করিমের ছাদ
সিঁড়িগুলো গুনে গুনে ওঠে করিম। বাহাত্তরটা ধাপ। ছয়তলা বিল্ডিংয়ের ছাদ পর্যন্ত বাহাত্তরটা ধাপ। প্রতিটা ধাপে হাঁটু বলে, থামো। করিম থামে না। থামলে আর ওঠা হয় না।
তৃতীয় তলার ল্যান্ডিংয়ে একটু দাঁড়ায়। দম নেয়। দেয়ালে হেলান দেয়। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে, ইটের গা দেখা যায়। এই বিল্ডিংটা করিমের চেয়ে পুরোনো না, কিন্তু দেখতে পুরোনো লাগে। ঢাকার বিল্ডিং জন্মের পরপরই বুড়ো হয়ে যায়।
চতুর্থ তলায় শামীম ভাইয়ের বাসা থেকে রান্নার গন্ধ আসে। পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ। একটু আগে মাগরিবের আজান হয়েছে। সন্ধ্যার রান্না শুরু হয়ে গেছে সবার ঘরে।
পঞ্চম তলায় একটা বিড়াল বসে আছে সিঁড়ির কোণায়। চোখ বন্ধ করে বসে আছে, যেন ধ্যান করছে। করিম পাশ দিয়ে যায়। বিড়ালটা চোখ খোলে না।
ছাদের দরজাটা ঠেলে খোলে। মরচে ধরা কব্জায় শব্দ হয়। প্রতিদিন একই শব্দ। করিমের পরিচিত শব্দ এখন এটা, যেমন রংপুরে ভোরের মোরগের ডাক পরিচিত ছিলো।
ছাদে বাতাস আছে। মার্চের বাতাস। গরম শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু সন্ধ্যায় একটু ভালো লাগে। করিম ছাদের ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। উত্তর দিকে মুখ করে।
উত্তর দিকে রংপুর।
করিম জানে কোন দিকে রংপুর। কম্পাস দিয়ে মাপেনি কখনো। কিন্তু জানে। শরীরের ভেতরে একটা সুই আছে যেটা সবসময় উত্তরে টানে। রংপুরের দিকে টানে।
এখান থেকে দেখা যায় কংক্রিটের সমুদ্র। বিল্ডিংয়ের পর বিল্ডিং। মাঝে মাঝে একটা মিনার, একটা পানির ট্যাংকি, একটা টেলিভিশনের অ্যান্টেনা যেটা কেউ আর ব্যবহার করে না কিন্তু খোলেওনি। সব ধূসর। সন্ধ্যার আলোয় ধূসর রঙটা একটু নরম হয়, কিন্তু ধূসরই থাকে।
করিম মনে করে, এইখানে মাঠ ছিলো। অনেকদিন আগের কথা, যখন প্রথম ঢাকায় এসেছিলো। মিরপুরের এই দিকটায় কিছু জায়গা ফাঁকা ছিলো। ঘাস ছিলো। একটা পুকুর ছিলো, ওতে ছেলেপিলেরা সাঁতার কাটতো। সেই পুকুর ভরাট হয়ে গেছে কবে। তার উপরে এখন একটা দশতলা বিল্ডিং। বিল্ডিংয়ের নিচে মার্কেট। মার্কেটে মোবাইল ফোনের দোকান, জুতোর দোকান, একটা ফার্মেসি।
পুকুরটার পানিতে শাপলা ফুটতো কি না, করিম মনে করতে পারে না। হয়তো ফুটতো। হয়তো সেটা অন্য কোনো পুকুরের স্মৃতি, রংপুরের। স্মৃতি মিশে যায়। কোনটা কোথাকার, আলাদা করা যায় না।
---
ছাদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় একটা কার্নিশের খাঁজে একটা পায়রা বাসা বেঁধেছে। ঘাসের টুকরো, কাগজের ফালি, পলিথিনের সুতো দিয়ে বানানো বাসা। কতদিন থেকে আছে জানে না। একদিন দেখলো, একটা পায়রা বসে আছে। তারপর থেকে আছে।
