বেলালের কন্ঠে গান

পর্ব ৫৭ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

বেলাল গান গাইছে।

মাইক নেই। সাউন্ড সিস্টেম আছে, কিন্তু কাজ করছে না। চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলের বিয়ে, মণ্ডপের সামনে একশো জন বসে আছে, বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে, মহিলারা পাশের ঘরে খাচ্ছেন, পুরুষেরা এইমাত্র খেয়ে উঠেছেন। বেলাল মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে। মঞ্চ বলতে চারটা ইট দিয়ে উঁচু করা একটুকরো জায়গা, ওপরে একটা চাটাই।

সাউন্ড সিস্টেমের লোক তারের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে কিছু একটা করছে। বেলাল বলল, "থাক ভাই, এমনিই গাই।"

লোকটা বলল, "এত মানুষ, শুনবে কেমনে?"

"শোনে না হয়। গাইতে তো পারি।"

বেলাল গাইতে শুরু করল। ভাটিয়ালি। মায়ের শেখানো।

"নদীর কূল নাই, কিনার নাই, রে..."

প্রথম কয়েকটা লাইনে কেউ কান দিল না। বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে। কেউ একজন ফোনে কথা বলছে জোরে জোরে। পেছনে রান্নাঘর থেকে থালার আওয়াজ আসছে।

তারপর বেলালের গলা একটু উঁচু হলো। সুরটা ভেঙে গেল। তিস্তার পানির মতো, একটু ফাটল ধরল কন্ঠে, যেখানে উঁচু নোটে যাওয়ার কথা সেখানে গলাটা কেঁপে গেল, পুরোপুরি পৌঁছাতে পারল না।

একজন বুড়ো মানুষ, সামনের সারিতে বসা, পানের পিক ফেলতে যাচ্ছিলেন, থেমে গেলেন।

বেলাল গাইতে থাকল। গলা ভাঙছে। ভাঙুক। এই ভাঙাটাই তো গান। ফ্যাক্টরির মেশিনে কোনো কিছু ভাঙে না। মেশিন নিখুঁত। মেশিন একটুও এদিক-ওদিক করে না। কিন্তু মানুষ ভাঙে। মানুষের গলা ভাঙে, হাত ভাঙে, বুক ভাঙে। এই ভাঙাটাই মানুষের প্রমাণ।

গান শেষ হলো। পানের পিক ফেলা বুড়ো মানুষটা তালি দিলেন। আরো কয়েকজন দিল। বেশি না। বেলাল মঞ্চ থেকে নামল।

চেয়ারম্যান সাহেব এগিয়ে এসে বললেন, "ভালো গাইছ, বেলাল। পরেরবার আমার মেয়ের বিয়েতেও গাইবি।"

"জ্বি।"

"কত দিতে হবে?"

বেলাল একটু ভাবল। "যা দেন।"

চেয়ারম্যান সাহেব পাঁচশো টাকা দিলেন। বেলাল পকেটে রাখল। পাঁচশো টাকা। দুই ঘণ্টা গান গেয়ে পাঁচশো টাকা। ফ্যাক্টরিতে আট ঘণ্টা কাজ করলে পেত চারশো। হিসেব ভালো। কিন্তু ফ্যাক্টরি প্রতিদিন ছিল। গান প্রতিদিন নেই।

বেলাল ফ্যাক্টরি ছেড়েছে তিন বছর হলো। ছেড়েছে বললে ভুল হবে। ফ্যাক্টরি তাকে ছেড়েছে। রংপুরের ওই কারখানাটা, যেখানে প্লাস্টিকের চেয়ার বানাত, বন্ধ হয়ে গেল ২০২৯ সালে। মেশিন এলো। রোবট এলো। মানুষ বেরিয়ে গেল। বেলাল ছিল প্যাকিং সেকশনে। চেয়ার বাক্সে ভরত। রোবট এখন চেয়ার বাক্সে ভরে। রোবট বেলালের চেয়ে দ্রুত ভরে। রোবট ক্লান্ত হয় না। রোবটকে ঈদের বোনাস দিতে হয় না।

তিন বছর। তিন বছর বেলাল কাজ খুঁজেছে। রংপুর শহরে। বগুড়ায়। এমনকি ঢাকায় গিয়েছিল একবার, বাবার কাছে। বাবা বলেছিলেন, "এখানে থাক। গার্ডের কাজ দেখি তোর জন্য।" বেলাল দুই সপ্তাহ থেকে ফিরে এসেছিল। ঢাকায় সে ঘুমাতে পারে না। ঢাকার বাতাসে অক্সিজেন কম, মানুষ বেশি। রংপুরে অন্তত আকাশ দেখা যায়।

