রশিদা ব্যবসায়ী

পর্ব ৫৮ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

রশিদা সুতা কাটছে।

দাঁতে সুতা ধরে টান দিল। সুতা ছিঁড়ল। ঠিক যেখানে ছেঁড়ার কথা, ঠিক সেখানে ছিঁড়ল। আঠারো বছর ধরে সুতা কাটছে রশিদা, আঙুলগুলো জানে কতটুকু টান দিলে কোথায় ছিঁড়বে। এটা কোনো বইয়ে লেখা নেই। আঙুল নিজে শিখেছে।

ঘরের এক কোণে তিনটা সেলাই মেশিন। তিনটাই চলছে। ফাতেমা, নার্গিস, আর জুলি। তিনজন শিখছে। শিখছে বললে ভুল হবে, তিনজনই এখন কাজ করে। রশিদা শেখানো শেষ করেছে। এখন তারা নিজেরা সেলাই করে, রশিদা দেখে, মাঝে মাঝে ঠিক করে দেয়।

"ফাতেমা, কলারটা একটু বাঁকা হয়ে গেছে। খোল।"

ফাতেমা খুলল। আবার করল। এবার ঠিক।

রশিদার ব্যবসা শুরু হয়েছিল একটা সেলাই মেশিন দিয়ে। জাহিদের চায়ের দোকানের পেছনের ঘরে। পাড়ার মেয়েদের ব্লাউজ সেলাই করত। পাঁচশো টাকা, হাজার টাকা। তারপর সালোয়ার-কামিজ। তারপর বিয়ের কাপড়ের কাজ। তারপর ফেসবুকে ছবি দিল। ছবি দেওয়াটা জাহিদের আইডিয়া ছিল। জাহিদ বলেছিল, "তোমার কাজ ভালো। মানুষকে দেখাও।" রশিদা দেখিয়েছিল। মানুষ দেখেছিল।

এখন রশিদার একটা ফেসবুক পেজ আছে। "রশিদার সেলাই।" ফলোয়ার চৌদ্দশো। বেশি না। কিন্তু যারা আছে তারা আসল। অর্ডার দেয়। পীরগঞ্জ থেকে, রংপুর শহর থেকে, ময়মনসিংহ থেকে, কিশোরগঞ্জ থেকে। কিশোরগঞ্জের একজন বলেছিল, "আপা, আপনার হাতের কাজ দেখে মনে হচ্ছে মেশিনে করা। কিন্তু মেশিনের চেয়ে সুন্দর।" রশিদা এটাকে প্রশংসা হিসেবে নিয়েছিল, যদিও সে নিশ্চিত না মেশিনের চেয়ে সুন্দর বলাটা ঠিক প্রশংসা কিনা।

বিকাশ শিখতে রশিদার দুই সপ্তাহ লেগেছিল। প্রথম প্রথম ভয় পেত। টাকা গায়েব হয়ে যাবে না তো? ফোনের ভেতরে টাকা থাকে, এটা একটা অদ্ভুত ধারণা। টাকা তো ধরা যায়, গোনা যায়, ভাঁজ করে পকেটে রাখা যায়। ফোনের ভেতরে টাকা রাখলে সেটা কি আসলেই টাকা? কিন্তু অভ্যাস হয়ে গেল। এখন বিকাশ ছাড়া ব্যবসা চলে না। কিশোরগঞ্জের কাস্টমার ক্যাশ পাঠাবে কেমনে? বিকাশে পাঠায়। রশিদা পায়। সহজ।

ফেসবুক মার্কেটপ্লেসটা রনি দেখিয়ে দিয়েছিল। রনি পাশের বাড়ির ছেলে, বেলালের বন্ধু, সব জানে। রশিদা মার্কেটপ্লেসে কাপড়ের ছবি দেয়, দাম লেখে, অর্ডার আসে। ডেলিভারি? ডেলিভারির জন্য জাহিদের চায়ের দোকান। কাস্টমার আসে জাহিদের দোকানে, প্যাকেট নিয়ে যায়। দূরের কাস্টমারের জন্য কুরিয়ার। সুন্দরবন কুরিয়ার। পীরগঞ্জ থেকে যেকোনো জায়গায় পৌঁছে যায়।