করিম পকেট থেকে চাল বের করে। এক মুঠো চাল। সকালে হালিমাকে বলেছে, "একটু চাল রাখো আলাদা করে।" হালিমা জিজ্ঞেস করেনি কেন। চাল রেখে দিয়েছে একটা ছোট পলিথিনে।
পায়রাটা চাল দেখে কাছে আসে। ভয় পায় না করিমকে। অভ্যাস হয়ে গেছে। করিম চাল ছড়িয়ে দেয় কার্নিশের উপর। পায়রাটা খায়। ঠোকর দিয়ে দিয়ে খায়। মাথা ওঠে-নামে। করিম দেখে।
এটাই এখন তার একমাত্র পোষা জিনিস। পোষা বলা ঠিক না, পায়রা তো তার না। কিন্তু সে চাল দেয়, পায়রা খায়। এই সম্পর্কটুকুই আছে। রংপুরে গরু ছিলো একটা। ছাগল ছিলো দুটো। হাঁস ছিলো। সব গেছে। এখন একটা পায়রা আছে যেটা তার ছাদে এসে চাল খায়। এটুকুই।
---
হালিমা ছাদে আসে। দুই হাতে দুটো কাপ। চা। করিম পেছন ফিরে তাকায়। হালিমাও সিঁড়ি ভেঙে এসেছে। তারও হাঁটু ব্যথা করে, কিন্তু সে বলে না। করিম জানে।
"বসো।"
করিম বলে। ছাদে বসার কিছু নেই। একটা ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ার আছে, একটা ইটের স্তূপ। করিম ইটের উপর বসে। হালিমা চেয়ারে।
চা দেয়। করিম নেয়। গরম চা। চিনি একটু বেশি দিয়েছে হালিমা। করিম চিনি কম খায় এখন, ডাক্তার বলেছে কমাতে। কিন্তু হালিমা কমাতে পারে না। অভ্যাস। তিরিশ বছরের অভ্যাস।
চা খেতে খেতে করিম বলে, "এই শহরে মাটির গন্ধ নেই।"
হালিমা কিছু বলে না।
করিম বলে, "বৃষ্টি হলে রংপুরে মাটি থেকে একটা গন্ধ উঠতো। মনে আছে? প্রথম বৃষ্টির পরে। মাটি ভিজলে যে গন্ধ হয়।"
হালিমা বলে, "হ্যাঁ।"
"এইখানে বৃষ্টি হলে পানি জমে। গন্ধ হয়, কিন্তু সেটা নর্দমার গন্ধ। মাটির না।"
হালিমা চা খায়। চুপ করে থাকে। সে জানে এই কথা। করিম জানে সে জানে। তবু বলে। বলা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
হালিমাও মিস করে। ভোরবেলা উঠানে দাঁড়িয়ে মুখ ধোয়া, টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি, পাশের ক্ষেত থেকে ধানের গন্ধ আসা। সন্ধ্যায় উঠানে চাটাই পেতে বসা। আকাশে তারা দেখা। মিরপুরে আকাশে তারা দেখা যায় না। বিল্ডিংয়ের আলো, রাস্তার আলো, সব মিলে একটা কমলা রঙের কুয়াশা থাকে আকাশে। তারা লুকিয়ে যায় তার পেছনে।
কিন্তু হালিমা বলে না এসব। করিম বলে, সে শোনে। এতটুকুই।
---
একটা প্লেন যায় মাথার উপর দিয়ে। রাতের আকাশে দুটো আলো জ্বলছে, একটা লাল, একটা সাদা। শব্দ হচ্ছে, গোঙানির মতো শব্দ। করিম তাকিয়ে দেখে।
"জাহিদের ছেলে ইমরান কোথায় গেলো, শুনেছো?"
হালিমা বলে, "মালয়েশিয়া।"
"কবে গেলো?"