কাজ নেই। টাকা নেই। দিনের বেশিরভাগ সময় বেলাল বাড়িতে বসে থাকে। মা হালিমা কিছু বলেন না। মায়েরা কিছু বলেন না। মায়েরা রান্না করেন, খেতে দেন, চুপ করে থাকেন। বেলালের ছোট বোন রুমি স্কুলে যায়। বাবা ঢাকায় গার্ডের কাজ করেন। মাসে আট হাজার টাকা পাঠান। এই দিয়ে চলে।

একদিন বিকেলে বেলাল বাড়ির সামনে বসে ছিল। কিছু করছিল না। পাশের বাড়ির ছেলে রনি বলল, "বেলাল ভাই, একটা গান গাও না।"

"কেন?"

"এমনি। তুমি তো ভালো গাও।"

বেলাল ভাবল, আমি কি ভালো গাই? কে বলেছে? কেউ বলেনি। কিন্তু ছোটবেলায় মা গান গাইতেন। রাতে ঘুম পাড়ানোর সময়। বাউল গান, পল্লিগীতি, ভাটিয়ালি। বেলাল শুনত। তারপর একদিন গাইতে শুরু করল। কবে শুরু করেছিল মনে নেই। গান এমনই, শুরু হয় কিন্তু শুরুর দিনটা কেউ মনে রাখে না।

ফ্যাক্টরিতে থাকতে গান গাওয়ার সময় ছিল না। সকাল সাতটায় ঢুকত, রাত আটটায় বেরোত। তেরো ঘণ্টা। ওভারটাইম মিলিয়ে। বাড়ি ফিরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। গান? গান কখন গাইবে? গানের জন্য অলস সময় লাগে। ফাঁকা দুপুর লাগে। বিকেলের হাওয়া লাগে। ফ্যাক্টরিতে এসবের জায়গা নেই।

রনিকে বেলাল গাইল। একটা বাউল গান। লালনের। "খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।" গাইতে গাইতে বেলালের চোখ বন্ধ হয়ে গেল। মায়ের গলা শুনতে পেল। মায়ের গলাটা মোটা ছিল, একটু ভাঙা ছিল, ঠিক বেলালের মতো। বেলালের গলাও মোটা, একটু ভাঙা, উঁচু সুরে গেলে ফেটে যায়। এটা ত্রুটি। বেলাল জানে এটা ত্রুটি। কিন্তু ঠিক করে না। ঠিক করার উপায়ও জানে না, ইচ্ছাও নেই। এই ভাঙা গলাটাই তার। অন্য কারো গলা নিয়ে সে কী করবে?

রনি বলল, "বেলাল ভাই, তোমার গলায় মাটির গন্ধ আছে।"

বেলাল হাসল। মাটির গন্ধ। ভালো বলেছে।

এভাবে শুরু। পাড়ার ওয়াজ মাহফিলের আগে একটু গান, বিয়েতে একটু গান, একবার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে একজন প্রার্থী ডেকে নিল, মঞ্চে গান গাইতে বলল। বেলাল গাইল। প্রার্থী হেরে গেল, কিন্তু বেলালের গান মানুষ মনে রাখল।

ধীরে ধীরে ডাক আসতে লাগল। মাসে দুই-তিনটা অনুষ্ঠান। কোনোটায় পাঁচশো টাকা, কোনোটায় হাজার টাকা, একবার দুই হাজার পেয়েছিল, সেটা বড় একটা অনুষ্ঠান ছিল, পীরগঞ্জে। মাসে মোট পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আসে। যথেষ্ট না। কোনোভাবেই যথেষ্ট না। কিন্তু শূন্যের চেয়ে বেশি। তিন বছর শূন্য ছিল, তার সাথে তুলনা করলে পাঁচ হাজারও অনেক।

বেলাল শুধু বাংলা গান গায়। ভাটিয়ালি, বাউল, পল্লিগীতি। হিন্দি গায় না। ইংরেজি গায় না। ডিজে বাজায় না। একটা হারমোনিয়াম আছে, পুরোনো, কার কাছ থেকে কিনেছিল মনে নেই, সম্ভবত দেড়শো টাকায়। সেটা বাজায়। একটা ঢোল আছে, সেটা বাজায় রনি। রনি বেলালের সঙ্গী হয়ে গেছে। রনি কোনো বাদ্যযন্ত্র জানে না, কিন্তু ঢোল বাজাতে কী জানতে হয়? তালে তালে মারো। রনি মারে। মাঝে মাঝে তাল ভুল হয়। বেলাল কিছু বলে না।

একদিন রনি বলল, "বেলাল ভাই, ইউটিউবে দিই না?"

