নতুন নিয়মে পুরোনো মানুষ

পর্ব ৬০ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৮

সাত বছর।

সাত বছর আগে একটা শব্দ এসেছিলো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। শব্দটা বড়। মুখে আনতে গেলে জিভ আটকে যায়। কিন্তু শব্দটা এসেছিলো, আর থেকে গেছে। পানির মতো। পানি ঢাললে মাটিতে চলে যায়, দেখা যায় না, কিন্তু মাটি ভেজা থাকে। এই শব্দটাও তেমন। কেউ আর উচ্চারণ করে না প্রতিদিন, কিন্তু সব কিছুতে ভেজা।

সাত বছরে কী হলো? সরকার বলেছিলো, ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে। বিনিয়োগকারীরা বলেছিলো, বিলিয়ন ডলার আসবে। পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছিলো, "চতুর্থ শিল্পবিপ্লব।" সেমিনারে বক্তারা বলেছিলেন, "আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।"

কেউ প্রস্তুত হলো কি?

এটা সেই গল্প না। এটা সেই গল্প যেখানে মানুষ যা করলো, সেটা কেউ আগে ভাবেনি। কেউ পরিকল্পনা করেনি। কোনো কমিটির রিপোর্টে ছিলো না। কোনো বিনিয়োগকারীর পিচ ডেকে ছিলো না।

মানুষ তার মতো করে বেঁচে রইলো। এইটুকুই।

---

রহিমা সাইকেল চালায়।

ঢাকার রাস্তায় সকাল আটটায় সাইকেল চালানো সহজ না। বাস আছে, রিকশা আছে, সিএনজি আছে, মানুষ আছে, গরু আছে, আর আছে রহিমা। সাইকেলে। পেছনে ব্যাগ। ব্যাগে তিনটা অর্ডার।

মিরপুর রোডে একটা বিলবোর্ড। নতুন লাগিয়েছে। বড়, চকচকে, নীল রঙের পটভূমিতে সাদা অক্ষরে কিছু লেখা। রহিমা পড়তে পারে না। মানে, ইংরেজি পড়তে পারে না। বিলবোর্ডটা ইংরেজিতে। "AI Jobs: Bangladesh's Future Workforce" লেখা। নিচে ছোট ছোট লোগো, বড় বড় কোম্পানির নাম।

রহিমা বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে চলে যায়। বিলবোর্ড রহিমার দিকে তাকায় না। রহিমাও বিলবোর্ডের দিকে তাকায় না। দুজনের কারো কারো প্রতি কোনো দায় নেই।

রহিমার বয়স চুয়াল্লিশ। গার্মেন্টস থেকে বেরিয়ে পাঁচ বছর হলো। এখন ডেলিভারি দেয়। অ্যাপে কাজ পায়, অ্যাপে টাকা পায়। মাসে যা আসে, তাতে চলে। আগের চেয়ে কম। কিন্তু কারখানায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না দশ ঘণ্টা। পিঠ ব্যথা করতো। এখন সাইকেল চালায়, পিঠ ব্যথা অন্যরকম।

সাইকেলের চেইন একটু ঢিলে হয়ে গেছে। আজকে ঠিক করাতে হবে। মেকানিক নূরু মিয়ার কাছে। নূরু মিয়া পঞ্চাশ টাকায় করে দেবে। পঞ্চাশ টাকা। একটা ডেলিভারির আয়।

রহিমা সাইকেল চালায়। সামনে তাকিয়ে।

---

করিম রাতের শিফটে বসে আছে।

গাজীপুরের কোল্ড স্টোরেজ। রাত এগারোটা। চারপাশে যন্ত্রের গুনগুন। কম্প্রেসার চলছে, কুলিং ইউনিট চলছে, কোথাও একটা পাইপ থেকে পানি টপটপ করে পড়ছে। করিম একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে। হাতে টর্চ। পাশে রেডিও। রেডিও বন্ধ। ব্যাটারি শেষ, নতুন ব্যাটারি কিনবে পরশু, বেতনের পর।

করিমের কাজ হলো পাহারা দেওয়া। কী পাহারা দেয় সেটা সে পুরোপুরি বোঝে না। ভেতরে মেশিন আছে, সেন্সর আছে, কম্পিউটারের পর্দায় সবুজ আর লাল আলো জ্বলে। করিমকে বলা হয়েছে, যদি লাল আলো জ্বলে, ফোন করবে ম্যানেজারকে। কিন্তু লাল আলো কখনো জ্বলেনি। দুই বছরে একবারও না।