এর কোনোটাতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেই। কোনো অ্যাপ নেই। কোনো অ্যালগরিদম নেই। শুধু একটা ফোন, একটা বিকাশ একাউন্ট, একটা ফেসবুক পেজ, আর রশিদার হাত। এটাই যথেষ্ট।

আজ মাসের শেষ। রশিদা খাতা খুলল।

খাতাটা একটা সাধারণ স্কুলের খাতা। নীল মলাট। ভেতরে রশিদা নিজের হিসেব রাখে। কোন কাস্টমার কত দিয়েছে, কাপড়ের খরচ কত, সুতার খরচ কত, কুরিয়ারের খরচ কত। প্রতিটা অর্ডারের হিসেব আলাদা আলাদা। পরিষ্কার হাতের লেখা। রশিদা ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে, কিন্তু হিসেব ভালো পারে। হিসেব পারার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয় না। হিসেব পারার জন্য প্রয়োজনের চাপ যথেষ্ট।

এই মাসে আয়: আঠারো হাজার তিনশো টাকা।

রশিদা সংখ্যাটা দেখল। তারপর আবার দেখল। আঠারো হাজার তিনশো। গত মাসে ছিল ষোলো হাজার। তার আগের মাসে চৌদ্দ হাজার। বাড়ছে। ধীরে ধীরে, কিন্তু বাড়ছে।

জাহিদের চায়ের দোকানের আয়: পনেরো হাজার। কম-বেশি। কখনো তেরো, কখনো ষোলো। কিন্তু গড়ে পনেরো। রশিদা জানে কারণ জাহিদও খাতা রাখে। জাহিদের খাতা লাল মলাটের। দুটো খাতা একই তাকে থাকে। রশিদার নীল, জাহিদের লাল। পাশাপাশি।

আঠারো হাজার আর পনেরো হাজার। রশিদা মুখে কিছু বলল না। বলার কিছু নেই। এটা প্রতিযোগিতা না। জাহিদ তার স্বামী, তার প্রতিদ্বন্দ্বী না। কিন্তু সংখ্যাগুলো সংখ্যাই। সংখ্যা মিথ্যা বলে না। সংখ্যা জানে না কে স্বামী কে স্ত্রী। সংখ্যা শুধু বড়-ছোট বোঝে।

রশিদা খাতা বন্ধ করে তাকে রাখল। জাহিদের লাল খাতার পাশে। দুটো খাতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ।

রাতে জাহিদ দোকান থেকে ফিরল। হাত-মুখ ধুয়ে ভাত খেতে বসল। রশিদা ভাত বাড়ল। মাছের ঝোল, আলু ভর্তা, শুকনো মরিচ ভাজা।

"দোকান কেমন ছিল আজ?"

"বাজার দিন না, একটু কম ছিল।" জাহিদ ভাত মাখছে। "তোমার?"

"দুইটা অর্ডার এসেছে। একটা ময়মনসিংহ থেকে। সালোয়ার-কামিজ। আরেকটা পীরগঞ্জ থেকে। ব্লাউজ।"

জাহিদ মাথা নাড়ল। কিছু বলল না।

খেতে খেতে জাহিদ বলল, "ফাতেমা ভালো করছে?"

"হ্যাঁ। ফাতেমা এখন নিজে নিজে সালোয়ার করতে পারে। নার্গিসও পারে। জুলি একটু ধীর, কিন্তু শিখছে।"

"তিনজনকে কত দাও?"

"প্রতিজনকে চার হাজার। পিস রেটে। যত বেশি করবে তত বেশি পাবে।"

জাহিদ হিসেব করল মনে মনে। তিনজনকে বারো হাজার। রশিদার আয় আঠারো হাজার। মানে রশিদার নিজের আয় ছয় হাজার। কিন্তু না, কাপড়ের খরচ, সুতার খরচ, কুরিয়ার খরচ বাদ দিলে আঠারো হাজারই নেট। শ্রমিকদের টাকা আলাদা। মানে রশিদা আসলে আঠারো হাজার নেট আয় করে, তার ওপরে তিনজনকে বারো হাজার দেয়, মোট ব্যবসার আয়তন ত্রিশ হাজার।