"কী?"

"তোমার গান। ভিডিও করে ইউটিউবে দিই।"

বেলাল ভাবল। ইউটিউব। বাবা করিম ইউটিউব দেখেন। ঢাকায় রাতে গার্ডের কাজ করতে করতে ফোনে ইউটিউব দেখেন। ওয়াজ দেখেন বেশি। মাঝে মাঝে পুরোনো বাংলা সিনেমা দেখেন।

"ভিডিও কেমনে করবি?"

"ফোনে। আমার ফোনে ক্যামেরা আছে।"

রনির ফোন পুরোনো, ক্যামেরা ঝাপসা, কিন্তু চলে। রনি একদিন বিকেলে বেলালকে বাড়ির সামনে বসিয়ে ভিডিও করল। পেছনে আমগাছ। বেলাল হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে, গাইছে। একটা ভাটিয়ালি, "আমার গহীন জলের নদী।" মায়ের শেখানো। বেলালের মা হালিমা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিলেন। কিছু বললেন না। ফিরে গেলেন।

ভিডিওটা ইউটিউবে দিল রনি। চ্যানেলের নাম রাখল "বেলালের গান।" কোনো লোগো নেই, কোনো ইন্ট্রো নেই, কোনো এডিটিং নেই। শুধু একটা ছেলে বসে আছে আমগাছের নিচে, হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে, গাইছে। পেছনে মুরগি ডাকছে।

প্রথম সপ্তাহে তেইশ ভিউ। বেলাল বলল, "তেইশ জন দেখেছে?" রনি বলল, "তেইশ জনের বারোটা আমি নিজে।" দুজনে হেসেছিল। হাসিটা ভালো ছিল। হাসিতে কোনো তিক্ততা ছিল না।

মাস যায়। ভিডিও বাড়ে। রনি প্রতি সপ্তাহে একটা করে ভিডিও দেয়। বেলাল গায়, রনি ধরে। ক্যামেরা ঝাপসা, আলো খারাপ, শব্দে বাতাসের শো শো, কিন্তু গান পরিষ্কার। বেলালের ভাঙা গলা পরিষ্কার।

একদিন একটা মন্তব্য এলো। কেউ একজন লিখেছে, "ভাইয়ের গলা কাঁচা, কিন্তু আসল। আজকাল এরকম গলা পাওয়া যায় না।"

আরেকজন লিখেছে, "উঁচু সুরে যখন গলা ভাঙে, তখন বুকে লাগে। এইটা ফিক্স কইরেন না ভাই।"

বেলাল মন্তব্যটা পড়ে চুপ করে রইল। কেউ বলছে ফিক্স করো না। ত্রুটিটাকে রাখো। বেলাল এটা ভাবেনি কোনোদিন। ত্রুটি রাখার কথা কেউ বলে? ফ্যাক্টরিতে ত্রুটি মানেই বাতিল। প্লাস্টিকের চেয়ারে একটু আঁচড় পড়লে সেটা রিজেক্ট। কিন্তু গানে? গানে ত্রুটি মানে আসল?

ছয় মাসে সাবস্ক্রাইবার হলো দুই হাজার। দুই হাজার মানুষ বেলালের গান শুনতে চায়। রংপুর থেকে, ঢাকা থেকে, কিশোরগঞ্জ থেকে, এমনকি মালয়েশিয়া থেকে একজন। প্রবাসী। লিখেছে, "ভাই, তোমার গান শুনলে দেশের কথা মনে পড়ে। চোখ ভিজে যায়।"

বেলাল চোখ ভেজায় না। বেলাল গায়।

ইউটিউব থেকে টাকা আসে না। দুই হাজার সাবস্ক্রাইবারে টাকা আসে না। চার হাজার লাগে। তারপরেও কত আসবে কে জানে। কিন্তু স্থানীয় অনুষ্ঠানে ডাক বেড়েছে। ইউটিউবে দেখে লোকে চেনে এখন। "ও, তুমি সেই বেলাল? ইউটিউবের বেলাল?" বেলাল হাসে। সে ইউটিউবের বেলাল না। সে রংপুরের বেলাল। করিমের ছেলে বেলাল। হালিমার ছেলে বেলাল। কিন্তু মানুষ যেটা চেনে সেটাই পরিচয়।