করিম যন্ত্র বোঝে না। কিন্তু করিম দরজায় বসে। করিম আছে। এইটুকুই তার কাজ। থাকা।

পঞ্চান্ন বছর বয়সে রংপুর থেকে এসে এই চেয়ারে বসা, এটা কি করিম কল্পনা করেছিলো? না। করিম কল্পনা করেছিলো ধানের ক্ষেত। বৃষ্টির গন্ধ। হালিমার রান্নার ধোঁয়া। সেসব আছে, রংপুরে আছে, কিন্তু করিম গাজীপুরে। করিম এখানে। যন্ত্রের পাশে। যন্ত্র যা করে, করিম তা বোঝে না। কিন্তু করিম পাহারা দেয়। রাতে কেউ না কেউ তো থাকতে হবে। মেশিনের পাশে মানুষ লাগে। কেন লাগে সেটা কেউ পরিষ্কার করে বলেনি।

---

তানিয়া ঘুমায়।

রাত বারোটায় তানিয়া ঘুমিয়ে পড়ে। আগে রাত তিনটায় ঘুমাতো। ক্লায়েন্টের মেইল, ডেডলাইন, রিভিশন, কল, আরেকটা কল। প্রযুক্তি খাতে কাজ করলে ঘুমের সময় থাকে না। তানিয়া প্রযুক্তি খাতে কাজ করতো।

এখন তানিয়া সেলাই মেশিনের যন্ত্রাংশ বিক্রি করে। নেটে না, মানুষের কাছে। গাজীপুরের কারখানাগুলোতে যায়, কী লাগবে জিজ্ঞেস করে, সাপ্লায়ারের কাছ থেকে আনে, দিয়ে আসে। মাঝখানে একটু লাভ। আগের চেয়ে কম আয়। অনেক কম। কিন্তু রাত বারোটায় ঘুমায়।

তানিয়া একদিন হিসাব করেছিলো। প্রযুক্তি কোম্পানিতে যা আয় করতো, তার থেকে এখন পঁয়তাল্লিশ ভাগ কম আসে। পঁয়তাল্লিশ ভাগ। কিন্তু তানিয়ার মুখে ব্রণ নেই। তানিয়ার হাত কাঁপে না। তানিয়া রাতে জেগে উঠে ফোন চেক করে না।

এটা কি সাফল্য? তানিয়া জানে না। এটা কি ব্যর্থতা? সেটাও জানে না। তানিয়া শুধু জানে, ঘুম ভালো হচ্ছে। শরীর ভালো আছে। মা বলেছিলেন, "তানিয়া, তুই আবার মানুষের মতো দেখতে লাগছিস।"

মানুষের মতো দেখতে লাগা। এটা একটা অর্জন, তাই না?

---

জাহিদ চা বানায়।

নেত্রকোনা বাজারে জাহিদের দোকান। টিনের চাল, বাঁশের খুঁটি, কাঠের বেঞ্চ। আগে বেঞ্চে পাঁচজন বসতো, এখন দুইজন বসে। কখনো কেউ বসে না। জাহিদ তবু চা বানায়। সকালে চুলা ধরায়, পানি ফোটায়, চা পাতা দেয়, দুধ দেয়, আদা দেয়।

বাজারে মানুষ কম আসে। অ্যাপে বাজার হয়। ডেলিভারি ছেলে মোটরসাইকেলে আসে, ব্যাগ দিয়ে যায়। মানুষের হেঁটে বাজারে আসার দরকার কমেছে। হেঁটে না এলে জাহিদের দোকানের সামনে দিয়ে যায় না। সামনে দিয়ে না গেলে চায়ের গন্ধ পায় না। গন্ধ না পেলে থামে না।

জাহিদ চা বানায়। খদ্দের আসুক না আসুক।

বিকেলে একটা ছেলে এলো। বছর বারো-তেরো হবে। একটা চা খেলো। দশ টাকা দিলো। চলে গেলো। জাহিদ চায়ের কাপ ধুলো। আরেকটা চা ঢাললো। নিজের জন্য। বসলো বেঞ্চে।