"মাস দুয়েক হলো।"
করিম প্লেনটার দিকে তাকিয়ে থাকে। প্লেনটা পূর্ব দিকে যাচ্ছে। মালয়েশিয়া পূর্বে। হয়তো ইমরানই আছে ওই প্লেনে। হয়তো অন্য কেউ। কী ফারাক। সবাই যায়। সবাই কোথাও না কোথাও যায়। জাহিদ গেছে, জাহিদের ছেলেও গেছে। করিমের নিজের ছেলে চট্টগ্রামে, মেয়ে গাজীপুরে। কেউ থাকে না। সবাই যায়।
করিমই থাকে। করিম আর হালিমা। আট বাই দশ ঘরে। মিরপুরে। সারা রাত পাহারা দেয়, সকালে ঘুমায়, বিকালে ওঠে, সন্ধ্যায় ছাদে আসে। এটাই জীবন। এটাই স্বাভাবিক এখন।
আগে স্বাভাবিক অন্যরকম ছিলো। রংপুরে জমি ছিলো, অল্প হলেও ছিলো। সেই জমি বন্যায় গেছে, মামলায় গেছে, শেষে বিক্রি হয়ে গেছে। তারপর ঢাকা। ঢাকায় এসে প্রথমে রিকশা চালিয়েছে, তারপর গার্মেন্টসের গেটে দাঁড়িয়েছে, তারপর এই নৈশ প্রহরীর কাজ পেয়েছে। আঠারো বছর ধরে এই কাজ করছে। রাতে বিল্ডিংয়ের গেটে বসে থাকে। একটা লাঠি আছে। একটা টর্চ আছে। একটা ছোট ট্রানজিস্টর আছে যেটা এখন আর কাজ করে না।
বিল্ডিংয়ের মালিক গত বছর একটা ক্যামেরা লাগিয়েছে গেটে। ক্যামেরাটা চব্বিশ ঘণ্টা রেকর্ড করে। মালিক ফোনে দেখতে পারে কে আসছে, কে যাচ্ছে। করিম জানে, এই ক্যামেরা একদিন তাকে বেকার করে দেবে। মালিক ভাববে, ক্যামেরা আছে, পাহারাদারের দরকার কী। সেদিন আসবে। হয়তো এসেও গেছে প্রায়। কিন্তু করিম ভাবে না সেকথা। ভাবলে রাতে ঘুম হয় না, যেটুকু ঘুম হয় সকালে।
---
ঘরে ফিরে আসে দুজনে। সিঁড়ি নামতে সহজ, উঠতে কষ্ট। করিম ধীরে ধীরে নামে। হালিমা আগে যায়।
ঘরটা আট বাই দশ। একটা খাট, একটা আলনা, একটা রান্নার কোণা। রান্নার কোণায় একটা গ্যাসের চুলা, দুটো হাঁড়ি, তিনটা প্লেট, দুটো গ্লাস। দেয়ালে একটা পাখা, সিলিংয়ে আরেকটা। জানালা একটাই, সেটাও পাশের বিল্ডিংয়ের দেয়ালের দিকে। আলো আসে না। দিনেও বাতি জ্বালাতে হয়।
খাটের নিচে দাওটা আছে।
করিম জানে ওটা ওখানে আছে। সরায়নি। সরাবেও না। দাওটা রংপুর থেকে এনেছিলো। আসার সময় আর কী এনেছিলো? কিছু কাপড়, একটা থালা, হালিমার সিঁদুরের কৌটা, আর এই দাওটা। ভেবেছিলো, ঢাকায় কাজে লাগবে। লাগেনি। ঢাকায় দাও দিয়ে কী করবে? গাছ নেই কাটার, বাঁশ নেই ফাঁড়ার, মাছ ধরার নদী নেই।
দাওটার হাতল ভেঙে গেছে কবে। করিম ভেবেছিলো ঠিক করবে। নতুন হাতল লাগাবে। কিন্তু করেনি। বছরের পর বছর ভেবেছে, করেনি। এখন আর করবে না। সে জানে। ষাট পার হয়ে গেছে, হাঁটু ব্যথা করে, সিঁড়ি উঠতে পারে না ঠিকমতো, দাওয়ের হাতল কে ঠিক করবে? কার জন্যই বা করবে?