অনুষ্ঠান থেকে মাসে আট-দশ হাজার আসে এখন। যথেষ্ট না। ফ্যাক্টরির বেতনের সমান। কিন্তু ফ্যাক্টরি নেই। ফ্যাক্টরি বন্ধ। সেই ফ্যাক্টরির জায়গায় এখন একটা গুদাম। গুদামে কী থাকে বেলাল জানে না। জানার দরকারও নেই।

বেলাল যখন গায়, তার হাত কাঁপে না। ফ্যাক্টরিতে তার হাত কাঁপত। বাক্স ভরতে ভরতে, চেয়ার তুলতে তুলতে, কাঁধে ব্যথা হতো, হাত অবশ হয়ে যেত। এখন হারমোনিয়ামের ওপর আঙুল রাখলে হাত শান্ত। গান গাইলে শরীর শান্ত। গানের ভেতরে ফ্যাক্টরি নেই। গানের ভেতরে প্লাস্টিকের চেয়ার নেই। গানের ভেতরে শুধু নদী আছে, মাটি আছে, মায়ের গলা আছে।

করিম ঢাকায় বসে ভিডিও দেখেন।

রাত দুইটা। মিরপুরের একটা বিল্ডিংয়ের সামনে। করিম গার্ড। রাতের শিফট। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সকাল ছয়টা। বারো ঘণ্টা। বিল্ডিংটা নতুন, কাচের দেয়াল, ভেতরে একটা প্রযুক্তি কোম্পানির অফিস। কী করে কোম্পানিটা করিম জানে না। কম্পিউটারের কিছু একটা। দিনের বেলা তরুণ-তরুণীরা আসে, ল্যাপটপ বগলে, কফির কাপ হাতে। রাতে কেউ থাকে না। শুধু করিম। আর করিমের ছায়া।

করিম চেয়ারে বসে ফোন বের করলেন। ইউটিউব খুললেন। "বেলালের গান" চ্যানেল। নতুন ভিডিও এসেছে। বেলাল বসে আছে, সেই আমগাছের নিচে, হারমোনিয়াম কোলে। পেছনে বিকেলের আলো।

বেলাল গাইছে। পল্লিগীতি। "আমার সোনার মইনা পাখি, কইরে মইনা কথা..."

এটা হালিমার গান। হালিমা এই গানটা গাইত রাতে, ঘুম পাড়ানোর সময়। করিম শুনতেন। ঘুমিয়ে পড়তেন। ঘুমের ভেতরে গানটা থাকত।

বেলালের গলায় হালিমার গলা। একই ভাঙা জায়গায় একই ভাঙন। জিনগত। রক্তের ভেতর দিয়ে আসা। করিম গান গাইতে পারেন না। করিমের গলায় সুর নেই। কিন্তু হালিমার ছিল। বেলাল পেয়েছে মায়ের কাছ থেকে।

ভিডিওটা চার মিনিট বিশ সেকেন্ড। করিম পুরোটা দেখলেন। তারপর আবার দেখলেন। তারপর ফোন নামিয়ে রাখলেন।

মিরপুরের রাস্তা ফাঁকা। দূরে একটা কুকুর ডাকছে। বিল্ডিংয়ের কাচের দেয়ালে রাস্তার বাতির আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। করিম চেয়ারে হেলান দিলেন।

বেলালের ইউটিউব চ্যানেলে করিমের কোনো মন্তব্য নেই। একটাও না। কোনো লাইকও নেই। করিম মন্তব্য করতে জানেন। রনি দেখিয়ে দিয়েছিল একবার। কিন্তু করেন না। কী লিখবেন? "ভালো গান"? এটা তো সবাই লেখে। "আমি তোর বাবা, ভালো গাইছিস"? না। এটা ইউটিউবে লেখার জিনিস না। কিছু কিছু কথা আছে যেগুলো কোথাও লেখা যায় না। বলাও যায় না। শুধু বুকের ভেতরে রাখা যায়।

করিম প্রতিটা ভিডিও দেখেন। একটাও মিস করেন না। রাত দুইটায়, তিনটায়, যখন বিল্ডিংয়ের সামনে কেউ আসে না, যখন ঢাকা ঘুমায়, করিম ফোন বের করে ছেলের গান শোনেন। ভলিউম কম রাখেন, যেন কেউ শুনতে না পায়।