জাহিদের দোকান: পনেরো হাজার, তার মধ্যে চিনি-দুধ-চা পাতার খরচ বাদ দিলে নেট আট-নয় হাজার।

জাহিদ ভাত খেতে থাকল। মাছের কাঁটা বেছে রাখল পাশে।

"ভালো করছ," জাহিদ বলল।

রশিদা বলল, "তোমারটাও ভালো চলছে।"

এটা পুরোপুরি সত্য না। জাহিদের দোকান ভালো চলছে না। দোকানে আগের মতো মানুষ আসে না। গ্রামে মানুষ কমেছে। যুবকরা ঢাকায় গেছে, বিদেশে গেছে। যারা আছে তারা বাড়িতে চা বানায়। চায়ের দোকানে চা খাওয়াটা একটা সামাজিক কাজ ছিল, মানুষ আসত আড্ডা দিতে, চা ছিল অজুহাত। এখন আড্ডা মোবাইলে হয়। ফেসবুকে হয়। চায়ের দোকানের প্রয়োজন কমছে।

জাহিদ এটা জানে। রশিদাও জানে। কেউ মুখে বলে না।

ভাত খাওয়া শেষ। জাহিদ বারান্দায় গেল। রশিদা থালাবাসন ধুতে লাগল। বারান্দা থেকে জাহিদ দেখতে পাচ্ছে ঘরের ভেতরে ফাতেমার মেশিনটা দাঁড়িয়ে আছে। কাপড়ে ঢাকা। কাল সকালে আবার চলবে। ফাতেমা আসবে, নার্গিস আসবে, জুলি আসবে। তিনজন মেয়ে রশিদার কাছে আসবে কাজ করতে। রশিদা অর্ডার বুঝিয়ে দেবে। তারা সেলাই করবে। রশিদা দেখবে।

জাহিদ ভাবল, আমার দোকানে কেউ আসে না শিখতে। চা বানানো শেখার কিছু নেই। চা বানানো সবাই পারে। কিন্তু সেলাই? সেলাই সবাই পারে না। রশিদা পারে। রশিদা শেখাতেও পারে।

জাহিদ মনে মনে বলল, ভালোই তো। ভালো না?

ভালোই। নিশ্চয়ই ভালো। স্ত্রীর ব্যবসা ভালো চলছে, এটা তো ভালো কথা। ভালো না হলে কী? রশিদা কি না খেয়ে থাকুক? না। জাহিদ চায় রশিদা ভালো করুক। চায়। অবশ্যই চায়।

কিন্তু রাতে বিছানায় শুয়ে জাহিদের ঘুম আসে না। কারণ কী সে জানে না। জানতে চায়ও না।

ছাদের ওপর লাউগাছ। লাউগাছটা এমনিতেই হয়েছিল। রশিদা একটা লাউয়ের বীজ ফেলেছিল ছাদের কোণে, মাটি দিয়েছিল, পানি দিয়েছিল, তারপর ভুলে গিয়েছিল। লাউগাছ ভোলে না। লাউগাছ বেড়ে উঠেছিল। মাচা ছাড়াই ছাদের ওপর ছড়িয়ে গিয়েছিল। জাহিদ বাঁশ দিয়ে একটা মাচা বানিয়ে দিয়েছিল। এখন লাউগাছটা মাচা ভরে গেছে। ছাদের অর্ধেকটা সবুজ।

লাউ ধরে। অনেক ধরে। রশিদার পরিবারে লাউ খাওয়ার লোক বেশি না। জাহিদ লাউ খান, কিন্তু প্রতিদিন খেতে চান না। ছেলে-মেয়ে লাউ দেখলে মুখ বিকৃত করে। রশিদা নিজেও প্রতিদিন লাউ রান্না করতে চায় না।

তাই রশিদা লাউ বিলি করে। পাশের বাড়িতে, সামনের বাড়িতে, রাস্তার ওপাশের বাড়িতে। "নেন, লাউ নেন।" কেউ বলে, "আরে, আবার? গতকালও তো দিলা।" রশিদা বলে, "গাছে ধরে, আমি কী করব?" লাউগাছের সমস্যা হলো এটা শোনে না। তুমি যতই বলো যথেষ্ট হয়েছে, লাউগাছ তার নিজের ছন্দে ধরতে থাকে।