দাওটা এখন যন্ত্র না। যন্ত্র হলে কাজ করতো। এটা এখন একটা জিনিস যেটা রংপুর থেকে এসেছে। ব্যস। এটুকুই এর পরিচয়। রংপুরের একটা জিনিস। খাটের নিচে পড়ে আছে, ধুলো জমেছে, মরচে ধরেছে। কিন্তু আছে। করিম ফেলে দেয়নি। ফেলে দেবেও না।
কিছু জিনিস ফেলা যায় না। কাজে না লাগলেও ফেলা যায় না।
---
রাত নয়টায় করিম পাহারায় বেরোয়। হালিমা দরজা বন্ধ করে। ভেতরে শব্দ হয়, হালিমা খাটে শুয়ে পড়ে। করিম জানে, হালিমা ঘুমাবে না এখনই। শুয়ে থাকবে। ভাববে। কী ভাবে হালিমা? করিম জানে না। কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি। কিছু কিছু জিনিস জিজ্ঞেস করতে নেই।
গেটে গিয়ে বসে। চেয়ারটা প্লাস্টিকের, হাতল ভাঙা। লাঠিটা পাশে রাখে। ক্যামেরার লাল আলোটা জ্বলছে, মিটমিট করে। করিম ক্যামেরার দিকে তাকায় না। ক্যামেরা তার দিকে তাকায়।
রাস্তায় এখনো মানুষ আছে। রিকশা যাচ্ছে, বাইক যাচ্ছে, একটা ট্রাক গেলো ভারী শব্দ করে। মিরপুরের রাত কখনো চুপ হয় না। কোথাও না কোথাও শব্দ থাকে। রংপুরে রাত চুপ ছিলো। এতটাই চুপ যে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যেতো, দূরের কুকুরের ডাক শোনা যেতো, বাতাসে বাঁশের পাতার শব্দ শোনা যেতো।
এখানে কিছু শোনা যায় না। সব শব্দ মিলে একটা বড় শব্দ হয়ে যায়, সেই বড় শব্দের ভেতরে কোনো আলাদা শব্দ নেই। শুধু গর্জন। শহরের গর্জন।
করিম চোখ বন্ধ করে। চোখ বন্ধ করলে কখনো কখনো রংপুর দেখতে পায়। সবসময় না। কখনো কখনো। আজ দেখতে পায় একটা মাঠ। মাঠের ধারে একটা তালগাছ। তালগাছের নিচে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা সে নিজে, অনেকদিন আগের। পায়ে চটি নেই। গায়ে একটা ময়লা গেঞ্জি। হাতে একটা দাও। দাওটার হাতল তখন ভাঙেনি।
চোখ খোলে।
ক্যামেরার লাল আলোটা এখনো জ্বলছে। রাস্তায় একটা কুকুর হেঁটে যাচ্ছে। রাতের ঢাকা।
করিম বসে থাকে। সারারাত বসে থাকবে। সকালে ঘুমাবে। বিকালে উঠবে। সন্ধ্যায় আবার ছাদে যাবে। পায়রাকে চাল দেবে। উত্তর দিকে তাকাবে। হালিমা চা আনবে।
এটাই স্বাভাবিক। নতুন স্বাভাবিক।
---
অনেক রাতে, শহর যখন একটু থামে, করিম গেটের চেয়ারে বসে ভাবে, এই শহরটা তাকে কিছু দিয়েছে কি? একটা চাকরি দিয়েছে। একটা আট বাই দশ ঘর দিয়েছে। ছেলেমেয়েদের বড় করার জায়গা দিয়েছে। এটুকুই। আর কিছু দেয়নি। মাটি দেয়নি, আকাশ দেয়নি, নিরিবিলি দেয়নি। এই শহরে সব আছে, শুধু জায়গা নেই। মানুষের জন্য জায়গা নেই। শ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই।
কিন্তু করিম যাবে না। যাওয়ার জায়গাও নেই আর। রংপুরে জমি নেই, ঘর নেই। যে মাঠে দাঁড়িয়ে তালগাছ দেখতো, সেই মাঠও আর আগের মতো নেই। চাচাতো ভাই ফোনে বলে, "সব বদলে গেছে। তুমি চিনতেই পারবে না।" করিম চিনতে চায়ও না। যে রংপুর তার মনে আছে, সেটাই থাক। আসল রংপুর দেখলে সেই স্মৃতিটাও নষ্ট হয়ে যাবে।
তাই করিম থাকে। ঢাকায় থাকে। এই আট বাই দশ ঘরে থাকে। ছাদে যায়। পায়রাকে চাল দেয়। উত্তর দিকে দাঁড়ায়।
কোনো কোনো সন্ধ্যায় পায়রাটা কার্নিশে বসে থাকে, চাল খায় না। শুধু বসে থাকে। করিমও দাঁড়িয়ে থাকে। দুজনে চুপ করে থাকে। নিচে শহর গর্জন করে। উপরে আকাশ কমলা হয়ে থাকে। তারা নেই।
হালিমা চা নিয়ে আসে। করিম চা নেয়। একটু চিনি বেশি। কিছু বলে না।
পায়রাটা ডানা ঝাপটায়। উড়ে যায়। আবার ফিরে আসে। বাসাটা ওর এখানে।
করিমেরটাও।