বেলাল জানে না বাবা দেখেন। রনি একদিন বলেছিল, "ভাই, তোমার বাবা দেখেন না? কোনো কমেন্ট নেই তো।" বেলাল বলেছিল, "বাবা ইউটিউব-টুটিউব বোঝেন না।" রনি আর কিছু বলেনি।

আজ সন্ধ্যায় একটা অনুষ্ঠান। রংপুর শহরের কাছে, গঙ্গাচড়ায়। একটা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। উপজেলা পরিষদ আয়োজন করেছে। বেলালকে ডেকেছে। পাঁচটা গান গাইবে। দেড় হাজার টাকা পাবে।

বেলাল হারমোনিয়ামটা কাপড়ে জড়িয়ে বাসে উঠল। রনি ঢোল নিয়ে পেছনে। বাসে জায়গা নেই, দাঁড়িয়ে গেল। হারমোনিয়ামটা কোলে ধরে রাখল।

বাসের জানালা দিয়ে রংপুরের মাঠ দেখা যাচ্ছে। শীতের পর ধান কাটা হয়ে গেছে, মাঠ ফাঁকা, শুধু নাড়া পড়ে আছে। দূরে একটা মোবাইল টাওয়ার। আরো দূরে একটা সোলার প্যানেলের সারি। রংপুর বদলাচ্ছে। সব বদলাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে পৌঁছে দেখে মঞ্চ ভালো। মাইক আছে, সাউন্ড সিস্টেম আছে, আলো আছে। দুইশো মানুষ বসে আছে। বেলাল একটু ঘাবড়ে গেল। এত মানুষের সামনে আগে গায়নি।

রনি বলল, "ভাই, ক্যামেরা সেট করি? ইউটিউবের জন্য?"

বেলাল বলল, "কর।"

রনি ফোনটা একটা চেয়ারের ওপর বসিয়ে দিল। তির্যক কোণে। ক্যামেরা ঝাপসা, আগের মতোই।

বেলাল মঞ্চে উঠল। মাইকের সামনে দাঁড়াল। হারমোনিয়াম রাখল। বসল।

গাইল। পাঁচটা গান। ভাটিয়ালি, বাউল, একটা পল্লিগীতি, একটা মুর্শিদি, শেষে একটা মায়ের শেখানো গান যেটার নাম বেলাল জানে না। মা কখনো নাম বলেনি। শুধু গাইতেন। বেলালও নাম দেয়নি। নামহীন গান। নামহীন গানের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। নাম দিলেই গান ছোট হয়ে যায়।

তৃতীয় গানে বেলালের গলা ভাঙল। সেই জায়গায়। উঁচু সুরে। গলাটা কেঁপে গেল, একটু ফেটে গেল, তারপর আবার সামলে নিল। সামনের সারিতে একজন মহিলা চোখ মুছলেন। বেলাল দেখল। কিন্তু থামল না। গান থামানো যায় না। গান শুরু হলে শেষ হতে হবে। এটাই নিয়ম।

গান শেষ। তালি। বেশ ভালো তালি। বেলাল মঞ্চ থেকে নামল। দেড় হাজার টাকা পেল।

রাতে বাড়ি ফিরে বেলাল বিছানায় শুয়ে পড়ল। ক্লান্ত। কিন্তু ভালো ক্লান্তি। ফ্যাক্টরির ক্লান্তি আলাদা ছিল। সেটা শরীরকে ভেঙে ফেলত। এই ক্লান্তি শরীরকে খালি করে। হালকা করে।

চোখ বন্ধ করল। মায়ের সেই নামহীন গানটা মাথায় ঘুরছে। সুরটা। ভাঙা জায়গাটাসহ।

ঢাকায়, মিরপুরে, একটা কাচের বিল্ডিংয়ের সামনে, করিম ফোনের স্ক্রিনে নতুন ভিডিওর নোটিফিকেশন দেখলেন। খুললেন। ভলিউম কম করলেন। দেখতে শুরু করলেন।

বেলাল গাইছে। করিম শুনছেন। দুজনের মাঝখানে তিনশো কিলোমিটার। একটা ভাঙা গলা। একটা ফোনের স্ক্রিন।

করিম মন্তব্য করলেন না। লাইক দিলেন না। শুধু দেখলেন। শেষ পর্যন্ত।