দোকানের সামনে রাস্তা। রাস্তায় একটা কুকুর শুয়ে আছে। কুকুরটা জাহিদকে চেনে। জাহিদ মাঝে মাঝে ভাতের ফেন দেয়। কুকুরটা জাহিদের দোকানের সামনে শুয়ে থাকে। কুকুরের কোনো অ্যাপ নেই, কোনো ডেলিভারি নেই, কোনো তাড়া নেই।

---

সেলিনা হাঁটছে।

ভোলার চরে। পায়ে স্যান্ডেল। কাঁধে ব্যাগ। ব্যাগে ওষুধ, ব্যান্ডেজ, থার্মোমিটার, একটা পুরোনো রক্তচাপ মাপার যন্ত্র। সেলিনা স্বাস্থ্যকর্মী। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে বেরিয়েছে সকালে। তিনটা বাড়িতে যাবে। প্রথম বাড়ি আধা ঘণ্টার হাঁটা।

সেলিনার ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। চরে টাওয়ার কম। যে টাওয়ার আছে, সেটা থেকে সিগন্যাল আসে, কখনো আসে না। সেলিনার কাজে নেটওয়ার্ক লাগার কথা ছিলো। সরকার একটা অ্যাপ দিয়েছিলো, রোগীর তথ্য লিখতে হবে, ছবি তুলতে হবে, আপলোড করতে হবে। অ্যাপটা খোলে, তারপর ঘুরতে থাকে, তারপর বন্ধ হয়ে যায়। নেটওয়ার্ক নেই তো আপলোড হবে কী করে।

সেলিনা খাতায় লেখে। কলম দিয়ে। রোগীর নাম, বয়স, সমস্যা, কী ওষুধ দিলো। খাতাটা মোটা হয়ে যাচ্ছে। পাতা শেষ হলে নতুন খাতা কিনবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ। সেলিনা হাসে না, রাগ করে না। সেলিনা হাঁটে। পায়ের নিচে নরম কাদা। গতকাল বৃষ্টি হয়েছিলো। চরের মাটি ভেজা। স্যান্ডেলে কাদা ঢুকছে।

সেলিনা হাঁটে। রোগী অপেক্ষা করছে। ওয়াইফাই না থাকলেও রোগী আছে। রোগী সব সময় আছে।

---

মিতু কোড লেখে।

রাজশাহীতে। নিজের ঘরে। ল্যাপটপে। মিতুর বয়স বাইশ। কম্পিউটার সায়েন্স পড়েছে। চাকরি পায়নি। ঢাকায় গিয়ে ইন্টার্নশিপ করেছিলো, ছয় মাস বিনা বেতনে। তারপর ফিরে এসেছে। রাজশাহীতে সফটওয়্যার কোম্পানি নেই। থাকলেও মিতুকে নেবে না। মিতু মেয়ে। রাজশাহীতে মেয়ে প্রোগ্রামার ধারণাটাই অনেকের কাছে আজগুবি।

মিতু নিজে একটা জিনিস বানাচ্ছে। বাংলায় প্রোগ্রামিং শেখার একটা প্ল্যাটফর্ম। ইংরেজিতে হাজারটা আছে, বাংলায় নেই। মিতু বানাচ্ছে। কেউ বলেনি বানাতে। কোনো ফান্ডিং নেই। কোনো টিম নেই। মিতু একা।

কোডের ভাষা ইংরেজি। কিন্তু মিতু যা বানাচ্ছে, সেটা বাংলায় কথা বলে। "তুমি একটা ভেরিয়েবল বানাও। ভেরিয়েবলের নাম দাও 'নাম'।" এভাবে। মিতু মনে করে, প্রযুক্তি যদি বাংলায় না আসে, তাহলে বাংলার মানুষের কাছে কখনো পৌঁছাবে না।

মিতুর মা জিজ্ঞেস করেন, "এটা করে কী হবে?"