শাশুড়ি আগে অভিযোগ করতেন। সবকিছু নিয়ে। রশিদার রান্না নিয়ে, ঘর গোছানো নিয়ে, সেলাই মেশিনের আওয়াজ নিয়ে, ছেলেমেয়েদের লালনপালন নিয়ে। শাশুড়ি অভিযোগ করা একটা শিল্প মনে করতেন, এবং তিনি সেই শিল্পে পারদর্শী ছিলেন।

কিন্তু লাউ দেওয়া শুরু করার পর শাশুড়ি থামলেন। পুরোপুরি না। কিন্তু অনেকটা। কারণ রশিদা শাশুড়িকেও লাউ দেয়। বড় বড় লাউ। শাশুড়ি লাউ দিয়ে ঘণ্ট রান্না করেন। শাশুড়ির লাউয়ের ঘণ্ট পাড়ায় বিখ্যাত। লাউটা রশিদার ছাদ থেকে আসে, এটা শাশুড়ি কাউকে বলেন না। কিন্তু রশিদাকে আর আগের মতো বলেন না, "বউমা, তোমার সেলাই মেশিনের আওয়াজে আমার মাথা ধরে।" এখন বলেন, "বউমা, পরশু একটা লাউ দিও। মেহমান আসবে।"

লাউ একটা কূটনৈতিক অস্ত্র, রশিদা আবিষ্কার করেছে।

সকালে রশিদা ফোন খুলল। ফেসবুক পেজে তিনটা মেসেজ।

একটা ময়মনসিংহ থেকে। "আপা, আগের সালোয়ার-কামিজটা এত সুন্দর হয়েছে, আরেকটা চাই। এবার সবুজ রঙে।"

একটা কিশোরগঞ্জ থেকে। "আপা, ব্লাউজের মাপ পাঠাচ্ছি। একটু তাড়াতাড়ি হলে ভালো, বিয়ে আছে।"

একটা রংপুর শহর থেকে। "রশিদা আপা, আপনি কি শাড়ির ব্লাউজে হাতের কাজ করেন? নকশীকাঁথার মতো?"

রশিদা তৃতীয় মেসেজটা পড়ে ভাবল। নকশীকাঁথার কাজ সে পারে। মা শিখিয়েছিলেন। কিন্তু ব্লাউজে? সেটা আলাদা। ছোট জায়গায় সূক্ষ্ম কাজ। সময় বেশি লাগবে। দাম বেশি নিতে হবে। কাস্টমার দেবে?

রশিদা লিখল, "করি। দাম একটু বেশি হবে। হাতের কাজ সময় নেয়।"

উত্তর এলো, "কত?"

"দেখতে হবে নকশা। ছবি পাঠান কেমন চান।"

রশিদা ফোন রেখে সেলাই মেশিনের সামনে বসল। ফাতেমা এসে গেছে। নার্গিস আসছে একটু পরে। জুলি আজ আসবে না, তার মেয়ের জ্বর।

"ফাতেমা, এই অর্ডারটা তুমি করো। সালোয়ার-কামিজ। মাপ এইখানে।"

ফাতেমা মাপ নিয়ে কাজ শুরু করল। রশিদা নিজে আরেকটা অর্ডারে হাত দিল। কিশোরগঞ্জের ব্লাউজ। বিয়ের জন্য। তাড়াতাড়ি চাই।

রশিদা কাপড় কাটতে শুরু করল। কাঁচিটা পুরোনো, কিন্তু ধার আছে। রশিদা প্রতি সপ্তাহে ধার দেয়। কাঁচি ধারালো না থাকলে কাটা সোজা হয় না। কাটা সোজা না হলে সেলাই সোজা হয় না। সেলাই সোজা না হলে কাপড় সুন্দর হয় না। সবকিছু কাঁচি থেকে শুরু।

