। আম্মু এখন ফ্যাক্টরিতে কাজ করে না। মিতু বারণ করেছে। মিতুর বেতন দিয়ে দুজনের চলে যায়।
আম্মু বললো, "অফিস কেমন?"
"ভালো।"
"খাও।"
মিতু খেলো। আম্মু খেলো। দুজনে চুপচাপ। টিভি চলছে, কোনো নাটক, কেউ দেখছে না।
মিতু নিজের ঘরে গেলো। ল্যাপটপ খুললো। অফিসের কাজ না। নিজের একটা প্রজেক্ট। বাংলায় একটা প্রোগ্রামিং শেখার প্ল্যাটফর্ম। যারা ইংরেজি পারে না, তাদের জন্য। পুরো বাংলায়। টিউটোরিয়াল বাংলায়, কমেন্ট বাংলায়, ডকুমেন্টেশন বাংলায়।
এটা কেউ বলেনি করতে। মিতু নিজে করছে। রাতে। অফিসের কাজের পরে।
সে জানে, কোথাও একটা মেয়ে আছে যে আম্মুর ভাঙা ফোনে ইউটিউব দেখছে, কিন্তু ইংরেজি বুঝতে পারছে না। সেই মেয়ের জন্য।
ল্যাপটপের পাশে পেন্সিল হোল্ডার। পেন্সিল হোল্ডারের ভেতরে কলম, মার্কার, আর একটা ধূসর বোতাম।
মিতু কোড লিখতে শুরু করলো। স্ক্রিনের আলো তার মুখে পড়লো। ঘরের বাকি সব অন্ধকার।