মিতু বলে, "জানি না।"

সত্যি জানে না। হয়তো কিছু হবে। হয়তো কিছু হবে না। হয়তো কেউ ব্যবহার করবে, হয়তো কেউ করবে না। কিন্তু মিতু বানাচ্ছে। রাতে। রাজশাহীতে। নিজের ঘরে।

---

বেলাল গান গায়।

চাঁদপুরে। নদীর ধারে। সন্ধ্যায়। বেলালের গলায় ভৈরবী। লোকগান। পুরোনো গান। বেলালের দাদা গাইতেন, বেলালের বাবা গাইতেন, এখন বেলাল গায়।

বেলাল ইউটিউবে গান দেয়। একটা চ্যানেল আছে। সাবস্ক্রাইবার তিনশো। তিনশো। তিন হাজার না, তিন লক্ষ না, তিনশো। মাসে যা আসে ইউটিউব থেকে, সেটা দিয়ে এক কেজি চাল কেনা যায় না।

কিন্তু বেলাল গায়।

কেন গায়? কারণ গান গাইতে ভালো লাগে। এর বাইরে কোনো কারণ নেই। কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নেই, কোনো মনিটাইজেশন স্ট্র্যাটেজি নেই, কোনো ব্র্যান্ড কোলাবোরেশন নেই। বেলাল গান গায় কারণ বেলাল গান গায়।

সন্ধ্যায় নদীর ধারে বসে বেলাল গায়। কয়েকটা মানুষ দাঁড়িয়ে শোনে। কেউ চেনে, কেউ চেনে না। বেলাল গাইতে থাকে। নদী বইতে থাকে। দুটোই পুরোনো, দুটোই চলতে থাকে, কারো অনুমতি ছাড়া।

---

রশিদা টাকা গোনে।

নেত্রকোনায়। নিজের দোকানে। সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে রশিদা হিসাব করে। আজ কত আয় হলো। কত খরচ হলো। কত বাকি রইলো। রশিদা নিজে হিসাব করে। খাতায়। কলমে।

আগে জাহিদ হিসাব করতো। রশিদার টাকা জাহিদের হাতে থাকতো। জাহিদ ভালো মানুষ, খারাপ কিছু করেনি, কিন্তু টাকাটা জাহিদের হাতে থাকতো। রশিদার জানা থাকতো না ঠিক কত আছে, কত যাচ্ছে, কত আসছে।

এখন রশিদা নিজে জানে। প্রতিটা টাকা। প্রতিটা খরচ। রশিদা একটা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খুলেছে। নিজের নামে। জাহিদ জানে, আপত্তি নেই। কিন্তু অ্যাকাউন্ট রশিদার।

রশিদার দোকানে কাপড় বিক্রি হয়। সেলাইয়ের কাপড়, তৈরি জামা, কিছু শাড়ি। ছোট দোকান। কিন্তু রশিদার নিজের। রশিদা নিজে কেনে, নিজে বিক্রি করে, নিজে হিসাব রাখে।

সন্ধ্যায় টাকা গুনে রশিদা সন্তুষ্ট। বেশি না। কিন্তু নিজের। এই "নিজের" শব্দটা রশিদার কাছে অনেক বড়। আগে কিছুই নিজের ছিলো না। এখন কিছু আছে। অল্প, কিন্তু আছে।

---

১০

বিকেলে।

নেত্রকোনা বাজারের পাশে একটা খোলা মাঠ। মাঠে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে একটা ছেলে। বছর দশ-এগারো হবে। ময়লা শার্ট, খালি পা। ঘুড়িটা পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে বানানো। কাগজটা ছেঁড়া ছেঁড়া। তাতে একটা শিরোনাম দেখা যাচ্ছে, অর্ধেক ছেঁড়া: "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাংলাদেশ..." বাকিটা ছিঁড়ে গেছে। ঘুড়ির লেজ হয়ে দুলছে।

ঘুড়ি উড়ছে। বাতাস ভালো। ছেলেটা সুতো টানছে, ছাড়ছে, টানছে। ঘুড়ি উপরে যাচ্ছে। ঘুড়ি কাগজের শিরোনাম পড়ে না। ঘুড়ি জানে না তাতে কী লেখা। ঘুড়ি শুধু ওড়ে। বাতাস পেলে ওড়ে, না পেলে পড়ে যায়। এইটুকুই।

ছেলেটা হাসছে। ঘুড়ি ওড়াতে পারলে ছেলেরা হাসে। এটা পুরোনো ব্যাপার। এটা বদলায়নি। এটা বদলাবে না।