দুপুরে খাওয়ার বিরতি। ফাতেমা আর নার্গিস ভাত খেল। রশিদা ভাত খেয়ে খাতাটা খুলল। আজকের অর্ডার লিখল। কলামগুলো পরিষ্কার: তারিখ, কাস্টমার, জিনিস, মাপ, দাম, ডেলিভারি তারিখ, পেমেন্ট স্ট্যাটাস। প্রতিটা অর্ডার একটা লাইন। প্রতিটা লাইন একটা গল্প। কোন মেয়ে কোন উপলক্ষে কী বানাচ্ছে, সেটা লাইনে লেখা থাকে না, কিন্তু রশিদা মনে রাখে।

খাতার শেষ পাতায় মাসিক হিসেব। মার্চ মাস: আঠারো হাজার তিনশো।

রশিদা পাতাটা একবার দেখে খাতা বন্ধ করল। তাকে রাখল। জাহিদের লাল খাতার পাশে।

সন্ধ্যায় রশিদা ছাদে উঠল। লাউগাছ দেখতে। দুটো লাউ পেকেছে। কাল পাড়বে। একটা শাশুড়িকে দেবে, একটা পাশের বাড়িতে।

ছাদ থেকে পীরগঞ্জ দেখা যায়। ছোট শহর। দূরে মসজিদের মিনার। তার পাশে মোবাইল টাওয়ার। আরো দূরে মাঠ, সবুজ, ধানের চারা বড় হচ্ছে। আকাশে পাখি ফিরছে। সন্ধ্যা হচ্ছে।

রশিদা ভাবল, তিন বছর আগে সে কী ছিল। জাহিদের স্ত্রী। করিমের বন্ধুর বউ। পাড়ার একজন। ঘরে বসে থাকত। রান্না করত, ঘর মুছত, বাচ্চা সামলাত। সেলাই করত, কিন্তু সেটা শখ ছিল, কাজ ছিল না।

এখন সে রশিদা। ফেসবুকে "রশিদার সেলাই।" তিনটা মেয়ে তার কাছে কাজ করে। চার জেলায় তার কাস্টমার আছে। আঠারো হাজার টাকা মাসে আয় করে। বিকাশে টাকা আসে। কুরিয়ারে কাপড় যায়। এটা কি ব্যবসা? ছোট ব্যবসা। খুবই ছোট। কিন্তু এটা তার।

রশিদার ব্যবসায় কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেই। কোনো অ্যালগরিদম তাকে বলে দেয়নি কোন কাপড় বানাতে হবে। কোনো অ্যাপ তাকে শেখায়নি কীভাবে সেলাই করতে হয়। সে নিজে শিখেছে। মায়ের কাছে, তারপর নিজে নিজে। ভুল করে করে শিখেছে। কাপড় নষ্ট করে শিখেছে। আঙুলে সুই ফুটিয়ে শিখেছে।

তার হাতটা তুলে দেখল। ডান হাতের তর্জনীতে একটা পুরোনো দাগ। সুইয়ের দাগ। প্রথম দিনের। সেই দাগটা থেকে গেছে। চলেও গেছে, কিন্তু রশিদা দেখতে পায়। অন্য কেউ দেখতে পায় না।

নিচে জাহিদ দোকান বন্ধ করছে। শাটার নামাচ্ছে। শাটারের আওয়াজ ছাদ পর্যন্ত আসছে। পুরোনো আওয়াজ। প্রতিদিনের আওয়াজ।

রশিদা ছাদ থেকে নামল। রান্নাঘরে ঢুকল। ভাত বসাতে হবে। আঠারো হাজার টাকা আয় করুক আর আঠারো লাখ, সন্ধ্যায় ভাত বসাতে হয়।

রাতে, বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে, রশিদা খাতা খুলল। আজকের অর্ডারগুলো আবার দেখল। কলমটা ঘোরাল। মার্চের হিসেবের পাশে ছোট করে লিখল, "নকশীকাঁথার কাজ শুরু করব।" তারপর খাতা বন্ধ করল।

তাকে রাখল। জাহিদের খাতার পাশে। দুটো খাতা। একটা নীল। একটা লাল। একই তাক। একই ঘর। একই ছাদ, যেখানে লাউগাছ চুপচাপ বেড়ে যাচ্ছে, কারো অনুমতি না নিয়ে।