---

১১

সাত বছর আগে সরকার বলেছিলো, মানুষ রিট্রেনিং করবে। নতুন দক্ষতা শিখবে। ডিজিটাল শ্রমিক হবে। পুরোনো পেশা ছেড়ে নতুন পেশা নেবে। গ্রাম থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আসবে। কৃষক কোডার হবে। গার্মেন্টস শ্রমিক ডাটা এন্ট্রি করবে। সবাই ল্যাপটপ খুলবে, সবাই ইন্টারনেটে ঢুকবে, সবাই নতুন পৃথিবীতে জায়গা করে নেবে।

বিনিয়োগকারীরা বলেছিলো, বাজার তৈরি হচ্ছে। কোটি কোটি মানুষ, সস্তা শ্রম, ইংরেজি জানে (জানে কি?), তরুণ জনগোষ্ঠী। রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট দুই বছরে। তিন বছরে ব্রেক ইভেন। পাঁচ বছরে মুনাফা।

সাত বছর হলো।

রহিমা কোডার হয়নি। রহিমা সাইকেলে ডেলিভারি দেয়। করিম ডাটা এন্ট্রি শেখেনি। করিম যন্ত্রের পাশে বসে পাহারা দেয়। তানিয়া প্রযুক্তি ছেড়ে সেলাই মেশিনের যন্ত্রাংশ বিক্রি করে। জাহিদ চা বানায় এমন দোকানে যেখানে খদ্দের আসে না। সেলিনা খাতায় লেখে কারণ অ্যাপ কাজ করে না। মিতু একা একা কোড লেখে যেটা কেউ চায়নি। বেলাল গান গায় তিনশো সাবস্ক্রাইবারের জন্য। রশিদা নিজের টাকা নিজে গোনে।

কেউ সেই পথে যায়নি যেটা তাদের জন্য আঁকা হয়েছিলো।

তারা নিজেদের পথ বানিয়েছে। আঁকাবাঁকা, অসম্পূর্ণ, অপরিকল্পিত পথ। কোনো রিপোর্টে এই পথের কথা নেই। কোনো গ্রাফে এই পথ দেখা যায় না। কিন্তু পথ আছে। তারা হাঁটছে।

---

১২

রাত।

ঢাকায় রহিমা শুয়ে আছে। দিনের ক্লান্তি। সাইকেলের চেইন ঠিক করিয়েছে। পঞ্চাশ টাকা গেছে।

গাজীপুরে করিম বসে আছে। যন্ত্রের পাশে। সব সবুজ আলো। কোনো সমস্যা নেই। করিম বসে আছে।

ঢাকায় তানিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত বারোটার আগেই।

নেত্রকোনায় জাহিদ দোকান বন্ধ করেছে। চুলা নিভিয়েছে। বাকি চা ফেলে দিয়েছে। কাল আবার বানাবে।

ভোলায় সেলিনা খাতায় শেষ রোগীর নাম লিখেছে। খাতা বন্ধ করেছে। ব্যাগে রেখেছে।

রাজশাহীতে মিতু এখনো কোড লিখছে। স্ক্রিনের আলো মুখে। মা ঘুমিয়ে গেছেন। মিতু জেগে আছে।

চাঁদপুরে বেলাল ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল সকালে আবার গাইবে। নদীর ধারে না, বাড়িতে, নিজে নিজে।

নেত্রকোনায় রশিদা হিসাবের খাতা তাকে রেখেছে। আলো নিভিয়েছে। ঘুমাবে।

আটটা মানুষ। আটটা জীবন। কেউ কাউকে চেনে না, চেনে। কেউ কারো খবর রাখে না, রাখে। কেউ ভালো নেই, কেউ খারাপ নেই। সবাই আছে। টিকে আছে। নিজের মতো। নিজের নিয়মে।

---

এটাই কি অভিযোজন? নাকি এটা শুধু টিকে থাকা?

প্রশ্নটা শূন্যে ঝুলে থাকলো। কেউ উত্তর দিলো না। নেত্রকোনার মাঠে ঘুড়িটা পড়ে আছে। বাতাস থেমে গেছে। কাগজের শিরোনাম কাদায় মিশে যাচ্ছে। কাল সকালে ছেলেটা আবার আসবে। নতুন কাগজ দিয়ে নতুন ঘুড়ি বানাবে। ঘুড়ি আবার উড়বে। শিরোনাম আবার কেউ পড়বে না।